সম্পদ বলতে কী বোঝ?
উত্তর: সম্পদ কোনো বস্তু বা পদার্থ নয়, ওই বস্তু বা পদার্থের কার্যকারিতা এবং উপযোগিতা বা অভাবপূরণের ক্ষমতাই হল সম্পদ। বিশিষ্ট সম্পদ বিশেষজ্ঞ জিমারম্যান (1992) সম্পদের সংজ্ঞা নির্ণয় করতে গিয়ে বলেছেন—“সম্পদ বলতে কোনো বস্তু বা পদার্থকে বোঝায় না, বোঝায় ওই বস্তু বা পদার্থের কার্যকারিতা বা ক্রিয়াপ্রণালী, যা মানুষের চাহিদা পূরণ করে।” সুতরাং, ‘সম্পদ হল লক্ষ্যপূরণের একটি মাধ্যম মাত্র, যার লক্ষ্য হল ব্যক্তিগত চাহিদা পূরপ অথবা সামাজিক উদ্দেশ্যসাধন'।
অন্যদিকে, 1992 সালে ব্রাজিলের রিও-ডি-জেনিরো শহরে অনুষ্ঠিত বসুন্ধরা সম্মেলনে সম্পদ সম্পর্কে বলা হয়—যে-কোনো বস্তু, যখন তার কার্যকারিতার মাধ্যমে মানুষের চাহিদা পূরণের সঙ্গে সঙ্গে জীবমণ্ডলের সংরক্ষণকেও সুনিশ্চিত করে, তাকেই সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যেমন—খনি থেকে কয়লা তোলার পর যখন তাকে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন তা সম্পদে পরিণত হয়। আবার ওই কয়লার ধোঁয়া যাতে পরিবেশকে দূষিত না করে তার ব্যবস্থাও করতে হবে।
সম্পদের কার্যকারিতা তত্ত্বটি লেখো।
উত্তর: যে-কোনো বস্তু বা অবস্তুর কাজ করার ক্ষমতাকেই সম্পদের কার্যকারিতা বলে | এই তত্ত্বের মূল বিষয়গুলি হল—
1) কার্যকরী ক্ষমতা: কোনো বস্তুর কার্যকরী ক্ষমতা তাকে সম্পদে পরিণত করে।
2) সম্পদের প্রকৃতির: গতিশীলতা কার্যকারিতার দিক থেকে সম্পদকে গতিশীল হতে হবে।
3) সম্পদের ব্যাবহারিক রহুমুখীতা: কোনো সম্পদের ব্যবহার কেবল এক ধরনের হবে না। সম্পদকে বহুমুখী হতে হবে। যেমন—খনিজ তেল থেকে কেবল পেট্রোল, ডিজেল পাওয়া যায় না, বিভিন্ন রকমের দ্রব্যও উৎপাদন করা যায়।
সম্পদের কার্যকারিতার নিয়ন্ত্রণকারী বিষয়গুলি কী কী?
উত্তর: সম্পদের কার্যকারিতার নিয়ন্ত্রণকারী বিষয়গুলি হল—
1) সংস্কৃতি : সংস্কৃতির উন্নয়নই সম্পদের কার্যকারিতাকে বদলে দেয় | এই জন্যই নিরপেক্ষ বস্তুগুলি সম্পদ হয়ে ওঠে।
2) স্থান ও সময়: বর্তমানে যা নিরপেক্ষ উপাদান বা বাধা হিসেবে গণ্য হয়, স্থান ও সময়ের পরিবর্তনে সেটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। যেমন—একসময় তেজস্ক্রিয় পদার্থকে উন্নতির পথে বাধা হিসেবে গণ্য করা হলেও উন্নত দেশগুলিতে তা বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়।
3) প্রযুক্তি: প্রযুক্তি বা কারিগরি দক্ষতা সম্পদের কার্যকারিতা বৃদ্ধি করে। এ ছাড়া চাহিদা, জনসংখ্যা প্রভৃতি সম্পদের কার্যকারিতা নিয়ন্ত্রণ করে।
জনসংখ্যাকে সম্পদ বলা হয় কেন?
উত্তর: জনসংখ্যা অবশ্যই সম্পদ যদি তার সঠিক কার্যকারিতা, দর্শন, প্রজ্ঞা প্রভৃতি থাকে | অধ্যাপক জিমারম্যানের মতে, ‘মানুষের নিজের প্রজ্ঞাই হল তার মুখ্য সম্পদ—যে সম্পদ বিশ্ব সম্পদের উন্মোচনের চাবিকাঠি'।
জনসংখ্যা শ্রমের জোগানকে সুনিশ্চিত করে। মানুষের চাহিদা সম্পদ সৃষ্টিতে সাহায্য করে। উন্নত মানব সংস্কৃতি উন্নততর সম্পদ সৃষ্টি করে। সুশিক্ষিত কর্মদক্ষ জনসংখ্যা পৃথিবীর যে-কোনো দেশের প্রধান সম্পদ | অধিক জনসংখ্যাবিশিষ্ট দেশে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, কারিগরি দক্ষতার বিকাশ অধিকমাত্রায় ঘটে। আবার স্বল্প জনসংখ্যার কারণে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি দেশে সম্পদের বিকাশ ঠিকমতো হয় না।
সম্পদ সৃষ্টির উপাদানগুলি কী কী?
সম্পদ সৃষ্টির উপাদান তিনটি। যথা— প্রকৃতি, মানুষ এবং সংস্কৃতি। এরা কখনও এককভাবে, আবার কখনও সম্মিলিতভাবে সম্পদ সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। যেমন, আগে কয়লা প্রকৃতিতে নিরপেক্ষ সামগ্রী হিসেবে অবস্থান করত, মানুষ তার সাংস্কৃতিক জ্ঞানের সাহায্যে ভূগর্ভ থেকে কয়লা তুলে ব্যবহার করেছে। সুতরাং সম্পদ সৃষ্টিতে প্রকৃতি, মানুষ এবং সংস্কৃতির ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
মানুষ একসাথে সম্পদ সৃষ্টিকারী ও ধ্বংসকারী-কারণ ব্যাখ্যা করো। অথবা, সম্পদ সৃষ্টিতে মানুষের দ্বৈত ভূমিকা কী?
উত্তর: মানুষই সম্পদ সৃষ্টি করে। প্রাকৃতিক সম্পদ ছাড়া মানুষ যত সম্পদ ব্যবহার করে তা মানুষেরই সৃষ্টি। তার বুদ্ধি, মেধা, মনন, শক্তি দিয়ে সম্পদ উৎপাদন করে এবং এই মানুষই ওই সকল সম্পদকে ব্যবহার করে বা ভোগ করে। অধ্যাপক জিমারম্যান একেই ‘মানুষের দ্বৈত ভূমিকা' হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। অন্যদিকে মানুষ সম্পদের ধ্বংসকারীও বটে। এমনিতে সম্পদের ব্যবহারে কিছু সম্পদ বিনষ্ট হয় | কিন্তু সম্পদের সর্বাধিক বিনাশ হয় মানুষের সীমাহীন লোভ এবং নির্বুদ্ধিতার কারণে | অশিক্ষা, ধর্মন্ধতা, যুদ্ধ, দাঙ্গা প্রভৃতির কারণে প্রচুর সম্পদ নষ্ট হয় |
মানুষ কীভাবে সম্পদ সৃষ্টির ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে?
উত্তর: মানুষের চাহিদাই সম্পদ সৃষ্টির মূল কারণ। মানুষই সম্পদ সৃষ্টি করে, ভোগ করে। সেইসঙ্গে সম্পদ সৃষ্টির ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায় মানুষ নিজেই। এর কারণগুলি হল— 1) সম্পদের অতি ব্যবহার সম্পদকে চিরতরে বিনষ্ট করছে। 2) মানুষ তার লোভ, আত্মকেন্দ্রিকতা, লালসার কারণে নির্বিচারে বন ধ্বংস করছে। 3) অজ্ঞৈানিক প্রথায় চাষবাসের ফলে মাটির গুণাগুণ যেমন নষ্ট হচ্ছে তেমনই মাটির দূষণও ঘটছে। 4) পৃথিবীতে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ বিগ্রহ, দাঙ্গা প্রভৃতির কারণে বিপুল পরিমাণ সম্পদ ধ্বংস হচ্ছে | সেকারণে মানুষ কেবল সম্পদ সৃষ্টিই করে না সম্পদের ধ্বংসও করে।
প্রাকৃতিক, মানবিক ও সাংস্কৃতিক বাধা কাকে বলে?
উত্তর: যেসব উপাদান সম্পদ সৃষ্টিতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে তাকেই বাধা বলে।
প্রাকৃতিক বাধা : প্রকৃতি যখন সম্পদ সৃষ্টিতে বাধা দেয়, সেটি হল প্রাকৃতিক বাধা | যেমন—প্রবল ঘূর্ণিঝড়, বজ্রপাত, বন্যা ইত্যাদি |
মানবিক বাধা : মানুষের ক্রিয়াকলাপ যখন সম্পদ তৈরিতে বাধা দেয় তখন তা হল মানবিক বাধা। যেমন—যুদ্ধ, স্বল্প জনসংখ্যা, অধিক জনসংখ্যা ইত্যাদি।
সাংস্কৃতিক রাধা : যেসব সাংস্কৃতিক উপাদান সম্পদ তৈরিতে বাধা দেয় তখন তাকে সাংস্কৃতিক বাধা বলে যেমন—ধর্মীয় গোঁড়ামি, কুসংস্কার প্রভৃতি।
কয়লাকে স্তরীভূত জৈব পিলা বলা হয় কেন?
উত্তর: বিভিন্ন কারণে বহু কোটি বছর আগে গাছপালা ভূগর্ভে চাপা পড়ে গেলে ভূগর্ভের তাপ ও চাপের মিলিত প্রভাবে তার পরিবর্তন ঘটে। গাছপালার কান্ডের মধ্যে সঙ্গিত কার্বন বা অঙ্গার রাসায়নিক পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে কয়লায় পরিবর্তিত হয়। কয়লা হল হাইড্রোকার্বনের যৌগ। যেহেতু পলিস্তরের মধ্যেই উদ্ভিদসমূহ চাপা পড়ে কয়লায় পরিণত হয় এবং পাললিক শিলার মধ্যে স্তরে স্তরে এই কয়লা সশ্চিত হয়, তাই কয়লাকে স্তরীভূত জৈব শিলা বলা হয়।
কয়লাকে কালো হিরে বলা হয় কেন?
উত্তর: কয়লাকে কালো হিরে বলার কারণগুলি হল
1) উপাদান: কয়লা এবং হিরে উভয়ই কার্বন দিয়ে গঠিত হয়।
2) মূল্য : হিরে যেমন একটি বহুমূল্য রত্ন, তেমনি কয়লাও ব্যাবহারিক গুরুত্বের জন্য আধুনিক বিশ্বে অত্যন্ত মূল্যবান খনিজরূপে পরিগণিত হয়।
3) উপযোগিতা : হিরে গুরুত্বপূর্ণ রত্ন এবং অলংকার শিল্পে এর ভীষণ চাহিদা আছে | কয়লাও ব্যাবহারিক দিক থেকে অন্যতম খনিজ পদার্থ ও শক্তি সম্পদের উৎস| তাপশক্তি উৎপাদন থেকে শুরু করে রাসায়নিক কাঁচামাল হিসেবে কয়লার ব্যবহার বহুমুখী। এ ছাড়া কয়লা থেকে বন্ধু উপজাত দ্রব্যও পাওয়া যায়।
এইসব দিক বিবেচনা করে কয়লাকে হিরের সাথে তুলনা করে ‘কালো হিরে' (Black dimond) বলা হয় |
কোক কয়লা কী?
উত্তর: বিটুমিনাস কয়লাকে কোক চুল্লিতে বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যে উন্নতমানের কয়লায় রূপান্তরিত করা হয়, তাকেই কোক কয়লা বলে।
পদ্ধতি: কয়লার মধ্যে যেসব মাটি, অজৈব পদার্থ, শিলাখণ্ড, জল ইত্যাদি থাকে, সেগুলিকে বের করার জন্য কোক চুল্লিতে দেওয়া হয় এবং পরিসুত করে কোক কয়লা তৈরি করা হয়।
ব্যবহার: [i] উচ্চ তাপ উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়। [ii] ধাতু নিষ্কাশনে এর ব্যবহার খুব বেশি।
ভারতে কয়লার ব্যবহার সংক্ষেপে লেখো।
ভারতে কয়লার ব্যবহারগুলি হল—
1) তাপবিদ্যুৎ উৎপাদনে : ভারতের তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রে জ্বালানি কাচামাল হিসেবে উৎপাদিত মোট কয়লার 74 শতাংশ ব্যবহার করা হয়।
2) ইস্পাত শিল্পে : উৎপাদিত মোট কয়লার 5 শতাংশ লৌহ-ইস্পাত শিল্পে আকরিক লোহা গলানোর জন্য ব্যবহার করা হয়।
3) সিমেন্ট শিল্পে : ভারতে উত্তোলিত কয়লার প্রায় ৫ শতাংশ সিমেন্ট শিল্পে জ্বালানিরূপে ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়াও সিমেন্ট প্রস্তুতিতে কয়লার ছাই ব্যবহৃত হয়।
4) গৃহস্থালির কাজে : মোট উত্তোলিত কয়লার 14% গৃহস্থালির জ্বালানিসহ অন্যান্য কাজে ব্যবহৃত হয়।
5) অন্যান্য ক্ষেত্রে : [i] খুব সামান্য পরিমাণ কয়লা বাষ্পীয় রেলইঞ্জিনে ব্যবহার করা হয়। [ii] অ্যামোনিয়া, ক্রিয়োজোট প্রভৃতি কয়লার উপজাত দ্রব্যগুলি সার উৎপাদন, কীটনাশক ওষুধ তৈরিতে কাজে লাগে | [iii] পিচ ও আলকাতরা যথাক্রমে রাস্তা নির্মাণ, বাড়িঘর নির্মাণে ব্যবহৃত উপকরণে প্রলেপ দিতে ব্যবহৃত হয়।
পেট্রোলিয়ামকে তরল সোনা বলা হয় কেন?
উত্তর: সোনা একটি মূল্যবান ও বহুল ব্যবহৃত ধাতু। একইভাবে পেট্রোলিয়াম হল একটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি খনিজ যা মোটরগাড়ি, বাস, ট্রাক, রেলইঞ্জিন, জাহাজ, স্টিমার প্রভৃতি যানবাহন চালাতে ব্যবহৃত হয়। বিভিন্ন শিল্পে এবং গৃহস্থালির নানা কাজেও পেট্রোলিয়ামের ব্যবহার বহুমুখী। আধুনিক সভ্যতার উন্নয়ন পেট্রোলিয়ামের ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল। তাই গুরুত্বের দিক থেকে বহু মূল্যবান ধাতু সোনার সাথে তুলনা করে পেট্রোলিয়ামকে 'তরল সোনা’ বলা হয়।
পাললিক শিলাস্তরেই খনিজ তেল পাওয়া যায় কেন?
উত্তর: ভূবিজ্ঞানীদের মতে সমুদ্রের তলদেশে পলিরাশির মধ্যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সামুদ্রিক প্রাণীদেহ চাপা পড়ে এবং সেগুলি পাললিক শিলাস্তরের চাপে, তাপে এবং সময়ের ব্যবধানে তরল পদার্থে পরিণত হয়। জল, তেল এবং স্বাভাবিক গ্যাস পাললিক শিলার ভাজে অবস্থান করে। শিলাস্তরে ভাজের ঊর্ধ্বর্বভাগে তেল ও গ্যাস থাকে | সাধারণত পাললিক শিলাসমূহের মধ্যে বেলেপাথর ও চুনাপাথর বেশি সচ্ছিদ্র হওয়ায় এই শিলাগুলির মধ্যেই অধিক তেল সঞ্চিত হয় | তাই পাললিক শিলা ভিন্ন অন্য শিলায় খনিজ তেল পাওয়া যায় না।
ভারতে খনিজ তেলের ব্যবহার সংক্ষেপে লেখো।
উত্তর: ভারতে খনিজ তেল বহুবিধ কাজে ব্যবহার করা হয়। যেমন—
পরিবহণ শিল্পে : বাস, ট্রাক, রেলইঞ্জিন, মোটরগাড়ি, জাহাজ, এরোপ্লেন, মোটর সাইকেল প্রভৃতি চালাতে খনিজ তেলের উপজাত দ্রব্য পেট্রোল, ডিজেল ও গ্যাসোলিন ব্যবহৃত হয়।
তাপবিদ্যুৎ উৎপাদনে : ভারতে তাপবিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রেও খনিজ তেলের উপজাত দ্রব্য ফার্নেস অয়েল, হাই স্পিড ডিজেল অয়েল প্রভৃতি ব্যবহার করা হয়।
প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায়: ভারতের প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রেও খনিজ তেলের অবদান অপরিসীম। সামরিক প্রয়োজনে ব্যবহৃত বিভিন্ন যানবাহন চালাতে প্রচুর পরিমাণে ডিজেল ও পেট্রোল ব্যবহার করা হয়|প্রতিরক্ষার জন্য একান্ত প্রয়োজনীয় বিস্ফোরক সামগ্রী প্রস্তুত করতেও খনিজ তেল প্রয়োজনীয় |
কৃষিক্ষেত্রে : কৃষিক্ষেত্রে জলসেচ, সার উৎপাদন, কীটনাশক ওষুধ তৈরি, ট্র্যাক্টর, হারভেস্টর ইত্যাদির ব্যবহারে খনিজ তেলের বিভিন্ন উপজাত দ্রব্য একান্ত প্রয়োজনীয়।
ভারতের কোথায় কোথায় খনিজ তেল শোধনাগার রয়েছে?
অপরিশোধিত খনিজ তেল শোধন করার জন্য ভারতে মোট 23টি সরকারি এবং বেসরকারি তেল শোধনাগার রয়েছে। এগুলি হল— 1) অসমের - ডিগবয়, গুয়াহাটি, বঙ্গাইগাঁও, নুমালিগড়, 2) গুজরাতের—কয়ালি, জামনগর (দুটি), ভাদিনার, এসার; 3) তামিলনাড়ুর—মানালি, নাগাপট্টিনম; 4) মহারাষ্ট্রের—ট্রম্বে I এবং II, 5)পশ্চিমবঙ্গের—হলদিয়া; 6) অন্ধ্রপ্রদেশের– তাতিপাকা, বিশাখাপত্তনম; 7) বিহারের–বারাউনি;
8) উত্তরপ্রদেশের—মথুরা; 9) হরিয়ানার—পানিপথ; 10) কেরলের— কোচি; 11) কৰ্ণাটকের—ম্যাঙ্গালোর; 12) পাঞ্জাবের—ভাতিন্দা; 13) মধ্যপ্রদেশের– বীণা।
ONGC সম্পর্কে কী জান?
পরিচয়: ONGC-এর পুরো নাম অয়েল অ্যান্ড ন্যাচারাল গ্যাস কর্পোরেশন। এটি 1956 সালে গঠিত হয়। এটি সম্পূর্ণ একটি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা। এর সদর দফতর উত্তরাঞ্চলের দেরাদুনে অবস্থিত।
গুরুত্ব: [i] এই সংস্থা ভারতের বিভিন্ন স্থানে খনিজ তেল সন্ধান করে। [ii] ভারতের বেশিরভাগ খনিজ তেল এই সংস্থার মাধ্যমে উত্তোলিত হয়। [iii] এই সংস্থা ভারতের বাইরেও বিভিন্ন দেশে খনিজ তেল অনুসন্ধান ও উত্তোলনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নেয়।
প্রচলিত শক্তির উৎস ব্যবহারের সুবিধা ও অসুবিধাগুলি লেখো।
উত্তর: প্রচলিত শক্তির উৎস ব্যবহারের
সুবিধা : [i] চিরাচরিত শক্তির উৎসগুলি দীর্ঘকাল ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে, ফলে এই শক্তি ব্যবহারের প্রযুক্তি অত্যন্ত সহজলভ্য। [ii] কোনো দেশে এই শক্তি না থাকলেও, চিরাচরিত শক্তির উৎস পরিবহণযোগ্য বলে (জলপ্রবাহ ছাড়া) এগুলি অন্য দেশ থেকে আমদানি করে ব্যবহার করা যায়।
প্রচলিত শক্তির উৎস ব্যবহারের অসুবিধা: [i] অধিকাংশ চিরাচরিত শক্তির উৎস ব্যবহারে পরিবেশ দূষিত হয়। [ii] অধিকাংশ চিরাচরিত শক্তির উৎস সঞ্চিত বা ক্ষয়িয়ু (fund or exhaustible) হওয়ায় ক্রমাগত ব্যবহারের ফলে এগুলি নিঃশেষিত হয়ে যেতে পারে। [iii] আহরণ এবং ব্যবহার বা বিকাশের জন্য প্রচুর মূলধন এবং উন্নত প্রযুক্তির প্রয়োজন হয়। [iii] চিরাচরিত শক্তি উন্নত এবং অনুন্নত দেশগুলির মধ্যে সৃষ্ট বৈষম্যকে আরও প্রকট করে।
বর্তমানে প্রচলিত শক্তি সম্পদগুলির ব্যবহার ক্রমশ গুরুত্ব হারাচ্ছে কেন?
উত্তর: বর্তমানে প্রচলিত শক্তি সম্পদগুলির ব্যাবহারিক গুরুত্ব হ্রাস পাওয়ার কারণ—
1) নিঃশেষিত : প্রচলিত শক্তি সম্পদের বিভিন্ন উৎসগুলির (যেমন— কয়লা, খনিজ তেল) পরিমাণ হ্রাস পাচ্ছে।
2) দূষণ : প্রচলিত শক্তি সম্পদগুলি ব্যবহারের ফলে পরিবেশ দূষণ ঘটে (জলবিদ্যুৎশক্তি ছাড়া)।
3) ব্যয়বহুলতা : প্রচলিত শক্তি সম্পদগুলি বেশি ব্যয়বহুল।
জলবিদ্যুৎশক্তি একটি পরিবেশবান্ধব শক্তি এরূপ বলার কারণ ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: জলবিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত হয় খরস্রোতা নদীর জল। এ ছাড়া জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের কেন্দ্রগুলি তাপবিদ্যুতের মতো জ্বালানিনির্ভর নয়। জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহৃত হয় না, ফলে পরিবেশ দূষিত হয় না। এ ছাড়া, জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের সময় উৎপাদনকেন্দ্র থেকে কোনো প্রকার ক্ষতিকর গ্যাস বা ছাই নির্গত হয় না যা পরিবেশকে দূষিত করতে পারে।
জলবিদ্যুৎকে 'সাদা কয়লা’ বলার কারণ লেখো ।
উত্তর: বিদ্যুৎশক্তি উৎপাদনের প্রধানতম উপাদান কয়লা। কিন্তু কয়লা একটি গচ্ছিত সম্পদ এবং পরিবেশদূষণ ঘটায়। তাই বর্তমানে প্রবহমান জলধারা থেকে বিশেষ প্রযুক্তির মাধ্যমে টারবাইন ঘুরিয়ে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয় এটি প্রবহমান সম্পদ হওয়ায় ভবিষ্যতে ফুরিয়ে যাবার সম্ভাবনা কম। তা ছাড়া অপেক্ষাকৃত কম পরিবেশদূষণ ঘটায় বলে জলবিদ্যুতের ব্যাবহারিক গুরুত্ব বাড়ছে | সেকারণে জলবিদ্যুতের ব্যাবহারিক গুরুত্ব উপলব্ধি করে, একে কয়লার সাথে তুলনা করে 'সাদা কয়লা' বলা হয়।
বহুমুখী নদী পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্যগুলি কী?
ভারতে বিপুল নদনদী এবং জলসম্ভার থাকা সত্ত্বেও তার জলপ্রবাহের মাত্র 7% জলসেচের কাজে ব্যবহার করা হয়।
ধারণা: যে পরিকল্পনার মাধ্যমে প্রবহমান কোনো নদীতে বাঁধ দিয়ে তার জলসম্ভারকে ওই নদীর অববাহিকা অঞ্চলের অধিবাসীদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ও অন্যান্য বহুমুখী কাজে ব্যবহার করা হয়, তাকে বহুমুখী নদী পরিকল্পনা বলে।
উদ্দেশ্য : [i] শুষ্ক ঋতুতে এবং বৃষ্টিহীন সময়ে কৃষিজমিতে জলসরবরাহের মাধ্যমে জলসেচ নিশ্চিত করা, [ii] নদীর জলকে আটকে বন্যা নিয়ন্ত্রণ করা, [ii] জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করা, [iv] পানীয় জলের সরবরাহ করা, [v] বাঁধের পিছনের জলাধারে মাছচাষ করা, [vi] সেতু, সড়ক ও রেলপথ নির্মাণ করা, [vii] বাঁধ সন্নিহিত অঞ্চলে পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলা, [viii] জলপথকে পরিবহণের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা ইত্যাদি।
পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে ভারত পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় পিছিয়ে আছে কেন?
বর্তমান বিশ্বের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় 15 শতাংশ বিদ্যুৎ পারমাণবিক বিদ্যুৎ থেকে পাওয়া যায়। বিজ্ঞানীদের মতে, 1 পাউন্ড ইউরেনিয়াম বা প্লুটোনিয়াম থেকে 12000 মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যায়। এ ছাড়া থোরিয়াম, হাইড্রোজেন, লিথিয়াম প্রভৃতি মৌলিক পদার্থ থেকে পারমাণবিক বিদ্যুৎশক্তি উৎপাদিত হয়। ভারতের মোট বিদ্যুতের প্রায় 3 শতাংশ পারমাণবিক বিদ্যুৎশক্তি। ভারতে মোট 6টি পারমাণবিক শক্তিকেন্দ্রের মোট উৎপাদন ক্ষমতা 4780 মেগাওয়াট ঘণ্টা।
ভারতে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কম উৎপাদনের কারণগুলি হল— 1) ভারতে খুব অল্প পরিমাণ ইউরেনিয়াম, থোরিয়ামের সঞ্চয় রয়েছে তাই কাঁচামাল দুষ্প্রাপ্যতা পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রধান অন্তরায়। 2) পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিকাঠামো গড়তে বিপুল অর্থের প্রয়োজন, ভারতের ক্ষেত্রে যা অসুবিধাজনক। 3) ভারতের মতো দেশে পরমাণু বিদ্যুতের উৎপাদনকেন্দ্র স্থাপন করা নিয়ে নানাবিধ সামাজিক বাধার সম্মুখীন হতে হয়।
অপ্রচলিত শক্তিসম্পদ ব্যবহারের সুবিধা ও অসুবিধাগুলি লেখো
উত্তর: অপ্রচলিত শক্তির উৎস ব্যবহারের সুবিধা : [i] অপ্রচলিত শক্তি ব্যবহারে পরিবেশ দূষিত হয় না। [ii] ক্ষুদ্রাকারে ব্যবহার করা যায় বলে প্রচুর মূলধনের প্রয়োজন হয় না। [iii] প্রবহমান সম্পদ (flow resource) বলে নিঃশেষিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে না। [iv] দেশের অধিকাংশ জায়গায় বেশিরভাগ অপ্রচলিত শক্তির উৎস যথেষ্ট সহজলভ্য।
অপ্রচলিত শক্তির উৎস ব্যবহারের অসুবিধা : [i] অপ্রচলিত হওয়ায় এ ধরনের উৎসকে ব্যবহার করে শক্তি উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি সহজলভ্য নয়।[ii] সর্বত্র সমান মাত্রায় পাওয়া যায় না। যেমন—সমুদ্র উপকূল ছাড়া অন্য স্থানে জোয়ার-ভাটা শক্তি উৎপাদন অসুবিধাজনক | আবার হিমমণ্ডলে সৌরশক্তি পর্যাপ্ত নয় | এ ছাড়া বায়ুশক্তিও সর্বত্র ব্যবহারোপযোগী নয়। [iii] অচিরাচরিত শক্তির উৎস এক দেশ থেকে অন্য দেশে পরিবহণ করা যায় না।
অপ্রচলিত শক্তি ব্যবহারের গুরুত্ব ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে কেন?
উত্তর: ভারতসহ পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই বর্তমানে অপ্রচলিত শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে এর প্রধান কারণগুলি হল— 1) প্রচলিত শক্তির উৎসগুলি হল ক্ষয়িয়ু প্রকৃতির অর্থাৎ নিঃশেষ হয়ে যেতে পারে, কিন্তু অপ্রচলিত শক্তির উৎসগুলি সাধারণত প্রবহমান | 2) অপ্রচলিত শক্তির উৎসগুলির ব্যবহারে পরিবেশদূষণের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। অর্থাৎ এগুলি পরিবেশবান্ধব। 3) অপ্রচলিত শক্তির উৎসগুলি সহজলভ্য। 4) প্রাথমিক পর্বে শক্তি উৎপাদন করতে গেলে মোটা অঙ্কের অর্থ ব্যয় হলেও পরবর্তীকালে এর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় অত্যন্ত কম। এর জন্য কাঁচামাল কেনার প্রয়োজন খুব একটা হয় না। 5) দুর্গম বা প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছোটো স্কেলে গড়ে তোলা বেশ সুবিধাজনক।
questions-answers
