“ধ্রুবতারার উন্নতিকোণের সাহায্যে বোঝা যায় পৃথিবী গোলাকার।”- কারণ ব্যাখ্যা করো।
ধ্রুবতারার উন্নতিকোণের সাহায্যে পৃথিবী যে গোল তা বোঝা যায়। ধ্রুবতারাকে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থান থেকে বিভিন্ন কোণে লক্ষ করা যায়| নিরক্ষরেখার ওপর একে 0° কোণে, কর্কটক্রান্তিরেখার ওপর 23½° কোণে এবং সুমেরু বিন্দুতে 90° কোণে দেখা যায় | পৃথিবী গোলাকার বলেই এমন ঘটনা ঘটে। পৃথিবী সমতল হলে পৃথিবীর সব স্থানে ধ্রুবতারাকে একই কৌণিক অবস্থানে দেখা যেত।
নিরক্ষীয় অঞ্চল অপেক্ষা মেরু অঞ্চলে মাধ্যাকর্ষণ বলের প্রভাব বেশি হয় কেন?
পৃথিবীর আকৃতি নিখুঁত গোলাকার নয় | পৃথিবীর নিরক্ষীয় ব্যাস 12757 কিমি এবং মেরু ব্যাস 12714 কিমি। অর্থাৎ পৃথিবীর নিরক্ষীয় অঞ্চল স্ফীত ও মেরুপ্রদেশ চাপা। পৃথিবীর দুটি মেরু অঞ্চলের সাথে পৃথিবীর কেন্দ্রের দূরত্ব নিরক্ষীয় অঞ্চলের সাপেক্ষে কম হওয়ায় কেন্দ্রের আকর্ষণ বল মেরুর দিকে বেশি এবং নিরক্ষীয় অঞ্চল কম |
নিরক্ষীয় অঞ্চল অপেক্ষা মেরু অঞ্চলে বস্তুর ওজন বেশি হয় কেন?
যেসব স্থান পৃথিবীর কেন্দ্রের কাছে অবস্থিত, সেইসব স্থানে মাধ্যাকর্ষণ বলের প্রভাব বেশি | ফলে বস্তুর ওজনও বেশি হবে। পৃথিবীর আকৃতি অভিগত গোলক অর্থাৎ পৃথিবীর মেরুপ্রদেশ চাপা এবং নিরক্ষীয় প্রদেশ স্ফীত | তাই নিরক্ষীয় অঞ্চল পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে দূরে অবস্থিত হওয়ায় মাধ্যাকর্ষণ বলের মান মেরু অঞ্চল অপেক্ষা কম হয় এবং বস্তুর ওজনও কম হয়। সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই নিরক্ষীয় অঞ্চলের তুলনায় মেরু অঞ্চলে বস্তুর ওজন বেশি হবে।
পৃথিবীর আকৃতি নির্ধারণে মাধ্যাকর্ষণ বল এবং কেন্দ্রবহির্মুখী বলের ভূমিকা কতখানি?
উত্তর: পৃথিবীর আকৃতির নির্ধারণে মাধ্যাকর্ষণ বল এবং আবর্তন গতির ফলে উদ্ভূত কেন্দ্রবহির্মুখী বলের ভূমিকা রয়েছে। ভূকেন্দ্র থেকে নিরক্ষরেখার দূরত্ব বেশি হওয়ায় এখানে মাধ্যাকর্ষণ বল সবচেয়ে কম, কিন্তু আবর্তনের বেগ বেশি হওয়ায় এখানে কেন্দ্রবহির্মুখী বল সবচেয়ে বেশি সক্রিয় হয়। ফলে বস্তুসমূহ বাইরের দিকে ছিটকে যেতে চায় | অন্যদিকে, মেরু অঞ্চলে আবর্তনের বেগ এবং পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে দূরত্ব কম হওয়ায় এখানে কেন্দ্রমুখী বল অর্থাৎ মাধ্যাকর্ষণ বল অধিক ক্রিয়াশীল হয়। ফলে বস্তুসমূহ কেন্দ্রের দিকে আকর্ষিত হয়| এভাবে দুটি বিপরীতধর্মী বলের প্রভাবে পৃথিবীর আকৃতি সম্পূর্ণ গোলাকার না হয়ে অভিগত গোলাকৃতি হয়েছে।
ঘড়ির দোলনগতির পরীক্ষা থেকে কীভাবে পৃথিবীর অভিগত গোলক আকৃতির পরিচয় পাওয়া যায়?
উত্তর: 1671 সালে ফরাসি জ্যোতির্বিদ জ্যঁ রিচার পৃথিবীর কয়েকটি স্থানে ঘড়ির দোলনগতির পরীক্ষা করেন। তিনি দক্ষিণ আমেরিকার কেইন দ্বাঁপে (5° উত্তর) ভ্রমণকালে লক্ষ করেন, যে ঘড়িটি প্যারিস শহরে (49° উত্তর) সঠিক সময় দিত, সেই ঘড়িটিই প্রতিদিন আড়াই মিনিট করে দেরিতে চলছে। এইসময় তিনি ঘড়ির দোলকের ওপর মাধ্যাকর্ষণ বলের প্রভাব নিয়ে গবেষণা করেন। তিনি বলেন, কেইন দ্বীপটি নিরক্ষীয় অঞ্চলে অবস্থিত এবং এই অঞ্চলের পরিধি বেশি বলে প্যারিস শহরের তুলনায় এই দ্বীপের মাধ্যাকর্ষণ বল কম | তাই ঘড়ির দোলন ধীরগতিতে ঘটছে ও ঘড়িটি আড়াই মিনিট করে দেরিতে চলছে (নিরক্ষীয় অঞ্চল ভূকেন্দ্র থেকে দূরবর্তী হওয়ায় মাধ্যাকর্ষণ বলের মান কম, তাই ঘড়ির দোলনকাল বেশি)। এর থেকে পৃথিবীর অভিগত গোলক আকৃতির প্রমাণ পাওয়া যায়।
মেরু নক্ষত্রের মাধ্যমে পৃথিবীর গোলীয় আকার কীড়াবে প্রমাণিত হয়?
উত্তর: পৃথিবীর উত্তর মেরুর ওপর ধ্রুবতারা এবং দক্ষিণ মেরুর ওপর সিগমা অকট্যানটিস | ঠিক লম্বভাবে অর্থাৎ 90° কোণে অবস্থিত।দুই মেরু বিন্দু থেকে যতই নিরক্ষরেখা অভিমুখে যাওয়া যায়, এই তারা দুটির উন্নতিকোপ ততই কমতে থাকে এবং নিরক্ষরেখার ওপর কোনো ব্যক্তি এই দুই তারাকে দিগন্ত রেখায় বা 0° কোণে দেখতে পায়। পৃথিবীর আকৃতি সমতল হলে সর্বর একই কোপে ওই দুটি মেরু নক্ষত্রকে দেখা যেত। সুতরাং পৃথিবীর আকৃতি গোলীয়।
নিরক্ষীয় অঞ্চল থেকে মেরুর দিকে অগ্রসর হলে বৃত্তচাপের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি পায় কেন?
উত্তর: পৃথিবীর দুই মেরুপ্রদেশ চাপা এবং নিরক্ষীয় প্রদেশ স্ফীত। সেজন্যই নিরক্ষীয় অঞ্চলের বৃত্তচাপের দৈর্ঘ্য কম এবং মেরু অঞ্চলে বেশি হয়। 1737 খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সের রয়্যাল অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সেস কিটো (0°), প্যারিস (49° উত্তর) এবং ল্যাপল্যান্ড (68° উত্তর)—এই তিনটি শহরে পৃথিবীর পরিধির একটি নির্দিষ্ট বৃত্তচাপ নিখুঁতভাবে পরিমাপ করে। দেখা গেছে, কিটো শহরে বৃত্তচাপের দৈর্ঘ্য সবচেয়ে কম। প্যারিস শহরে তা কিটো শহরের থেকে বেশি এবং ল্যাপল্যান্ডে এই বৃত্তচাপের দৈর্ঘ্য সর্বাধিক। এর থেকে প্রমাণ হয়, নিরক্ষীয় অঞ্চল থেকে মেরুর দিকে অগ্রসর হলে বৃত্তচাপের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি পায়।
কীভাবে প্রমাণ করবে পৃথিবী একটি আদর্শ অভিগত গোলক নয়?
উত্তর: অভিগত গোলক বলতে বোঝায়, গোলকের কোনো দুই বিপরীত দিকের পরিধি একটু বৃহৎ এবং এর সমকোণের দুই বিপরীত দিকের পরিধি —পৃথিবী। এর পূর্ব-পশ্চিম (নিরক্ষরেখা বরাবর) অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র; যেমন— বিস্তৃতি একটু বেশি এবং উত্তর-দক্ষিপ (মেরুদ্বয় বরাবর) পরিধি অপেক্ষাকৃত কম। কিন্তু পৃথিবীকেও আদর্শ অভিগত গোলক বলা যায় না। কারণ— 1) কৃত্রিম উপগ্রহ থেকে তোলা বা দূর সংবেদনে পাঠানো ছবি থেকে ধরা পড়েছে যে পৃথিবীর উত্তর মেরু 20 মিটার উঁচু এবং দক্ষিণ মেরু 20 মিটার চাপা | আবার উত্তর গোলার্ধের মধ্যভাগ ৪ মিটার চাপা ও দক্ষিণ গোলার্ধের মধ্যভাগ ৪ মিটার স্ফীত । 2) পৃথিবীর পৃষ্ঠদেশ সর্বত্র সমতলও নয়। এখানে এভারেস্টের মতো উচ্চতাবিশিষ্ট (8848 মি+) স্থানের সাথে মারিয়ানা খাতের ন্যায় নীচু স্থান (10916 মিটার) ও অবিস্থত।
