খাদ্যজাল ও খাদ্যশৃঙ্খলের পারস্পরিক সম্পর্ক বুঝিয়ে দাও।
খাদ্যশক্তি যে ক্ৰমিক পর্যায়ে উৎপাদক থেকে ভক্ষক এবং ভক্ষিত সম্পর্কযুক্ত বিভিন্ন প্রাপীগােষ্ঠীর মধ্যে প্রবাহিত হয়, তাকে খাদ্যশৃঙ্খল বলে। সাধারণত খাদ্য খাদকের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত 35টি জীব মিলে একটি খাদ্যশৃঙ্খল গঠন করে। বাস্তুতন্ত্রের এই খাদ্যশৃ্খলগগুলি পরস্পর যুক্ত হয়ে শক্তিপ্রবাহের জটিল জালকাকার সংগঠন গড়ে তােলে| একে খাদ্যজাল বা খাদ্যজালক বলে। অর্থাৎ, বাস্তুতন্ত্রে খাদ্যশৃঙ্খলের আন্তঃসম্পর্কে খাদ্যজালক গঠিত হয়। অর্থাৎ, খাদ্যজালকের গঠনগত একক হল কতকগুলি খাদ্যশৃঙ্খল |
খাদ্যজালের গুরুত্ব লেখাে।
খাদ্যজালের গুরুত্বগুলি হল—
1. খাদ্যজালের থেকে বাস্তুতন্ত্র সম্বন্ধে ধারণা করা যায়। এটি জটিল হলে তা বাস্তুতন্ত্রকে স্থায়িত্ব প্রদান করে।
2. খাদ্যজাল থাকায় কোনাে জীব লুপ্ত হলেও বাস্তুতন্ত্র ওই পুষ্টিস্তরের অন্য জীব দিয়ে চালিত হয়।
এনার্জি-ফ্লো বা শক্তিপ্রবাহ কী? অথবা, বাস্তুতন্ত্রে শক্তিপ্রবাহ বলতে কী বােঝ?
খাদ্যশৃঙ্খলে উৎপাদক থেকে ক্রমপর্যায়ে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন * পুষ্টিস্তরের খাদ্য খাদক সম্পর্কযুক্ত জীবগােষ্ঠীর মধ্যে শক্তির (খাদ্যশক্তির) একমুখী স্থানান্তর বা প্রবাহকে এনার্জি-ফ্লো বা শক্তিপ্রবাহ বলা হয়।
বাস্তুতন্ত্রের শক্তিপ্রবাহের দুটি বৈশিষ্ট্য লেখাে।
বাস্তুতন্ত্রের শক্তিপ্রবাহের দুটি বৈশিষ্ট্য হল—
1. বাস্তুতন্ত্রে শক্তিপ্রবাহ একমুখীভাবে ঘটে থাকে। অর্থাৎ, উৎপাদক দ্বারা আবদ্ধ সৌরশক্তি বিভিন্ন স্তরের খাদকের মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়। কিন্তু বিপরীত অভিমুখে কখনােই প্রবাহিত হয় না।
2. বাস্তুতন্ত্রে প্রবাহিত সকল শক্তির উৎস হল সূর্য।
বাস্তুতন্ত্রে শক্তিপ্রবাহকে একমুখী হয় কেন?
বাস্তুতন্ত্রে শক্তি খাদ্যের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমিকভাবে উৎপাদক থেকে বিয়ােজকে প্রবাহিত হয়, কিন্তু সেই শক্তি পুনরায় উৎপাদকে ফিরে আসে না,তাপশক্তিরূপে পরিবেশে মুক্ত হয়। অর্থাৎ, শক্তির প্রবাহ একমুখী হয়।
শক্তির 10% সূত্র বলতে কী বােঝ? অথবা, রেমন্ড লিন্ডেম্যানের দশ শতাংশ সূত্র কাকে বলে?
বাস্তুতন্ত্রের প্রতিটি ট্রফিক স্তর বা পুষ্টিসুরে যে শক্তি এসে পৌঁছায় তার 10% পরবর্তী পুষ্টিভরে যায়,বাকি অংশ ওই পুষ্টিগুরের জীবেদের বিভিন্ন জৈবনিক ক্রিয়া পরিচালনায় ব্যবহৃত হয়। এইভাবে আবার পরবর্তী স্তরে পূর্ববর্তী সুরের 10% শক্তি প্রবাহিত হয়। একেই শক্তির 10% সূত্র বলে। বিজ্ঞানী লি্ডেম্যান বাস্তুতন্ত্রে শক্তিপ্রবাহ সংক্লান্ত এই সূত্রের প্রবত্তা।
বাস্তুতন্ত্রের সার্বিক উৎপাদন বলতে কী বােঝ? অথবা, GP কী?
উদ্ভিদের সালােকসংশ্লেষ পদ্ধতির মাধ্যমে সর্বমােট যে পরিমাণ শক্তি কোনাে বাস্তুতন্ত্রে আবদ্ধ হয় তাকে সার্বিক উৎপাদন বা গ্রস প্রােডাকশন (GP) বলে।
প্রকৃত উৎপাদন কাকে বলে? অথবা, NP কী?
উদ্ভিদদেহের সার্বিক উৎপাদনের থেকে শ্বসন ও অন্যান্য জৈবনিক কার্য সম্পাদনের পর যে পরিমাণ শক্তি অবশিষ্ট থাকে তাকে প্রকৃত উৎপাদন বা নিট উৎপাদন (NP) বলে।
NP < GP হয় কেন?
সার্বিক উৎপাদনের (GP) কিছু অংশ জৈবনিক কাজে ব্যবহৃত (R) হয়ে গেলে বাকিটা প্রকৃত উৎপাদন (NP) সূচিত করে।
অর্থাৎ, GP- R = NP , এই জন্য NP < GP হয়ে থাকে।
GP - R = NP সমীকরণটি ব্যাখ্যা করাে।,
উৎপাদক দ্বারা সালােকসংশ্লেষের মাধ্যমে মােট আবদ্ধ শক্তি বা GP- এর কিছু অংশ উৎপাদকের শ্বসন, রেচন ও অন্যান্য জৈবিক কার্যে ব্যবহৃত হয়। এই ব্যয়িত শক্তিকে 'R' দ্বারা সূচিত করা হয়। অবশিষ্ট শক্তি উৎপাদকের দেহ গঠনের কাজে লাগে বা দেহে অবশিষ্ট থাকে। একে নিট উৎপাদন বা NP বলে| অর্থাৎ, GP R = NP |
শক্তিপ্রবাহের সাথে তাপগতিবিদ্যার সম্পর্ক লেখাে।
বাস্তুতন্ত্রে শক্তিপ্রবাহতে তাপগতিবিদ্যার প্রথম ও দ্বিতীয় সূত্র প্রযােজ্য হয় -
1. শক্তির সৃষ্টি বা বিনাশ নেই, কেবল একপ্রকার শক্তি অন্য শক্তিতে রূপান্তরিত হতে পারে (প্রথম সূত্র)। অর্থাৎ, বাস্তুতন্ত্রে শক্তিপ্রবাহের ক্ষেত্রে সূর্যের সৌরশক্তি স্থিতিশক্তিরূপে খাদ্যে আবদ্ধ হয়। এই স্থিতিশক্তিই বিভিন্ন পুষ্টিস্তরে বাহিত হয়।
2. একপ্রকার শক্তি যখন অন্য শক্তিতে রূপান্তরিত হয় তখন কিছু শক্তির অপচয় ঘটে (দ্বিতীয় সূত্র)। এই কারণেই বাস্তুতন্ত্রে বিভিন্ন পুষ্টিস্তরে সঞ্চিত শক্তির পরিমাপের ক্রমিক অবনতি ঘটে।
পরিপােষক কাকে বলে ?
জৈব বা অজৈব বস্তু যা জীবের বৃদ্ধি ও বিপাকে পুষ্টি জোগান দেয়, তাকেই পরিপােষক বলে। যেমন-C, H, 0, N, Mg. Fe, S, P, Na, Ca ইত্যাদি।
পরিপােষক চক্র বলতে কী বােঝ ?
যে চক্রাকার পথে পরিপােষকসমূহ পরিবেশ থেকে জীবদেহে এবং জীবদেহ থেকে পুনরায় পরিবেশে ফিরে এসে উপাদানগুলির সাম্যাবস্থা বজায় রাখে, তাকে পরিপােষক চক্র বলে। কেন নাইট্রোজেন পরিপােষক চক্র।
পরিপােষক চক্রের প্রকারভেদগুলি কী কী?
পরিপােষকের প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে পরিপােষক চক্র তিন প্রকার। যেমন -
1. জলচক্র: জলচক্রের উপাদান হল জল যা ভূপৃষ্ঠ ও বায়ুমণ্ডলের মধ্যে চক্রাকারে আবর্তিত হয়।
2. গ্যাসীয় চক্র: নানা প্রকার বায়ব গ্যাস, যেমন- অক্সিজেন, নাইট্রোজেন ও কার্বন প্রভৃতি চক্রাকারে আবর্তিত হয়। এদের গ্যাসীয় চক্র বলে।
3. অধঃক্ষেপণ চক্র: বিভিন্ন ধরনের খনিজ উপাদান যেমন- ফসফরাস, সালফার প্রভৃতি অধঃক্ষিপ্ত হয়ে পাথরে জমা হয় এবং জলে দ্রবীভূত হয়ে অধঃক্ষেপণ চক্র তৈরি করে। যেমন- ফসফরাস চক্র, সালফার চক্র।
পরিপােষক চক্রের গুরুত্ব কী?
পরিপােষক চক্রের গুরুত্বগুলি হল—
a. পরিপােষক চক্রের মাধ্যমে কার্বন, অক্সিজেন, নাইট্রোজেন, ফসফরাস প্রভৃতি মৌলগুলি জীবদেহে প্রবেশ করে এবং তাদের মৃত্যুর পর মৌলগুলি পরিবেশে ফিরে যায়, ফলে তা পুনরায় ব্যবহৃত হতে পারে।
b. পরিপােষক চক্রের মাধ্যমে পরিপােষক উপাদানগুলি প্রকৃতিতে চক্রাকারে আর্বতিত হয় বলে পরিবেশে এদের ভারসাম্য বজায় থাকে |
পরিপােষক চক্রকে জৈব ভূ-রাসায়নিক চক্র বলে কেন?
পরিপােষক চক্রকে জৈব ভূ-রাসায়নিক চক্র বলার কারণ -
1. পরিপােষক চক্রে জীব অংশগ্রহণ করে, তাই এটি জৈব চক্র।
2. শিলা, মৃত্তিকা প্রভৃতি ভৌগােলিক উপাদান এর অন্তর্ভুক্ত বলে এটি ‘ভূ-চক্র'।
3. পরিপােষকগুলি বিভিন্ন রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অংশ নেয়। তাই এটি রাসায়নিক চক্র। সেই কারণে সম্মিলিতভাবে পরিপােষক চক্রকে জৈব ভূ-রাসায়নিক চক্র।
