Class 9 Geography Chapter 8 (পশ্চিমবঙ্গ) সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর Mark 3 Questions And Answers

পশ্চিমবঙ্গের ভৌগোলিক অবস্থান লেখো।

পশ্চিমবঙ্গ পূর্ব ভারতের একটি অন্যতম রাজ্য। ভারতের 29টি রাজ্যের মধ্যে আয়তন অনুসারে পশ্চিমবঙ্গের স্থান চতুর্দশ | এই রাজ্যটি দক্ষিণে 21°38´ উত্তর অক্ষাংশ থেকে উত্তরে 27°10´ উত্তর অক্ষাংশ পর্যন্ত বিস্তৃত এবং দ্রাঘিমাগত বিস্তারের দিক থেকে পশ্চিমবঙ্গ পশ্চিমে 85°50′ পূর্ব থেকে 89°50´ পূর্ব পর্যন্ত বিস্তৃত | কর্কটক্রান্তিরেখা পশ্চিমবঙ্গের মধ্যভাগ বরাবর নদিয়া, পূর্ব বর্ধমান, পশ্চিম বর্ধমান, বাঁকুড়া ও পুরুলিয়া জেলার ওপর দিয়ে প্রসারিত হয়েছে |

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যটির দক্ষিণাংশ বাদে তিনদিক স্থলবেষ্টিত ও জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক সীমানা দ্বারা পরিবেষ্টিত | উত্তরদিকে দার্জিলিং জেলার উত্তর সীমা থেকে দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় 650 কিমি এবং পশ্চিম থেকে পূর্বে প্রস্থ বরাবর দৈর্ঘ্য প্রায় 325 কিমি |

এই রাজ্যের উত্তরে আছে সিকিম ও ভুটান, পূর্বে বাংলাদেশ, উত্তর-পূর্বে অসম, পশ্চিমে ঝাড়খণ্ড ও বিহার, দক্ষিণ-পশ্চিমে ওডিশা, উত্তর-পশ্চিমে নেপাল এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর।



পশ্চিমবঙ্গের ভৌগোলিক অবস্থানের গুরুত্ব লেখো।

উত্তর: পশ্চিমবঙ্গ ভারতের পূর্বদিকে অবস্থিত একটি অঙ্গরাজ্য। এর উত্তরে আছে হিমালয় পর্বত ও দক্ষিণে আছে বঙ্গোপসাগর। নানা দিক থেকে পশ্চিমবঙ্গের এই ভৌগোলিক অবস্থান বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, যেমন– 1) উত্তরে হিমালয় পর্বত থাকায় উত্তরের ঠান্ডা কনকনে বাতাস পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করতে পারে না। তেমনি বহিঃশত্রুর আক্রমণের হাত থেকেও রক্ষা করে হিমালয় পর্বত। 2) দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের অবস্থান শত্রুর আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করে, আবার আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রসারেও সাহায্য করে। 3) পশ্চিমবঙ্গের এই ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই পশ্চিমবঙ্গে ঋতুবৈচিত্র্য এবং জীববৈচিত্র্যের সৃষ্টি হয়েছে |



অঙ্গরাজ্য হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের গুরুত্ব লেখো।

উত্তর: অঙ্গরাজ্য হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের গুরুত্ব অপরিসীম— 1) ভারতের মোট ক্ষেত্রফলের শতকরা 2.7 ভাগ পশ্চিমবঙ্গের আওতাভুক্ত। 2) বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান দেশের সাথে পশ্চিমবঙ্গের আন্তর্জাতিক সীমানা রয়েছে। 3) জনসংখ্যার বিচারে এই রাজ্যের স্থান ভারতে চতুর্থ এবং ভারতের মোট জনসংখ্যার প্রায় 7.5 শতাংশ এখানে বাস করে। 4) জনসংখ্যার ঘনত্বের বিচারে এই রাজ্যের স্থান দ্বিতীয় (জনঘনত্ব 1029/কিমি), বিহারের পরেই। 5) পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতা, জনসংখ্যার বিচারে ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। 6) পশ্চিমবঙ্গই ভারতবর্ষের একমাত্র রাজ্য যাকে হিমালয় পর্বতমালা ও বঙ্গোপসাগর ছুঁয়ে আছে | অর্থাৎ, পশ্চিমবঙ্গ আসমুদ্রহিমাচল বিস্তৃত।



পৌরসভা ও পৌরনিগম কী?

ভারতের অন্যান্য রাজ্যের মতো পশ্চিমবঙ্গেও স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনমূলক প্রতিষ্ঠানগুলিকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়, যথা – গ্রামীণ (rural) এবং পৌর (urban)। পঞ্চায়েত গ্রামীণ স্বায়ত্তশাসনমূলক প্রতিষ্ঠান | বিভিন্ন ক্ষুদ্র ও মাঝারি শহরে পৌরসভা (municipality) এবং বৃহৎ শহরে পৌরনিগম (municipal corporation) প্রতিষ্ঠিত হয়েছে | বর্তমানে এই রাজ্যে সর্বমোট 130টিরও বেশি পৌরসভা রয়েছে এবং 6টি পৌরনিগম রয়েছে, সেগুলি হল—কলকাতা, হাওড়া, আসানসোল, দুর্গাপুর, শিলিগুড়ি এবং চন্দননগর পৌরনিগম।



পশ্চিমবঙ্গের জেলাপরিষদের ধারণা দাও।

ত্রিস্তর পঞ্চায়েত ব্যবস্থার সর্বোচ্চ স্তরে জেলাপরিষদ অবস্থিত | পশ্চিমবঙ্গ পঞ্চায়েত আইন অনুসারে পঞ্চায়েত ব্যবস্থার সর্বোচ্চ স্তরে জেলা পরিষদের অবস্থান | রাজ্য সরকার দার্জিলিং ছাড়া প্রত্যেক জেলার জন্য জেলার নাম অনুযায়ী একটি জেলাপরিষদ গঠন করে। নিম্নলিখিত সদস্যদের নিয়ে জেলাপরিষদ গঠিত হয়— 1) জেলার অন্তর্গত পঞ্চায়েত সমিতিগুলির সভাপতিবৃন্দ (পদাধিকারবলে), 2) প্রতিটি ব্লক থেকে ভোটদাতাগপ কর্তৃক নির্বাচিত অনধিক 3) জন সদস্য, জেলা থেকে নির্বাচিত মন্ত্রী ছাড়া লোকসভা এবং রাজ্য বিধানসভার সদস্যবৃন্দ এবং 4) জেলার মধ্যে ভোটদাতা হিসেবে নাম নথিভুক্ত থাকলে মন্ত্রী ছাড়া রাজ্যসভার সদস্যরা।



পশ্চিমবঙ্গের পঞ্চায়েত সমিতির ধারণা দাও।

ত্রিস্তর পঞ্চায়েত ব্যবস্থার দ্বিতীয় স্তর হল পঞ্চায়েত সমিতি। 1973 সালের পশ্চিমবঙ্গ পঞ্চায়েত আইন অনুসারে পঞ্চায়েত ব্যবস্থার দ্বিতীয় স্তরে পঞ্চায়েত সমিতির অবস্থান। প্রতিটি ব্লকে একটি করে পঞ্চায়েত সমিতি থাকে | কয়েকটি গ্রাম নিয়ে একটি ব্লক গঠিত হয়। পঞ্চায়েত আইন অনুসারে ব্লক উন্নয়নের সার্বিক দায়িত্ব পঞ্চায়েত সমিতির হাতে অর্পিত হয়েছে। রাজ্য সরকার ব্লকের নাম অনুসারে পঞ্চায়েত সমিতির নামকরণ করে। নিম্নলিখিত ব্যক্তিদের নিয়ে পঞ্চায়েত সমিতি গঠিত হয়—  1) ব্লকের অন্তর্গত গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধানরা পদাধিকারবলে পায়েত সমিতির সদস্যপদ লাভ করেন। 2) ব্লকের অন্তর্গত প্রতিটি গ্রাম পঞ্চায়েতের এলাকা থেকে।নির্বাচকমণ্ডলী কর্তৃক অনধিক 3 জন সদস্য নির্বাচিত হন।



গ্রাম পঞ্চায়েত কী?

ত্রিস্তর পঞ্চায়েত ব্যবস্থার সর্বনিম্ন স্তরে গ্রাম পঞ্চায়েত অবস্থিত। কোনো একটি মৌজা কিংবা তার কোনো অংশ অথবা পরস্পর সংলগ্ন কয়েকটি মৌজার সমষ্টি বা তাদের অংশসমূহকে নিয়ে এক-একটি গ্রাম গঠিত হবে বলে 1973 সালের পঞ্চায়েত আইনে বলা হয়। রাজ্য সরকার প্রতিটি গ্রামের জন্য গ্রামের নাম অনুসারে গ্রাম পঞ্চায়েত গঠন করে | যেসব গ্রামবাসী পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার ভোটদাতা হিসেবে নিজেদের নাম ভোটার তালিকাভুক্ত করেছে, তারা গোপন ভোটদান পদ্ধতির মাধ্যমে গ্রাম পঞ্চায়েতের সদস্যদের নির্বাচন করতে পারে। গ্রাম পঞ্চায়েতের নির্বাচিত সদস্যসংখ্যা কমপক্ষে 5 এবং সর্বাধিক 25 হতে পারে। গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান হলেন পঞ্চায়েত প্রধান।



পশ্চিমবঙ্গের ‘তরাই অঞ্চলের আর-এক নাম ডুয়াস বা 'দুয়ার'—ব্যাখ্যা করো। 

উত্তর: উত্তরবঙ্গে হিমালয় পর্বতশ্রেণির দক্ষিণ দিকের ঢালু পাদদেশ ভূমি তরাই নামে পরিচিত। এখানে নুড়ি পাথরের স্তূপ এবং প্রচুর জলাভূমি দেখা যায় | তরাই কথার অর্থ স্যাতসেঁতে ভূমি। তরাই অঞ্চলের পূর্বদিক, আলিপুরদুয়ারের উত্তর অংশটি ডুয়ার্স নামে পরিচিত। ডুয়ার্স কথাটি ‘door' থেকে এসেছে | ডুয়ার্স অঞ্চলটি প্রকৃতপক্ষে পশ্চিমবঙ্গের সমভূমি অঞ্চল এবং ডুয়ার্স আসলে ভুটানে যাওয়ার দুয়ার বা প্রবেশদ্বার।



তাল অঞ্চলে প্রায়ই বন্যা হয় কেন? অথবা, উত্তরবঙ্গের সমভূমি অত্যন্ত বন্যাপ্রবণ-ব্যাখ্যা করো।

উত্তর: কালিন্দী নদীর বামতীরের অংশ তাল নামে পরিচিত। কোচবিহার, উত্তর দিনাজপুর ও মালদহ জেলার পশ্চিমদিকের যেসব অংশগুলি 'তাল' নামে পরিচিত, সেগুলি প্রকৃতপক্ষে নিম্নভূমি। ওইসব অংশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত নদীসমূহ (যথা মহানন্দা, কালিন্দী, জলঢাকা, তোর্সা প্রভৃতি) অত্যন্ত ধীরগতিসম্পন্ন। সেকারণে নদীগুলি প্রায়ই তার গতিপথ পরিবর্তন করে নদীগুলির খাত অগভীর, সেজন্য বর্ষাকালে যখনই বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বাড়ে তখনই নদীগুলির দু-কূল ছাপিয়ে পার্শ্ববর্তী অংশে বন্যা সৃষ্টি হয়।



পশ্চিমের মালভূমি অঞ্চল খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ—এরূপ বলার কারণ ব্যাখ্যা করো।

উত্তর: পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিমের মালভূমিটি খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ। এখানে কয়লা, ফায়ার ক্লে, চিনামাটি, ডলোমাইট, চুনাপাথর কোয়ার্টজ, অ্যাপেটাইট ম্যাঙ্গানিজ, গ্রাফাইট ও সামান্য আকরিক লোহা প্রভৃতি পাওয়া যায়। এ ছাড়াও দামোদর অববাহিকা অঞ্চলটিতে গণ্ডোয়ানা যুগের অবক্ষেপ কয়লার স্তর হিসেবে সঞ্চিত রয়েছে। এই মালভূমি অঞ্চলটি অনেক প্রাচীন এবং এটি ছোটোনাগপুর মালভূমির সম্প্রসারিত অংশ হওয়ায় এখানে বিভিন্ন ধরনের। খনিজ পদার্থের সন্নিবেশ ঘটেছে।



পশ্চিমবঙ্গকে নদীমাতৃক রাজ্য বলা হয় কেন?

উত্তর: পশ্চিমবঙ্গের নদী মানচিত্রের দিকে লক্ষ করলে দেখা যায়, এখানে অসংখ্য প্রধান নদী, উপনদী, শাখানদী প্রবাহিত হচ্ছে। এরা পশ্চিমবঙ্গে নদীজালক তৈরি করেছে। নদীগুলির প্রধান উৎসস্থল হিমালয় পার্বত্য অঞ্চল এবং পশ্চিমের মালভূমি বা ছোটোনাগপুর অঞ্চল | নদীগুলি উত্তর থেকে দক্ষিণে বা পশ্চিম থেকে পূর্বে প্রবাহিত হয়ে শেষে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে। পশ্চিমবঙ্গকে গঙ্গা, ভাগীরথী এবং তাদের উপনদী ও শাখানদীসমূহের দান বললেও ভুল বলা হয় না । সেকারণে পশ্চিমবঙ্গকে নদীমাতৃক রাজ্য বলে।



উত্তরবঙ্গের নদনদীর বৈশিষ্ট্য লেখো। 

উত্তর: উত্তরবঙ্গের নদনদীগুলির প্রধান বৈশিষ্ট্য হল— 1) এই নদীগুলির অধিকাংশ।বরফগলা জলে পুষ্ট। তবে প্রস্রবণ বা ঝরনা থেকে সৃষ্ট কিছু নদীও আছে। 2) এই নদীগুলি ভূমির ঢালকে অনুসরণ করে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বদিকে প্রবাহিত হয়েছে। 3) নদীগুলির মধ্যে অধিকাংশই বাংলাদেশে প্রবেশ করে যমুনার (ব্রহ্মপুত্রের) সঙ্গে মিলিত হয়েছে। কিছু নদী পদ্মার সঙ্গে মিলিত হয়েছে। 4) বরফগলা জলে পুষ্ট হওয়ায় এই নদীগুলিতে সারাবছরই জল থাকে। 5) পর্বতের ঢালবরাবর নেমে আসে বলে এগুলি খরস্রোতা। ফলে গভীর গিরিখাত (সংকীর্ণ 'V' আকৃতির) সৃষ্টি করে এবং জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের পক্ষে উপযোগী। 6) নদীগুলি পর্বতের ওপর থেকে সমভূমিতে নামার পর বন্যা প্রবণতা দেখা যায়।



পশ্চিমবঙ্গের মালভূমি অঞ্চলের অধিকাংশ নদী পূর্ববাহিনী কেন?

উত্তর: পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম ভাগের নদীগুলির উৎস ছোটোনাগপুর মালভূমি। অজয়, ময়ূরাক্ষী,দামোদর, রূপনারায়ণ,ব্রাহ্মণী,দ্বারকেশ্বর, শিলাবতী প্রভৃতি নদীগুলি এই অংশের ওপর দিয়ে পশ্চিম থেকে পূর্বদিকে প্রবাহিত হচ্ছে এবং শেষে ভাগীরথী-হুগলির ডানতীরের উপনদী হিসেবে মিশেছে। নদীগুলির উৎসস্থল ছোটোনাগপুর মালভূমি হওয়ার জন্য ভূমির সাধারণ ঢাল অনুযায়ী নদীগুলি পশ্চিম থেকে পূর্বদিকে প্রবাহিত হয়েছে। নদীগুলি অনিত্যবহ। বর্ষাকালে নদীগুলিতে জলপ্রবাহ বেড়ে যায় এবং নদীগুলি বন্যাপ্রবণ হয়ে ওঠে।



শুষ্ক ঋতুতে পশ্চিমবঙ্গের মালভূমি অঞ্চলের নদীগুলির সমভূমি প্রবাহে জল প্রায় থাকে না কেন?

উত্তর: পশ্চিমবঙ্গের মালভূমি অঞ্চলের নদনদীগুলির মধ্যে দামোদর, অজয়, ময়ূরাক্ষী, কংসাবতী প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। তবে এইসব নদীগুলির নিম্নপ্রবাহে তেমন জল থাকে না কারণ -

বৃষ্টির জলে পুষ্ট নদী : মালভূমি অঞ্চলের বেশিরভাগ নদী বৃষ্টির জলে পুষ্ট বলে বর্ষাকাল ছাড়া অন্য সময়ে তেমন জল থাকে না |

অধিক উদ্বুদ্ধা : মালভূমি অঞ্চলে গ্রীষ্মকালের গড় তাপমাত্রা 40°সে-এর বেশি থাকে বলে বাষ্পীভবন বেশি ঘটে, ফলে নদীর জল হ্রাস পায় |

বাঁধের প্রভাব : দামোদর, কংসাবতী প্রভৃতি নদনদীর ওপর এক বা একাধিক বাঁধ দিয়ে জলাধার তৈরি করা হয়েছে। এর ফলেও নদীগুলির নিম্নপ্রবাহে জলের পরিমাণ হ্রাস পায়।



দামোদরকে ‘বাংলার দুঃখ' বলা হত কেন?

উত্তর: দামোদর হল পশ্চিমের মালভূমি ও রুর অঞ্চলের প্রধান নদী। ছোটোনাগপুর মালভূমিতে অধিক বৃষ্টি হলে তার জল দামোদর নদে সংযোজিত হত, ফলে নদীর পার্শ্ববর্তী অঞ্চল প্রায়ই বন্যার কবলে পড়ত। বন্যার জন্য পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের জনবসতি ধ্বংস হয়ে যেত। একারণে একে ‘বাংলার দুঃখ’ বলা হত। পরবর্তীকালে দামোদর উপত্যকা পরিকল্পনা গ্রহণ করে নদীর জলকে আটকে রেখে শুষ্ক সময়ে ছাড়ার ব্যবস্থা করা হয়। এতে একদিকে যেমন বন্যারোধ করা গেছে তেমনি অন্যদিকে শুষ্ক সময়ে কৃষিকাজ ও অন্যান্য কাজে সুবিধা হয়েছে।



কংসাবতীকে ‘মেদিনীপুরের দুঃখ’ বলা হয় কেন? উত্তর

উত্তর: কংসাবতী নদীটি পুরুলিয়া জেলার অযোধ্যা পাহাড় থেকে উৎপন্ন হয়ে বাঁকুড়া, পশ্চিম মেদিনীপুর ও পূর্ব মেদিনীপুর জেলার মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। নদীটি হলদিয়াতে হলদি নদীর সাথে মিশে হুগলি নদীর মোহানায় পড়েছে। উৎস এবং মধ্যপ্রবাহে নদীর ঢাল বেশি থাকার কারণে ওই অঞ্চলে জল জমতে পারে না। কিন্তু পূর্ব মেদিনীপুর জেলায় ভূমির ঢাল একেবারে কমে যাওয়ার জন্য উৎস অঞ্চলে বা অববাহিকা অংশে অধিক বৃষ্টিপাত হলে অতিরিক্ত জল যুক্ত হওয়ায় মেদিনীপুর জেলাটি বন্যাপ্লাবিত হয়। সেকারণে কংসাবতীর নিম্নপ্রবাহে অর্থাৎ মেদিনীপুরে বন্যার কারণে প্রচুর ক্ষতি হয়। তাই একে ‘মেদিনীপুরের দুঃখ’ বলে। 



পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবন অঞ্চলে খাড়ি দেখা যায় কেন?

উত্তর: বঙ্গোপসাগরে জোয়ার হলে সেইসময় অতিরিক্ত জল সুন্দরবন অঞ্চলের অনেক ভিতর পর্যন্ত চলে আসে এবং নদীর মোহানাকে প্লাবিত করে। নদীর চওড়া মোহানাকে খাড়ি বলে। প্রতিনিয়ত জোয়ারভাটার জন্য বদ্বীপের মুখে নানান ছোটো বড়ো খাড়ি তৈরি হয় যা স্থলভাগের ভিতর পর্যন্ত প্রসারিত হয়। এই খাড়িগুলি পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হলে এদের মধ্যবর্তী অংশে দ্বীপ তৈরি হয়। এইসব খাড়িগুলি পরবর্তীকালে এক একটি নদীতে পরিণত হয়। যার মোহানার দিক খুব চওড়া কিন্তু স্থলভাগের দিক সরু হয়ে গেছে।



পশ্চিমবঙ্গে ভূপৃষ্ঠস্থ জলের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলাফল গুলো আলোচনা করো।

উত্তর: পশ্চিমবঙ্গে ভূপৃষ্ঠস্থ জলের অতিরিক্ত ব্যবহারের কুফলগুলি হল—

রাসায়নিক দ্রব্যের সংমিশ্রণ বৃদ্ধি: জলসেচের জন্য ব্যবহৃত খালের জলে, নদনদীতে স্নান করা ও কাপড় কাচার ফলে সাবান, ডিটারজেন্ট ইত্যাদি নানারকম রাসায়নিক দ্রব্যের মিশ্রণ ঘটে। এভাবে দূষিত নদীর জল প্রাকৃতিক উপায়ে দূষণমুক্ত হতে পারে না।

কলকারখানার বর্জ্য পদার্থ থেকে জলদূষণ: নদীতে কলকারখানা থেকে দূষিত বর্জ্য পদার্থ মিশে জলদূষণ ঘটায়। 

কৃষির উৎপাদনে ক্ষতি: দূষিত জল কৃষিকাজের জমিকে ক্ষারকীয় করে তোলে | তাই কৃষিজমির উৎপাদন শক্তি হ্রাস পায়।

জলসংকট: ভূপৃষ্ঠস্থ জলের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে জলের ভাণ্ডার কমে গিয়ে ভবিষ্যতে জলসংকট ঘটতে পারে।



পশ্চিমবঙ্গে ভৌমজলের বহুমুখী ব্যবহারগুলি লেখো।

উত্তর: পশ্চিমবঙ্গে একাধিক ক্ষেত্রে ভৌমজলের ব্যবহার লক্ষ করা যায়। যেমন—

কৃষিকাজে : পশ্চিমবঙ্গের যেসব অঞ্চলে খাল বা নদনদীর জলের সুবিধা নেই, সেইসব অঞ্চলে নলকূপের মাধ্যমে ভৌমজলকে ব্যবহার।করে কৃষিকাজ সম্পাদন করা হয়।

পানীয় জল হিসেবে : ভৌমজল জলসেচের জন্য ব্যবহৃত হলেও পানীয় জলের উৎস হিসেবে এর গুরুত্ব অনেক বেশি।

গৃহস্থালির কাজে: রান্নার কাজ, জামাকাপড় কাচা, ঘর পরিষ্কার ইত্যাদি গৃহস্থালির কাজেও ভৌমজল ব্যবহার করা হয়।



মানুষের কার্যাবলির ফলে কীভাবে ভৌমজলের পরিমাণ হ্রাস পাচ্ছে?

উত্তর: ভূপৃষ্ঠের নীচে প্রবেশ্য শিলার মধ্যে সঞ্চিত জলকে ভৌমজল বলে। এই ভৌমজলের পরিমাণ মানুষের বিভিন্ন কার্যাবলির ফলে হ্রাস পাচ্ছে। যেমন— 

1) পানীয় জলের জোগান : জনসংখ্যা দ্রুত হারে বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে | তাই পানীয় জলের সরবরাহের জন্য কূপ ও নলকূপের মাধ্যমে ভৌমজল অধিক পরিমাণে তোলা হচ্ছে, যা ভৌমজলের পরিমাণ হ্রাস ঘটাচ্ছে। 

2) নগরায়ণ: জনবসতি বিস্তার, নগরায়ণের ফলে কংক্রিটের ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় ভূপৃষ্ঠে মুক্ত স্থানের (open space) পরিমাণ কমে যাচ্ছে। ফলে বৃষ্টির জল ভূ-অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে না পারায় ভৌমজলের সস্কৃয় ব্যাহত হচ্ছে।

3) কৃষিকার্য : সারাবছর ধরে (শুষ্ক ঋতুতেও) কৃষিকার্যের ফলে যথেচ্ছ পরিমাণে ভৌমজল সেচের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা ভৌমজলের হ্রাসের অন্যতম কারণ।



পশ্চিমবঙ্গে নদনদী, খাল, কূপ প্রভৃতি ভূপৃষ্ঠ্য জলের বহুমুখী ব্যবহার সম্পর্কে আলোচনা করো।

উত্তর: পশ্চিমবঙ্গে নদনদী, খাল, কূপ প্রভৃতি ভূপৃষ্ঠস্থ জলের বহুমুখী ব্যবহারগুলি হলো -

কৃষিকাজে: পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অন্যতম কৃষিপ্রধান রাজ্য। নদীর জল, খাল প্রভৃতির সাহায্যে কৃষিজমিতে জলসেচ করা হয়। ভাগীরথী-হুগলি নদীর দু-পালের কৃষিজমিতে নদীর জলকে ব্যবহার করাহয়।

পরিবহণের কাজে: ভাগীরথী-হুগলি নদীর সাহায্যে জলপথে পরিবহণ করা সম্ভব হয়।

পানীয় ও দৈনন্দিক কাজে: নদীর জলকে পরিশোধন করে পানীয় হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া দৈনন্দিন কাজেও নদীর জল, কূপ প্রভৃতির প্রভাব অপরিসীম।



পশ্চিমবঙ্গে ভৌমজলের অতিরিক্ত ব্যবহারের কুফলগুলি আলোচনা করো।

উত্তর: পশ্চিমবঙ্গে ভৌমজলের অতিরিক্ত ব্যবহারের কুফলগুলি হল –

আর্সেনিকের পরিমাণ বৃদ্ধি: অত্যধিক পরিমাণে ভৌমজল উত্তোলনের কারণে জলে নাইট্রেট, ফ্লুরাইড জাতীয় যৌগের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে এবং এই জল ব্যবহারের ফলে প্রাণীদেহে ব্ল্যাকফুট ও ক্যানসার রোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের নদিয়া, মুরশিদাবাদ, মালদহ, উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর, বর্ধমান, হাওড়া ও হুগলি প্রভৃতি জেলায় প্রচুর পরিমাণে ভৌমজল তোলার জন্য আর্সেনিক দূষণের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে।

লবণতা বৃদ্ধি : মাটির নীচের ভৌমজল অতিরিক্ত ব্যবহার করার ফলে জল লবণাক্ত হচ্ছে। এর ফলে লবণাক্ত মাটি কৃষিকাজের অযোগ্য হয়ে পড়ছে। নদিয়া, বর্ধমান জেলায় নোনা জলের কারণে পানীয় জলের সংকট দেখা দিয়েছে

শিল্পক্ষেত্রে: নদনদী ও খালের সর্বাধিক ব্যবহার ঘটে শিল্পক্ষেে যেমন– কুগলি নদীর দুই তাঁরে হলদিয়া শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠেছে।

বনসৃজনে: পশ্চিমবঙ্গে সামাজিক বনসৃজন ও কৃষি বনসৃজনে খাল বিল, জলাশয়ের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। পশ্চিমের মালভূমি অঞ্চলে বনভূমি গড়ে তুলতে বপুল পরিমাণে ভূপৃষ্ঠস্থ জল ব্যবহার করা হয়।

বিদ্যুৎ উৎপাদনে: নদীর ওপর বাঁধ দিয়ে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। যেমন—দামোদর নদের ওপর মাইথন, পাঞ্চেত, তিলাইয়া প্রভৃতি বাঁধ নির্মাণ করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়।

ভূমির অবনমনের সম্ভাবনা: অতিরিক্ত ভৌমজলের ব্যবহারের ফলে ভূমির অবনমনের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। যেমন— অতিরিক্ত ভৌমজলের ব্যবহারের ফলে কলকাতা এবং তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ভবিষ্যতে ভূমির অবনমন ঘটার আশঙ্কা করা হচ্ছে। 

ভৌমজলতলের উচ্চতা হ্রাস: অনিয়ন্ত্রিতভাবে ভৌমজলের ব্যবহারের ফলে ভৌমজলতলের উচ্চতা হ্রাস পায়।



পশ্চিমের মালভূমি অঞ্চলে ভৌমজলের স্তর সমৃদ্ধ নয় কেন?

উত্তর: পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিমে পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, পশ্চিম মেদিনীপুর, বীরভূমে ভৌমজলের স্তর সমৃদ্ধ নয়, কারণ- 1) মালভূমি অঞ্চলে বার্ষিক বৃষ্টিপাতের পরিমাগ কম। তাই জল সঞ্চয়ের পরিমাণ স্বল্প। 2) অঞ্চলটি পশ্চিম থেকে পূর্বে ঢালু, তাই বৃষ্টি হলে দ্রুত জল ঢাল বেয়ে অন্যত্র অপসারিত হয়ে যায়, ফলে এতে ভূঅভ্যন্তরে জল সতি হওয়ার সুযোগ পায় না। 3) এখানকার ভূমিভাগ প্রাচীন কঠিন শিলায় গঠিত বলে ওই পাথুরে জমি মাটির গভীরে জল প্রবেশে বাধা দেয়।



পশ্চিমবঙ্গের জলবায়ুর প্রধান নিয়ন্ত্রকগুলি সংক্ষেপে আলোচনা করো।

উত্তর: পশ্চিমবঙ্গের জলবায়ুর প্রধান নিয়ন্ত্রকগুলি হল—

কর্কটক্রান্তিরেখা: পশ্চিমবঙ্গের ওপর দিয়ে কর্কটক্রান্তিরেখা (23½°) উত্তর) বিস্তৃত হওয়ার জন্য এই রাজ্যের (দার্জিলিং হিমালয়ের পার্বত্য অঞ্চল ছাড়া) জলবায়ু কিছুটা উন্ন প্রকৃতির।

মৌসুমি বায়ু : বর্ষাকালে দক্ষিণের বঙ্গোপসাগর থেকে আসা আর্দ্র দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু পশ্চিমবঙ্গের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সারা রাজ্যে বৃষ্টিপাত ঘটায়। আবার, শীতকালে উত্তরদিকের ঠান্ডা স্থলভাগ থেকে আসে শুষ্ক ও শীতল উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ু। এর প্রভাবে সমগ্র পশ্চিমবঙ্গে শীত পড়ে এবং এই বায়ু শুরু বলে শীতকালে বৃষ্টিপাত হয় না। 3 ভূমির উচ্চতা : ভূমির উচ্চতার সঙ্গে উন্নতার বিপরীতমুখী সম্পর্ক লক্ষ করা যায় অর্থাৎ, উচ্চতা (প্রতি 1000 মিটারে 6.4 °সে হারে) বাড়লে উন্নতা কমে | এই রাজ্যের সমভূমি অঞ্চলের তুলনায় দার্জিলিং-এর পার্বত্য অঞ্চলের উচ্চতা অনেক বেশি বলে এখানে উষ্মতা অনেক কম।

বঙ্গোপসাগর উপস্থিতি: পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর থাকায় পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণভাগের জলবায়ু কিছুটা সমভাবাপন্ন অর্থাৎ, গ্রীষ্ম ও শীত কোনোটিই তীব্র নয়।

হিমালয় পর্বতের অবস্থান: পশ্চিমবঙ্গের উত্তর সীমান্তে হিমালয় পর্বতশ্রেণি পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত থাকায় একদিকে যেমন আর্দ্র দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু বাধাপ্রাপ্ত হয়ে এই রাজ্যে বৃষ্টিপাত ঘটায়, তেমনি শীতকালে শীতল উত্তর-পূর্ব মৌসুমি বায়ুও বাধাপ্রাপ্ত হয় বলে শীতের তীব্রতা বেশ কম।



মানুষের জীবনে ঋতুপরিবর্তনের প্রভাব আলোচনা করো।

ঋতুপরিবর্তন যেমন মানুষের শরীর ও মনের ওপর প্রভাব ফেলে তেমনি জীবিকা ও অর্থনীতির ওপরও প্রভাব বিস্তার করে। মানুষের জীবনে ঋতুপরিবর্তনের প্রভাবগুলি হল—

রোগের প্রাদুর্ভাব : ঋতুভেদে বিশেষ বিশেষ রোগের প্রার্দুভাব লক্ষ করা যায় । যেমন—শীতের শেষে বসন্তকালে জলবসন্ত রোগ, বর্ষাকালে সর্দি কাশি প্রভৃতি রোগ হয়।

শরীর ও মনের ওপর প্রভাব : ঋতুপরিবর্তনের ফলে মানুষের শরীর ও মনের ওপর এর প্রভাব পড়ে । যেমন—প্রচণ্ড গরমে ক্লান্তি আসে, আবার প্রচণ্ড ঠান্ডায় কাজ করতে আলস্য লাগে প্রভৃতি।

কৃষিকাজে পরিবর্তন: ঋতুপরিবর্তনের সাথে সাথে কৃষিকাজেরও পরিবর্তন হয় | যেমন— শীতকালে শাকসবজির চাষ ভালো হয়। আবার, শীতকালে রবিশস্য এবং বর্ষাকালে খরিফ শস্যের চাষ হয়।

খাদ্যতালিকায় পরিবর্তন : ঋতুপরিবর্তনের সাথে সাথে মানুষের খাদ্যতালিকাও পরিবর্তিত হয়। 

উৎসর ও পর্যটনের ওপর প্রভাব: মেলা, পর্যটন ও উৎসবের মরশুম ঋতুপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। যেমন—পশ্চিমবঙ্গের শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজো শরৎকালে হয়, শীতকালে পিকনিক, মেলা প্রভৃতি হয়।

জৈবিক ক্রিয়ায় পরিবর্তন : ঋতুভেদে দিনরাতের হ্রাসবৃদ্ধি অনুযায়ী মানুষের জৈবিক সময় (biological clock) পরিবর্তিত হয়। 

পোশাক পরিচ্ছদের পরিবর্তন : শীতকালে গরম পোশাক, গ্রীষ্মকালে হালকা সুতির পোশাক পরা হয়।



পশ্চিমবঙ্গের পার্বত্য জলবায়ুর বৈশিষ্ট্য লেখো।

উত্তর: পশ্চিমবঙ্গের পার্বত্য অঞ্চলের জলবায়ুর বৈশিষ্ট্য হল— 1) পার্বত্য অঞ্চলে গ্রীষ্মকাল বেশ আরামদায়ক। গ্রীষ্মকালীন গড় তাপমাত্রা 15-18°সে এবং শীতকালীন গড় তাপমাত্রা 4-5°সে। 2) বৃষ্টিপাতের পরিমাণ অন্যান্য স্থান অপেক্ষা বেশি | বছরে প্রায় গড়ে 400 সেমি বৃষ্টিপাত ঘটে। 3) সারাবছর আপেক্ষিক আর্দ্রতা বেশি থাকে এবং ভোরবেলা বা সন্ধেবেলা কুয়াশাচ্ছন্নতা দেখা যায়। 4) শীতকালে মাঝে মধ্যে তুষারপাত ঘটে। 5) সাধারণভাবে এই অঞ্চলের জলবায়ু কিছুটা নাতিশীতোয় প্রকৃতির। 6) শীত এবং গ্রীষ্ম এই দুই ঋতুর প্রাধান্য লক্ষণীয়।



উত্তরের পার্বত্য অঞ্চলে গ্রীষ্মকালে আরামদায়ক আবহাওয়া বিরাজ করে কেন?

উত্তর: গ্রীষ্মকালে পশ্চিমবঙ্গের সর্বত্র তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। তবে রাজ্যের উত্তরভাগের পার্বত্য অঞ্চলের তাপমাত্রা কম থাকায় আরামদায়ক আবহাওয়া বিরাজ করে। সাধারণভাবে দেখা যায়, সমুদ্রতল থেকে প্রতি 1000 মিটার উচ্চতা বৃদ্ধির জন্য তাপমাত্রা প্রায় 6.4° সে হারে হ্রাস পায় | দার্জিলিং পার্বত্য অঞ্চলের উচ্চতা 2000 মিটারের বেশি হওয়ার জন্য সেখানকার তাপমাত্রা পশ্চিমবঙ্গের অন্য অংশের তুলনায় কম হয় | গ্রীষ্মে যেখানে সমভূমি এবং মালভূমি অংশের তাপমাত্রা 30-35° সেলসিয়াসের মধ্যে থাকে, সেখানে দার্জিলিং পার্বত্য অঞ্চলের তাপমাত্রা হয় প্রায় 15-18% সে। এই তাপমাত্রা গ্রীষ্মে আরামদায়ক অনুভূতি আনে।



পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতিতে কৃষিকাজের গুরুত্ব লেখো।

উত্তর: পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতিতে কৃষির গুরুত্ব অপরিসীম—

কর্মসংস্থানের উৎস : পশ্চিমবঙ্গে প্রায় 60% জনসংখ্যা কৃষিকাজের ওপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত। বর্তমানে রাজ্যে মোট শ্রমিকের প্রায় 53-55% কৃষিতে নিযুক্ত। অর্থাৎ কৃষির ওপর নির্ভর করে বহু শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয় |

কৃষিনির্ভর শিল্পের বিকাশ চা, পাট, খাদ্য- প্রক্রিয়াকরণ, ফল প্রক্রিয়াকরণ প্রভৃতি যে কৃষিভিত্তিক শিল্পগুলি রয়েছে তার বিকাশ সম্পূর্ণভাবে কৃষিজ ফসলের ওপর নির্ভরশীল।

বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন: পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম দুটি গুরুত্বপূর্ণ কৃষিজ ফসল হল চা এবং পাটজাত দ্রব্য। এই দুটি ফসল রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়।

সার শিল্পের বিকাশ : পশ্চিমবঙ্গে কৃষি ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য নানাধরনের সার ব্যবহৃত হয়, যা পরোক্ষভাবে সার শিল্পের বিকাশ ঘটতে সাহায্য করেছে।



পশ্চিমবঙ্গের কৃষিজ ফসলের শ্রেণিবিভাগ করো।

উত্তর: পশ্চিমবঙ্গের মাটির প্রকৃতি, জলবায়ু, ভূমির গঠনের ওপর নির্ভর করে কৃষিজ ফসলকে নিম্নলিখিতভাগে ভাগ করা যায়—

1) ঋতু অনুসারে: বৃষ্টিপাত ও উন্নতার ওপর নির্ভর করে ঋতু অনুসারে ফসলকে দুভাগে ভাগ করা যায়

[i] রবিশস্য : শীতকালে চাষ করা হয়। যেমন—গম, আলু, সরষে প্রভৃতি।

[ii] খরিফ শস্য : গ্রীষ্মের মধ্যবর্তী সময় চাষ করা হয়। যেমন—ধান, পাট প্রভৃতি।

2) ব্যবহার অনুযায়ী : ব্যবহার অনুযায়ী ফসলকে দু'ভাগে ভাগ করা হয়। যেমন— 

[i] খাদ্য ফসল: কৃষকের নিজের এবং নিজের পরিবারের খাদ্যের চাহিদা মেটানোর জন্য যে শস্যের চাষ করা হয়, তাকে খাদ্য ফসল বলে । যেমন—ধান, গম, যব, ভুট্টা প্রভৃতি।

[ii] বাণিজ্যিক ফসল: কেবলমাত্র বাজারে বিক্রির উদ্দেশ্যে যে ফসল চাষ করা হয় তাকে বাণিজ্যিক ফসল বলে। এটিকে তিনটি ভাগ করা হয়। যথা—[a] বাগিচা ফসল: চা, কফি প্রভৃতি। নটি ভাগে [b] তক্ষুজাতীয় ফসল : পার্ট, ফান, মেম্তা প্রভৃতি। [c] ফুল-ফল ও সবজি ভাব বা হর্টিকালচার: আম, কলা, পেয়ারা, লিচু, আনারস, জগদ প্রভৃতি। সবজির মধ্যে আলু, পেয়াজ, পটল, বাধাকপি, ফুলকপি, ঝিঙে, উচ্ছে ইত্যাদি।



গাঙ্গেয় বদ্বীপ অঞ্চল কৃষিকাজে সমৃদ্ধি লাভ করেছে কেন?

উত্তর: গাঙ্গেয় বদ্বীপ অঞ্চল পশ্চিমবঙ্গের সর্বাধিক কৃষিসমৃদ্ধ অঞ্চল | এখানকার অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজের মাধ্যমে তাদের জীবিকানির্বাহ করে। এখানে কৃষির উন্নতির কারণ হল

1) বিস্তীর্ণ সমভূমি : এই বদ্বীপ অঞ্চলটির ভূপ্রকৃতি সমতল। ফলে জমিতে জলসেচ ও চাষবাস করা সুবিধাজনক।

2) উর্বর পলিমাটি: অঞ্চলটি গঙ্গার পলিসমৃদ্ধ মাটি দিয়ে গঠিত। এই মাটি কৃষিকাজের পক্ষে সর্বাধিক অনুকূল |

3) পরিমিত বৃষ্টিপাত ও উন্নতা : ক্রান্তীয় অঞ্চলে অবস্থিত বলে এখানে যে বৃষ্টিপাত এবং উম্নতা দেখা যায় তা কৃষির পক্ষে উপযুক্ত। ফলে এখানে ধান, পাট, সবজি, আলু প্রভৃতি ফসল চাষ ভালো হয়।

4) জনসংখ্যার আধিক্য : এই অঞ্চলের জনসংখ্যার আধিক্য বেশি থাকার ফলে এখানে কৃষির জন্য শ্রমিকের প্রাচুর্য এবং উৎপাদিত ফসলের অধিক চাহিদা কৃষিকাজের উন্নতি ঘটিয়েছে।



তরাই অঞ্চলে কৃষিজ ফসলের উৎপাদন আশানুরূপ হয় না কেন?

উত্তর: তরাই অঞ্চল দার্জিলিং জেলার শিলিগুড়ি মহকুমা, জলপাইগুড়ি এবং আলিপুরদুয়ার জেলার কিছু অংশ নিয়ে এই অঞ্চল গঠিত। স্থূল এবং অদৃঢ় সংঘবদ্ধ পলল দিয়ে এই তরাই অঞ্চলটি গঠিত। এই অঞ্চলের গড় উষ্মতা 75 মিটার থেকে 150 মিটারের মধ্যে। তিস্তা, তোর্সা, জলঢাকা, রায়ডাক, সংকোশ, মহানন্দা প্রভৃতি নদীগুলি এই অঞ্চলে নুড়ি, পাথর এবং কাঁকরপূর্ণ মাটির সঞ্চয় ঘটায় | এই অঞ্চলটি কৃষির পক্ষে অনুকূল নয়। অন্যদিকে এই অঞ্চলে গভীর বনভূমি, ভিজে, স্যাতসেঁতে পরিবেশ বিরাজমান যা কৃষিতে সহায়তা করে না। তাই এখানে কৃষি ফসলের উৎপাদন আশানুরূপ নয়। কেবল চা, তামাক, সামান্য ধান, নানা ধরনের ফলের চাষ হয়।



পশ্চিমবঙ্গের কৃষিকাজের সমস্যা লেখো।

উত্তর: পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতিতে কৃষির গুরুত্ব খুব বেশি থাকলেও এই রাজ্যের কৃষিকে কতকগুলি সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়, যেমন –  1) পশ্চিমবঙ্গের বহুজমিকে এখনও সেচের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি, ফলে কৃষি উৎপাদনের পরিমাণ সেরকমভাবে বাড়ানো সম্ভব হয়নি | 2) দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ুর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এ রাজ্যের কৃষির অন্যতম সমস্যা। 3) পশ্চিমবঙ্গের কৃষি ব্যবস্থায় প্রয়োজনের তুলনায় খুব অল্পই উচ্চফলনশীল বীজ ব্যবহার করা হয়। ফলে কৃষি উৎপাদন আশানুরূপ হয় না| 4) কৃষিতে কৃষকরা এখনও লাঙল, বলদ, কাস্তে ইত্যাদি পুরাতন প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি ব্যবহার করেন। আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার এখনও কম। 5) কৃষিতে মূলধন বিনিয়োগের পরিমাণ খুব কম। 6) উৎপাদিত ফসল অনেকসময় বাজারে ন্যায্য মূল্যে বিক্রি করতে না পেরে কৃষকরা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েন।



পশ্চিমবঙ্গে জলসেচের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করো।

ভারতের অন্যান্য অংশের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গের কৃষিকার্যে জলসেচের প্রয়োজনীয়তা বেশি। এর কারণগুলি হল -

মৌসুমি বায়ুর নির্ভরশীলতা কমানো: পশ্চিমবঙ্গে বৃষ্টিপাত মূলত মৌসুমি বায়ুর ওপর নির্ভরশীল এবং এই মৌসুমি বায়ুর অনিশ্চয়তার জন্য প্রায়ই খরা-বন্যা দেখা যায়। এই ধরনের অনিশ্চয়তা কাটাতে জলসেচ প্রয়োজন হয়।

রবিশস্যের চাষ : পশ্চিমবঙ্গে শীতকাল বৃষ্টিহীন থাকে। এমতাবস্থায় শীতকালীন রবিশস্য চাষের জন্য জলসেচের প্রয়োজন হয়। 3 উচ্চফলনশীল শস্যের চাষ : বর্ধিত জনসংখ্যার খাদ্যের চাহিদা। মেটানোর জন্য উচ্চফলনশীল শস্যের চাষ করা হয়। এজন্য নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট পরিমাণে জল প্রয়োজন, যা একমাত্র জলসেচের দ্বারাই সম্ভব।

মৃত্তিকার জলধারণক্ষমতার তারতম্য: পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অংশের মৃত্তিকার চরিত্র পৃথক আবার মৃত্তিকার চরিত্রের ওপর মাটির জলধারণক্ষমতা নির্ভর করে। মোটা প্রথনযুক্ত মার্টির জলধারণক্ষমতা কম বলে সেই মাটিতে জলসেচ প্রয়োজন হয়।

শুষ্ক অঞ্চল: শুষ্ক অঞ্চলে চাষ আবাদের জন্য জলসেচের প্রয়োজন, যেমন—পশ্চিমের মালভূমি অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ অপেক্ষাকৃত কম বলে এখানে জলসেচের বিশেষভাবে প্রয়োজন হয়।



পশ্চিমবঙ্গের সমভূমি অঞ্চল ধান ও পাট চাষের পক্ষে যথেষ্ট উপযুক্ত কেন আলোচনা করো।

উত্তর: পশ্চিমবঙ্গের সমভূমি অঞ্চলে বিশেষত উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর, মালদহ, মুরশিদাবাদ, নদিয়া, বর্ধমান, হুগলি, উত্তর ও দক্ষিণ 24 পরগনা প্রভৃতি জেলায় ধান ও পাট পর্যাপ্ত পরিমাণে উৎপাদিত হয়। এই দুটি ফসল চাষের জন্য যেসব অনুকূল পরিবেশ প্রয়োজন সেগুলির মধ্যে অন্যতম হল— 

সমতল ভূভাগ: ধান ও পাট চাষের জন্য সমতল ভূভাগ প্রয়োজন | এই ধরনের ভূপ্রকৃতিগত সুবিধার জন্য পার্বত্য ও মালভূমি অঞ্চল অপেক্ষা সমভূমিতে এই দুটি ফসল ভালো উৎপাদন হয়।

উর্বর পলিমাটি : ধান ও পাট চাষের জন্য প্রয়োজনীয় উর্বর পলিমাটি প্রয়োজন যা পশ্চিমবঙ্গের গাঙ্গেয় সমভূমি অঞ্চলে অর্থাৎ গঙ্গাসহ তার অন্যান্য উপনদী ও শাখানদনদীবাহিত অঞ্চলে দেখা যায়।

সুলভ শ্রমিক : ধান ও পাট চাষের জন্য সুলভ ও প্রচুর শ্রমিক প্রয়োজন হয়। সমভূমি অঞ্চলে জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি বলে কৃষিকার্যে প্রয়োজনীয় শ্রমিক সহজেই পাওয়া যায়। এইসব কারণের জন্য পশ্চিমবঙ্গের সমভূমি অঞ্চল ধান ও পার্ট চাষের পক্ষে যথেষ্ট উপযুক্ত।



পশ্চিমবঙ্গের প্রধান ফসল ধান সম্পর্কে লেখো।

উত্তর: ভারতের ধান উৎপাদনে পশ্চিমবঙ্গের স্থান ভারতে প্রথম। পশ্চিমবঙ্গের মোট খাদ্যশস্যের প্রায় 91% ধান থেকে আসে।

উৎপাদকঅঞ্চল: পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমান, মুরশিদাবাদ, বীরভূম, বাঁকুড়া, নদিয়া, উত্তর 24 পরগনা, মালদহ, হাওড়া, হুগলি, পুরুলিয়া, দক্ষিণ 24 পরগনা, পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর, কোচবিহার, উত্তর দিনাজপুর, জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং, কালিম্পং, আলিপুরদুয়ার ইত্যাদি অঞ্চলে ধান চাষ করা হয়।

প্রকারভেদ : ঋতুর বৈচিত্র্য অনুসারে তিন প্রকার ধান চাষ হয়, যথা—

[i] আমন, [ii] আউস ও [iii] বোরো।

[i] আমন ধান : আমন ধান বর্ষার শেষে জুলাই মাসে রোপণ করা হয় আর নভেম্বর মাসে কাটা হয় | এই ধান পশ্চিমবঙ্গের সর্বত্র রোপণ করা হলেও বীরভূম ও বর্ধমানে আমন ধানের উৎপাদন অনেক বেশি হয়ে থাকে।

[ii] আউস ধান: এপ্রিল-মে মাসে আউস ধান রোপণ করা হয় এবং আগস্ট মাসে কাটা হয়।

[iii] বোরো ধান : বোরো ধান নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে রোপণ করা হয় এবং মার্চ-এপ্রিল মাসে কাটা হয়।



পশ্চিমবঙ্গের লোহা ও ইস্পাত শিল্পের উন্নতির কারণগুলি আলোচনা করো।

উত্তর: পশ্চিমবঙ্গের লোহা ও ইস্পাত শিল্প গড়ে ওঠার কারণগুলি হল—

1) ভৌগোলিক কারণ 

[i] কাঁচামালের সুবিধা: পশ্চিমবঙ্গে লোহা ও ইস্পাত শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল, যেমন— লোহা ও আকরিক (ঝাড়খণ্ড), কয়লা (রানিগঞ্জ), চুনাপাথর (বাঁকুড়া) ইত্যাদি যথেষ্ট পরিমাণে পাওয়া যায়।

[ii] জলের সহজলভ্যতা: লোহা ও ইস্পাত শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় জল দামোদর নদ ও দুর্গাপুর ব্যারেজ থেকে পাওয়া যায়।

[iii] শক্তিসম্পদের জোগান: মাইথন, পাতে ও তিলাইয়ার জলবিদ্যুৎ ও দুর্গাপুরের তাপবিদ্যুৎ পাওয়ার সুবিধা রয়েছে, যা শিল্প গড়ে তুলতে সাহায্য করে।

2) অর্থনৈতিক কারণ

[i] সুলভ শ্রমিক: পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড, বিহার ও দুর্গাপুরের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলি থেকে দক্ষ ও সুলভ শ্রমিক এখানে শিল্পন্নোতিতে সহায়তা করে।

[ii] উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা: এই শিল্পকেন্দ্রগুলি পূর্ব রেলপথ এবং গ্র্যান্ড ট্যাঙ্ক সড়কপথ দ্বারা কাঁচামাল উৎপাদক অঞ্চল ও বাজারের সাথে যুক্ত রয়েছে, যা এই শিল্পের উন্নতিতে সহায়তা করেছে |

[iii] চাহিদা বা বাজার : দুর্গাপুর-আসানসোল শিল্পাঞ্চল ও কলকাতা শিল্পাঞ্চলের চাহিদা এখানে শিল্পোন্নতিতে সাহায্য করেছে।



দুর্গাপুরকে ' ইস্পাত নগরী' বলা হয় কেন?

বর্ধমান জেলার দুর্গাপুর পশ্চিমবঙ্গের একটি আধুনিক শিল্পশহর। এটি পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম শিল্পশহর। এখানে লোহা ও ইস্পাত শিল্পের উন্নতির সাথে সাথে ইস্পাতজাত দ্রব্যের উৎপাদনও বৃদ্ধি পেয়েছে। দুর্গাপুরে ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পেরও ব্যাপক উন্নতি ঘটেছে। এখানে দুর্গাপুর স্টিল প্ল্যান্ট, অ্যালয় স্টিল প্ল্যান্ট, সেন্ট্রাল মেকানিক্যাল রিসার্চ ইন্সটিটিউট রয়েছে। এখানকার বৈদ্যুতিক চুল্লিতে সাধারণ ইস্পাতের সঙ্গে ক্রোমিয়াম ও নিকেল মিশিয়ে স্টেইনলেস স্টিল' তৈরি করা হয়। অ্যালয় স্টিল প্ল্যান্টে সংকর ইস্পাত তৈরি হয় জাপান ও কানাডার সহযোগিতায়। দুর্গাপুরে ইস্পাতকে কেন্দ্র করে একাধিক শিল্প ও প্রকল্প গড়ে ওঠায় একে ইস্পাত নগরী' বলে।



দুর্গাপুরকে 'ভারতের রূর' বলা হয় কেন?

উত্তর: জার্মানিতে রুর নামে রাইনের একটি উপনদী আছে। ব্লুর নদীর উপত্যকায় প্রচুর উন্নতমানের কয়লা পাওয়া যায়। ওই কয়লার ওপর নির্ভর করে রুর অঞ্চলে নানা ধাতুভিত্তিক শিল্পের বিকাশ ঘটায় এই সামগ্রিক অঞ্চলটি ব্লুর শিল্পাঞ্চল নামে পরিচিত।

পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলায় দামোদর নদীর উপত্যকা অঞ্চলেও পুর কয়লা পাওয়া যায় এবং ওই কয়লার ওপর নির্ভর করে দুর্গাপুরে লোহা ও ইস্পাত, সার, সিমেন্ট, ইঞ্জিনিয়ারিং প্রভৃতি নানা ধরনের শিল্প গড়ে উঠেছে। জার্মানির রুর অঞ্চলের সঙ্গে এই সাদৃশ্য দেখে অনেকে বর্ধমান জেলার দুর্গাপুরকে 'ভারতের রুর' বলেন।



টীকা লেখো-ISCO 

IISCO-এর সম্পূর্ণ নাম হল Indian Iron and Steel Company অবস্থান: বর্ধমান জেলার পূর্ব রেলপথের পাশে দামোদর নদের তাঁরে কুলটি এবং বার্নপুরে এই কারখানাটি অবস্থিত। কুলটি 1870 সালে এবং বার্নপুর 1919 সালে স্থাপিত হয়। দুটি কারখানাকে একত্রে IISCO বলা হয়।

গড়ে ওঠার কারণ: [1] নিকটবর্তী রানিগঞ্জ ও ঝরিয়া কয়লাখনি থেকে কয়লার প্রাপ্তি। [ii] ঝাড়খণ্ডের নোয়ামুণ্ডি, গুয়া এবং ওডিশার গোরুমহিষানী, বাদামপাহাড় থেকে লৌহ আকরিকের জোগান।[iii] ওডিশার বীরমিত্রপুরের চুনাপাথর এবং গাংপুর থেকে ম্যাঙ্গানিজ ও ডলোমাইটের প্রাপ্তির সুবিধা। [iv] দামোদর এবং বরাকর নদীর জলের সহজলভ্যতা। [v] দুর্গাপুর, মেজিয়ার তাপবিদ্যুতের সুবিধা। [vi] a ছাড়া সহজলভ্য, দক্ষ এবং স্থানীয় শ্রমিক, পরিবহণের সুবিধা, সংলগ্ন বাজার চাহিদা ইত্যাদি কারণেও এই লোহা ও ইস্পাত কেন্দ্রটি গড়ে উঠেছে। বর্তমানে এটি SAIL নামক সরকারি সংস্থার পরিচালনাধীন।



পশ্চিমবঙ্গের লোহা ও ইস্পাত শিল্পের সমস্যা ও সম্ভাবনাগুলি লেখো।

পশ্চিমবঙ্গের লোহা ও ইস্পাত শিল্পের সমস্যা—

আধুনিক প্রযুক্তির অভাব: অত্যাধুনিক প্রযুক্তির অভাবে পশ্চিমবঙ্গে লোহা ও ইস্পাত শিল্পে যথেষ্ট উন্নতি হয়নি |

প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাব: লোহা ও ইস্পাত শিল্পের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ভারতে পাওয়া যায় না। 

দক্ষ শ্রমিকের অভাব: পশ্চিমবঙ্গে শ্রমিক পাওয়া গেলেও দক্ষত্রমিকের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। এ ছাড়া বিস্তীর্ণ জমির অভাব, কোকিং কয়লার অভাব, মূলধনের অভাব, শ্রমিক অসন্তোষ, অধিক পরিবহণ ব্যয় প্রভৃতি হল পশ্চিমবঙ্গে লোহা ও ইস্পাত শিল্প বিকাশের প্রধান অন্তরায়। পশ্চিমবঙ্গে লোহা ও ইস্পাত শিল্পের সম্ভাবনা—স্বাধীনতার পর পশ্চিমবঙ্গে ইস্পাতের উৎপাদন বাড়ার তুলনায় চাহিদা অনেক বেশি বেড়েছে। পশ্চিমবঙ্গ থেকে এখন বিভিন্ন ধরনের ইস্পাত বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা প্রভৃতি দেশে রপ্তানি করা হয়। তবে শিল্পের সামগ্রিক অবস্থা পর্যালোচনা করে বলা যায়, ভারতে লোহা ও ইস্পাত শিল্প খুবই সম্ভাবনাময়। বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন অংশে যেসব লোহা ও ইস্পাত কারখানা নির্মাণের কাজ চলছে সেগুলি চালু হলে লোহা ও ইস্পাতের উৎপাদন বাড়বে বলে অনুমান করা হয়।



পশ্চিমবঙ্গে পাটশিল্পের উন্নতির কারণগুলি আলোচনা করো। অথবা, হুগলি নদীর উভয়তীরে গাটশিল্প গড়ে ওঠার কারণগুলি কী কী?  

উত্তর: পশ্চিমবঙ্গে পাটশিল্পের উন্নতির কারণগুলি হল—

ভৌগোলিক কারণ

[i] কাঁচামালের সহজলভ্যতা : পাটশিল্পের প্রধান কাঁচামাল হল কাঁচা পাট, যা পশ্চিমবঙ্গের গাঙ্গেয় সমভূমি অঞ্চলে সহজেই পাওয়া যায়। মূলত পাটের সহজলভ্যতার জন্যই এখানে পাটকল গড়ে উঠেছে।

[ii] অনুকূল জলবায়ু: পশ্চিমবঙ্গে আর্দ্র জলবায়ু পাট উৎপাদনের জন্য আদর্শ, যা পাটশিল্পের উন্নতিতে সাহায্য করেছে।

[iii] শক্তিসম্পদের সহজলভ্যতা: রানিগঞ্জ এর কয়লা খনি থেকে পাটকলের জন্য প্রয়োজনীয় কয়লা পাওয়া যায়। এ ছাড়া DVC-র জলবিদ্যুৎ ও স্থানীয় বহু তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ পাওয়া যায়।

অর্থনৈতিক কারণ

[i] উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা: কাচামাল আনা এবং উৎপাদিত পণ্য বাজারজাতকরণের জন্য উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রয়োজন। এই অঞ্চলটি রেলপথ, জলপথ ও সড়কপথের মাধ্যমে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত, যা শিল্পোন্নতির সহায়ক।

[ii] সুলভ শ্রমিক: পশ্চিমবঙ্গ ও তার পার্শ্ববর্তী রাজ্য যেমন—বিহার, ঝাড়খণ্ড এবং ওড়িশা প্রভৃতি থেকে সুলভ শ্রমিকের জোগান পাওয়া যায়, যা এই অঞ্চলের পাটশিল্পের উন্নতিতে সহায়তা করেছে।

[iii] বন্দরের সুবিধা: পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্গত কলকাতা বন্দরের নৈকট্যের কারণে এখানে পাটজাত দ্রব্য রপ্তানি এবং বিদেশ থেকে যন্ত্রপাতি আনার সুবিধা রয়েছে ।



পশ্চিমবঙ্গের পাটশিল্পের সমস্যা ও সম্ভাবনাগুলি আলোচনা করো। অথবা, পাটশিল্পের পুনরুজ্জীবনের জন্য কী কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?

উত্তর: পশ্চিমবঙ্গের পাটশিল্পের সমস্যা—

বাজারে বিকল্প তন্তুর আগমন: কাপড়ের থলে, কাগজের ব্যাগ পলিথিন, প্লাস্টিক প্রভৃতি বাজারে আসার ফলে পাটের প্রয়োজনীয়তা কমে গেছে।

পুরোনো যন্ত্রপাতি: পশ্চিমবঙ্গের পাটকলগুলি ইংরেজ আমলে চালু হয়েছে। সেই সময় থেকে ব্যবহৃত পুরোনো যন্ত্রপাতির যথাযথ আধুনিকীকরণ হয়নি।

রপ্তানি যুদ্ধের উচ্চহার: পাটজাত দ্রব্য রপ্তানি করার জন্য সরকারকে খুব বেশি শুল্ক দিতে হয়। এজন্য পাটজাত দ্রব্যের দাম বেড়ে যায়। পশ্চিমবঙ্গে পাটশিল্পের সম্ভাবনা— পশ্চিমবঙ্গ পাটশিল্পের ক্ষেত্রে নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। পুরোনো যন্ত্রপাতি, বিকল্প তত্ত্ব ইত্যাদি সমস্যাগুলির অবসান ঘটিয়ে উন্নত পাট চাষ, যন্ত্রাংশের আধুনিকীকরণ ইত্যাদি দ্বারা সমস্যার সমাধান করা যায়। পাটজাত দ্রব্য যেহেতু সস্তা এবং বৈদেশিক মুদ্ৰা অর্জনকারী শিল্প এবং এই শিল্প কোনোরকম দূষণ ঘটায় না, তাই এর জাতীয়করণ করলে আর্থিক ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হবে বলে অনুমান করা যায়।



হাওড়াকে ‘ভারতের গ্লাসগো' বলা হয় কেন?

হাওড়া জেলার সদর হল শহর হাওড়া। কলকাতা শহরের বিপরীতে ভুগলি নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত এ রাজ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর হাওড়া। এই শহরটি হুগলি শিল্পাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পশহর। এখানে পাটশিল্প, ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প, বস্ত্রবয়ন ও অন্যান্য শিল্পের অনেকগুলি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র রয়েছে। ইংল্যান্ডের গ্লাসগো শহরের মতো অসংখ্য ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পকেন্দ্র থাকার জন্য এই শহরকে ‘ভারতের গ্লাসগো' বলা হয়।



হুগলি শিল্পাঞ্চলের কুমাবনতি ঘটছে—এরূপ বলার কারণ লেখো।

উত্তর: চুগলি শিল্পাঞ্চল একসময় দেশের সর্বশ্রেষ্ঠ শিল্পাঞ্চল ছিল। কিন্তু বর্তমানে এর ক্রমাবনতি ঘটে চলেছে। এর প্রধান কারণগুলি হল— 1)  হুগলি শিল্পাঞ্চল পাটশিল্পকে কেন্দ্র করেই উন্নতি লাভ করেছিল। সেই পাটশিল্পই এখন অনেক সমস্যার সম্মুখীন। 2) কলকাতা বন্দরের অবনমন ও হুগলি নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ার কারণেও এই শিল্পাঞ্চল দুর্দশাগ্রস্ত। 3) কলকাতাসহ হুগলি শিলাঞ্চলটি অত্যন্ত ঘনবসতিযুক্ত এবং নতুন কলকারখানা স্থাপনের জন্য জমির অভাব তীব্র। 4) চাহিদার তুলনায় বিদ্যুতের জোগানের স্বল্পতাও এই শিল্পাঞ্চলের অবনতির অন্যতম কারণ। 5) শ্রমিক অসন্তোষ, বিশেষত মালিকপক্ষের সঙ্গে শ্রমিক ইউনিয়নের সমস্যা ও তাতে রাজনৈতিক দলের হস্তক্ষেপও উল্লেখযোগ্য। 6) শিল্পপতিদের মূলধন বিনিয়োগে অনীহা, সরকারি নীতি, পরিকাঠামোগত সমস্যা ইত্যাদির জন্য হুগলি শিল্পাঞ্চলের কুমাবনতি ঘটে চলেছে।



পশ্চিমবঙ্গের চা শিল্পের উন্নতির কারণ আলোচনা করো।

উত্তর: পশ্চিমবঙ্গের চা শিল্পের উন্নতির কারণগুলি হল—

1)ভৌগলিক কারণ

[i] কাঁচামাল পশ্চিমবঙ্গে চা শিল্পের কাচামাল পর্যাপ্ত পরিমাণে‌ পাওয়া যায়।

[ii] শক্তিসম্পদের সহজলভ্যতা : চা শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তিসম্পদ পশ্চিমবঙ্গে পর্যাপ্ত পরিমাণে রয়েছে।

[iii] অনুকূল জলবায়ু পশ্চিমবঙ্গে চা শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় জলবায়ু থাকায় এখানে চা শিল্প উন্নতি লাভ করেছে।

[iv] জলসম্পদের প্রাচুর্য পশ্চিমবঙ্গে শিল্প গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় জলের পর্যাপ্ত জোগান রয়েছে।

2) অর্থনৈতিক কারণ

পশ্চিমবঙ্গে শিল্প উন্নতির অর্থনৈতিক কারণগুলি হল— 

[i] পরিবহণ ব্যবস্থার উন্নতি: পশ্চিমবঙ্গে পরিবহণ ব্যবস্থা যথেষ্ট উন্নত তাই এখানে চা শিল্প যথেষ্ট উন্নতি লাভ করেছে।

[ii] সুলভ শ্রমিক : সর্বাধিক জনঘনত্বপূর্ণ রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে চা শিল্পের জন্য পর্যাপ্ত শ্রমিক পাওয়া যায়।

[iii] চাহিদা বা বাজার: পশ্চিমবঙ্গে চা শিল্পের যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে, যা এই শিল্পকে উন্নতির পথে চালিত করেছে |



পশ্চিমবঙ্গে চা শিল্পের সমস্যা ও সম্ভাবনা আলোচনা করো।

উত্তর: পশ্চিমবঙ্গে চা শিল্পের সমস্যা — পশ্চিমবঙ্গ চা শিল্পে সমৃদ্ধ হলেও এই শিল্পের বেশ কিছু সমস্যা রয়েছে। 

রুগণ চা বাগান: পশ্চিমবঙ্গে চা বাগানগুলি বহু প্রাচীন হওয়ায় এইগুলিতে ফসল উৎপাদন কম হয়।

বিকল্প পানীয়: বর্তমানে বিকল্প পানীয়ের আমদানি হওয়ায় চা শিল্পের প্রয়োজনীয়তা কমে গেছে।

দক্ষ শ্রমিকের অভাব: পশ্চিমবঙ্গে চা শিল্পের জন্য প্রচুর শ্রমিক পাওয়া গেলেও দক্ষ শ্রমিকের পরিমাণ কম।

আধুনিক প্রযুক্তির অভাব: অত্যাধুনিক প্রযুক্তির অভাবে পশ্চিমবঙ্গের চা শিল্পের গুণগতমান হ্রাস পেয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গে চা শিল্পের সম্ভাবনা—চা উৎপাদনে পশ্চিমবঙ্গ ভারতের মধ্যে দ্বিতীয় স্থানের অধিকারী হলেও বর্তমানে চা শিল্প নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। পুরোনো যন্ত্রপাতি, অধিক উৎপাদন ব্যয় ইত্যাদি সমস্যাগুলি চা শিল্পের উন্নয়নের গতিকে স্তব্ধ করে দিচ্ছে। সেইজন্য চা বাগিচার উন্নতি, চা বাগিচার সম্প্রসারণ, উৎপাদন ব্যয় হ্রাস প্রভৃতি ব্যবস্থা গ্রহণ করলে পশ্চিমবঙ্গ চা শিল্পে অনেক উন্নতি করতে পারবে।



দার্জিলিং পার্বত্য অঞ্চল ভারী শিল্পে অনুন্নত যুক্তিসহ ব্যাখ্যা করো।

উত্তর: পশ্চিমবঙ্গের উত্তর সীমায় অবস্থিত দার্জিলিং জেলার পার্বত্য অঞ্চলে ভারী শিল্পের অনুন্নতির প্রধান কারণগুলি হল— 1) পার্বত্য অঞ্চলের ভূমিরূপ বন্ধুর হওয়ায় তা ভারী শিল্প গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অসুবিধাজনক। 2) ভূমিরূপের কধুরতার জন্য পরিবহণ ব্যবস্থাও আশানুরূপভাবে গড়ে ওঠেনি। ফলে অনুন্নত পরিবহণ ব্যবস্থাও শিল্পোন্নতির পক্ষে বাধাস্বরূপ। 3) দার্জিলিং পার্বত্য অঞ্চলে খনিজ পদার্থও তেমনভাবে পাওয়া যায় না, এটি ভারী শিল্পের বিকাশের অন্যতম বাধা। 4) এ ছাড়াও বিদ্যুৎ বা শক্তিসম্পদের অভাব, শ্রমিকের অভাব, পরিকাঠামোগত সমস্যা, স্থানাভাব, ভূমিধসের সমস্যা ইত্যাদি কারণে দার্জিলিং পার্বত্য অঞ্চলে ভারী শিল্পের বিকাশ ঘটেনি।



পশ্চিমবঙ্গে খাদ্যপ্রক্রিয়াকরণ শিল্পের উন্নতির কারণ আলোচনা করো। 

উত্তর: মানবসভ্যতার ইতিহাসে যেসব শিল্পকে অতি প্রাচীন বলা হয়, সেগুলির মধ্যে অন্যতম খাদ্যপ্রক্রিয়াকরণ শিল্প | এর কারণ হল বহুদিন আগে থেকেই মানুষ মাছ, মাংস, সবজি ইত্যাদি সরাসরি না খেয়ে নানা ধরনের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে খাদ্যোপযোগী করে তারপর সেগুলিকে ব্যবহার করেছে। তবে, বর্তমানে খাদাপ্রক্রিয়াকরণের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে গেছে। এই রাজ্যের কলকাতা, বারাসত, মালদহ, শংকরপুর, বর্ধমান, দমদম ইত্যাদি অঞ্চলে প্লুরে খাদপ্রক্রিয়াকরণ শিল্প গড়ে উঠেছে।

পশ্চিমবঙ্গে খাদ্যপ্রক্রিয়াকরণ শিল্পের উন্নতির কারণগুলি হল

উন্নতমানের কাঁচামালের জোগান: খাদপ্রভিয়ার শিল্পের বেশিরভাগ কাঁচামাল হল নানা ধরনের কৃষিজ, (দানাশস্য, সবজি) পণুজাত ও সমুদ্রজাত দ্রব্য। এইসব কঁচামালের পর্যাপ্ত জোগান পশ্চিমবঙ্গে রয়েছে, যা এই শিল্পের উন্নতিতে সাহায্য করেছে।

উচ্চ ক্রয়ক্ষমতা: প্রক্রিয়াকরণের জন্য খাদ্যসামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধি পায়। তাই এসব পণ্যের চাহিদা সৃষ্টির জন্য অধিবাসীদের কুরক্ষমতা বেশি হওয়া প্রয়োজন, যা পশ্চিমবঙ্গের যথেষ্ট সংখ্যক জনগণের রয়েছে।

উন্নত প্রযুক্তিবিদ্যা: অধিকাংশ খাদ্যসামগ্রীই দ্রুত পচনশীল। তাই সঠিক প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে সেগুলির গুণমান অঙ্কুঞ্জ রেখে দীর্ঘদিনের জন্য খাদ্যোপযোগী করে রাখার যথেষ্ট উন্নত প্রযুক্তি পশ্চিমবঙ্গে রয়েছে, যা এই শিল্পের উন্নতিতে সহায়ক হয়েছে।

উন্নত পরিবহণ ব্যাবস্থা: মাছ, মাংস, ফল ইত্যাদি যাতে নষ্ট না হয় তাই সেগুলি দ্রুত সংগ্রহ করে প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রে পাঠানোর জন্য পরিবহণ ব্যবস্থার উন্নতির প্রয়োজন, যা পশ্চিমবঙ্গে রয়েছে।

খাদ্যরুটি: পশ্চিমবঙ্গের অধিবাসীদের মধ্যে খাদ্য হিসেবে কলকারখানার প্রক্রিয়াজাত খাদ্যসামগ্রীর ব্যবহার যথেষ্ট বেশি। 

সরকারি নীতি: পশ্চিমবঙ্গে খাদ্যপ্রক্রিয়াকরণের ক্ষেত্রে অনুকূল সরকারি নীতি এই শিল্পের বিকাশে সাহায্য করেছে।



পশ্চিমবঙ্গের খাদ্যপ্রক্রিয়াকরণ শিল্পের সমস্যা ও সম্ভাবনা আলোচনা করো।

উত্তর: পশ্চিমবঙ্গে খাদ্যপ্রক্রিয়াকরণ শিল্পের সমস্যা— পশ্চিমবঙ্গ খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পে সমৃদ্ধ হলেও এই শিল্পের বেশ কিছু সমস্যা রয়েছে।

ফসল সংগ্রহের পর ক্ষতি: পশ্চিমবঙ্গে কৃষিজ ফসলের চাষ, ফসল সংগ্রহ ও পরবর্তী ব্যবস্থাপনা এই তিনটি ক্ষেত্রের কোনোটির সঙ্গে কোনোটির সংগতি নেই। তাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে কৃষকরা চাহিদা অনুযায়ী চাষ করে না।

উন্নত প্রযুক্তির অভাব: খাদ্যপ্রক্রিয়াকরণের জন্য উন্নত দেশগুলিতে যে ধরনের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয় তা পশ্চিমবঙ্গে নেই।

যথোপযুক্ত সংরক্ষণাগারের অভাব: পশ্চিমবঙ্গে ফসল সংরক্ষণের যথোপযুক্ত ব্যবস্থা না থাকায় প্রচুর ফসল নষ্ট হয়। পশ্চিমবঙ্গে খাদ্যপ্রক্রিয়াকরণ শিল্পের সম্ভাবনা—পশ্চিমবঙ্গে খাদ্যপ্রক্রিয়াকরণ শিল্পের গুরুত্ব সীমাহীন। এই কারণে খাদ্যপ্রক্রিয়াকরণ শিল্পের উন্নতির জন্য কতকগুলি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। যেমন—ফুড পার্ক নির্মাণ, কোল্ড স্টোরেজ গঠন, বিভিন্ন কেন্দ্রীয় প্রকল্প গঠন, কাঁচামাল সংরক্ষণে সচেতনতা, দূষণের নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি যার ফলে পশ্চিমবঙ্গে খাদ্যপ্রক্রিয়াকরণের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা উজ্জ্বল হবে।



পশ্চিমবঙ্গে পর্যটন শিল্পকেন্দ্র গড়ে ওঠার কারণগুলি লেখো। 

উত্তর: পশ্চিমবঙ্গে পর্যটন শিল্পকেন্দ্র গড়ে ওঠার কারণগুলি হল— প্রকৃতিক কারণ, সাংস্কৃতিক কারণ।

1) প্রাকৃতিক কারণ : পর্যটন শিল্পকেন্দ্র গড়ে ওঠার প্রাকৃতিক কারণগুলি হলো -

[i] পার্বত্য অঞ্চল : পার্বত্য অঞ্চলের মনোরম আবহাওয়া উপভোগ করার জন্য ভ্রমণপিপাসু মানুষদের পার্বত্য অঞ্চলের পর্যটন শিল্পকেন্দ্রগুলি বিশেষ পছন্দ | যেমন—দার্জিলিং পার্বত্য অঞ্চল।

[ii] সমুদ্র সৈকত : সমুদ্রের উপকূল অঞ্চলের সমভাবাপন্ন আবহাওয়া উপভোগ করার জন্য মানুষ এই এলাকার পর্যটন শিল্পকেন্দ্রগুলিতে ভ্রমণে যায়। যেমন—পশ্চিম মেদিনীপুরের সমুদ্র সৈকত দিঘা। 

[iii] মালভূমি অঞ্চল: মালভূমি অঞ্চলে বা লালমাটির দেশে বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র গড়ে ওঠে। যেমন—বাঁকুড়া, বীরভূম |

[iv] অরণ্য : অরণ্যে বিভিন্ন প্রাণীর এবং উদ্ভিদের সমাগম লক্ষণীয় | তাই

অরগ্যকে কেন্দ্র করে পর্যটনকেন্দ্র গড়ে ওঠে। যেমন—উত্তর ও দক্ষিস 24 পরগনার সুন্দরবন। 

2) সাংস্কৃতিক কারণ: পর্যটনকেন্দ্র গড়ে ওঠার সাংস্কৃতিক কারণগুলি হলো -

[i] ঐতিহাসিক স্থান: ঐতিহাসিক স্থানের গুরুত্ব পর্যবেক্ষণ করার জন্য গড়ে ওঠে ঐতিহাসিক পর্যটনকেন্দ্র। যেমন—মুরশিদাবাদের পলাশী।



পশ্চিমবঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের সমস্যা ও সম্ভাবনা সম্পর্কে লেখো।

পশ্চিমবঙ্গের তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের সমস্যা—

জমির সমস্যা : কলকাতা এবং তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে বর্তমানে তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পক্ষেত্র গড়ার জন্য জমির অভাব দেখা দিয়েছে। অথবা যে জমি পাওয়া যাচ্ছে তার দাম আকাশ ছোঁয়া।

পরিকাঠামোর অভাব: এখনও এ রাজ্যে শিল্পস্থাপনের সব পরিকাঠামো ঠিকমতো গড়ে ওঠেনি। 

সম্ভাবনা— 1) রাজারহাটে 41টি ছোটো এবং মাঝারি মাপের কোম্পানির জন্য 1 একর থেকে 25 বিঘা জমির বন্দোবস্ত করা গেছে। 2) ভারত সরকারের গৃহীত ‘পূর্বদিকেতাকাও’ নীতির ফলে পশ্চিমবঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পে উন্নয়নের সম্ভাবনা প্রবল। 3) কলকাতায় তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (Special Economic Zone-SEZ) নির্মাণ করা হয়েছে।



পশ্চিমবঙ্গে শহর গড়ে ওঠার ভিত্তিপুজি কী কী?

পশ্চিমবঙ্গ ভারতের দ্বিতীয় জনঘনত্বযুক্ত রাজ্য। এই রাজ্যে শহর গড়ে ওঠার প্রধান ভিত্তিগুলি হল—  1) শিক্ষা-সংস্কৃতির কেন্দ্রকে ভিত্তি করে প্রচুর লোকের সমাগমের ফলে শহর গড়ে উঠেছে। যেমন— শান্তিনিকেতন। 2) পর্যটক এবং পর্যটন শিল্পকে কেন্দ্র করে হোটেল, রেস্টুরেন্ট, লজ ইত্যাদি এবং লোকসমাগমের জন্যও শহর গড়ে ওঠে। যেমন- দার্জিলিং, মিরিক প্রভৃতি। 3) ব্যাবসাবাণিজ্য এবং বাজার প্রভৃতিকে কেন্দ্র করে সর্বাপেক্ষা বেশি লোকসমাগম ঘটে এবং শহর গড়ে ওঠে। যেমন- রাজধানী শহর কলকাতা। 4) শিল্পকে ভিত্তি করে বহু মানুষের কর্মসংস্থান ঘটে এবং বাজার-ঘাট প্রসারিত হয় এবং শহর গড়ে ওঠে। যেমন– আসানসোল। 5) অনেকসময় ঘনিকে কেন্দ্র করেও শহর গড়ে উঠতে পারে। যেমন— রানিগঞ্জ কয়লাখনিকে কেন্দ্র করেও শহর গড়ে উঠেছে।



কলকাতা ও হাওড়াকে যমজ শহর বলা হয় তার কারণ ব্যাখ্যা করো।

উত্তর: হুগলি নদীর দুই তীরে পশ্চিমবঙ্গের দুটি প্রধান এবং গুরুত্বপূর্ণ শহর কলকাতা ও হাওড়া অবস্থিত। হুগলি নদীর পূর্ব তীরে কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী এবং ঠিক তার বিপরীতে পশ্চিমতীরে অবস্থিত হাওড়া হল প্রধান শিল্পশহর। এই দুটি শহরকে রবীন্দ্রসেতু (হাওড়া ব্রিজ) এবং বিদ্যাসাগর সেতু জুড়েছে। দুটি শহরের মধ্যে মানুষের যাতায়াত অবাধ। কলকাতা হল ব্যাবসাবাণিজ্য, রাজনীতি এবং সংস্কৃতির কেন্দ্রস্থল। অন্যপ্রান্তে হাওড়া ইংল্যান্ডের গ্লাসগোর মতো অসংখ্য ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে অবস্থান করছে | একারণে কলকাতা এবং হাওড়া একে অপরের পরিপূরক। তাই এদের যমজ শহর বলে।



শিলিগুড়িকে উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রবেশদ্বার বলে কেন?

মহানন্দা নদীর তীরে পর্বত ও সমভূমির সংযোগস্থলে অবস্থিত শিলিগুড়ি শহরটি উত্তরবঙ্গের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শহর। এই শহরের ওপর দিয়েই 31 নং এবং 34 নং (পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘতম সড়কপথ) জাতীয় সড়কপথ প্রসারিত হয়েছে | 31 নং জাতীয় সড়ক বিহার, পশ্চিমবঙ্গ এবং অসমের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে। এই শহরের ওপর দিয়েই প্রসারিত রেল ও সড়কপথের মাধ্যমে অরুণাচলপ্রদেশ, নাগাল্যান্ড, মিজোরাম, মণিপুর, ত্রিপুরা প্রভৃতি রাজ্যগুলির সাথে সুযোগাযোগ গড়ে উঠেছে। তাই শিলিগুড়িকে উত্তর পূর্ব ভারতের প্রবেশদ্বার বলে।



সুন্দরবন অঞ্চলকে অনুন্নত বা পিছিয়ে পড়া অঞ্চল বলা হয় কেন?

উত্তর: সুন্দরবন অঞ্চলকে অনুন্নত বা পিছিয়ে পড়া অঞ্চল বলা হয় কারণ— 

কৃষির সমস্যা : এই অঞ্চলে লবণাক্ত মাটি, কৃষি জমির অভাব, প্রাচীন প্রথায় চাষবাসের কারণে কৃষিকাজ লাভজনক নয়।

খনিজ সম্পদের অভাব : সুন্দরবন অঞ্চলে এখনও কোনো খনিজ সম্পদের সন্ধান পাওয়া যায়নি | তাই খনিজভিত্তিক কোনো ক্রিয়াকলাপ এখানে গড়ে ওঠেনি।

অনুন্নত পরিবহণ ব্যবস্থা: অঞ্চলটি নদীবেষ্টিত বলে স্খল পরিবহপ তথা সড়ক এবং রেল পরিবহণে খুবই অনুন্নত। কেবল লঞ্চ এবং নৌকার মাধ্যমে জলপথে যোগাযোগ ও পরিবহণ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।

বিদ্যুৎ শক্তির অভাব: সুন্দরবনে বিদ্যুৎ শক্তি সরবরাহের পরিমাণ খুবই কম, এমনকি বেশকিছু দ্বীপ এখনও বিদ্যুতের আলো থেকে বঞ্ঝিত | ফলে ছোটোখাটো শিল্পেরও উন্নতি হয়নি।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ : সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, নদীর বাঁধ ভেঙে জলপ্রবেশ প্রভৃতি কারণে এখানে প্রায়ই জীবন এবং সম্পত্তিহানি ঘটে।



গাঙ্গেয় বদ্বীপ অঞ্চল ঘনবসতিপূর্ণ হওয়ার কারণ কী? 

উত্তর: গঙ্গার বদ্বীপ পশ্চিমবঙ্গের সর্বাধিক জনবসতিপূর্ণ অঞ্চল। লোকবসতির এত ঘনত্ব ভারত তথা বিশ্বের খুব কম জায়গাতেই দেখা যায়। এরূপ ঘনবসতির কারণগুলি হল -

সমতল ভূপ্রকৃতি : এখানকার সমতল ভূপ্রকৃতি কৃষিকাজ করার জন্য এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার পক্ষে আদর্শ |

সমভাবাপন্ন জলবায়ু : এখানকার জলবায়ু সমভাবাপন্ন এবং বৃষ্টিপাত পরিমিত বলে জনবসতির ঘনত্ব বেশি। 

উর্বর পলিমৃত্তিকা : বদ্বীপ অঞ্চলের মাটি পলি দিয়ে গঠিত এবং অত্যন্ত উর্বর, যা কৃষির সহায়ক।

উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা: এই বদ্বীপ অঞ্চলের ওপর দিয়ে জলপথ রেলপথ, জাতীয় এবং রাজ্য সড়কপথ, জেলা সড়কপথ বিস্তৃত যা উন্নত পরিবহণে সাহায্য করে। 

জীবিকানির্বাহের সুবিধা : বদ্বীপ অঞ্চলটি কৃষি এবং শিল্প উভয়েই উন্নত। ফলে মানুষের জীবিকা অর্জনের সুবিধা রয়েছে।



সুন্দরবন অঞ্চলে লোকবসতি কম কেন?

উত্তর: সুন্দরবন অঞ্চলের বেশিরভাগ দ্বীপের লোকবসতি কম। আবার বহু দ্বীপ আছে যেখানে কোনো লোকবসতিই নেই। এর কারণ –  1) এখানে কৃষিযোগ্য জমির পরিমাণ খুব কম। 2) এখানকার মাটি লবণাক্ত বলে কৃষিজ ফসলের উৎপাদন খুব কম হয়। 3) কৃষিতে জলসেচের সুবিধা খুবই সীমিত, তাই একবারের বেশি চাষ করা প্রায় অসম্ভব। 4) যোগাযোগ এবং পরিবহণ ব্যবস্থা অনুন্নত এবং প্রাচীন। দ্রুতগামী যানবাহনের অভাব জনবসতি কম হওয়ার অন্যতম কারণ। 5) অঞ্চলটিতে তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য শিল্পের বিকাশ ঘটেনি। 6) প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বিশেষ করে ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার প্রাদুর্ভাব বেশি। 7) কীটপতঙ্গের প্রাদুর্ভাব, সাপের উপদ্রব, এমনকি বন্যজন্তু বা বাঘের হঠাৎ উপস্থিতির কারণে জনবসতি কম |



হলদিয়ায় বন্দর গড়ে ওঠার কারণগুলি লেখো।

উত্তর: হলদিয়ায় বন্দর গড়ে ওঠার কারণগুলি হল—

কলকাতা বন্দরের সাহায্যকারী বদর : হুগলি নদীর নাব্যতা হ্রাসজনিত কারণে বড়ো জাহাজগুলির কলকাতা বন্দরে প্রবেশ করতে অসুবিধা হয়| সেকারণে হুগলি-হলদি নদীর মিলনস্থলে কলকাতা বন্দরের সহায়ক বন্দর হিসেবে হলদিয়া বন্দর গড়ে তোলা হয়েছে।

জমির সহজলভ্যতা: হলদিয়ায় বন্দরের পরিকাঠামো গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় জমি সহজলভ্য হওয়ায় হলদিয়া বন্দর গড়ে উঠেছে। 

বাণিজ্যিক চাহিদা পূরণ: খনিজ তেল শোধন, পেট্রোরসায়ন শিল্প প্রভৃতি বড়ো বড়ো শিল্পগুলির প্রয়োজনীয় কাচামাল আমদানি করা ও উৎপাদিত পণ্য বিদেশে রপ্তানি করার প্রয়োজনীয়তা হলদিয়া বন্দরের উন্নতিতে সাহায্য করেছে।



কলকাতা বন্দরের ক্রম অবনতি ঘটে চলেছে কেন?

কলকাতা একসময় ভারতের শ্রেষ্ঠ বন্দর হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু বর্তমানে ক্রমাগত কলকাতা বন্দরের গুরুত্ব হ্রাস পাচ্ছে | এর কারণগুলি হল—

ভাগীরথী-হুগলি নদীর নাব্যতা হ্রাস : নিয়মিতভাবে প্রচুর পরিমাণে পলি, বালি প্রভৃতি নদীবক্ষে সঞ্চিত হওয়ার ফলে ভাগীরথী-হুগলি নদীর নাব্যতা ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। ফলে বড়ো জাহাজগুলির কলকাতা বন্দরে প্রবেশ করতে অসুবিধা হচ্ছে। 

হুগলি নদীর আঁকাবাঁকা গতিপথ : মোহানা থেকে কলকাতা বন্দর পর্যন্ত হুগলি নদীতে অসংখ্য বাঁক আছে। এগুলি বড়ো জাহাজ চলাচলের পক্ষে অসুবিধাজনক।

অন্যান্য কারণ : পারাদীপ, বিশাখাপত্তনম, হলদিয়া প্রভৃতি একাধিক নতুন বন্দর সৃষ্টি হওয়ার ফলে কলকাতার পশ্চাদৃভূমির পরিধি অনেক হ্রাস পেয়েছে। এ ছাড়া অতিরিক্ত শুল্কহার, শ্রমিক অসন্তোষ প্রভৃতি কারণেও কলকাতা বন্দরের গুরুত্ব ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে।



পশ্চিমবঙ্গে পর্যটনশিল্পের সমস্যা ও সম্ভাবনা সম্পর্কে লেখো। অথবা, সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও অন্যান্য রাজ্য অপেক্ষা পশ্চিমবঙ্গ পর্যটনে অনেকটাই পিছিয়ে—কারণসহ লেখো।

উত্তর: পশ্চিমবঙ্গে পর্যটন শিল্পের সমস্যা—

পরিকল্পনার অভাব : পশ্চিমবঙ্গের পর্যটন শিল্পের পরিকাঠামো অত্যন্ত অনুন্নত । রাস্তাঘাট, বাসস্থান, যোগাযোগব্যবস্থা প্রভৃতির অভাব এই শিল্পের অন্যতম সমস্যা।

নিরাপত্তার অভাব : পর্যটন কেন্দ্রগুলিতে নিরাপত্তাজনিত সমস্যা অত্যন্ত প্রকট। বিশেষ করে বিদেশি পর্যটকদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল।

রক্ষণাবেক্ষণের অভাব: প্রাচীন স্থাপত্য, ঐতিহ্যগুলি রক্ষণাবেক্ষপের অভাবে ধবংসপ্রাপ্ত হচ্ছে। এতে পর্যটনশিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে | পশ্চিমবঙ্গের পর্যটন শিল্পের ভবিষ্যৎ বেশ সম্ভাবনাময় | এই শিল্পের উন্নতিকল্পে অনেক পরিকল্পনা গৃহীত হয়েছে, যেমন—

পর্যটন মেলা : প্রতি বছর কলকাতায় পর্যটন মেলার অয়োজন করা হচ্ছে | যাতে দেশি-বিদেশি পর্যটকরা এ রাজ্য সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে ওঠে।

নতুন পর্যটনকেন্দ্র : পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্থানে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে নতুন নতুন স্থান খোঁজা হচ্ছে। যাতে পর্যটকদের কাছে তা আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।

উন্নত পরিকাঠামো নির্মাণ: রাজ্য সরকারের সহযোগিতায় পর্যটন কেন্দ্রগুলির সাথে বড়ো বড়ো শহরগুলির সুযোগাযোগ ও পরিবহণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে। বিভিন্ন স্থানে নতুন নতুন হোটেল, রিসর্ট নির্মাণ করা হচ্ছে।



পশ্চিমবঙ্গের একটি পর্যটনকেন্দ্রের পরিচয় দাও।

উত্তর: পশ্চিমবঙ্গের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্র হল দার্জিলিং। এটি পূর্ব হিমালয়ের কোলে অবস্থিত একটি শৈলশহর| কাঞ্চনজঙ্ঘার সূর্যোদয় দেখার জন্য দর্জিলিং-এর টাইগার হিল বিখ্যাত | দার্জিলিং-এর প্রাণকেন্দ্র হল ম্যাল| এ ছাড়াও ভারতের ঐতিহ্যপূর্ণ টয়ট্রেনও এখানে আছে। আবার দার্জিলিংকে কেন্দ্র করে কার্সিয়াং, মিরিক ইত্যাদি স্থানও বেড়িয়ে আসা যায়। সমতলভূমি থেকে পাহাড়ে ওঠার পথে বনের শোভা এবং নানান পাখিদের কলরব মনে রাখার মতো। বসন্তকাল এবং গ্রীষ্মকাল এখানে বেড়াতে আসার সেরা সময়।