Class 9 Bengali Chapter 12 (ভাঙার গান) সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর

 ‘গাজনের বাজনা বাজা’ – ‘গাজন’ কী? কবি কেন গাজনের বাজনা বাজাতে বলেছেন? 

উত্তর: ‘গাজন' বলতে আমরা চৈত্র মাসের সংক্রান্তিতে ও পালিত বাংলার লৌকিক উৎসবকে বুঝি। মূলত শিবঠাকুরকে। কেন্দ্র করেই এই উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। গাজন উৎসবের সাথে গোঁড়া হিন্দুধর্মের আচার অনুষ্ঠানের কোনো যোগ নেই। সংস্কৃতে একে ‘কালাক রুদ্র পূজা’ বলে যার অর্থ কাল সদৃশ ভীষণ অর্ক বা সূর্যের পূজা। এই উৎসবে ঢাক-ঢোলের গগনভেদী বোল ওঠে। 

→ কবি এ কথা বলার মধ্যে দিয়ে পরাধীন ভারতের তরুণ বিপ্লবীদের কাছে বার্তা দিতে চেয়েছেন যে তারা যেন একাত্ম হয়ে গাজনের বাজনার মতো তীব্র বোল তুলে সংগ্রামী পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। 



'কে মালিক? কে সে রাজা? | কে দেয় সাজা'—এখানে ‘মালিক’ ও ‘রাজা’ বলতে কবি কাদের বুঝিয়েছেন? কাকে সাজা দেওয়া যায় না? 

উত্তর: ‘ভাঙার গান’ কবিতায় কবি ‘মালিক’ বলতে শাসক ও শাসকের অনুগত ধনিক শ্রেণি এবং 'রাজা' বলতে রাজতন্ত্রের প্রতিভূ সাম্রাজ্যাবাদী ইংরেজ শাসককুলকে বুঝিয়েছেন। 

→ বৈপ্লবিক অভ্যুত্থানে বিশ্বাসী নবীন প্রজন্মের দেশমাতার শৃঙ্খল মোচনের স্বপ্ন ও বাসনা হল মানুষের মনের চিরকালীন মুক্ত স্বাধীন সত্য। মানুষের হৃদয়ের এই মুক্তি ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার কখনো মৃত্যু হয় না। তাই কোনো মালিক বা রাজা তাকে সাজা বা শাস্তি দিতে পারে না। 



‘কে দেয় সাজা/ মুক্ত স্বাধীন সত্যকে রে?’——‘মুক্ত স্বাধীন সত্য' বলতে কাকে বোঝানো হয়েছে? তাকে কে সাজা দিতে চায়? 

উত্তর: উদ্ধৃতাংশে দেশপ্রেমিক বিপ্লবীদের দেশমাতৃকার পরাধীনতা মোচনের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষাকে ‘মুক্ত স্বাধীন সত্য' বলা হয়েছে। বিপ্লবীরা সত্যের উপাসক এবং ন্যায়ের বার্তাবাহক। মুক্তিকামী এই তরুণ প্রজন্মের বিশ্বাস, স্বাধীনতা মানুষের জন্মগত অধিকার। তাই দেশের মুক্তিই হল তাঁদের একমাত্র লক্ষ্য। 'মুক্ত স্বাধীন সত্য' বলতে কবি এ কথাই বোঝাতে চেয়েছেন। 

→ দেশপ্রেমিক বিপ্লবীদের ব্রিটিশ রাজশক্তি সাজা দিতে চায়। 



‘হা হা হা পায় যে হাসি, ' — কার হাসি পায়? হাসি পাওয়ার কারণ কী? 

উত্তর: চিরবিদ্রোহী কবি নজরুল তাঁর ‘ভাঙার গান’ কবিতায় নিজের হাসি পাওয়ার কথা বলেছেন।

 → পরাধীন ভারতে স্বাধীনতার জন্য তরুণ বিপ্লবীদের সংগ্রামকে স্তব্ধ করে দিতে ব্রিটিশ শাসক বিপ্লবীদের ওপর নানান দমন-পীড়ন চালাতেন। কবির কথায় স্বাধীনতার স্বপ্নকে রুদ্ধ করা যায় না, কেননা বিপ্লবীর মৃত্যু হলেও বিপ্লবের মৃত্যু হয় না। তাঁর মতে, বিপ্লবীরা সত্য, ন্যায় ও মুক্তির সাধক বলে তারা মৃত্যুঞ্জয়ী ভগবানের অংশ। তাই এদের ফাঁসি দেওয়াটা শুধু অর্থহীন নয় হাস্যকরও বটে। 



'দে রে দে প্রলয়-দোলা” –কার উদ্দেশ্যে এ কথা বলা হয়েছে? তার কাছে কবি কী আবেদন করেছেন। 

উত্তর: কবি উদ্ধৃতাংশে ‘পাগলা ভোলা’ সম্বোধন করে পরাধীন ভারতের মুক্তিকামী তরুণ প্রজন্ম অর্থাৎ বিপ্লবীদের এ কথা বলেছেন। 

→ অত্যাচারী ব্রিটিশদের কারাগারে আবদ্ধ দেশের যুবশক্তিকে কবি কারাগারের লৌহ কপাট হেঁচকা টানে নিশ্চিহ্ন করতে বলেছেন। কেননা কবির বিশ্বাস এই তরুণরাই পারে রুদ্র রূপ ধরে স্থবির সৃষ্টির বুকে প্রলয় দোলার আঘাত আনতে। কবি এদের যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে, কণ্ঠে হায়দারী তেজ নিয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে, কালবৈশাখীর ঝড়ের তাণ্ডবে বিশাল কারাগারের ভিত নড়িয়ে, বন্দিশালায় তালা লাথি মেরে ভেঙে তাতে আগুন জ্বালিয়ে দিতে বলেছেন। 



‘মৃত্যুকে ডাক জীবন পানে'!— উদ্ধৃতাংশটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো।

উত্তর: সাধারণভাবে মৃত্যুর দিকেই জীবন এগিয়ে চলে। কিন্তু ‘ভাঙার গান’ কবিতায় কবি জীবনের পথেই মৃত্যুকে আহ্বান করেছেন। তিনি পরাধীন ভারতবর্ষে তরুণ সম্প্রদায়কে ইংরেজ-বিরোধী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়তে দেখেছেন। আত্মদানে উন্মুখ মুক্তিকামী এই নবীন প্রজন্ম জীবনকে ভালোবাসে বলেই, অত্যাচারী ইংরেজের দমন-পীড়নকে তুচ্ছ জ্ঞান করে স্বাধীনতার আন্দোলনে অংশ নিয়ে মৃত্যুকেই প্রকারান্তরে আহ্বান করেছে। মৃত্যুঞ্জয়ী এই অগ্রপথিকদের আত্মোৎসর্গের অভিপ্রায়কে ফুটিয়ে তুলতেই কবি বলেছেন “মৃত্যুকে ডাক জীবন পানে"। 



‘নাচে ওই কালবোশেখি’ ও ‘কাটাবি কাল বসে কি' বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন? 

উত্তর: কালবৈশাখী ঝড় আচমকা সৃষ্টি হয়ে প্রকৃতির শান্ত-সমাহিত স্থিতাবস্থাকে এক লহমায় অস্থির ও তাশাস্ত করে তোলে। কবির চোখে ইংরেজ অপশাসনের অবসানের জন্য দেশবাসীর প্রতিবাদ-প্রতিরোধের সংগ্রামী রুদ্র-রূপ এই বৈশাখী ঝড়ের মতোই প্রলয়ংকর। মুক্তিকামী মানুষের তীব্র সংঘর্ষের সর্বনাশী তাণ্ডবের ভয়াবহতাকে ফুটিয়ে তুলতেই কবি এরূপ তুলনা টেনেছেন। 

ইংরেজ বিতাড়নের সংকল্পে দেশব্যাপী সংগ্রামী তৎপরতা যখন তুঙ্গে, তখন ভাঙনের এই মহান কর্মযজ্ঞে শামিল না হয়ে ঘরে বসে সময় কাটানো বা কালক্ষেপ করা অনুচিত। এই বার্তা দিতেই ‘কাটাবি কাল বসে কি?’ পঙ্ক্তিটির অবতারণা। 



‘ভীম কারার ওই ভিত্তি নাড়ি’ –‘ভীম কারা’ কী? কীভাবে তার ভিত্তি নাড়ানো যাবে?

উত্তর: কবি ‘ভাঙার গান’ কবিতায় অত্যাচারী ইংরেজ শাসকের ভয়াবহ বন্দিশালা এবং ব্যাপক অর্থে কারাগাররূপী সমগ্র পরাধীন ভারতকে দাসত্বে অবরুদ্ধ ভীম কারার সঙ্গে তুলনা করেছেন। ইংরেজ অপশাসনের অবসানের জন্য কবি দেশের যুবশক্তিকে আহ্বান জানিয়েছেন। অকুতোভয় তারুণ্যই পারে এই লাঞ্ছনা ও দাসত্বের সমাপ্তি ঘটাতে। নবযৌবনের অগ্রদূত এই মৃত্যুঞ্জয়ী বীরের দল এজন্য মৃত্যুকে বরণ করে নিতেও পিছপা হয় না। তাঁরাই আত্মদানের বিনিময়ে ইংরেজ শাসকের ভয়াবহ কারাগারের ভিত উপড়ে ফেলে ইংরেজ শাসনতন্ত্রকে চিরতরে উৎখাত করতে পারে। 



‘যত সব বন্দিশালায়—| আগুন জ্বালা' কবি কার উদ্দেশ্যে, এই কথা বলেছেন? বন্দিশালায় আগুন জ্বালাতে বলেছেন কেন? 

উত্তর: কবি কাজী নজরুল ইসলাম পরাধীন ভারতবর্ষের মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দেশ্যে এই কথা বলেছেন। 

→ স্বাধীনতা অর্জনের আন্দোলনে অংশ নেওয়ার অপরাধে বহু স্বদেশপ্রেমিক মানুষ ব্রিটিশ কারাগারে বন্দি রয়েছেন। তাঁরা বন্দিশালার অন্ধকার কক্ষে অসম্ভব অত্যাচারে প্রতিনিয়ত লাঞ্ছিত হয়ে চলেছেন। অথচ দেশমাতৃকাকে স্বাধীন করার অপরাধে কাউকে বন্দি করা যায় না। তাই কবি তরুণ সম্প্রদায়কে ওই ব্রিটিশ কারাগারগুলিকে ভেঙে ফেলার কিংবা আগুন লাগিয়ে ধ্বংস করে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এর ফলে বন্দিশালাগুলির ভিত্তিভূমিকে যেমন উপড়ে ফেলা যাবে, তেমনি ইংরেজ শাসনতন্ত্রের ভিতকেও চিরতরে নিশ্চিহ্ন করা যাবে। 



লৌহ কপাটের প্রতি কবির আক্রোশের কারণ কী? 

উত্তর: কবি নজরুলের ‘ভাঙার গান’ কবিতায় লৌহ কপাট একদিকে যেমন কারাগারে বন্দি শত-সহস্র মুক্তিকামী তরুণের লাঞ্ছনা ও অবদমনের প্রতীক, অন্যদিকে তেমনি দেশমাতৃকার বন্দিত্বের ক্ষতচিহ্ন। সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজ শাসকের দাসত্বের হাত থেকে মুক্ত হতে পরাধীন ভারতবর্ষে অসংখ্য তরুণ-তরুণী স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নিয়েছিলেন। ব্রিটিশ রাজশক্তি এই অপরাধে স্বাধীনতাকামী সেই নবীন প্রজন্মকে বিনা বিচারে বন্দি করে নির্মম অত্যাচার চালায়। দিনের পর দিন তাঁরা ব্রিটিশ কারাগারের অন্ধকার কোণে অভিশপ্ত জীবন কাটাতে বাধ্য হন। দেশপ্রেমিক যোদ্ধাদের এই পরিণতি দেখে বিক্ষুব্ধ কবিমন প্রলয়ংকর রুদ্র-রূপ ধারণ করে স্বদেশপ্রেমিক তরুণ প্রজন্মকে বন্দিশালার লৌহকপাট ভেঙে ফেলবার পরামর্শ দিয়েছেন।