‘খেয়া নৌকা পারাপার করে নদীস্রোতে’; - খেয়া নৌকা পারাপার করে কেন?
উত্তর: আলোচ্য উদ্ধৃতিটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘খেয়া’ কবিতা থেকে গৃহীত। নদীমাতৃক বাংলাদেশে মানুষের যাতায়াতের অন্যতম প্রধান মাধ্যম খেয়া নৌকা। কর্মসূত্রে বা অন্যান্য প্রয়োজনে মানুষকে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে যেতে হয়। তাই পল্লিগ্রামের জীবনচর্যার অন্যতম প্রধান যোগসূত্র হল খেয়া। নদীতীরস্থ দুটি গ্রামের মানুষের প্রাত্যহিক জীবন আবর্তিত হতে থাকে খেয়ার আনাগোনার মাধ্যমে। নদী পারাপারের সূত্রকে কেন্দ্র করে এই খেয়া নৌকাই দুই গ্রামের মানুষকে আবহমানকাল ধরে মানবিক আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ করে রাখে।
'কেহ যায় ঘরে, কেহ আসে ঘর প্রশ্ন হতে'–উদ্ধৃতাংশটির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো।
অথবা,
'কেহ যায় ঘরে, কেহ আসে ঘর হতে’—উদ্ধৃতাংশে ‘ঘর’ কোন্ ব্যঞ্ছনা ফুটিয়ে তোলে?
উত্তর: দার্শনিক কবি রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘খেয়া’ কবিতায় নদী তীরবর্তী দুটি গ্রামের মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ছবি এঁকেছেন। নিত্য প্রয়োজনার্থে খেয়া নৌকার যাত্রীরা ঘর ছেড়ে গন্তব্যে পৌঁছায় এবং প্রয়োজন মিটিয়ে নিজের ঘরে ফেরে। কর্মব্যস্ত গ্রামীণ মানুষের জীবনে নিরন্তর এই আনাগোনা চলতেই থাকে সকাল থেকে সন্ধ্যা। তবে এই বাস্তবের আড়ালে কবি বোঝাতে চেয়েছেন, মানুষ জন্মের মাধ্যমেই পৃথিবীর ‘ঘরে' আসে আর মৃত্যুতে ফিরে যায় চিরকালের আবাসভূমিতে। কবি তার এই ঘরে যাওয়া-আসাকে কেন্দ্র করে জীবনের অনন্ত প্রবাহমানতাকে তুলে ধরেছেন।
‘দুই তীরে দুই গ্রাম আছে জানাশোনা' - এই ‘জানাশোনা’-র অন্তর্নিহিত অর্থ বুঝিয়ে লেখো।
অথবা,
গ্রাম দুটির পারস্পরিক সম্পর্ক কবিতায় কেমনভাবে ফুটে উঠেছে লেখো।
উত্তর: 'খেয়া' কবিতায় আছে নদী-তীরবর্তী দুটি গ্রামের ছবি। তাদের মাঝখানে প্রবহমান নদী। আর এই নদীস্রোতে ভাসমান খেয়া নৌকা উভয়ের মধ্যে যোগাযোগের সূত্র। গ্রামের মানুষ প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে খেয়াপথে নিত্য আনাগোনা করে। আবহমানকাল ধরে গ্রামীণ জীবনে এই আসা-যাওয়া দুই গ্রামের মধ্যে গড়ে তুলেছে এক নিবিড় একাত্মতার বন্ধন। তাই মানব-জীবনপ্রবাহের সরল স্বাভাবিকতার ছন্দ ফুটিয়ে তুলতে ‘জানাশোনা’-র মতো সহজ আটপৌরে শব্দ প্রয়োগ করে কবি এই চিরন্তন সত্যকেই ফুটিয়ে তুলেছেন।
‘সকাল হইতে সন্ধ্যা করে আনাগোনা'— ‘আনাগোনা’ শব্দটির অর্থ কী? কারা কেন আনাগোনা করে?
উত্তর: কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘খেয়া’ কবিতা থেকে উদ্ধৃত পঙ্ক্তিটিতে ‘আনাগোনা’ শব্দটির অর্থ হল আসা-যাওয়া।
→ ‘খেয়া’ কবিতার প্রারম্ভিক চরণেই আছে গ্রামীণ জীবনের কর্মব্যস্ততার ছবি। নদীপ্রধান বাংলাদেশের নদী-তীরস্থ দুটি গ্রামের মানুষদের দৈনন্দিন জীবন আবর্তিত হয় খেয়ায় আসা-যাওয়ার মাধ্যমে। খেয়া নৌকাই হল দুই পারের দুই গ্রামের মানুষের জীবনচর্যার প্রধান যোগসূত্র। তাই সকাল থেকে সন্ধ্যা প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে উভয় তীরস্থ মানুষ নদীস্রোতে খেয়া নৌকায় পারাপার করে চলে। আলোচ্য উদ্ধৃতাংশে কবি এ কথাই বলতে চেয়েছেন।
‘পৃথিবীতে কত দ্বন্দ্ব, কত সর্বনাশ - উদ্ধৃতাংশটির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো।
অথবা,
‘নূতন নূতন কত গড়ে ইতিহাস’—কীভাবে ‘নূতন নূতন’ ইতিহাস গড়ে ওঠে বলে কবি মনে করেছেন?
অথবা,
‘পৃথিবীতে কত দ্বন্দ্ব, কত সর্বনাশ—কবি-বর্ণিত এই দ্বন্দ্ব ও সর্বনাশের কারণ কী বলে তুমি মনে করো? কবি এর ফল কী মনে করেন?
উত্তর: ‘খেয়া’ কবিতায় কবি রবীন্দ্রনাথ মানব ইতিহাসের প্রতি দৃষ্টিপাত করে এক ঐতিহাসিক-সত্য উপলব্ধি করেছেন। তাঁর মতে ক্ষমতা, অহংকার, লোভ, হিংসা ও বিদ্বেষের বশবর্তী রাষ্ট্রশক্তিগুলি বারংবার পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-সংঘাতে লিপ্ত হয়। তাই মানবসভ্যতার তথাকথিত ইতিহাস এই | সংঘর্ষ ও সর্বনাশের উত্থানপতনের রক্তাক্ত ধারাবিবরণী মাত্র।
→কবি দ্বন্দ্ব-সংঘাতে রঞ্জিত এহেন বর্বর পাশবিক ‘নূতন নূতন’ ইতিহাসকে আবহমান মানব-জীবনপ্রবাহের নিরিখে সাময়িক এবং তাৎপর্যহীন বলে মনে করেছেন।
'রক্তপ্রবাহের মাঝে ফেনাইয়া ওঠে' - ‘রক্তপ্রবাহ’ বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন? এখানে ‘ফেনাইয়া’ শব্দটি ব্যবহারের কারণ কী?
অথবা,
‘রক্তপ্রবাহের মাঝে ফেনাইয়া ওঠে'—পঙ্ক্তিটির তাৎপর্য বুঝিয়ে লেখো।
উত্তর: ‘খেয়া’ কবিতায় যুদ্ধের বিরুদ্ধে আজীবন সোচ্চার কবি ইতিহাসের রক্তাক্ত, বর্বর ও পাশবিক জয়-পরাজয়ের নগ্ন রুপটিকে তুলে ধরতে ‘রক্তপ্রবাহ' শব্দটি ব্যবহার করেছেন। শক্তিধর রাষ্ট্রগুলি নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করতে পৃথিবীকে বারবার যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছে আর তার ফলেই মানুষের রক্তে পঙ্কিল হয়েছে এই পৃথিবী।
→ ইতিহাসের দিকে লক্ষ করলে দেখা যায়, অশুভ শক্তির উত্থানপতন বুদবুদের মতো ক্ষণস্থায়ী। এই সত্যটি বোঝাতেই কবি ‘ফেনাইয়া' শব্দটি ব্যবহার করেছেন।
‘সোনার মুকুট’ শব্দবন্ধের অন্তর্নিহিত ব্যগুনাটি ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: ‘সোনার মুকুট’ কথাটির আভিধানিক অর্থ হল স্বর্ণনির্মিত রাজশিরোস্ত্রাণ। সাধারণত রাজতন্ত্রের প্রতীক হিসেবেই ‘সোনার মুকুট’ শব্দবন্ধের প্রয়োগ করা হয়। কিন্তু ‘খেয়া’ কবিতায় কবি ব্যাপক অর্থে এই প্রতীকের প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। ক্ষমতালিপ্সু মানুষের লোভ-লালসা ও মদমত্ততার প্রতীক হল ‘সোনার মুকুট'। তাই শুধু রাজতন্ত্রে নয়, অতীত বা বর্তমানে যে যখন ক্ষমতার শীর্ষে, সে তখন স্বর্ণমুকুট অধিকার করেছে। আবার পরাজিত বা ক্ষমতাচ্যুত হওয়া মানেই সোনার মুকুটের ভঙ্গুর বা চূর্ণ-বিচূর্ণ অবস্থা।
‘সোনার মুকুট কত ফুটে আর টুটে!'— ‘ফুটে আর টুটে’ বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন?
উত্তর: ‘খেয়া’ কবিতায় কবি ‘সোনার মুকুট’কে ক্ষমতালিপ্স মানুষের দম্ভ ও মদমত্ততার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন। ইতিহাসের পথে দৃষ্টি সুদুরপ্রসারিত করলে দেখা যায়, রাজশক্তি কিংবা রাষ্ট্রশক্তির উত্থানপতন বা জয়-পরাজয়ের স্থায়িত্ব সাময়িক। আজ যে বিজয়ীর অহংকাে বিজিতকে পর্যুদস্ত করে, আগামীকাল সে নিজেই সর্বস্ব হারিয়ে বিজিতের স্থান দখল করে। তাই মানব-ইতিহাসকে রক্তাক্ত করা ছাড়া, এই জয়-পরাজয়ের কোনো স্থায়ী মূল্য নেই। এভাবেই সোনার মুকুটের শোভা পাওয়া ('ফুটে') কিংবা ভেঙে পড়া (টুটে') আসলে বহমান ইতিহাসে ক্ষণস্থায়িত্বের অনিবার্যতাকে বাণীরূপ দেয়।
‘সভ্যতার নব নব কত তৃয়া ক্ষুধা' – এমন কথা বলার কারণ ব্যাখ্যা করো।
অথবা,
‘নব নব কত তৃয়া ক্ষুধা-’ বলার তাৎপর্য বুঝিয়ে দাও।
অথবা,
‘তৃস্না’ ও ‘ক্ষুধা'-র সঙ্গে সত্যতার সম্পর্ক কী? এরা কীভাবে সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে চলে।
উত্তর: কবি রবীন্দ্রনাথ ‘খেয়া’ কবিতায় মানব-ইতিহাসের সুদীর্ঘ প্রেক্ষাপটে উত্থানপতন, ধ্বংস ও পুনর্নির্মাণের বিপরীতে অন্তহীন জীবনধারার বহমানতাকে লক্ষ করেছেন। এই বিবর্তমান ভাঙা-গড়ার পরিক্রমায় বিভিন্ন সভ্যতার উন্মেষ ঘটেছে। কিন্তু এইসব নতুন নতুন সভ্যতার উন্মেষ ও বিকাশের ফলে নানাম বিচিত্র ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা-চাহিদা ও প্রবণতার সৃজন হয়েছে পৃথিবীর বুকে। বিভিন্ন সভ্যতা তার পূর্বের অপ্রাপ্তি ও অপূর্ণতাকে পুরণের পাশাপাশি তেমনই নিজের ‘তৃয়া’ ও ‘ক্ষুধা' অর্থাৎ বাসনা আর চাহিদা মেটানোর জন্যও প্রয়াসী হয়েছে।
→ এভাবেই নব নব তৃয়া ও ক্ষুধার অনুপ্রেরণায় মানবসভ্যতা তার অগ্রগমনের বৈচিত্র্যপূর্ণ উপাদান সংগ্রহ করে ইতিহাসের পথে ক্রম-অগ্রসর হয়েছে।
‘উঠে কত হলাহল, উঠে কত সুধা' - ‘হলাহল’ ও ‘সুধা' কী? এ প্রসঙ্গে এমন মন্তব্যের কারণ কী বলে তোমার মনে হয়?
অথবা,
‘উঠে কত হলাহল, উঠে কত সুধা — সভ্যতা প্রসঙ্গে কবি এমন বিপরীতধর্মী দুটি শব্দের প্রয়োগ ঘটিয়েছেন কেন?
অথবা,
‘উঠে কত হলাহল, উঠে কত সুধা'—প্রসঙ্গ উল্লেখ করে পঙ্ক্তিটির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: পুরাণে বর্ণিত আছে দেবাসুর কর্তৃক সমুদ্রমন্থনকালে প্রথমে তীব্র বিষ উত্থিত হয়েছিল এবং শেষে পাওয়া গিয়েছিল অমৃত। কবি দেখেছেন মানবসভ্যতার ইতিহাসেও এই বিপরীত বৈশিষ্ট্যের প্রতিফলন। সেখানে সংঘর্ষ-সর্বনাশের রক্তাক্ত ‘হলাহল' যেমন আছে, তেমনই তা আবার মানবজীবনের অন্তর্গত অপূর্ণতা পুরণের শুভ মানবিক প্রয়াসের সুধারসেও পরিপূর্ণ। এই বৈপরীত্য থেকে যেন সভ্যতার পরিত্রাণ নেই; এ কথা বোঝাতেই ‘খেয়া’ কবিতায় কবি এমন উপমা ব্যবহার রেছেন।
‘দোঁহা-পানে চেয়ে আছে দুইখানি গ্রাম ‘দোঁহা-পানে’ কথাটির অর্থ কী? তাদের পরস্পরের দিকে চেয়ে থাকার কারণ কী বলে তোমার মনে হয়?
→ গ্রাম দুটি অন্তরঙ্গ মানবিকতার বন্ধনে আবদ্ধ। আবহমান কাল ধরে মানব-জীবনপ্রবাহের মূল সুর তাদের শিরা-ধর্মনির মধ্যে স্পন্দিত হয়। সভ্যতার উত্থানপতনকে অস্বীকার করে, তাদের এই অপলক চেয়ে থাকা জীবন-মৃত্যু অতিক্রমকারী গভীর জীবনদৃষ্টির প্রতীক।
