দুর্যোগ কী?
প্রাকৃতিক ও মানবীয় কারণে অথবা উভয়ের সম্মিলিত কার্যের ফলে সৃষ্ট যে সকল ঘটনাবলি সমাজজীবনের স্বাভাবিক অবস্থার বিঘ্ন ঘটায়, তাকে দুর্যোগ বলে। যেমন—মরুভূমি এলাকায় ভূমিকম্প হলে তার ফলে রু এলাকার পরিবেশের অবনমন ঘটে, সেটি দুর্যোগ হিসেবে পরিগণিত হয়।
বিপর্যয় কী?
প্রাকৃতিক বা মানবীয় কারণে অথবা উভয়ের সম্মিলিত কার্যের ফলে সৃষ্ট দীর্ঘস্থায়ী অথবা ক্ষণস্থায়ী যে সকল ঘটনাবলি মানবজীবনকে বিঘ্নিত করে এবং জীবন ও সম্পত্তির প্রভূত ক্ষতি করে, তাকে বিপর্যয় বলে | অপরের সাহায্য ছাড়া বিপর্যয় প্রতিরোধ করা যায় না।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ কী?
কেবল প্রাকৃতিক নিয়মে সৃষ্ট যে সকল ঘটনাবলি মানবজীবনকে বিপর্য করে, তাদের প্রাকৃতিক দুযোগ বলে। যেমন—2004 সালে বার্মা পাতের নিচে ভারতীয় পাত প্রবেশ করায় তীব্র ভূমিকম্প ও সুনামি হয়।
আধাপ্রাকৃতিক দুর্যোগ কী?
যে দুর্যোগ সৃষ্টিতে প্রকৃতির সাথে সাথে মানুষের ভূমিকাও বর্তমান থাকে, তাদের আধাপ্রাকৃতিক দুর্যোগ বলে | যেমন—ধস হল একটি আধাপ্রাকৃতিক দুর্যোগ, যা অধিক বৃষ্টিপাতের ফলেও যেমন সৃষ্টি হয়, তেমনি মানুষের অবিবেচনাপ্রসূত কার্যকলাপের ফলেও ঘটে থাকে।
পশ্চিমবঙ্গের প্রধান দুর্যোগ বা বিপর্যয়গুলি কী কী?
পশ্চিমবঙ্গের প্রধান দুর্যোগ বা বিপর্যয়গুলি হল—খরা, বন্যা, ধস, ভূমিকম্প ও ঘূর্ণিঝড়।
দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চল কী?
বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও অপ্রাকৃতিক দুর্যোগ তথা বিপর্যয়ের সম্ভবনা অঞ্চলকে দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চল বলা হয়। যেমন—পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং ও কালিম্পং জেলা ধস ও ভূমিকম্পজনিত দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চল, সমুদ্র উপকূলবর্তী পূর্ব মেদিনীপুর জেলা ঘূর্ণিঝড় ও সুনামির দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চল | ঝুঁকির সম্ভাবনার দ্বারা দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চল চিহ্নিত করা হয়।
বন্যা কী ?
একটানা কয়েকদিন ধরে চলা অতিরিক্ত বৃষ্টি কিংবা অন্য কোনো কারণে নদীর জলস্তর বিপদসীমা ছাড়িয়ে প্রবাহিত হলে এবং তা বিস্তীর্ণ অববাহিকাকে জলমগ্ন করলে, তখন তাকে বন্যা বলে।
আচমকা বা হড়পা বান কী?
উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে অল্পসময়ে প্রচুর পরিমাণে বৃষ্টির ফলে হঠাৎ করে বা আকস্মিকভাবে বিশাল আয়তনের জলের প্রবাহ সৃষ্টি হয়, যাকে হড়পা বান বলে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়—2013 সালে উত্তরাখণ্ডের জোশীমঠের কাছে হড়পা বানের ফলে প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়।
বাঁধ-সংক্রান্ত বন্যা কী?
নদীপথে নির্মিত অতিকায় বাঁধ থেকে অতিরিক্ত জল নিষ্কাশন করা অথবা বাঁধ ভেঙে যাওয়ার ফলে নদীর নিম্ন অববাহিকায় যে বন্যা হয় তাকে বাঁধ সংক্রান্ত বন্যা বলে। যেমন— দামোদর অববাহিকায় নির্মিত বাঁধের (DVC বাঁধ) ফলে এই ধরনের বন্যা দেখা যায়।
খরা কী ?
কোনো অঞ্চলে দীর্ঘকাল বৃষ্টির অভাবে অথবা পর্যাপ্ত পরিমাণে বৃষ্টির অভাবে যে শুষ্ক অবস্থার সৃষ্টি হয়, তাকে বলে খরা |
IMD (India Meteorological Department) মতানুসারে, কোনো অঞ্চলে গড় বার্ষিক বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের 75% বা এর কম হলে খরার সৃষ্টি হয়।
আবহাওয়া-সংক্রান্ত খরা কী?
দীর্ঘকাল বৃষ্টির অভাবে জলের পরিমাণ স্বাভাবিকের থেকে কমে যাওয়ার ফলে যে খরা সৃষ্টি হয় তা হল আবহাওয়া সংক্রান্ত খরা।
কৃষি-সংক্রান্ত খরা কী?
বৃষ্টির অভাবে মাটির আর্দ্রতা কমে গেলে শস্যের বৃদ্ধির জন্য জল না পাওয়া গেলে শস্যের বৃদ্ধি ব্যাহত বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে, তাকে বলে কৃষি-সংক্রান্ত খরা।
পশ্চিমবঙ্গের কোথায় কোথায় খরার প্রকোপ বেশি দেখা যায় ?
পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিমাংশের মালভূমি অঞ্চলে (পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, বীরভূম, পশ্চিম মেদিনীপুরের পশ্চিমাংশ) খরার প্রকোপ বেশি দেখা যায়।
ঘূর্ণিঝড় কী?
ক্রান্তীয় ও নাতিশীতোয়মণ্ডলের উন্নতা হঠাৎ বৃদ্ধি পেলে সেখানে নিম্নচাপের সৃষ্টি হয়। এই সময় পার্শ্ববর্তী উচ্চচাপযুক্ত অঞ্চল থেকে শীতল বায়ু ওই নিম্নচাপযুক্ত অঞ্চলে ছুটে এসে ঘূর্ণায়মান অবস্থায় ক্রমান্বয়ে উম্ন ও ঊর্ধ্বমুখী হয়। এই ধরনের কেন্দ্রমুখী ও ঊর্ধ্বগামী বায়ুকে ঘূর্ণিঝড় বলে।
পশ্চিমবঙ্গের কোথায় ঘূর্ণিঝড়ের প্রকোপ বেশি?
পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণভাগে উত্তর ও দক্ষিণ 24 পরগনা, পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর প্রভৃতি সমুদ্রতীরবর্তী অঞ্চলগুলিতে ঘূর্ণিঝড়ের প্রকোপ বেশি।
ভূমিধস কী?
প্রাকৃতিক বা অপ্রাকৃতিক কারণে ভূপৃষ্ঠের চাল বরাবর অভিকর্ষের টানে শিলাস্তূপ বা শিলাচূর্ণের আকস্মিক নীচের দিকে নেমে আসাকে বলে ভূমিধস। পার্বত্য ঢালে ভূমিধস বেশি ঘটে। যেমন—পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং পার্বত্য অঞ্চলে ভূমিধস বেশি দেখা যায়।
তুষারঝড় বা ব্লিজার্ড কী ?
তুষারঝড় বা ব্লিজার্ড হল একধরনের প্রবল, অতিশীতল বায়ুপ্রবাহ যার মধ্যে তুষারকণা থাকে এবং এটি বরফাবৃত ভূভাগের ওপর অধিক ক্রিয়াশীল হয় | প্রধানত শীতপ্রধান দেশে তুষারঝড়ের প্রকোপ বেশি।
তুষারঝড় কোথায় কোথায় দেখা যায় ?
অ্যান্টার্কটিকা, উত্তর আমেরিকার উত্তরাংশ, কানাডা, ইউরোপ ও এশিয়ার উত্তরভাগ, অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস প্রভৃতি অঞ্চলে তুষারঝড় দেখা যায়।
হিমানী সম্প্ৰপাত কী?
পর্বতের খাড়া ঢাল বরাবর (35°-45°) যখন সতি তুষার বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে নেমে আসে, তখন তাকে হিমানী সম্প্রপাত (avalanche) বলে শীতকালে, উঁচু পার্বত্য ঢালে সঞ্চিত তুষারের উপরিস্তর নীচের স্তর থেকে পৃথক হয়ে চাদরের মতো নেমে আসে। মূলত অভিকর্ষ বলের ষ্টানেই ঐ সম্প্রপাত ঘটে।
অগ্ন্যুৎপাত কী?
ভূ-অভ্যন্তরের গলিত পদার্থ অর্থাৎ ম্যাগমা এবং এর সাথে ভূগর্ভের গ্যাস, বাষ্প, ছাই যখন ভূপৃষ্ঠের কোনো দুর্বল স্থান দিয়ে বা ফাটলপথে বাইরে বেরিয়ে আসে তখন তাকে বলে অগ্ন্যুৎপাত। উদাহরণ—1902 সালে ক্যারিবিয়ান সাগরের একটি দ্বীপে অবস্থিত মাউন্ট পিলি (Mount Pelee)-র অগ্ন্যুৎপাতের দ্বারা সেন্ট পিয়ের (St. Pierre) শহরটি ধ্বংস হয়ে যায়।
দাবানল কী ?
প্রাকৃতিক বা মানুষের কার্যাবলির ফলে যখন অরণ্য অঞ্চলে আগুন লেগে যায় এবং যার ফলে বিস্তীর্ণ অঞ্চলের গাছপালা পুড়ে ছাই হয়ে যায়, তখন তা দাবানল নামে বিবেচিত হয়। বজ্রপাত, অগ্ন্যুৎপাত, মানুষের অসচেতনতার ফলে দাবানল সংগঠিত হয়।
সুনামি কি ?
জাপানি শব্দ 'সু' (tsu) কথার অর্থ ‘পোতাশ্রয়’ বা ‘বন্দর' এবং 'নামি’ (nami) শব্দের অর্থ তরঙ্গ বা ঢেউ। অর্থাৎ সুনামি শব্দের অর্থ হল বন্দরের তরঙ্গ। সমুদ্রতলদেশে ভূমিকম্পের ফলে সৃষ্ট বিশালাকৃতি সামুদ্রিক ঢেউ অথবা জলোচ্ছ্বাসকে বলে সুনামি।
বিপর্যয় ব্যবস্থাপনা বলতে কী বোঝ?
প্রাকৃতিক বা মানবীয় কারণে সৃষ্ট দীর্ঘস্থায়ী বা ক্ষণস্থায়ী যেসকল ঘটনাবলি মানবজীবনের স্বাভাবিক অবস্থাকে বিপন্ন করে তোলে এবং অপরের সাহায্য ছাড়া যা প্রতিরোধযোগ্য নয়, তা হল বিপর্যয়। বিপর্যয় প্রতিরোধ করা অথবা বিপর্যয় পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণ করার এই উপায়গুলিকে বলে বিপর্যয় ব্যবস্থাপনা।
বিপর্যয় ব্যবস্থাপনার প্রধান তিনটি ধাপ কী কী ?
বিপর্যয় ব্যবস্থাপনার প্রধান তিনটি ধাপ হল— বিপর্যয় পূর্ববর্তী ব্যবস্থাপনা, বিপর্যয় চলাকালীন ব্যবস্থাপনা, বিপর্যয় পরবর্তী ব্যবস্থাপনা।
ঝুঁকি (Risk) বলতে কী বোঝ?
দুর্যোগ বা বিপর্যয়ের প্রভাবে কোনো অঞ্চলে সম্ভাব্য যে ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে তার পরিমাণকেই ঝুঁকি (Risk) বলা হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলে সুনামি এবং ঘূর্ণিঝড়জনিত ঝুঁকির পরিমাণ অন্যান্য অঞ্চল অপেক্ষা অনেক বেশি।
পশ্চিমবঙ্গের কোন কোন জেলায় বন্যার প্রকোপ বেশি?
পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া, উত্তর ও দক্ষিপ দিনাজপুর, মালদহ, বীরভূম, জলপাইগুড়ি, পূর্ব মেদিনীপুর, ব্লুগলি, উত্তর ও দক্ষিপ 24 পরগনা প্রভৃতি জেলায় বন্যার প্রকোপ বেশি।
পশ্চিমবঙ্গের প্রধান / তীব্র খরাপ্রবণ অঞ্চলগুলির নাম লেখো।
পশ্চিমবঙ্গের সমগ্র পুরুলিয়া জেলা, বাঁকুড়া ও পশ্চিম মেদিনীপুরের পশ্চিমাংশ তীব্র খরাপ্রবণ অঞ্চলের অন্তর্গত। মূলত গ্রীষ্মকালে একটানা অনাবৃষ্টির ফলে তীব্র জলসংকটের কারণে খরা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
খরা মোকাবিলায় গ্রহণীয় ব্যবস্থাগুলি কী কী ?
খরা মোকাবিলায় গ্রহণীয় ব্যবস্থা: 1) উপযুক্ত জলাধার ঘটিয়ে তৈরি করতে হবে, বিভিন্ন জল সংরক্ষপ প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে জলসেচের উন্নতি করে খরার তীব্রতাকে রোধ করতে হবে । 2) খরাসহ্যকারী আধুনিকমানের বীজ রোপণ করতে হবে। 3) শুষ্ক কৃষি পদ্ধতিতে চাষ-আবাদ প্রবর্তন করতে হবে । 4) জলের অপচয় রোধ করতে হবে। 5) আধুনিক প্রযুক্তির ভিত্তিতে ধরাপ্রবণ এলাকাগুলিতে গভীর কূপ খনন করতে হবে। 6) খরাপীড়িত মানুষদের উপযুক্ত স্লাপ পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
