Class 9 Bengali Chapter 10 (আবহমান) সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর

‘কে এইখানে হারিয়ে গিয়েও আবার ফিরে আসে’ – উদ্ধৃতাংশটির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো। 

অথবা, 

‘কে এইখানে হারিয়ে গিয়েও আবার ফিরে আসে' —কে হারিয়ে গিয়েও আবার ফিরে আসে কেন বুঝিয়ে দাও। 

উত্তর: ‘আবহমান' কবিতায় কবি গ্রামছাড়া-দেশত্যাগী মানুষের অন্তর্মনের আকুলতাটিকে ফুটিয়ে তুলেছেন। গ্রামীণ প্রকৃতির উন্মুক্ত শ্যামলিমায়, অনুরাগ ও একাত্মতায় কাটানো শৈশব-স্মৃতির অচ্ছেদ্য বন্ধন তাকে আলোড়িত করে। আজন্ম চেনা উঠান, লাউমাচা, ছোট্ট ফুলের স্বপ্নময় দোদুল্যমানতার আহ্বানবার্তা, মাতৃভূমি-হারা মানুষটিকে ফিরতে অনুপ্রাণিত করেছে। তাই নিজের হারিয়ে যাওয়া শিকড়ের অমোঘ আকর্ষণেই সে স্বভূমিতে আবার ফিরে আসতে উদ্বুদ্ধ হয়েছে। 



'এই মাটিকে এই হাওয়াকে আবার ভালোবাসে'। —বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?

 ‘অথবা, 

'এই মাটিকে এই হাওয়াকে আবার ভালোবাসে। –‘মাটি’ ও ‘হাওয়া’ বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন? তাকে ভালোবাসার কারণ কী? 

উত্তর: প্রশ্নে উদ্ধৃত অংশে মাতৃভূমিহারা মানুষের চিরকালীন আবেগ ও ভালোবাসার কথা ধ্বনিত হয়েছে। পল্লিপ্রকৃতির কোনো এক নিভৃত অন্তরে নিবিড় অনুরাগে তারা ঘর বেঁধেছিল। সেখানকার উঠান-লাউমাচা-ছোটো ফুল-ঘাসের প্রাণময় গন্ধ-বাগানের শুভ্র কুন্দফুলের হাসি অর্থাৎ হাওয়া ও মাটির অমোঘ আকর্ষণই তাকে বিচ্যুত স্বদেশে ফিরিয়ে আনে। কেননা শৈশবের স্মৃতিবিজড়িত জন্মস্থানের মাটি-হাওয়ার চিরন্তন আহ্বানের আর্তি তার নির্বাসিত ব্যক্তিমনকে অফুরান মুক্তির আকুলতায় জীবনভর জাগিয়ে রাখে। 



‘ফুরয় না তার কিছুই ফুরয় না'— উদ্ধৃতাংশটির তাৎপর্য বুঝিয়ে লেখো। 

উত্তর: উদ্ধৃতাংশটি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর ‘আবহমান’ কবিতার অংশবিশেষ। নাগরিক স্বাচ্ছন্দ্যের হাতছানিতে মানুষের গ্রাম ছেড়ে নগরযাত্রা আজও বিদ্যমান, কিন্তু কিছুটা সময় অতিবাহিত হওয়ার পর নাগরিক সভ্যতায় ক্লান্ত হয়ে মানুষ চায় মুক্তি। কবি সেইসব মানুষদের যারা এক সময় গ্রাম বাংলার প্রকৃতিকে গভীর ভাবে ভালোবেসে নিবিড় অনুরাগে ঘর বেঁধেছিল, তাদের পুনরায় ফিরে আসাকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাদের অভয় দিতে তিনি প্রশ্নোদ্ধৃত উক্তিটি করেছেন। অর্থাৎ তাদের শৈশবের লীলাভূমি আজও অটুট আছে।



‘ফুরয় না তার যাওয়া এবং ফুরয় না তার  আসা' - যাওয়া এবং আসা ফুরায় না কেন? 

উত্তর: বড়ো হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জীবনের প্রয়োজনে মানুষ তার স্বভূমি থেকে বিচ্যুত হয়। শৈশবের সেই আনন্দময় খেলাঘর থেকে সে বহু দূরে চলে যায়। কিন্তু নির্বাসিত মন পড়ে থাকে শৈশবের সেই ফেলে আসা বিচরণভূমিতে, যেখানে সে একদিন নিবিড় অনুরাগে বাঁধা পড়েছিল। সেই অনুরাগে প্রতিটি মানুষই বারবার, রূঢ় নাগরিকতা-ক্লিষ্ট বর্তমান থেকে শৈশবের হারানো প্রকৃতিলালিত জগতের অন্তর্লোকে ফিরে যায়। নির্বাসিত ব্যক্তিমনের যাওয়া-আসার এই অন্তহীন মানসযাত্রাই এখানে প্রকাশিত হয়েছে। 



‘নটেগাছটা বুড়িয়ে ওঠে, কিন্তু মুড়য় না।'— ‘নটে গাছ’ বুড়িয়ে ওঠে কেন? তা ‘মুড়য় না’ বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন? 

‘অথবা, 

‘নটেগাছটা বুড়িয়ে ওঠে, কিন্তু মুড়য় না'। উদ্ধৃতাংশটির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো।

‘অথবা, 

‘নটেগাছ মুড়য় না'— এই অনুভূতি কোন্ ভাবসত্যকে প্রকাশ করে, কবিতা অবলম্বনে ব্যাখ্যা করো। 

উত্তর: উদ্ধৃতাংশটি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর আবহমান কবিতায় অংশবিশেষ। লোককাহিনির গল্প শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে নটেগাছটি মুড়িয়ে যায়। এক্ষেত্রে কিন্তু নটেগাছটি মুড়িয়ে যায় না কিন্তু বুড়িয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে; একটা চিরন্তন প্রবাহমানতার কথা এক্ষেত্রে ফুটে উঠেছে। কালের নিয়মে মানুষ শৈশব থেকে বার্ধক্যে উপনীত হয় কিন্তু প্রকৃতি লালিত আজন্মচেনা উঠোন লাউমাচা-কুন্দফুল সন্ধ্যা নদীর হাওয়ায় পরিপূর্ণ মাতৃভূমির স্বরূপ স্মৃতিপট থেকে বিস্মৃত হয়ে যায় না। তাই ব্যক্তির বার্ধক্য স্মৃতিকে শেষ করতে পারে না বোঝাতেই এমন উক্তি। 



‘ফুরয় না সেই একগুঁয়েটার দুরন্ত পিপাসা' —‘একগুঁয়েটার দুরন্ত পিপাসা' বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন? তা ফুরোয় না কেন? 

উত্তর: প্রদত্ত উদ্ধৃতাংশে কবি স্বভূমিচ্যুত ব্যক্তিমনের একরোখা মানসিক জেদকে বোঝাতে ‘একগুঁয়ে’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। 

→ স্মৃতিতাড়িত মানুষের আপন জন্মের আঙিনায় ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা চিরদিনের। তাই মাতৃভূমির 'নিবিড় অনুরাগ’কে হৃদয়ে অনুভব করার ব্যাকুলতা মূর্ত হয়ে ওঠে ‘দুরন্ত পিপাসা’ শব্দবন্ধের মাধ্যমে। নিজ জন্মভূমির নদী-হাওয়া-মাটির সঙ্গে মানুষের শিকড়ের বাঁধন। আজন্ম-চেনা প্রকৃতিলোকে ফিরে যাওয়ার আনন্দ যেন নির্বাসিত নাগরিক মনের ছিন্নমূল হওয়ার বেদনার উপশম ঘটায়। তাই ‘একগুঁয়ে ব্যক্তিমনের’ ‘দুরন্ত পিপাসা’ কখনও মেটে না।



'সারাটা দিন আপন মনে ঘাসের গন্ধ মাখে', – প্রসঙ্গ উল্লেখ করে এমন কথা বলার তাৎপর্য বুঝিয়ে দাও। 

অথবা, 

‘সারাটা দিন আপন মনে ঘাসের গন্ধ মাখে' – এখানে ‘ঘাসের গন্ধ’ কীসের প্রতীক হয়ে উঠেছে ব্যাখ্যা করো। 

উত্তর: প্রদত্ত উদ্ধৃতাংশে কবি প্রকৃতি ও মাতৃভূমিহারা মানুষের অচ্ছেদ্য নিবিড়তার কথা ফুটিয়ে তুলেছেন। গ্রামছাড়া, নির্বাসনের যন্ত্রণায় ক্লিষ্ট মানুষটি আবেগবিহ্বল হয়ে সবুজ ঘাসের মাতৃত্বের উষ্ণতায় পরিপূর্ণ আদুরে স্পর্শে আবিষ্ট হয়। সে ঘাসের অনাবিল গন্ধ প্রাণভরে শরীর ও মনে মেখে নির্বাসনের বেদনার্ত অনুভূতির উপশম খুঁজে পায়। এখানে ঘাসের গন্ধ আসলে, নিজের শিরা-ধমনি ও রক্তের মধ্যে প্রবাহিত আজন্ম চেনা প্রকৃতি-লালিত পরিপার্শ্বের প্রিয় নিজস্বতার গন্ধের প্রতীক হয়ে উঠেছে। 



'সারাটা রাত তারায় তারায় স্বপ্ন এঁকে রাখে।' –উদ্ধৃতাংশটির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো। 

অথবা, 

‘সারাটা রাত তারায় তারায় স্বপ্ন এঁকে রাখে'। –কে স্বপ্ন আঁকে? কেন?  

উত্তর: প্রশ্নে উদ্ধৃত অংশে কবি শহরে নির্বাসিত ব্যক্তিমনের স্মৃতিমেদুরতার স্বরূপ উন্মোচন করেছেন। আজন্ম চেনা নদী-হাওয়া-মাটির অন্তর্লীন অনুভূতির শিকড় সত্তার গভীরে বহমান। তাই ছিন্নমূল মানুষ তার প্রিয় প্রকৃতিলোকে পুনরায় ফেরার ব্যাকুলতায় অস্থির হয়। এই ব্যাকুলতার তীব্রতায় অন্ধকার রাতের নির্জন প্রহরে সে একাকী এক স্বপ্নে পাড়ি দেয়। সে ফেলে আসা অতীতের সুখস্মৃতি এবং তা ফিরে না পাওয়ার অপূর্ণ বাসনা-সম্বল নানান ছবি যেন সুদূর তারায় তারায় এঁকে চলে নিজস্ব খেয়ালে। 



‘নেভে না তার যন্ত্রণা যে, দুঃখ হয় না বাসি', -যন্ত্রণা নেভে না কেন? 'দুঃখ হয় না বাসি' বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন? 

অথবা, 

‘নেভে না তার যন্ত্রণা যে, দুঃখ হয় না বাসি', —উদ্ধৃতাংশটির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো। 

উত্তর: উদ্ধৃত পঙ্ক্তিটিতে মাতৃভূমি থেকে তার সন্তানের বিচ্ছেদজনিত বেদনা বা যন্ত্রণার কথা বলা হয়েছে। আজন্ম চেনা প্রকৃতির অঙ্গন থেকে বিচ্যুতি ও নির্বাসনের বেদনা অন্তহীন। তাই যন্ত্রণা নেভে না। 

→ ‘বাসি’ শব্দটির অর্থ ‘টাটকা’ নয় অর্থাৎ আজকের নয়। 'কবি দুঃখ হয় না বাসি' কথাটির মধ্যে দিয়ে বলতে চেয়ে মাতৃভূমি থেকে বিচ্ছেদজনিত বেদনা যেমন উভয়ের মনেই সজীব থাকে ঠিক অনুরূপভাবে জন্মভূমি ছাড়ায় বেদনাও সর্বদা মানসপটে সজীব হয়ে থাকে।



‘হারায় না তার বাগান থেকে কুন্দফুলের হাসি'। –কুন্দফুলের হাসি হারায় না বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন? 

অথবা, 

‘হারায় না তার বাগান থেকে কুন্দফুলের হাসি'। এখানে কোন্ জীবনসত্য প্রতিভাত হয়েছে লেখো। 

উত্তর: ‘আবহমান’ কবিতায় মাতৃভূমি ও তার সন্তানের দুঃখ-যন্ত্রণার আকুলতার পাশেই কবি কুন্দফুলের চিরকালীন অনাবিল হাস্যময় অবস্থানের ছবি এঁকেছেন। এখানে শুভ কুন্দফুল যেন প্রকৃতির চিরন্তনতা ও বিশুদ্ধতাকে প্রতীকায়িত করে। নাগরিক কৃত্রিমতার আগ্রাসনে পঙ্গু ব্যক্তিমনের দর্পণে কুন্দফুল যেমন ফেলে আসা শৈশবের আনন্দঘন মুহূর্তের দ্যোতক তেমনই প্রকৃতি এবং মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের সুখময়তার চিহ্ন। নদী, জল, হাওয়া, ফুলের মতো অবিনশ্বর প্রকৃতির নানান অনুষঙ্গে সুখাবহতার এই চিরায়ত রেশ নিহিত থাকে বলেই তা কখনো হারায় না। এখানে জীবনের এই গভীর সত্যই মূর্ত হয়ে উঠেছে। 



‘তেমনি করেই সূর্য ওঠে, তেমনি করেই ছায়া '| নামলে আবার ছুটে আসে সান্ধ্য নদীর হাওয়া' —উদ্ধৃতাংশটির অন্তর্নিহিত অর্থ বা তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো। 

অথবা, 

সূর্য, ছায়া এবং সান্ধ্য নদীর হাওয়াকে অবলম্বন করে কবি কোন্ গূঢ় অর্থ ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন লেখো। 

উত্তর: ‘আবহমান' কবিতায় প্রাকৃতিক নিয়ম ও ঘটনার চিরন্তনতার ছবি ধরা পড়ে। তাই প্রকৃতিলোকের শাশ্বত | বহমানতার দৃশ্য কখনো বদলায় না। সূর্যের সৌরকরোজ্জ্বলতার পাশেই ছায়াময় আঁধারের মন্থর গাম্ভীর্য যেমন ফিরে ফিরে আসে, তেমনই ঘনায়মান ছায়ার বুক চিরে দুরন্ত উচ্ছ্বাসে ছুটে আসে নদীর হৃদয় উজাড় করা সান্ধ্য বাতাস। এসবই আবহমানকালের। মায়াময় প্রকৃতির এই সমস্ত আজন্ম-চেনা অনুষঙ্গ নির্বাসিত ব্যক্তিমনে চিরকালীন মুক্তির আবেদন জাগায়। আলোচ্য উদ্ধৃতাংশে মাতৃভূমি-স্বরূপ প্রকৃতির শাশ্বত চলমানতা এবং মানুষের অন্তর্মনে তার মমত্বেপূর্ণ আকুল আর্তির আবহমানতা যে চিরন্তন সত্য সেই নিগূঢ় ব্যঞ্জনাই প্রকাশিত হয়েছে। 



'ছোট্ট একটা ফুল দুলছে, ফুল দুলছে, ফুল, -বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন? 

উত্তর: প্রশ্নে উদ্ধৃত অংশে মাতৃভূমির সঙ্গে সন্তানের চিরকালীন সম্পর্কের অন্তলীন দ্যোতনা মূর্ত হয়ে উঠেছে। এখানে রূঢ় নাগরিকতা-ক্লিষ্ট বর্তমানে দাঁড়িয়ে নির্বাসিত ব্যক্তিমনের স্মৃতিতাড়িত আবেগ-বিহ্বলতার ছবি ধরা পড়ে। প্রকৃতি-লালিত পরিপার্শ্বের নানান আনন্দঘন মুহূর্ত; ফেলে আসা মাতৃভূমির আহ্বানধ্বনির মতো মনের মধ্যে ফিরে ফিরে আসে। মানসিক সেই আশ্রয়ভূমির অমোঘ চিরকালীন মুহূর্তের ব্যাকুলতা যেন মর্মে দোলা দিয়ে যায়। আপন মানসপটে স্মৃতির সেই ফুল দোলা বা আলোড়নের কথাই কবি ব্যক্ত করেছেন।