পৃথিবীর গতি সম্পর্কে প্রাচীন মতবাদগুলি লেখো।
উত্তর: বহু প্রাচীনকাল থেকেই পৃথিবীর গতি সম্পর্কে নানা ধরনের মতপার্থক্য ছিল। প্রাচীনকালে মানুষ ‘পৃথিবীকেন্দ্রিক মতবাদ’-এ বিশ্বাস করত। এই মতবাদে বলা হয় মহাবিশ্বের মাঝখানে রয়েছে পৃথিবী এবং তার চারপাশে গ্রহ, নক্ষত্র এবং অন্যান্য জ্যোতিষ্ক ঘুরে বেড়াচ্ছে।
খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে গ্রিক দার্শনিক থালে, অ্যানাক্সিম্যানডার, পরবর্তীকালে প্লেটো, টলেমি প্রমুখ পৃথিবীকেন্দ্রিক মতবাদে বিশ্বাস করতেন। প্লেটো মনে করতেন, ব্রহ্মাণ্ডের ঠিক মাঝখানে পৃথিবী অবস্থান করছে | মধ্যযুগে রোমান ক্যাথলিক চার্চও এই মতবাদের সমর্থক ছিল।
পৃথিবীর সর্বত্র আবর্তন বেগ সমান নয় কেন?
উত্তর: পৃথিবী 23 ঘণ্টা 56 মিনিট 4 সেকেন্ডে নিজ অক্ষের ওপর একবার আবর্তন করে। পৃথিবীর বিভিন্ন অক্ষরেখায় পরিধি বিভিন্ন হওয়ার কারণে বিভিন্ন অক্ষরেখার আবর্তন বেগের তারতম্য হয়। নিরক্ষরেখা বরাবার পৃথিবীর পরিধি সবচেয়ে বড়ো, তাই নিরক্ষরেখা বরাবর পৃথিবীর আবর্তন বেগও সর্বাধিক। নিরক্ষরেখায় পৃথিবীর আবর্তন বেগ ঘণ্টায় 1675 কিষি। নিরক্ষরেখা থেকে মেরুর দিকে যত যাওয়া যায় ততই পৃথিবীর পরিধি ক্রমশ ছোটো হতে হতে মেরুতে শূন্য হয়। তাই নিরক্ষরেখা থেকে মেরুর দিকে পৃথিবীর আবর্তন বেগও কমে যায়।
আমরা পৃথিবীর আবর্তন গতি বুঝতে পারি না—কারণ ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: আমরা পৃথিবীর আবর্তন গতি বুঝতে পারি না, তার কারণ হল—
মানুষ ও পরিপার্শ্বিক পরিবেশের একইসঙ্গে আবর্তন: আমরা যেখানে বসবাস করি তার চারপাশের গাছপালা, বাড়িঘর, মাঠঘাট সবকিছুই আমাদের সঙ্গে একইভাবে আবর্তন করে চলেছে। তাই পৃথিবীর আবর্তন গতি আমাদের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। আমাদের পৃথিবীকে স্থির বলে মনে হয়।
অভিকর্ষজ বল : পৃথিবী নিজের মাধ্যাকর্ষণ বলের দ্বারা আমাদের ও ভূপৃষ্ঠের অন্যান্য বস্তুকে নিজের কেন্দ্রের দিকে আকর্ষণ করে। ফলে, আমরা পৃথিবীর গায়ের সঙ্গে লেগে থাকি ও এত প্রবল গতিতে পৃথিবীর আবর্তন সত্ত্বেও ছিটকে পড়ি না।
ক্ষুদ্রাকার: পৃথিবীর আয়তনের তুলনায় আমরা এতই ক্ষুদ্র যে আমাদের পক্ষে পৃথিবীর আবর্তন গতি বোঝা সম্ভব নয়।
সূর্যের দৈনিক আপাত গতি কী?
উত্তর: উৎপত্তির পর থেকেই সূর্যের চারিদিকে পৃথিবী নিজের মেরুদণ্ডের ওপর। অবিরাম আবর্তন করে চলেছে। পৃথিবীর ওপরে অবস্থান করায় আমাদের। মনে হয় পৃথিবী স্থির আর সূর্য পৃথিবীকে কেন্দ্র করে পূর্বদিক থেকে। পশ্চিমদিকে ঘুরে চলেছে। এ জন্যই আমরা সূর্যকে প্রতিদিন পূর্বদিকে উদিত হতে আর পশ্চিমদিকে অস্ত যেতে দেখি। প্রকৃতপক্ষে পৃথিবী পশ্চিম থেকে পূর্বে আবর্তন করছে বলেই সূর্যকে পূর্ব থেকে পশ্চিমে যেতে দেখি। প্রতিদিন সূর্যের পূর্ব থেকে পশ্চিমে এই আপাতভাবে সরে যাওয়াকেই সূর্যের দৈনিক আপাত গতি বলে।
ফেরেলের সূত্রটি লেখো।
উত্তর: পৃথিবীর আবর্তন গতির জন্য উৎপন্ন কেন্দ্রবহির্মুখী বলের কারণে পৃথিবীর ওপর গতিশীল কোনো বস্তু কেন্দ্র থেকে বাইরের দিকে সোজা না গিয়ে বেঁকে যায় | একেই ফেরেলের সূত্র বলা হয়।
ফল: এই গতিবিক্ষেপের ফলে বায়ুপ্রবাহ ও সমুদ্রস্রোত উত্তর গোলার্ধে ডানদিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে বামদিকে বেঁকে যায় | নামকরণ: মার্কিন বিজ্ঞানী উইলিয়ম ফেরেল 1856 খ্রিস্টাব্দে এই সূত্রটি প্রতিষ্ঠা করেন বলে একে ফেরেলের সূত্র বলে।
পৃথিবীর অভিগত গোলাকার আকৃতির ওপর পৃথিবীর আবর্তন গতির কোনো প্রভাব আছে কি?
উত্তর: হ্যাঁ, আছে। পৃথিবীর নিজ অক্ষের চারিদিকে আবর্তন করার জন্য কেন্দ্রবহির্মুখী বলের সৃষ্টি হয়। পৃথিবী যখন গ্যাসীয় ও তরল অবস্থায় ছিল তখন ওই বলের প্রভাবে মেরু অঞ্চলের বস্তু নিরক্ষীয় অঞ্চলের দিকে সরে আসে| তার ফলে নিরক্ষীয় অঞ্চলটি স্ফীত বা ফোলা হয়েছে এবং মেরুপ্রদেশ চ্যাপটা বা চাপা হয়েছে। অর্থাৎ পৃথিবীর অভিগত গোলীয় আকৃতি সৃষ্টির জন্য পৃথিবীর আবর্তনই দায়ী। বৃহস্পতি, শনি প্রভৃতি গ্রহগুলির আবর্তন বেগ পৃথিবী অপেক্ষা বেশি হওয়ার জন্য এদের মেরুপ্রদেশ অনেক বেশি চ্যাপটা |
“আবর্তন গতি না থাকলে পৃথিবীতে প্রাণের বিকাশ হত না" এই বক্তব্যের সমর্থনে তিনটি যুক্তি দেখাও।
উত্তর: “আবর্তন গতি না থাকলে পৃথিবীতে প্রাণের বিকাশ হত না” এই বক্তব্যের সমর্থনে যুক্তি— 1) পৃথিবীর আবর্তন গতির জন্য পর্যায়ক্রমে দিন ও রাত্রি সংঘটিত হয়। এর ফলে পৃথিবীর বিভিন্ন অংশে উন্নতার সমতা বজায় থাকে। এই কারণেই পৃথিবীতে উদ্ভিদ ও প্রাণীজগৎ সৃষ্টির উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি হয়। 2) পৃথিবীর আবর্তন গতি না থাকলে পৃথিবীর যে অংশ চিরকাল সূর্যের দিকে অবস্থান করত, সেই অংশ প্রখর উত্তপ্ত এবং এর বিপরীত অংশ আলো ও উত্তাপের অভাবে প্রবল শীতল হত । ফলে পৃথিবীতে প্রাণের বিকাশ হত না, উদ্ভিদ ও প্রাণীজগতের কোনো অস্তিত্বই থাকত না।
কোরিওলিস বল বা কোরিওলিস এফেক্ট বলতে কী বোঝ?
পৃথিবীর আবর্তন গভির জন্য একটি কেন্দ্রবহির্মুখী বলের সৃষ্টি হয়। এই বলের জন্য ভূপৃষ্ঠের ওপর দিয়ে কোনো গতিশীল বস্তু (যেমন – বায়ুপ্রবাহ এবং সমুদ্রস্রোত) সোজা পথে প্রবাহিত না হয়ে একটু বেঁকে প্রবাহিত হয়। যে বলের কারণে বায়ুপ্রবাহ এবং সমুদ্রস্রোতের এই দিকবিক্ষেপ ঘটে, সেই বলকে কোরিওলিস বল (Coriolis force) বা কোরিওলিস এফেক্ট (Coriolis (effect) বলে।
1835 সালে ফরাসি গণিতবিদ গ্যাসপার্ড গুস্তাভ দ্য কোরিওলিস (GG De Coriolis) এই বলটি আবিষ্কার করেন। তাঁর নামানুসারে এই বলকে কোরিওলিস বল বা কোরিওলিস এফেক্ট নাম দেওয়া হয়েছে।
কোরিওলিস বলের প্রভাব লেখো।
কোরিওলিস বলের প্রভাবে ভূপৃষ্ঠের ওপর দিয়ে প্রবাহিত কোনো গতিশীল বস্তুর দিকবিক্ষেপ ঘটে। এই বলের প্রভাবে বায়ুপ্রবাহ এবং সমুদ্রস্রোত উত্তর গোলার্ধে সোজাসুজি প্রবাহিত না হয়ে একটু ডানদিকে (ঘড়ির কাটার গতির দিকে) বেঁকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে একটু বামদিকে (ঘড়ির কাটার গতির বিপরীত দিকে) বেঁকে প্রবাহিত হয় | এই কোরিওলিস বল বায়ুচাপ ঢালের সমকোণে প্রযুক্ত হয় | বিজ্ঞানী ফেরেল এই সূত্রটি আবিষ্কার করেন বলে তার নামানুসারে এই সূত্রকে ফেরেলের সূত্র বলে | প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, কোরিওলিস বল কেবলমাত্র গতিপথের বিক্ষেপ ঘটায় কিন্তু গতিবেগের ওপর কোনো প্রভাব বিস্তার করে না।
পৃথিবীর অক্ষের হেলানো অবস্থান ও তার গুরুত্ব লেখো।
উত্তর: পৃথিবীর অক্ষ তার কক্ষতলের সঙ্গে 66½° কোণে হেলে অবস্থান করে অর্থাৎ, পৃথিবীর অক্ষ কিছুটা হেলানো অবস্থায় রয়েছে। এর ফলে – 1) দিন ও রাত্রির দৈর্ঘ্যের হ্রাসবৃদ্ধি ঘটে। 2) উন্নতার তারতম্য হওয়ায় ঋতুপরিবর্তন ঘটে। 3) সূর্যরশ্মির পতনকোণের পার্থক্য হয়। 4) একই সময়ে উত্তর গোলার্ধে ও দক্ষিপ গোলার্ধে বিপরীত ঋতু দেখা যায়। সূর্যকে কখনও বড়ো ও কখনও ছোটো দেখায়।
