সম্পদের বৈশিষ্ট্যগুলি আলোচনা করো।
সম্পদ কোনো বস্তু নয়, কোনো বস্তুর অভাব পূরণের ক্ষমতা। সম্পদের মূল বৈশিষ্ট্যগুলি হল— 1) উপযোগিতা, 2) কার্যকারিতা, 3) গ্রহণযোগ্যতা, 4) প্রয়োগযোগ্যতা, 5) সর্বজনীন চাহিদা, 6) সহজলভ্যতা, 7) সীমাবদ্ধতা, 8) ক্ষয়শীলতা, 9) পরিবেশমিত্রতা এবং 10) জীবমণ্ডলকে সংরক্ষণ করার ক্ষমতা।
নিরপেক্ষ উপাদান?
পরিবেশ থেকে প্রাপ্ত যেসব বস্তু বা উপাদানের কোনো উপযোগিতা বা কার্যকারিতা নেই, প্রকৃতিতে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকে, সেইসব সামগ্রী হল নিরপেক্ষ উপাদান (neutral staff)। যেমন—একখণ্ড পাথুরে জমি হল নিরপেক্ষ উপাদান।
প্রাকৃতিক সম্পদ কী?
প্রকৃতি থেকে যেসব সম্পদ সহজেই পাওয়া যায় তাকে প্রাকৃতিক সম্পদ (natural resource) বলে। যেমন—সূর্যালোক, বায়ু, নদী তীরবর্তী উর্বর পলিমাটি প্রভৃতি।
গচ্ছিত বা অপুনর্ভব সম্পদ কী?
প্রকৃতিতে এমন কিছু সম্পদ আছে যাদের পরিমাণ সীমিত, যেগুলি ক্রমাগত ব্যবহারের ফলে শেষ হয়ে যায়, সেগুলি গচ্ছিত বা অপুনর্ভব সম্পদ | যেমন—কয়লা, খনিজ তেল প্রভৃতি।
পুনর্ভর বা প্ৰৱাহমান সম্পদ কী?
প্রকৃতিতে এমন কিছু সম্পদ আছে যাদের পরিমাপ সীমিত নয় এবং ব্যবহারে শেষ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই, সেগুলি হল পুনর্ভব সম্পদ | যেমন—সৌরকিরণ, বায়ুপ্রবাহ, সমুদ্রস্রোত প্রভৃতি।
আঞ্চলিক সম্পদ কী?
যেসকল সম্পদের অবস্থান কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাদেরকে আঞ্চলিক সম্পদ বলে। যেমন—করলা, লোহা, সোনা প্রভৃতি।
জাতীয় সম্পদ কী?
যেসব সম্পদ কোনো রাষ্ট্র বা দেশের অধীনে থাকে, তাকে জাতীয় সম্পদ বলে। যেমন—খনিজ সম্পদ, বনজ সম্পদ, হ্রদ, নদনদী প্রভৃতি হল জাতীয় সম্পদের উদাহরণ।
সামাজিক সম্পদ কী?
যে সকল সম্পদ সমাজের অধীনে থেকে সামাজিক চাহিদা মেটায়, তাদের সামাজিক সম্পদ বলে | যেমন—স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল প্রভৃতি।
আন্তর্জাতিক সম্পদ কী?
যেসকল সম্পদ ব্যক্তিগত বা রাষ্ট্রগত নয়, সমগ্র মানবজাতির, সেই সকল সম্পদকে আন্তর্জাতিক সম্পদ বলে। যেমন—মহাসাগর, অ্যান্টার্কটিকা মহাদেশ, ওজোনস্তর প্রভৃতি।
জৈব সম্পদ কী ?
জীবজগৎ থেকে যেসকল সম্পদ পাওয়া যায়, তাদেরকে বলে জৈব সম্পদ। যেমন—দুধ, মাংস, কাঠ প্রভৃতি।
অবগত সম্পদ কী?
যেসকল সম্পদ স্পর্শযোগ্য নয় তাদেরকে বলে অবস্তুগত সম্পদ | এই সম্পদগুলি মানুসের সাংস্কৃতিক পরিবেশ থেকে আহরণ করা হয়। যেমন— শিক্ষা।
সম্ভাব্য সম্পদ কী?
যেসব সম্পদের ভৌগোলিক অস্তিত্ব ও ব্যবহারযোগ্যতা থাকা সত্বেও পরিবেশগত বাধার কারণে ওই সম্পদের পূর্ণ ব্যবহার করা যায়নি সেগুলি হল সম্ভাব্য সম্পদ | যেমন—দক্ষিণ মেরুর বরফাবৃত ভূমিভাগ |
সাংস্কৃতিক সম্পদ কী?
মানুষের জ্ঞান, বুদ্ধি এবং প্রয়োগকৌশল যেসব সম্পদ সৃষ্টিতে সহায়তা করে তাই সাংস্কৃতিক সম্পদ। মানুষ হল সাংস্কৃতিক সম্পদের স্রষ্টা। প্রকৃতপক্ষে সাংস্কৃতিক সম্পদের উন্নতি না হলে কোনো সম্পদই সম্পদ হিসেবে ব্যবহৃত হত না।
সম্পদ সৃষ্টির উপাদানগুলি কী কী?
সম্পদ সৃষ্টির তিনটি প্রধান উপাদান হল— 1) প্রকৃতি, 2) মানুষ ও 3) সংস্কৃতি। এরা কখনও এককভাবে, আবার কখনও সম্মিলিতভাবে সম্পদ সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।
সম্পদের বাধা কী?
যেসব উপাদান সম্পদ সৃষ্টিতে বাধা দেয় বা মানুষের তৈরি সম্পদকে ধ্বংস করে বা নষ্ট করে তাদের সম্পদের বাধা বলে। যেমন— ঘূর্ণিঝড়, যুদ্ধ, ধর্মীয় গোঁড়ামি প্রভৃতি।
সম্পদ সংরক্ষণ কী?
সংরক্ষণ কথার অর্থ বিশেষ উদ্দেশ্যে রক্ষা করা। সম্পদের অপচয় রোধ ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পরিমিত ব্যবহারের মাধ্যমে, সম্পদের ভাণ্ডার বৃদ্ধি করার কৌশল হল সম্পদ সংরক্ষণ।
সম্পদ সংরক্ষণের উদ্দেশ্য কী?
সম্পদ সংরক্ষণের উদ্দেশ্যগুলি হল – 1) পরিবেশের গ্রুপগতমান বজায় রাখা। 2) ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সম্পদ সস্কৃয় করা। 3) সম্পদের কার্যকারিতা বৃদ্ধি করা। 4) সম্পদের অপচয় রোধ করা।
সম্পদের পুনরাবর্তন (Recycle) কী?
যে সকল সম্পদ ক্রমাগত ব্যবহারের ফলে সাময়িকভাবে হ্রাস পেলেও সম্পূর্ণ নিঃশেষ হয়ে যায় না এবং সেগুলিকে আবার ব্যবহার করা যায় তাকেই সম্পদের পুনরাবর্তন বলে। যেমন—লোহা, তামা, সোনা প্রভৃতি।
খনিজ সম্পদ কী ?
মাটির নীচ থেকে খনন করে যে সম্পদ পাওয়া যায় তা খনিজ সম্পদ | যেমন—কয়লা, খনিজ তেল প্রভৃতি। খনিজ সম্পদের নির্দিষ্ট রাসায়নিক সংযুক্তি ও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য থাকে।
ধাতব খনিজ বলতে কী বোঝ ? উদাহরণ দাও।
যেসব খনিজ পদার্থ থেকে ধাতু নিষ্কাশন করা যায়, তাদের ধাতব খনিজ বলে। সাধারণভাবে সকল খনিজ গলিয়ে ধাতু পাওয়া যায়। এগুলি সাধারণভাবে ওজন হ্রাসশীল বা অবিশুদ্ধ কাঁচামাল হিসেবে শিল্পে ব্যবহৃত হয় | যেমন—আকরিক লোহা, বক্সাইট, ম্যাঙ্গানীজ প্রভৃতি।
অধাতব খনিজ বলতে কী বোঝ? উদাহরণ দাও।
যে সব খনিজ পদার্থ থেকে ধাতু ছাড়া অন্যান্য নানা উপজাত দ্রব্য পাওয়া যায়, সেগুলিকে অধাতব খনিজ বলা হয়। এই খনিজগুলি মূলত বিশুদ্ধ কাঁচামাল (অপরিবর্তনীয় ওজনবিশিষ্ট) হিসেবে শিল্পে ব্যবহৃত হয়। যেমন— কয়লা, চুনাপাথর, অভ্র ইত্যাদি |
খনিজ পদার্থের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য লেখো।
খনিজ পদার্থের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি হল— 1) খনিজ পদার্থ প্রকৃতিতে বিভিন্ন অজৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন হয় ও প্রায় একই উপাদানে গঠিত হয়। 2) খনিজ সম্পদগুলি কেন্দ্রীভূত সম্পদ অর্থাৎ ভূপৃষ্ঠের নির্দিষ্ট কিছু স্থানেই পাওয়া যায়। 3) এগুলি গচ্ছিত সম্পদ অর্থাৎ ব্যবহারের ফলে এদের পরিমাণ কমে আসছে। 4) প্রতিটি খনিজ পদার্থের নির্দিষ্ট পারমাণবিক ও রাসায়নিক গঠন আছে |
আকরিক কাকে বলে? উদাহরণ দাও।
যেসব খনিজ পদার্থের মধ্যে ধাতব মৌলের পরিমাণ বেশি থাকায় সহজেই ধাতু নিষ্কাশন করা যায়, সেগুলিকে আকরিক বলে | ‘আকর’ শব্দ থেকেই আকরিকের উৎপত্তি | আকরিকে অপদ্রব্যের পরিমাণ অন্যান্য খনিজ পদার্থ অপেক্ষা অনেক কম থাকে। যেমন—ম্যাগনেটাইট হল লোহার আকরিক |
আকরিক লোহাকে কী কী ভাগে ভাগ করা যায়?
লোহার পরিমাগ ও উৎকৃষ্টতা অনুসারে আকরিক লোহাকে চার ভাগে ভাগ করা যায়। যথা—ম্যাগনেটাইট, হেমাটাইট, লিমোনাইট, ও সিডেরাইট|
পিগ আয়রন (Pig Iron) কী ?
আকরিক লোহাকে বাতচুল্লিতে উচ্চতাপমাত্রায় গলিয়ে তার মধ্যস্থিত অপদ্রব্যগুলি বাদ দিয়ে গলিত বিশুদ্ধ তরল লোহাকে ছাঁচে ফেলে যে লৌহপিণ্ড তৈরি করা হয়, তাকেই পিগ আয়রন বলে।
স্ক্রাপ লোহা কী ?
স্ক্ৰাপ লোহা বা ছাটাই লোহা বলতে বোঝায় ব্যবহারের অনুপযোগী অর্থাৎ বাতিল লোহা | স্ক্রাপ লোহার মধ্যে অপদ্রব্যের পরিমাণ প্রায় থাকে না বললেই চলে | স্ক্রাপ লোহাকে গলিয়ে স্পঞ্জ লোহা তৈরি করা হয়।
ভারত কোন্ কোন্ দেশে আকরিক লোহা রপ্তানি করে?
ভারত জাপান, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র, চিন, ইরান, পাকিস্তান প্রভৃতি দেশে আকরিক লোহা রপ্তানি করে। ভারত বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম আকরিক লোহা রপ্তানিকারক দেশ।
ভারতের দুটি আকরিক লোহা উত্তোলক কেন্দ্রের নাম লেখো।
ভারতের দুটি আকরিক লোহা উত্তোলক কেন্দ্র হল ওডিশার ময়ূরভঞ্জের গোরুমহিষানী ও কর্ণাটকের বাবাবুদান পাহাড়।
জীবাশ্ম জ্বালানি কী ?
সমুদ্র, হ্রদ বা কোনো জলাভূমির তলদেশে যখন স্তরে স্তরে পলি সঞ্চিত হয়, তখন তার মধ্যে উদ্ভিদ ও প্রাণীর দেহও চাপা পড়ে যায়। ধীরে ধীরে ওপরের শিলারাশির চাপে ও নীচের ভূগর্ভের তাপে সেগুলি জীবাশ্মে পরিণত হয়। এইভাবে দীর্ঘকাল ধরে মাটির নীচে চাপা পড়ে থাকা উদ্ভিদের জীবাশ্ম থেকে সৃষ্টি হয় কয়লা এবং সামুদ্রিক প্রাণী থেকে সৃষ্টি হয় খনিজ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস, যা জ্বালানির প্রধান উৎস | তাই কয়লা, খনিজ তেল প্রভৃতিকে জীবাশ্ম জ্বালানি (fossil fuel) বলে।
কয়লার উপজাত দ্রব্যগুলি কী কী ?
কয়লা থেকে বিভিন্ন উপজাত দ্রব্য পাওয়া যায়। যথা— ন্যাপথলিন, বেনজিন, বেনজল, পিচ, পাইরিডিন, ফেনল, কোলগ্যাস, আলকাতরা, স্যাকারিন, অ্যানথ্রাসিন, টোলুইন, প্যারাজাইলিন ইত্যাদি।
ভারতের তিনটি কয়লাখনি অঞ্চলের নাম লেখো।
ভারতের তিনটি কয়লাখনি অঞ্চলের নাম- 1) দামোদর উপত্যকা কয়লা বলয় : এটি ভারতের সর্বোৎকৃষ্ট কয়লা বলয় | এখানকার রানিগঞ্জ, ঝরিয়া উল্লেখযোগ্য খনি অঞ্চল। 2) মহানদী উপত্যকা কয়রা বলয় ওড়িশার তালচের, রামপুর, ছত্তিশগড়ের কোরবা। 3) সোন উপত্যকা কয়লা বলয় মধ্যপ্রদেশের উমারিয়া, ছত্তিশগড়ের ঝিলিমিলি।
ভারতের একটি কয়লা উত্তোলক কেন্দ্রের নাম লেখো।
ভারতের একটি কয়লা উত্তোলক কেন্দ্র হল ঝাড়খণ্ডের ঝরিয়া।
ঝাড়খণ্ডের কোথায় কয়লা পাওয়া যায়?
ঝাড়খণ্ডের দামোদর উপত্যকার অন্তর্গত ঝরিয়া, বোকারো, করণপুরা, গিরিডি, রামগড়, ডালটনগঞ্জ প্রভৃতি স্থানে কয়লা পাওয়া যায়। কয়লা উত্তোলনে ঝাড়খণ্ড ভারতে প্রথম স্থানাধিকারী রাজ্য।
খনিজ তেলকে ‘তরল সোনা’ বলা হয় কেন?
বর্তমান যুগে খনিজ তেলের ব্যবহার বহুমুখী। পরিবহণ ব্যবস্থা থেকে শুরু করে, কৃষিক্ষেত্রে, বিদ্যুৎ উৎপাদনে, সামরিকক্ষেত্রে, পেট্রোরসায়ন শিল্পক্ষেত্রে, যন্ত্রপাতি সচল রাখতে সর্বক্ষেত্রেই খনিজ তেল দরকারি। অর্থাৎ বর্তমান সমাজ, অর্থনীতি বা দৈনন্দিন জীবনের প্রতিক্ষেত্রেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে খনিজ তেল ব্যবহৃত হয়। খনিজ তেলের এই বহুবিধ ব্যবহারের জন্য মূল্যবান ধাত্ন সোনার সাথে তুলনা করে একে ‘তরল সোনা’ বলা হয়।
খনিজ তেলের উপজাত দ্রব্যগুলি কী কী?
খনিজ তেলের প্রধান উপজাত দ্রব্যগুলি হল— অ্যাসফাল্ট বা পিচ, ন্যাপথা, কার্বন ব্ল্যাক, ভেসলিন। এইসকল উপজাত দ্রব্য বিভিন্ন শিল্পে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
সবুজ জ্বালানি কাকে বলে?
পরিবেশের পক্ষে হিতকর জ্বালানিকে সবুজ জ্বালানি বলে। বর্তমানে পরিবেশদূষণ রোধ করার জন্য ডিজেলকে সালফারযুক্ত এবং পেট্রোলকে সিসাযুক্ত করা হচ্ছে। এগুলি পরিবেশবান্ধব বলে এদের সবুজ জ্বালানি বলে।
সাগর সম্রাট ও সাগর বিকাশ কী ?
মুম্বই দরিয়া অঞ্চলের খনিজ তেল উত্তোলনকারী দুটি ভাসমান যন্ত্রের (Rig) নাম সাগর সম্রাট ও সাগর বিকাশ | এই দুটি যন্ত্রের সাহায্যে ভারতে সবথেকে বেশি খনিজ তেল উত্তোলন করা হয়।
অচিরাচরিত/অপ্রচলিত শক্তি কী?
যে সকল শক্তির ব্যবহার সাম্প্রতিককালে শুরু হয়েছে এবং এখনও সেভাবে বহুল পরিমাণে ব্যবহৃত হয় না, সেগুলিকেই অপ্রচলিত বা অচিরাচরিত শক্তি বলা হয়। এই শক্তির উৎসগুলি আগে থেকে মানুষের জানা থাকলেও সেভাবে ব্যবহার হত না, তবে ভবিষ্যতে এদের ব্যবহার বৃদ্ধির পূর্ণসম্ভাবনা আছে | যেমন—সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি ইত্যাদি।
অপ্রচলিত শক্তির উৎসের নাম লেখো।
অপ্রচলিত শক্তির উৎস হল–সূর্যালোক, বায়ুপ্রবাহ, জোয়ারভাটা, সমুদ্রের তরঙ্গ, ভূতাপ প্রভৃতি। অপ্রচলিত শক্তির উৎসগুলির ভাণ্ডার অফুরন্ত।
