‘সাগর যাহার বন্দনা রচে শত তরঙ্গ ভঙ্গে'—কবি এমন কথা বলেছেন কেন?
উত্তর: উদ্ধৃতাংশে কবি বঙ্গদেশের দক্ষিণ প্রান্তে স্থিত বঙ্গোপসাগরের ভৌগোলিক অবস্থানটিকে অসামান্য কাব্যিক ব্যঞ্জনায় মূর্ত করে তুলেছেন। কবি-কল্পনায় বঙ্গভূমি এক স্নেহময়ী জননী। আর সাগর তার চরণ স্পর্শ করে আছে। সাগরের বুকে নিরন্তর উঠতে থাকা ঢেউ, প্রতিনিয়ত বঙ্গমাতার চরণ-কমলে আছড়ে পড়ে যেন বারংবার প্রণাম জানিয়ে ফিরে যায়। তরঙ্গের এই কলধ্বনিই হল মায়ের প্রতি সমুদ্রের অন্তরের বিনম্র বন্দনা-গান। এখানে কবি এই ছবিই এঁকেছেন।
বঙ্গভূমিকে কবি ‘বাঞ্ছিত-ভূমি’ বলেছেন কেন?
উত্তর: গঙ্গার পবিত্র স্পর্শধন্য বঙ্গদেশ, সমস্ত বাঙালির জন্মভূমি। এই বঙ্গভূমির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য কবিকে মুগ্ধ করেছে। তুষারশুভ্র হিমালয়, সাগরজলে স্নাত বঙ্গভূমির চরণপদ্ম এবং নানারকম পুষ্পবিন্যাস তার এই সৌন্দর্যকে আরও মোহময় করে তুলেছে। আবার এই বঙ্গের খেতজোড়া কনকধান্য মায়ের বুকের স্নেহের মতোই কবিকে মায়ার বাঁধনে বেঁধে রেখেছে। তাই সুজলা-সুফলা, বহু তীর্থের পবিত্রতাধন্য মুক্তিদায়িনী বঙ্গভূমিকে কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত ‘বাঞ্ছিত ভূমি’ বলে মনে করেছেন।
‘আমরা বাঁচিয়া আছি’—আমরা কারা? তারা কীভাবে বেঁচে আছে?
উত্তর: এখানে ‘আমরা’ বলতে কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত বঙ্গভূমির অধিবাসী বাঙালিদের কথা বলেছেন।
-> বঙ্গভূমিতে বাঙালির বাস। বঙ্গভূমি যেমন সুজলা-সুফলা উর্বরা, তেমনি এই বঙ্গভূমিতে রয়েছে নদীময় জল-জঙ্গলে পূর্ণ অরণ্যভূমিও। তাই বাঘের সঙ্গে লড়াই করেই আরণ্যক ভূমিতে বসতি তৈরি করেছে বাঙালি। আবার নদী-নালা-বিলে পরিপূর্ণ জলময় ভূ-ভাগে বিভিন্ন বিষাক্ত সাপ তার দৈনন্দিনতার সঙ্গী। বাঙালি অসীম সাহসিকতায় তাকেও হেলায় বশ করে যেন খেলার সামগ্রী করে তুলেছে। এভাবেই বাংলার মানুষ নানান প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে এবং গড়ে তুলেছে এই সভ্যতা।
বাঙালির শৌর্যের পরিচয়জ্ঞাপক কোন্ কোন্ ঘটনার উল্লেখ কবি ‘আমরা’ কবিতায় করেছেন?
উত্তর: সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত তাঁর ‘আমরা’ কবিতায় শুধু বাংলার কাব্য দর্শন ও মেধার কথা তুলে ধরেননি, তুলে ধরেছেন বাঙালির সাহস ও বীরত্বের দিকটিও। শৌর্যের ও গৌরবের কথা বলতে গিয়ে কবি উত্থাপন করেছেন এই বাঙালিই একদিন রামচন্দ্রের প্রপিতামহ রঘুর সাথে যুদ্ধ করেছিল। তা ছাড়া বিজয় সিংহের লঙ্কা জয় ও সিংহলের নামকরণও বাঙালির শৌর্যের পরিচায়ক। তার উত্তরাধিকারী হয়েই তারা মোগল থেকে মগদের প্রতিহত করেছে। এমনকি বাংলায় চাঁদ-প্রতাপের বীরত্বে একদিন দিল্লীশ্বরকেও পিছু হঠতে হয়েছিল।
'সিংহল নামে রেখে গেছে নিজ শৌর্যের পরিচয়।'—উদ্দিষ্ট ব্যক্তির পরিচয় দাও? উদ্ধৃতাংশটির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: প্রাচীন রাঢ়বঙ্গে সিংহপুরের রাজকুমার ছিলেন বিজয়সিংহ। তিনি সমুদ্রপথে লঙ্কাদ্বীপে পৌঁছে সেখানে আপন আধিপত্য বিস্তার করেন। তাঁর নামানুসারে, দেশটির নাম হয়েছিল সিংহল। জাতীয় গৌরবে উদ্বুদ্ধ কবি উদ্ধৃতাংশে এই বিজয়সিংহের কথাই বলেছেন।
→ এখানে কবি বাঙালির শৌর্য ও অকুতোভয়তার চিরকালীন ঐতিহ্যের উল্লেখ করে বর্তমান বাঙালি প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করতে বিজয়সিংহের প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছেন।
'একহাতে মোরা মগেরে রুখেছি, মোগলেরে আর-হাতে'—বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?
অথবা,
‘চাঁদ-প্রতাপের হুকুমে হঠিতে হয়েছে দিল্লিনাথে'।— বলার কারণ কী?
উত্তর: উদ্ধৃতাংশের সাহায্যে কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত ‘আমরা’ কবিতায় বাঙালির জাতীয় চরিত্রের অনমনীয়তা, দৃঢ়তা ও পরাক্রমের ঐতিহাসিক বিবরণ দিয়েছেন। অতীতে বাংলায় যখন বারবার বিদেশি শক্তি আক্রমণ করেছে বাঙালি তা বীরত্বের সঙ্গে প্রতিহত করেছে, যেমন দুর্ধর্ষ মগজলদস্যুদের প্রতিহত করেছে আবার একইভাবে বাংলায় বারো-ভুঁইঞায়ারা মোগল শক্তিকে বাংলার মাটিতে মাথাতুলে দাঁড়াতে দেয়নি। কবি স্বজাতির অসম সাহসিকতা এবং মুক্তমনা ব্যক্তিসত্তার স্বরূপ উদঘাটন করতে গিয়ে উদ্ধৃত উক্তিটি করেছেন।
‘এই বাংলার মাটিতে গাঁথিল সূত্রে হীরক-হার'—কবি এখানে কার কথা বলেছেন? উদ্ধৃতাংশটির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: কবি সতেন্দ্রনাথ দত্ত এখানে বৈদিক ঋষি কপিলের কথা বলেছেন। গঙ্গাসাগরের ঋষি কপিলের একটা আশ্রম আছে। তাই কবি লোকশ্রুতির নিরিখে কপিল মুনির সঙ্গে বাংলা মাটির যোগ আছে বলে মান্যতা দেন।
→ পুরাণ মতে, ঋষি কপিলের ব্যাখ্যাত সাংখ্যদর্শন অনুসারে ঈশ্বরের অস্তিত্ব নেই। একমাত্র পুরুষরূপী আত্মা ও প্রকৃতি অনাদি ও অনন্ত। কবি প্রজ্ঞা ও দর্শনের আশ্চর্য স্বতন্ত্রের অধিকারী। ঋষিকেই আদি বিদ্বান অর্থাৎ প্রথম জ্ঞানী বলে মনে করেছেন। তাঁর এই সাংখ্য দর্শনের হীরকসূত্র বা যুক্তিবিন্যাস বাংলার মাটিতেই বাঙ্ময় হয়ে উঠেছিল বলে কবি গৌরব বোধ করেছেন।
‘বাঙালি অতীশ লঙ্ঘিল গিরি তুষারে ভয়ংকর, জ্বালিল জ্ঞানের দীর্ঘ তিব্বতে বাঙালি দীপঙ্কর'। —উদ্ধৃতাংশটি ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: ‘বাঙালি অতীশ’ হলেন নালন্দার অধ্যক্ষ শীলভদ্রের ছাত্র। এই বৌদ্ধ পণ্ডিত জয়পালের সময়ে বিক্রমশীল মহাবিহারের অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন। বৌদ্ধ ধর্ম (মহাযান) প্রচারের জন্য তিনি তিব্বতে যান। সেখানে তিনি শিক্ষাদান, বৌদ্ধ সাধন তত্ত্ব বিষয়ক গ্রন্থ রচনা এবং সাধনা শুরু করেন। এককথায় তিব্বতে অজ্ঞতার আঁধার দূর করে জ্ঞানচর্চার পথকে প্রশস্ত করাই ছিল তাঁর লক্ষ্য। তাঁর মনন ও মেধার অবদান বাঙালির কাছে গৌরববাহী।
'বাঙালির ছেলে ফিরে এল দেশে যশের মুকুট পরি'—উদ্ধৃতাংশটির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো।
অথবা,
‘কিশোর বয়সে পক্ষধরের পক্ষশাতন করি'—বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?
উত্তর: উদ্ধৃতাংশে বাঙালি কিশোর হলেন তার্কিক রঘুনাথ শিরোমণি আর ‘পক্ষধর’ হলেন মিথিলার ন্যায় দর্শনের পণ্ডিত। পঞ্চদশ-ষোড়শ শতাব্দীতে ভারতের জ্ঞানচর্চায় অন্যতম পীঠস্থান হয়ে উঠেছিল নবদ্বীপ। শ্রীচৈতন্যের সমসাময়িক রঘুনাথ শিরোমণি বিখ্যাত নৈয়ায়িক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিলেন। তিনি তর্ক যুদ্ধে পক্ষধর মিশ্রকে পরাজিত করেছিলেন। এই পরাজয়ের মাধ্যমেই বাঙালির ঐতিহাসিক উত্থানের আরম্ভ। এই ঘটনাটিকে জাতীয় গৌরববাহী বলে মনে করেই কবি প্রশ্নে উদ্ধৃত মন্তব্যটি করেছেন।
'বাংলার রবি জয়দেব কবি কান্ত কোমল পদে| করেছে সুরভি সংস্কৃতের কাঞ্চন-কোকনদে'। উদ্ধৃতাংশটি ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: কবি জয়দেব লক্ষ্মণ সেনের সভাকবি বলে কথিত। তাঁর লেখা রাধাকৃষ্ণ লীলা বিষয়ক পদাবলিটির নাম ‘গীতগোবিন্দ’। স্বয়ং শ্রীচৈতন্য এই পদাবলিটির গুণমুগ্ধ ছিলেন। গীতগোবিন্দের সুললিত ভাষা ও ভাবের জন্য তা সমগ্র ভারতে আজও জনপ্রিয়। কবি সত্যেন্দ্রনাথের মতে, তাঁর কবিপ্রতিভা সংস্কৃত সাহিত্যকেও প্রভাবিত করেছিল। কবির মতে, তৎকালীন সময়ের জনপ্রিয়তার নিরিখে জয়দেব ছিলেন বর্তমান যুগের রবিঠাকুরের মতো বিখ্যাত।
‘বরভূধরের ভিত্তি এবং ওষ্কার-ধাম' -এর প্রসঙ্গ বাঙালির জাতীয় গৌরব আলোচনাকালে কবি উল্লেখ করেছেন কেন বলে তোমার মনে হয়?
উত্তর: দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জাভা বা ইন্দোনেশিয়ায় অবস্থিত প্রাচীন বৌদ্ধ স্তূপ হল ‘বরভূধর’ বা ‘বরোবুদুর'। অষ্টম-নবম শতকে শৈলেন্দ্র রাজবংশের রাজত্বকালে এই স্থাপত্য কীর্তিটি গড়ে উঠেছিল যাতে পাল ও সেন যুগের স্থাপত্য পরিলক্ষিত হয়। অন্যদিকে ‘ওঙ্কার-ধাম’ মন্দিরটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কম্বোজ বা কম্বোডিয়ায় অবস্থিত। দ্বাদশ শতাব্দীতে খামের রাজা দ্বিতীয় সূর্যবর্মনের রাজত্বকালে তৈরি এই বিঘ্ন মন্দিরটি। পরে অবশ্য এটি বৌদ্ধ মন্দিরে পরিণত হয়েছিল। এই মন্দিরে পালযুগের স্থাপত্য পরিলক্ষিত হয়। ‘আমরা’ কবিতায় কবি বাংলায় স্থাপত্য ও শিল্প ভাবনার উৎকর্ষ প্রসঙ্গে উক্তিটি করেছেন।
‘ধেয়ানের ধনে মূর্তি দিয়েছে আমাদের ভাস্কর'—এখানে ‘আমাদের ভাস্কর’ কারা? ‘ধেয়ানের ধনে' শব্দবন্ধের মাধ্যমে কবির কোন্ মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে?
উত্তর: ‘আমরা’ কবিতায় কবি সত্যেন্দ্রনাথ ‘আমাদের ভাস্কর’ বলতে পালযুগের বিখ্যাত ভাস্কর ও স্থপতি, বরেন্দ্রভূমির বাসিন্দা বিটপাল আর ধীমানের কথা বলা হয়ছে।
→ ভাস্কর তার আপন কল্পনায় মাধুরী মিশিয়ে ছেনি-হাতুড়ির সাহায্যে কঠিন পাথর বা ধাতুর ওপর মূর্তি বা ছবিকে ফুটিয়ে তোলেন। এক আশ্চর্য দক্ষতা ও প্রতিভা বলে শিল্পী তাঁর আবেগ, দর্শন চিন্তায় সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম দিক ভাস্কর্যের গায়ে মুদ্রিত করেন। এক্ষেত্রে ধেয়ানের ধন, বলতে কবি ধ্যানের একাগ্রতা ও সাধনার কথা বলেছেন, ‘ধীমান’ ও ‘বিটপাল’ তাঁদের ভাস্কর্যে তাঁদের স্বাতন্ত্র্যকে এই একাগ্রতার সাহায্যে ফুটিয়ে তুলেছিলেন।
‘বিটপাল’ আর ‘ধীমান’-এর নাম অবিনশ্বর কেন?
উত্তর: ‘আমরা’ কবিতায় বাঙালির গৌরবগাথা পরিক্রমাকালে কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত পালযুগের দুই বিখ্যাত ভাস্কর ‘বিটপাল’ আর ‘ধীমান’-এর প্রসঙ্গ উল্লেখ করতে ভোলেননি। অনেকের মতে ধীমান ছিলেন বিটপালের পিতা। তবে এ বিষয়ে কোনো প্রামাণ্য তথ্য পাওয়া যায় না। তবে উভয়েই অসামান্য প্রতিভাবান ভাস্কর, স্থপতি এবং মূর্তিনির্মাণ শিল্পী ছিলেন। তাই পালযুগে শিল্পকলায় এ-বঙ্গে প্রভূত উন্নতি ঘটেছিল, যার প্রভাব পড়েছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশের স্থাপত্য রীতিতে। সংগত কারণেই বরেন্দ্রভূমির এই দুই শিল্পীর নাম অবিনশ্বর বা অমর বলে কবি মনে করেছেন।
‘আমাদের পট অক্ষয় করে রেখেছে অজন্তায় – ‘অজন্তা' কী? আমাদের পট সেখানে কীভাবে অক্ষয় হয়ে আছে?
উত্তর: অজন্তা হল মহারাষ্ট্রের ‘ঔরঙ্গাবাদ থেকে প্রায় ১০০ কিমি দূরে অবস্থিত পাহাড়ের গা কেটে তৈরি গুহা। এখানে যুদ্ধের জীবন ও জাতকের কাহিনি নিয়ে ছবি আঁকা হয়েছে।
→ কবি বাঙালির জাতীয় গৌরবের দৃষ্টান্তে অজন্তার প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছেন, কারণ এখানে হাতি ও অশ্বারোহী পরিবৃত বিজয় সিংহের একটি ছবি এবং সিংহলরাজ হিসেবে তাঁর অভিষেকের আর-একটি ছবি আছে। কবির মতে, বাঙালি রাজপুত্রের বীরগাথা যে-কোনো বাঙালি পটুয়ার তুলির আঁচড়ে অজন্তার গুহাচিত্রে চিরকালীন মর্যাদা লাভ করেছে।
‘কীর্তনে আর বাউলের গানে আমরা দিয়েছি খুলি'— বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?
উত্তর: ‘কীর্তন’ আর ‘বাউল’ বাংলা অতিপ্রাচীন দুই সংগীত। ধর্মীয় বিভাজন ও সংকীণতার ওপরে উঠে ভালোবাসা আর আত্মানুসন্ধানের গান গায় বাউল, আর অন্যদিকে রাধাকৃষ্ণের লীলাকে অবলম্বন করে মানব-মানবীর প্রেমানুভূতির আকুলতা প্রাণ পায় কীর্তনে। বাঙালি তার হৃদয়ের সুখ-দুঃখ ভালোবাসা ও মিলনের আনন্দ-বেদনাকে বাণীরূপ দিয়েছে বাউলে কীর্তনে। সে তার মনের দরজা খুলে সকলের সঙ্গে একাত্ম হয়েছে এই গানের প্রাণময়তায়। এই গানই বাঙালির আপন-পর ভুলে সবাইকে বক্ষমাঝে ধারণ করার ঐতিহ্যের ঐশ্বর্য। উদ্ধৃতাংশে কবির সেই ভাবনাই প্রকাশিত হয়েছে।
‘মন্বন্তরে মরিনি আমরা মারী নিয়ে ঘর করি'—কবি এখানে কোন ঘটনার কথা উল্লেখ করেছেন?
উত্তর: কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত ‘আমরা’ কবিতায় বাংলার অতীত ইতিহাসের যন্ত্রণাক্লিষ্ট ও বেদনাদায়ক দিনগুলির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। বাংলার ভাগ্যাকাশে মন্বন্তর, মহামারি, মড়ক, দুর্যোগ বারবার হানা দিয়েছে। মন্বন্তর বা দুর্ভিক্ষে শত-সহস্র মানুষ মারা গেছে। দুরারোগ্য মহামারির কবলে পড়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে কত-শত গ্রাম, সমৃদ্ধ জনপদ। কিন্তু মৃত্যু-অপচয় বঙ্গভূমিকে সাময়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করলেও, বাঙালি ফের তার অস্তিত্বের বিপন্নতা কাটিয়ে অফুরান জীবনীশক্তির পরিচয় দিয়েছে। মন্বন্তর মহামারির সংকট কাটিয়ে গড়ে তুলেছে নিজের সভ্যতা, প্রশ্নে উদ্ধৃত অংশে এই ঘটনার কথাই কবি বলেছেন।
‘দেবতারে মোরা আত্মীয় জানি’— উদ্ধৃতাংশে বাঙালির চরিত্রের কোন্ দিকটি ফুটে উঠেছে?
‘অথবা,
‘আমাদের এই কুটিরে দেখেছি মানুষের ঠাকুরালি'— উদ্ধৃতাংশের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: উদ্ধৃতাংশটির ব্যাখ্যা কালে রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতার লাইন বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। প্রিয়জনের মধ্যে দৈব মহত্ত্ব প্রকাশিত হতে দেখে তিনি লিখেছেন ‘দেবতারে প্রিয় করি, প্রিয়েরে দেবতা...'। বাঙালির সত্তায় মিলনের সুর চিরপ্রবাহমান, মানুষকে ভালোবাসার সঙ্গে সঙ্গে সে স্বর্গের দেবতাকেও নামিয়ে এনেছে নিজের ঘরের আঙিনায়। তাই দেবদেবীরা যেন ঘরে ছেলে মেয়ে বা মায়ের মতো, আবার এই আটপৌরে বাঙালি বাড়িতেই জন্ম নেওয়া সর্বগুণান্বিত অসামান্য মানুষকে বিশ্ববাসী দেখতে পেয়েছে দেবত্বসুলভ মহিমার।
‘ঘরের ছেলের চক্ষে দেখেছি বিশ্বভূপের ছায়া'—এখানে ‘ঘরের ছেলে’ বলতে কার কথা বলা হয়েছে? তাঁর চোখে ‘বিশ্বভূপের ছায়া কেমনভাবে দেখতে পাওয়া যায়?
উত্তর: প্রদত্ত উদ্ধৃতাংশে ‘ঘরের ছেলে’ বলতে কবি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর কথা বলেছেন। ‘বিশ্বভূপের ছায়া’ শব্দবন্ধের মাধ্যমে কবি এ জগতের হৃদয়-রাজ্যের অধীশ্বরের অন্তরের স্নেহছায়ার করুণাঘন রূপটিকে ফুটিয়ে তুলেছেন। শ্রীচৈতন্য ব্রাহ্মণ-চণ্ডাল-শূদ্র নির্বিশেষে সবাইকে হৃদয়ের অফুরান প্রেম-ভালোবাসা বিতরণ করেছেন। শ্রেণি-ধর্ম-বর্ণের ভেদাভেদ তিনি মানতেন না। বিশ্ববাসীকে তিনি মানবধর্মের সর্বজনীন আদর্শে দীক্ষিত করেছিলেন। মানব-হৃদয়ের এই সর্বোত্তম গুণ ঘরের ছেলে নিমাইয়ের মধ্যে প্রতিফলিত হয়েছিল বলেই বাঙালি তার চোখে ‘বিশ্বভূপের ছায়া দেখতে পেয়েছিল।
‘নিমাই ধরেছে কায়া'–নিমাই কায়া ধরেছে কীভাবে?
উত্তর: উদ্ধৃতাংশটি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ‘আমরা’ কবিতার অংশবিশেষ। উদ্ধৃতিটির মধ্যে দিয়ে বাঙালির অন্যতম শ্রেষ্ঠ চরিত্র শ্রীচৈতন্যের ব্যক্তিত্বের স্বরূপ উদ্ঘাটিত হয়েছে। কবি ‘অমিয়-মথিয়া’ শব্দ বন্ধের মাধ্যমে বাঙালির হৃদয়জাত স্নেহ-মায়া-মমতা-দয়া-ভক্তি ও ভালোবাসার মতো মহত্তম মানবিক গুণাবলি শ্রীচৈতন্যের মধ্যে প্রকাশিত হবার কথা বলেছেন। সমস্ত বিভেদ ভুলে মানুষকে ভালোবাসাতে শিখিয়ে ছিলেন নিমাই। বাঙালির হৃদয়ের সর্বত্যাগী প্রেমিক সত্তাই সেই ভালোবাসার বিগ্রহ নিমাই-এর মধ্যে বাণীরূপ পেয়েছে—কবি এ-কথাই বলেছেন।
'বীর সন্ন্যাসী বিবেকের বাণী ছুটেছে জগৎময়'—‘বীর সন্ন্যাসী বিবেকের' পরিচয় দাও? তাঁর বাণী জগৎময় ছুটেছিল কেন?
উত্তর: এখানে ‘বীর সন্ন্যাসী বিবেক’ হলেন স্বামী বিবেকানন্দ।
→ স্বামী বিবেকানন্দ শিকাগো ধর্ম সম্মেলনে ভারতের সনাতন হিন্দু ধর্মের প্রতিনিধিত্ব করে আধ্যাত্মিকতা ও দর্শন বিষয়ক যে ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, তা শ্রোতাদের মন্ত্রমুগ্ধ করে। সারা ইউরোপ আমেরিকা জুড়ে তাঁর আদর্শ, বাণী ও মানবসেবার দর্শন এক ভাবতরঙ্গের সৃষ্টি করেছিল। পৃথিবীর নানান প্রান্তের মানুষ তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছে, যোগ দিয়েছে মানবসেবায়। কবি বিবেকানন্দের আকর্ষণ ক্ষমতাকে ফুটিয়ে তুলতেই উক্তিটি করেছেন।
‘বাঙালির ছেলে ব্যাঘ্রে বৃষভে ঘটাবে সমন্বয়'—উক্তিটির অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: প্রদত্ত উদ্ধৃতাংশে কবি এক ঐতিহাসিক সত্যকে বাণীরূপ দিয়েছেন। ব্যাঘ্র ও বৃষভের সমন্বয় কথাটির অর্থ বাঘ ও ষাঁড়ের মধ্যে একাত্মতা ঘটানো। বাস্তবে তা সম্ভব নয়। কিন্তু এক মহামানবের বাণী ও ব্যক্তিত্বের জাদুস্পর্শে যেন এই ঘটনাই বাস্তবায়িত হয়েছিল। শ্বেতাঙ্গরা এদেশীয়দের ঘৃণা করতেন। আবার এদেশীয়দের মনেও শ্বেতাঙ্গদের প্রতি বিদ্বেষ ও ভয় পুঞ্জীভূত ছিল। তবে ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দে শিকাগো ধর্মসম্মেলনে বিবেকানন্দের মানবসেবার আদর্শ ঘোষিত এবং প্রচারিত হওয়ার পর, তা সমস্ত মানুষকে অনুপ্রাণিত করে। শ্বেতাঙ্গরাও সব ত্যাগ করে এদেশে এসে মানবসেবার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। এভাবেই বাঙালির ছেলে উভয়ের মধ্যে সমন্বয়ের বীজ বপন করতে পেরেছিল বলে কবি মনে করেছেন।
‘তপের প্রভাবে বাঙালি সাধক জড়ের পেয়েছে সাড়া'—'বাঙালি সাধক' কে? জড়ের সাড়া পাওয়া বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?
উত্তর: কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত রচিত ‘আমরা’ কবিতা থেকে উদ্ধৃত এই পঙ্ক্তিটিতে ‘বাঙালি সাধক' বিজ্ঞানাচার্য জগদীশচন্দ্র বসুর কথা বলা হয়েছে।
-> ‘জড়ের সাড়া’ পাওয়া কথাটির অর্থ 'তথাকথিত' জড়বস্তুর উত্তেজনায় সাড়া দেওয়ার ক্ষমতা। দীর্ঘদিনের ধারণা ছিল মানুষ, পশুপাখি, কীটপতঙ্গ বাদে গাছপালার কোনো অনুভূতি নেই। কিন্তু জগদীশচন্দ্র বসু প্রথম প্রমাণ করেছিলেন যে, উদ্ভিদ অর্থাৎ গাছেদেরও অনুভূতি আছে, এমনকি তারাও উত্তেজনায় সাড়া দেয়। জড়ের সাড়া পাওয়া বলতে কবি এই কথাই বলতে চেয়েছেন।
‘আমাদের নবীন সাধনা শব-সাধনার বাড়া'—বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?
উত্তর: সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত ‘আমরা’ কবিতায় বিজ্ঞানাচার্য | জগদীশচন্দ্র বসুর যুগান্তকারী কাজের প্রকৃত তাৎপর্য উল্লেখ করতে গিয়ে প্রশ্নে উদ্ধৃত উক্তিটি করেছেন। প্রাচীন হিন্দুতন্ত্রে শব-সাধনার কথা আছে। এক্ষেত্রে মৃতদেহে প্রাণ-প্রতিষ্ঠার প্রসঙ্গটিকে কবি গাছের উত্তেজনায় সাড়া দেওয়ার সঙ্গে তুলনা করেছেন। জগদীশচন্দ্রের কঠোর সাধনা যে তান্ত্রিকের শবসাধনার চেয়েও অনেক গুরুত্বপূর্ণ, এখানে সেকথাই কবি বলতে চেয়েছেন।
‘বাঙালি দিয়েছে বিয়া’— কবির এরূপ মন্তব্যের কারণ কী?
অথবা,
‘নব্য রসায়ন শুধু গরমিলে মিলাইয়া’—উদ্ধৃতাংশটির তাৎপর্য লেখো।
উত্তর: উদ্ধৃতাংশে কবি আধুনিক রসায়নচর্চায় বাঙালির অবদানের কথা বলেছেন। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় মারকিউরাস নাইট্রেট নামক একটি যৌগ আবিষ্কার করেছিলেন, এখানে সেই যুগান্তকারী আবিষ্কারের কথাই বলা হয়েছে। এই পরীক্ষাই কবির মতে ‘গরমিলে মিলাইয়া'। আর এভাবেই আচার্য প্রফুল্লচন্দ্ৰ বিষম মৌল বা ধাতুর মিলন ঘটিয়ে বা ‘বিয়া’ দিয়ে মারকিউরাস নাটট্রেট নামক নতুন মৌল সৃষ্টি করেছিলেন, কবি এখানে সেকথাই বলেছেন।
‘বাঙালির কবি গাহিছে জগতে মহামিলনের গান'—উদ্ধৃতাংশটির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো।
অথবা,
‘বিফল নহে এ প্রাণ'—কবি এরূপ মন্তব্য করেছেন কেন?
উত্তর: উদ্ধৃতাংশে বাঙালি কবি বলতে রবীন্দ্রনাথকে বোঝানো হয়েছে। জ্ঞানে-বিজ্ঞানে-শৌর্যে-শাস্ত্রে বাঙালি যেমন অসামান্য, কাব্য সাহিত্যেও তাই। বাঙালির বিভিন্ন সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের মধ্যে মানুষে-মানুষে মিলনের মূল সুরই হল রবীন্দ্রসাহিত্যের মর্মবাণী। রবীন্দ্রনাথ আজীবন তাঁর গানে, লেখায় মহামিলনের জয়গান করেছেন। বিভেদ-বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে সব মানুষের মিলনের এই সাধনাই বাঙালির চিরায়ত ঐতিহ্য। বিশ্বজুড়ে বাঙালির মানবতা স্বীকৃতি লাভ করেছে। তাই এই পুণ্যভূমিতে জন্ম সার্থক।
