আবহবিকারকে বিচূর্ণীভবন বলে কেন?
আবহবিকারের মাধ্যমেই ভূপৃষ্ঠের শিলা যান্ত্রিক ও রাসায়নিক পদ্ধতিতে চূর্ণবিচূর্ণ এবং বিয়োজিত হয় বলে আবহবিকারকে বিচূর্ণীভবন বলে।
ক্ষয়ীভবন কী?
আবহবিকারপ্রাপ্ত চুর্ণবিচূর্ণ শিলাখণ্ডগুলি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে নদী, হিমবাহ প্রভৃতি প্রাকৃতিক শক্তির দ্বারা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বাহিত হলে তাকে ক্ষয়ীভবন বলে | অর্থাৎ, আবহবিকারপ্রাপ্ত শিলার স্থানান্তরের প্রক্রিয়াটি হল ক্ষয়ীভবন।
নগ্নীভবন কী?
ক্ষয়ীভবনের ফলে আবহবিকারপ্রাপ্ত শিলা অপসারিত হলে নীচের আদি শিলা ভূপৃষ্ঠে উন্মোচিত হয় বা দৃশ্যমান হয় | এই উন্মোচনের প্রক্রিয়াই হল নগ্নীভবন।
পুঞ্জিত ক্ষয় কী?
অভিকর্ষজ বলের প্রভাবে অনেক সময় পাহাড়ের/উচ্চভূমির ঢাল বরাবর আবহবিকারপ্রাপ্ত শিলাচূর্ণ, নুড়ি পাথর প্রভৃতি ‘পুঞ্জ' বা স্তূপের আকারে নেমে আসে। এটিই পুঞ্জিত ক্ষয় নামে পরিচিত।
পুঞ্জিত ক্ষয়কে কী কী ভাগে ভাগ করা যায়?
পুঞ্জিত ক্ষয়কে প্রধান দুটি ভাগে ভাগ করা যায়— ধীর প্রবাহ ও দ্রুত প্রবাহ।
আবহবিকার কত প্রকার ও কী কী?
আবহবিকার তিন প্রকার। যথা— যান্ত্রিক, রাসায়নিক ও জৈবিক আবহবিকার |
যান্ত্রিক আবহবিকার বলতে কী বোঝ ?
আবহাওয়ার বিভিন্ন উপাদান (যেমন—উন্নতা, বৃষ্টিপাত) দ্বারা শিলা নিজ স্থানে চূর্ণবিচূর্ণ হলে তাকে যান্ত্রিক আবহবিকার বলে |
ভূপৃষ্ঠের কোথায় যান্ত্রিক আবহবিকার বেশি দেখা যায়?
উচ্চ পার্বত্য অঞ্চল এবং শুষ্ক, উয় মরু অঞ্চলে যান্ত্রিক আবহবিকার বেশি দেখা যায়। যেমন—শুষ্ক মরু অঞ্চলে শল্কমোচন, ক্ষুদ্রকণা বিশরণ প্রভৃতি প্রক্রিয়ায় শিলা চূর্ণবিচূর্ণ হয়।
প্রস্তরটাই খণ্ডীকরণ কী ?
প্রস্তরচাই খণ্ডীকরণ হল যান্ত্রিক আবহবিকারের একটি প্রক্রিয়া। তাপের তারতম্যে দারণযুক্ত শিলাস্তর যখন অসম প্রসারণ ও সংকোচনের ফলে চাই বা ব্লকের মতো খণ্ডবিখণ্ড হয়ে যায়, তখন সেই প্রক্রিয়াই হল প্রস্তরচাই খণ্ডীকরণ।
তুষারের দ্বারা যান্ত্রিক আবহবিকার কোথায় দেখা যায় ?
উচ্চ পার্বত্য অঞ্চল এবং মেরু জলবায়ু অঞ্চলে তুষারের দ্বারা যান্ত্রিক আবহবিকার দেখা যায়।
ক্ষুদ্রকণা বিশরণ কী?
ঊন্ন মরু অঞ্চলে যান্ত্রিক আবহবিকারের একটি প্রক্রিয়া হল ক্ষুদ্রকণা বিশরণ। একাধিক খনিজ দ্বারা গঠিত শিলায় তাপের তারতম্যের ফলে সংকোচন ও প্রসারণের পরিমাণ পৃথক হয় বলে শিলায় প্রবল পীড়নের সৃষ্টি হয় ফলে শিলাগুলি ক্ষুদ্র অংশে বিভক্ত হয়ে চূর্ণবিচূর্ণ হয়, যা ক্ষুদ্রকণা বিশরণ নামে পরিচিত।
শল্কমোচন কী?
উন্নতার প্রসর বেশি হলে শিলাস্তরের বাইরের ও ভেতরের অংশের মধ্যে সংকোচন ও প্রসারণের তারতম্য ঘটে এবং শিলায় পীড়নের ফলে ফাটলের সৃষ্টি হয় | ফলে শিলার ওপরের স্তর নীচের স্তর থেকে পেঁয়াজের খোসার মতো খুলে আসে, যা শল্কমোচন নামে পরিচিত।
পার্বত্য অঞ্চলে কোন্ যান্ত্রিক আবহবিকার বেশি কার্যকরী?
পার্বত্য অঞ্চলে তুষারের দ্বারা যান্ত্রিক আবহবিকার বেশি কার্যকরী। উঁচু পার্বত্য অঞ্চলে রাতে তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নীচে নেমে গেলে শিলা মধ্যস্থ জল বরফে পরিণত হয়। আবার দিনেরবেলা তাপমাত্রা বাড়লে বরফ গলে জয়ে পরিণত হয় | এইভাবে ক্রমাগত জলের ভৌত অবস্থার পরিবর্তনের পার্শ্ব শিলায় চাপ পড়ে এবং শিলা ফেটে চূর্ণবিচূর্ণ হয়।
যান্ত্রিক আবহবিকারে তুষারের ভূমিকা কী?
শীতল জলবায়ু অঞ্চলে শিলাস্তরের ফাটলে জমা জল, রাতে তাপমাত্রা হিমাঙ্কের নীচে নামার ফলে তুষার কেলাসে পরিণত হলে আয়তনে 9% বেড়ে যায়। ওই তুষার কেলাস পার্শ্বস্থ শিলাস্তরে চাপ দিয়ে শিলাকে বিপ করে যান্ত্রিক আবহবিকার ঘটায়।
রাসায়নিক আবহবিকার কাকে বলে?
বায়ুমণ্ডলে উপস্থিত অক্সিজেন, কার্বন ডাইঅক্সাইড, জলীয়বাষ্প প্রভৃতি উপাদান দ্বারা শিলার নিজ স্থানে বিয়োজিত হওয়ার প্রক্রিয়াই হল রাসায়নিক আবহবিকার।
রাসায়নিক আবহবিকার কোন্ জলবায়ু অঞ্চলে অধিক হয়?
নিরক্ষীয় জলবায়ু অঞ্চলে উন্নতা ও বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বেশি হওয়ায়, রাসায়নিক আবহবিকারের বিভিন্ন প্রক্রিয়াগুলি (যেমন–আৰ্দ্ৰবিশ্লেষণ, জলযোজন প্রভৃতি) বেশি দেখা যায় |
জারণ কী?
বায়ুমণ্ডলের অক্সিজেনের উপস্থিতিতে জল, লৌহঘটিত শিলার খনিজের সঙ্গে রাসায়নিক বিক্রিয়া করে শিলার বিয়োজন ঘটায়, যা জারণ নামে পরিচিত। জারণ প্রক্রিয়ায় লোহা (ফেরাস অক্সাইড) সোেদক ফেরিক অক্সাইডে পরিণত হলে তা সহজে ভেঙে যায় ও এভাবে শিলায় মরচে পড়ে।
অঙ্গারযোজন কী?
ক্যালশিয়াম কার্বনেটঘটিত শিলার খনিজের সাথে, কার্বন ডাইঅক্সাইড মিশ্রিত জলের রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে ক্যালশিয়াম বাইকার্বনেট উৎপন্ন হয়। ফলে শিলার বিয়োজন ঘটে, যা অঙ্গারযোজন নামে পরিচিত।
জলযোজন কী?
শিলা মধ্যস্থ খনিজের সাথে জল যুক্ত হয়ে শিলার বিয়োজন ঘটার প্রক্রিয়া হল জলযোজন। এই প্রক্রিয়ায় হেমাটাইট জাতীয় লৌহ আকরিক লিমোনাইট-এ পরিণত হয়।
আর্দ্রবিশ্লেষণ কী?
আর্দ্রবিশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় শিলা মধ্যস্থিত খনিজের সাথে তড়িদ্বিশ্লিষ্ট জলের আয়নগুলির রাসায়নিক বিক্রিয়ায় শিলার বিয়োজন ঘটে। এই প্রক্রিয়ায় অর্থোক্লেজ ফেলপার জলযোজনের ফলে অ্যালুমিনো সিলিসিক অ্যাসিড ও পটাশিয়াম হাইড্রক্সাইড উৎপন্ন করে।
চুনাপাথরগঠিত অঞ্চলে রাসায়নিক আবহবিকার বেশি হয় কেন?
চুনাপাথরগঠিত অঞ্চলে অঙ্গারযোজন প্রক্রিয়া বেশি কার্যকরী হয়। জলের সাথে কার্বন ডাইঅক্সাইড মিশে কার্বনিক অ্যাসিড তৈরি করে। ওই মৃদু অ্যাসিড চুনাপাথরের (ক্যালশিয়াম কার্বনেট) সাথে রাসায়নিক বিক্রিয়া করে ক্যালশিয়াম বাইকার্বনেট তৈরি করে, যা সহজেই জলে দ্রবীভূত হয়।
নিরক্ষীয় অঞ্চলে রাসায়নিক আবহবিকারের প্রভাব বেশি দেখা যায় কেন?
1) নিরক্ষীয় অঞ্চলে সারাবছর ধরে অধিক উষ্মতা, বৃষ্টিপাতের কারণে শিলায় রাসায়নিক আবহবিকার ঘটে। 2) নিরক্ষীয় অঞ্চলের গাছের পাতা মাটিতে পড়ে হিউমিক অ্যাসিড তৈরি করে। ওই অ্যাসিড শিলার জৈব রাসায়নিক আবহবিকার ঘটায়।
শিলায় মরচে পড়ে কেন?
যেসব শিলা লৌহমিশ্রিত খনিজ দ্বারা গঠিত, সেইসব শিলার ওপর মরচে পড়ে। লৌহযুক্ত খনিজ বায়ুর অক্সিজেনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে জারণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ফেরাস অক্সাইড থেকে ফেরিক অক্সাইডে পরিণত হয়। ফলে শিলায় হালকা বাদামি হলুদ রঙের মরচে পড়তে দেখা যায়।
জৈব আবহবিকার কী?
উদ্ভিদ এবং প্রাণীর কার্যকলাপের দ্বারা অনেকসময় ভূপৃষ্ঠের শিলা চূর্ণবিচূর্ণ হয় বা জীবদেহের পচনের ফলে সৃষ্ট হিউমিক অ্যাসিড দ্বারা শিলার বিয়োজন ঘটে। এভাবে জীবের দ্বারা শিলার বিকার বা পরিবর্তন হল জৈব আবহবিকার।
জৈব আবহবিকার কত প্রকার ও কী কী?
জৈব আবহবিকার দুই প্রকার। যথা– জৈব-যান্ত্রিক আবহবিকার ও জৈব-রাসায়নিক আবহবিকার।
জৈব আবহবিকারে উদ্ভিদের ভূমিকা কী?
1) উদ্ভিদের শিকড় শিলার ফাটল বা মৃত্তিকার রন্ধ্র দিয়ে প্রবেশ করে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হলে শিলায় চাপ দেয় ও শিলার বিচূর্ণন ঘটায়।
2)মাটিতে উদ্ভিদের দেহাংশের (যেমন—পাতা, কাণ্ড প্রভৃতি) পচনে সৃষ্ট হিউমিক অ্যাসিড শিলার বিয়োজন ঘটায়।
জৈব আবহবিকারে মানুষের ভূমিকা কী?
1) মানুষ কৃষিকাৰ্য, খনিজ দ্রব্য উত্তোলন প্রভৃতির মাধ্যমে শিলার বিচূর্ণন ঘটায় |
2) ঘরবাড়ি নির্মাণ, খাল খনন, রাস্তা নির্মাণ প্রভৃতির মাধ্যমে শিলার বিচূর্ণন ও বিয়োজন ঘটে।
কলিকরণ কাকে বলে? অথবা, Slaking কাকে বলে?
সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলে প্রতিদিন দুবার জোয়ার ও ভাটার জন্য শিলা ক্রমান্বয়ে আর্দ্র এবং শুষ্ক হয় | শিলাতে আর্দ্রতা এবং শুষ্কতার তারতম্যের ফলে শিলা ফেটে যায়। একে কলিকরণ বা স্যাকিং বলে।
কলয়েড প্লাকিং কাকে বলে?
শিলাস্তরের ওপর মাটির কলয়েড সঞ্চিত হলে তা পরে শুকিয়ে যায় এবং মূল শিলার খনিজের ওপর চাপ দেয়। এর ফলে শিলার আবহবিকার ঘটে। এটিই কলয়েড প্লাকিং নামে পরিচিত।
ট্যালাস কী?
অতি শীতল পার্বত্য অঞ্চলে তুষারের ক্রিয়ার ফলে প্রবল চাপে শিলার ফাটল বৃদ্ধি পেলে তীক্ষ্ণ কোণবিশিষ্ট শিলাখণ্ড সৃষ্টি হয়। এই শিলাখণ্ডগুলি যখন পর্বতের পাদদেশে কৌণিক আকারে সঞ্চিত হয়, তখন তাকে ট্যালাস বা স্ক্রী বলে | লাদাখ মালভূমিতে এই ধরনের ট্যালাস সঞ্চয় দেখা যায়।
টর কাকে বলে ?
বৈষম্যমূলক আবহবিকারের ফলে কোনো কোনো অঞ্চলে কঠিন প্রকৃতির অন্তঃস্থ শিলা ভূপৃষ্ঠে উন্মুক্ত হয় এবং এর পার্শ্ববর্তী নরম শিলাস্তর অপসারিত হলে সেখানে কঠিন অন্তঃস্থ শিলা উন্মোচিত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে । মৃদু ঢালযুক্ত এলাকায় হঠাৎ খাড়াভাবে উঁচু এই ধরনের প্রস্তরখণ্ডকে টর বলে।
সোলাম কী ?
ভূপৃষ্ঠ এবং উপপৃষ্ঠীয় মৃত্তিকাস্তর নিয়ে গঠিত স্তর যে মৃত্তিকা গঠনের বিভিন্ন পর্যায়কে অতিক্রম করে, তাকে সোলাম বলে। সোলামে মুত্তিকার বিভিন্ন স্তর (A, B ইত্যাদি স্তর) উপস্থিত থাকে।
হিউমাস কী ?
উদ্ভিদ এবং প্রাণীর মৃত দেহাবশেষ জৈব পদার্থ হিসেবে শিলা বা মৃত্তিকার উপরিভাগে সঞ্চিত হয়। ওই সকল পদার্থ অতি সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম জীব দ্বারা পচন এবং বিয়োজনের মাধ্যমে পরিবর্তিত হয়ে গাঢ় বাদামি বা কালচে বর্ণের জটিল পদার্থ সৃষ্টি করে। একেই হিউমাস (Humus) বলে। মৃত্তিকা হিউমাসসমৃদ্ধ হলে তা উর্বর হয় এবং এর জলধারণক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়।
মৃত্তিকাক্ষয় কী?
প্রাকৃতিক বা অপ্রাকৃতিক কারণে মৃত্তিকাকণার বিচ্ছিন্নকরণ ও স্থানান্তর হল মৃত্তিকাক্ষয় | বিভিন্ন প্রাকৃতিক (বৃষ্টিপাত, বায়ুপ্রবাহ প্রভৃতি) ও নুষসৃষ্ট কারণের ফলে মৃত্তিকাক্ষয় হয়|
ধাপচাষ কোথায় দেখা যায় ?
পাহাড়ি বা পার্বত্য অঞ্চলে পাহাড়ের ছাল বরাবর ধাপচাষ দেখা যায়। যেমন—দার্জিলিং পার্বত্য অঞ্চলে ধাপচাষ দেখা যায়।
