‘এ-তরীতে মাথা ঠুকে সমুদ্রের দিকে তারা ছোটে।'—পঙ্ক্তিটির মূল ভাব বুঝিয়ে লেখো।
উত্তর: কবি অজিত দত্তের ‘নোঙর’ কবিতাটি রূপক জাতীয় কবিতা। কবিতায় কবি মধ্যবিত্তের গণ্ডিবদ্ধ জীবন থেকে মুক্তির অভিপ্রায় ও তার অপূর্ণতার মানসিক দ্বন্দ্বকে সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। কথকের জীবনতরি প্রতিদিনের একঘেয়েমি ভেঙে যেতে চায় গতিশীল উদ্দামতায়। কিন্তু গতিশীল জোয়ারের ঢেউগুলি নোঙরে আবদ্ধ তরিতে আঘাত হানে মাত্র, তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে পারে না। তাই ইচ্ছা স্বরূপ জোয়ারের ঢেউগুলি নোঙরবদ্ধ জীবনতরিতে মাথা ঠোকে।
'তারপর ভাঁটার শোষণ'—উদ্ধৃতাংশটির প্রশ্ন অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝিয়ে লেখো।
অথবা,
'স্রোতের প্রবল প্রাণ করে আহরণ।'—এমন বলার কারণ কী বলে তোমার মনে হয়?
উত্তর: জোয়ারে নদী বা সমুদ্রের জলস্ফীতি ঘটে আর ভাটার টানে তা পূর্বাবস্থায় ফিরে আসে। এককথায় ভাটার টান জোয়ারের প্রবল জলোচ্ছ্বাস বা গতিময় ঢেউগুলিকে স্তিমিত করে দেয়। আসলে কথকের গণ্ডিবদ্ধ সাংসারিক জীবনের স্বপ্ন-কল্পনা ও আকাঙ্ক্ষাগুলি স্বপ্নময় জোয়ারের ঢেউয়ের প্রতীক। কিন্তু পারিপার্শ্বিক বাস্তবতার ঘাত-প্রতিঘাতে ভাটার শোষণের মতো কবির জীবনের আশা-আকাঙ্ক্ষাগুলি কার্যকারিতা হারায়। উদ্ধৃতাংশে কবি এ কথাই বোঝাতে চেয়েছেন।
‘আমার বাণিজ্য-তরী বাঁধা পড়ে আছে।' -কথাটির মূল তাৎপর্যটি বিশ্লেষণ করো।
উত্তর: কবি অজিত দত্ত তাঁর রূপকধর্মী কবিতা ‘নোঙর’-এ মানুষের জীবনকে বাণিজ্যতরির সাথে তুলনা করেছেন। এই বাণিজ্যতরিতে মানুষ নিজ নিজ পসরা সাজিয়ে জীবনের পথে অগ্রসর হয়। জীবনতরিকে লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে সাহায্য করে উদ্যোগ, উদ্যম ও কর্মচঞ্চলতা, যা দাঁড়ের মতো কাজ করে। কিন্তু মানুষের জীবন সর্বদা স্বপ্ন দেখা ও স্বপ্নভঙ্গের সুতোয় বাঁধা। জীবনের নানান প্রতিকূলতা মানুষকে তার কর্মপ্রচেষ্টায় বাধা দেয়। ফলে প্রার্থিত মুক্ত জীবনের ঘাটে মানুষের বাণিজ্যতরি বাঁধা পড়ে।
‘যতই না দাঁড় টানি, যতই মাণ্ডুলে বাঁধি পাল,'—বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?
উত্তর: ‘নোঙর’ কবিতায় কবি গতিশীল জগতের চলমানতাকে নদী এবং নিজের বদ্ধ জীবনকে নৌকার মধ্য দিয়ে প্রতীকায়িত করেছেন। সংসারের ‘তট’-এ ‘তরি’ বা নৌকাস্বরূপ কথকের জীবন মায়া-মোহের অলঙ্ঘ্য ‘নোঙর'-এর ‘কাছি’-তে আবদ্ধ। কিন্তু কবি এই বাঁধন-মুক্তির সাধনায় সদাতৎপর। দাঁড়, পাল,
মাস্তুল—কথকের এই প্রচেষ্টারই প্রতীক। যদিও সাংসারিক জীবনের অনতিক্রম্য প্রতিবন্ধকতা এবং তা ছিন্ন করার মানস-দ্বন্দ্বই মধ্যবিত্ত জীবনের চিরকালীন সত্য। আর সেই সত্যই এখানে প্রতিভাত হয়েছে।
‘নোঙরের কাছি বাঁধা তবু এ নৌকা চিরকাল।—নৌকা চিরকাল বাঁধা কেন?
উত্তর: কবি অজিত দত্ত উদ্ধৃত উক্তিটির রূপকের আড়ালে মানব জীবনের এক শাশ্বত সত্যকে তুলে ধরেছেন। সাগরপারের হাতছানিতে সাড়া দিয়ে কবি বেরিয়ে পড়তে আগ্রহী। কিন্তু তাঁর সেই স্বপ্নের সমুদ্রযাত্রায় রয়েছে বাস্তবের বাধা। এই বাধা অতিক্রমের জন্য তাঁর ত্রুটি নেই। মান্ডুলে পাল, অবিরাম দাঁড় টানা সবই ব্যর্থ। আসলে মাঝেমাঝে মানবজীবনে এটাই বাস্তব হয়ে দাঁড়ায় যে মানুষের স্বপ্ন, সাধনা, উদ্যম, উদ্যোগ ইত্যাদি পারিপার্শ্বিক বিরুদ্ধতায় স্তব্ধ হয়ে যায়—যেমনটি কবির ক্ষেত্রে ঘটেছে।
‘তারার দিকে চেয়ে করি দিকের নিশানা'–কে তারার দিকে চেয়ে দিকের নিশানা করেন? কেন করেন?
উত্তর: ‘নোঙর’ কবিতার কবি অজিত দত্ত তারার দিকে চেয়ে দিকের নিশানা করার কথা বলেছেন।
-> সমুদ্রে ভাসমান নাবিক রাত্রিবেলা দিকনির্ণয়ের জন্য আকাশের তারা দেখে। তেমনি কথকের মতো মানুষরাও জীবনসমুদ্রে ভাসতে ভাসতে নানা ঘাত-প্রতিঘাতে দিশেহারা হয়ে পড়েন এবং নির্দিষ্ট দিশা খোঁজার জন্য তারার দিকে চেয়ে নিশানা করেন। যদিও প্রতিবন্ধকতা নামক নোঙর তার জীবনতরিকে বারে বারে বাধা দেয়।
‘নিস্তব্ধ মুহূর্তগুলি সাগরগর্জনে ওঠে কেঁপে| স্রোতের বিদ্রুপ শুনি প্রতিবার দাঁড়ের নিক্ষেপে।' প্রসঙ্গ নির্দেশ করে তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: রূপকাৰ্থ বিশিষ্ট ‘নোঙর’ কবিতার কথক ব্যক্তিজীবনকে নৌকার সঙ্গে তুলনা করেছেন; আর সে জীবন পারিপার্শ্বিক গণ্ডিবদ্ধতায় আবদ্ধ। কিন্তু এই সংকীর্ণ সাংসারিকতার আবদ্ধতাকে ছিন্ন করে তিনি অচেনা স্বপ্নময়তার জগতে পাড়ি দিতে চান। অথচ মায়া-মোহ-কর্তব্যের অলঘ্য নোঙর তাঁর জীবনতরিকে সাংসারিকতার তটে আটকে রাখে। সময়ের স্রোতধারায় একাকী অসহায় কবির মনে হয় প্রতিবার দাঁড়ের নিক্ষেপে স্রোতের বিদ্রূপ ভেসে আসে। অর্থাৎ বন্ধন-মুক্তির নিষ্ফল প্রয়াসকে গতিশীল সময়ের স্রোত যেন উপহাস করে যায়।
“তরী ভরা পণ্য নিয়ে পাড়ি দিতে সপ্তসিন্ধুপারে।'—বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: ‘নোঙর’ কবিতার কথক ব্যক্তিজীবনকে তাঁর বা নৌকার সঙ্গে তুলনা করেছেন। আর কথকের অন্তর্মনের স্বপ্ন-কল্পনা-অভিজ্ঞতা-ঐশ্বর্য অর্থাৎ জীবনের সঞ্জয় হল তাঁর পণ্য। এই অসামান্য সম্পদকে সম্বল করে তিনি সুদূর স্বপ্নময় মুক্ত জগতে পাড়ি দিতে চান। কথকের রোমান্টিক মনের মানস-যাত্রার অভিলাষ পঙ্ক্তিটির মাধ্যমে ব্যক্ত হয়েছে।