ভূগোলক বা গ্লোব কী? এর প্রয়োজনীয়তা লেখো।
উত্তর: ভূগোলক বা গ্লোব হল পৃথিবীর প্রকৃত ক্ষুদ্র সংস্করণ বা প্রতিরূপ। অর্থাৎ, বাস্তব বা প্রকৃত পৃথিবীকে আনুপাতিক হারে ছোটো করে ভূগোলক আকা হয়। তাই একে পৃথিবীর ক্ষুদ্র প্রতিরূপ বলে।
গ্লোব-এর প্রয়োজনীয়তা– 1) গ্লোব দেখে পৃথিবীর সামগ্রিক রূপ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। 2) গ্লোব দেখে ফেল সম্পর্কে ধারণা জন্মায়। 3) পৃথিবীর সাগর, মহাসাগর, মহাদেশ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা গড়ে ওঠে। 4) গ্লোবের ঘূর্ণন পৃথিবীর আবর্তন গতি সম্পর্কে ধারণা দেয়।
মানচিত্রের প্রয়োজনীয়তা কতখানি?
উত্তর: মানচিত্র হল মানচিত্রের প্রয়োজনীয়তা অসীম। সেগুলি হল—
1) সর্বজনীন: মানচিত্র কেবল যে ভূগোলবিদদের প্রয়োজন তা নয়। মানচিত্র নানা পেশার মানুষ ব্যবহার করতে পারেন। সেকারণে মানচিত্র সর্বজনীন।
2) ভৌগোলিকদের মূল চাবিকাঠি: ভূগোলবিদদের কাছে মানচিত্র এক গুরুত্বপূর্ণ চাবিকাঠি। এর সাহায্যেই পৃথিবীর যে কোনো স্থানের সম্পর্কে ভৌগোলিকের ধারণা পরিষ্কার হয়।
3) প্রশাসনিক কাজকর্ম: নানা প্রশাসনিক কাজকর্মে মানচিত্র আবশ্যিক, খাজনা সংগ্রহে মৌজা মানচিত্রের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
পরিমাণবাচক মানচিত্রগুলি কী কী?
পরিমাণবাচক মানচিত্র নানাপ্রকার হয়—
সমমানরেখা মানচিত্র: সমান মানবিশিষ্ট স্থানগুলিকে যুক্ত করে যে রেখা পাওয়া যায়, তাকে সমমানরেখা মানচিত্র বলে। এই মানচিত্র নানা রকমের হতে পারে—[1] সমপ্রেষ রেখা, [ii] সমতাপ রেখা [iii] সমবর্ষণ রেখা, [iv] সমলবণতা রেখা, [v] সমোন্নতি রেখা মানচিত্র ইত্যাদি।
প্রতীক চিহ্নভিত্তিক মানচিত্র: আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত বিভিন্ন চিহ্ন ও প্রতীকের সাহায্যে এই মানচিত্র আঁকা হয়। এরা নানা রকমের হতে পারে—[i] বিন্দু মানচিত্র, [ii] বৃত্ত মানচিত্র ইত্যাদি।
জ্যামিতিক মানচিত্র : এই প্রকার মানচিত্র নানা প্রকারের হতে পারে— [i] গোলক ও উপবৃত্ত মানচিত্র, [ii] প্রবাহরেখা মানচিত্র, [iii] ঘনত্বজ্ঞাপক মানচিত্র।
বিভিন্ন সিরিজের ভূবৈচিত্র্যসূচক মানচিত্রের নাম লেখো।
বিভিন্ন সিরিজের ভূবৈচিত্র্যসূচক মানচিত্রগুলি হল—
আন্তর্জাতিক সিরিজ: আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুযায়ী এই মানচিত্র আঁকা হয়। এই সিরিজের মানচিত্রের স্কেল হয় 1:1000000 | এতে 4° অক্ষাংশ এবং 4° দ্রাঘিমার বিস্তারে কোনো অঞ্চলকে দেখানো হয়।
দক্ষিণ এশিয়া সিরিজ: ইরান, আফগানিস্তান, সৌদি আরব, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, চিন, মায়ানমার, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, দক্ষিণ-পূর্ব চিন প্রভৃতি দেশগুলি এই সিরিজের অন্তর্গত।
ভারত ও প্রতিবেশী দেশের সিরিজ: এই মানচিত্রটি 1:1000000 ফেলে আঁকা হয় | প্রতিটি মানচিত্র 4° অক্ষরেখা ও 4° দ্রাঘিমারেখার মধ্যে বিস্তৃত থাকে।
ভারতীয় জরিপ বিভাগের মানচিত্র: জরিপের সুবিধার জন্য সার্ভে অব ইন্ডিয়া ভারতীয় উপমহাদেশে 64° পূর্ব থেকে 100° পূর্ব এবং 4° উত্তর থেকে 40° উত্তর পর্যন্ত বিস্তৃত অংশকে 4°x4° গ্রিডে ভাগ করেছে।
টোপোগ্রাফিক্যাল মানচিত্রে সুবিধা ও অসুবিধাগুলি লেখো।
উত্তর: টোপোগ্রাফিক্যাল মানচিত্রের সুবিধা –
1) টোপোগ্রাফিক্যাল মানচিত্রে বিভিন্ন প্রাকৃতিক এবং সাংস্কৃতিক বিষয়সমূহের তথ্য পাওয়া যায়। 2) টোপোগ্রাফিক্যাল মানচিত্র থেকে যেকোনো দুটি স্থানের মধ্যে সহজেই দূরত্ব নির্ণয় করা যায়। 3) পরিবহপ এবং রাস্তাঘাট, রেললাইনের সম্পর্কে সামগ্রিক ধারণা পাওয়া যায়। 4) প্রাকৃতিক এবং সাংস্কৃতিক বিষয়গুলির মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ণয় করা যায়। 5) সামরিক উদ্দেশ্য এবং গবেষণার কাজে (পরিকল্পনাসহ) টোপো মানচিত্র বিশেষ উপযোগী।
টোপোগ্রাফিক্যাল মানচিত্রের অসুবিধা-
1) সময়ের সাপেক্ষে দ্রুত পরিবর্তন করা যায় না বলে অনেকসময় বাস্তবের সঙ্গে বিস্তর পার্থক্য লক্ষ করা যায়। 2) চিহ্ন, সংকেত এবং ব্যবহারবিধি না জানলে এই মানচিত্র পাঠ করা যায় না। 3) এই মানচিত্র নির্মাণ বেশ সময়, পরিশ্রম এবং | মূলধনসাপেক্ষ। 4) প্রতিটি প্লটের বিবরণ পাওয়া যায়।
মৌজা মানচিত্রের বৈশিষ্ট্য ও গুরুত্ব লেখো।
মৌজা মানচিত্রের বৈশিষ্ট্য - 1) মৌজা মানচিত্র একপ্রকারের বৃহৎ স্কেল মানচিত্র। এতে জমির পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরূপ থাকে। 2) এর স্কেল 16 ইঞ্চিতে 1 মাইল হয়। 3) শহর বা গ্রামাঞ্চলের সমস্তরকম ভূমির ব্যবহার এতে থাকে। 4) প্রতি জমির দাগ নং (J. L. No) অনুসারে নথিভুক্তি থাকে।
মৌজা মানচিত্রের গুরুত্ব- 1) গ্রাম বা শহরের প্রতি প্লট, বাড়ি ইত্যাদির বিবরণ থাকে বলে আঞ্চলিক উন্নয়ন পরিচালনা করা যায়। 2) ভূমির ব্যবহার এবং রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে এই প্রকার মানচিত্রের ভূমিকা সর্বাপেক্ষা বেশি।
ভৌগোলিকদের কাছে সর্বাপেক্ষা প্রয়োজনীয় হল
ভূবৈচিত্র্যসূচক মানচিত্র-এরূপ বলার কারণ ব্যাখ্যা করো। ভূবৈচিত্র্যসূচক মানচিত্র ভৌগোলিকদের কাছে সর্বাপেক্ষা প্রয়োজনীয়, কারণ—
প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশের আন্তঃসম্পর্ক নির্ধারণ: ভূপৃষ্ঠের প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশের বিভিন্ন উপাদানসমূহের আন্তঃসম্পর্ক ভূবৈচিত্র্যসূচক মানচিত্রের সাহায্যে সহজেই নির্ধারণ করা যায়। এই আন্তঃসম্পর্ক ভৌগোলিকদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
অঞ্চলের প্রকৃতি অনুধাবন: এই মানচিত্রের সাহায্যে কোন অঞ্চল কী প্রকৃতির, স্বাভাবিক উদ্ভিদের ধরন, নদনদী, পার্বত্য অঞ্চল, মালভূমি অঞ্চল, সমভূমি অঞ্চল প্রভৃতির প্রকৃতি অনুধাবন করা যায়।
উন্নয়ন পরিকল্পনায় উপযোগী: সড়কপথ, রেলপথ নির্মাণ তথা আঞ্চলিক উন্নয়ের পরিকল্পনায় ভূবেচিত্রাসূচক মানচিত্র বিশেষ উপযোগী।
রাজনৈতিক মানচিত্র কাকে বলে? এর বৈশিষ্ট্য লেখো।
উত্তর: রাজনৈতিক মানচিত্র, কোনো জেলা, মহকুমার সীমানা, গুরুত্বপূর্ণ স্থান তথা কোনো দেশের বা রাজ্যের অবস্থান দেখিয়ে যে মানচিত্র তৈরি করা হয়, তাকে রাজনৈতিক মানচিত্র বলে | কোনো জেলার রাজনৈতিক মানচিত্রে তার মহকুমা, সি ডি ব্লক, ব্লক অফিস কেন্দ্র, জেলা সদর শহর, মহকুমা শহরের অবস্থান উল্লেখ করা থাকে।
রাজনৈতিক মানচিত্রের বৈশিষ্ট্য: 1) এই ধরনের মানচিত্রে বিভিন্ন ধরনের রৈখিক চিহ্ন দিয়ে ছোটো থেকে বড়ো প্রশাসনিক এলাকা পৃথক করা থাকে। 2) এর সাহায্যে যে-কোনো মানচিত্রের সীমান্তবর্তী দেশ, রাজ্য, জেলা প্রভৃতির নাম জানা যায়। 3) এই মানচিত্রের মাধ্যমে রাজনৈতিক তথা প্রশাসনিক একক সম্পর্কে জানা যায়।
ক্ষুদ্র স্কেলের মানচিত্রে সব ধরনের তথ্য বিশদভাবে দেখানো যায় না কেন?
ক্ষুদ্র স্কেলের মানচিত্রে সব ধরনের তথ্য বিশদভাবে দেখানো যায় না, কারণ—
একাধিক সাংকেতিক চিহ্ন: ব্যবহারের সমস্যা অনেক বড়ো একটি অঞ্চলকে ছোটো করে দেখানোর জন্য একাধিক সাংকেতিক চিহ্ন ব্যবহার করে বিভিন্ন বস্তুকে দেখানো হয়। তাই এই মানচিত্রে সব তথ্য বিশদভাবে দেখানো যায় না |
স্থানের স্বল্পতা: স্থানের স্বল্পতার কারণে অনেকক্ষেত্রেই বড়ো অঞ্চলের সব তথ্য এই মানচিত্রে দেখানো সম্ভব হয় না।
জটিল বিষয়গুলি উপস্থাপনে সমস্যা: প্রাকৃতিক, অর্থনৈতিক, আঞ্চলিক প্রভৃতি বিষয়ভিত্তিক মানচিত্র এই ক্ষুদ্র স্কেলের মানচিত্রের দ্বারা তৈরি করা যায় না বলে এইসব জটিল বিষয়গুলির বিশ্লেষণ করা সম্ভব হয় না।
মানচিত্র স্কেলের ব্যবহার লেখো।
মানচিত্র স্কেলের ব্যবহারগুলি হল— 1) স্কেলের সাহায্যে মানচিত্রে প্রদর্শিত অঞ্চলের প্রকৃত আয়তন সহজে জানা যায়। 2) ভুগোলে নিখুঁতভাবে মানচিত্র আঁকতে স্কেলের ব্যবহার অবশ্যই প্রয়োজন। 3) স্কেলের পরিবর্তন করে কোনো মানচিত্রকে ছোটো বা বড়ো করা যায়। 4) মানচিত্রে দুটি স্থানের মধ্যে দূরত্ব, স্কেলের সাহায্যে পরিমাপ করে ভূমির প্রকৃত দূরত্ব জানা যায়।
মানচিত্র স্কেলের গুরুত্ব লেখো।
উত্তর: মানচিত্র স্কেলের গুরুত্ব হল 1) স্কেল ছাড়া মানচিত্র আঁকা সম্ভব নয়। 2) কোনো স্থানের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা নির্ণয়ে ফেলের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। 3) প্ল্যানার, ডিজাইনাররা যখন কোনো নকশা আঁকেন তখন সংস্থার কাছে প্রকল্পের খরচ সম্পর্কে ধারণা দিতে ফেলের গুরুত্ব অপরিসীম। 4) ভগ্নাংশ তথা অতি ক্ষুদ্র অংশ পরিমাপ করার জন্য ভার্নিয়ার স্কেলের গুরুত্ব খুব বেশি।
মানচিত্রে স্কেলের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ কারণসহ ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: মানচিত্রে স্কেলের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাগুলি হল—
পরিমাপ: মানচিত্রকে প্রয়োজনমতো ছোটো বা বড়ো করা, দূরত্ব, ক্ষেত্রফল নির্ণয়ে স্কেল ব্যবহার করা হয়।
পৃথিবীপৃষ্ঠের উপস্থাপন: স্কেলের সাহায্যে ত্রিমাত্রিক পৃথিবীকে দ্বিমাত্রিক তলে (সমতল কাগজে) উপস্থাপন করা যায়।
অন্যান্য প্রয়োজন: ভৌগোলিক গবেষণা, জরিপ কার্য, দেশের সামরিক ও প্রতিরক্ষার প্রয়োজনে মানচিত্রে স্কেলের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
রৈখিক স্কেলের সুবিধা ও অসুবিধাগুলি কী কী?
রৈখিক স্কেলের সুবিধাগুলি হল—
1) রৈখিক স্কেল লৈখিক স্কেলের সহজতম রূপ কারণ এতে হিসাবের জটিলতা কম। 2) মানচিত্রকে ছোটো কিংবা বড়ো করলে রৈখিক স্কেলও সেই অনুপাতে ছোটো কিংবা বড়ো হয়। যার ফলে এই স্কেল মানচিত্রের দূরত্ব ও ভূমিভাগের দূরত্বের অনুপাত সঠিক রাখে। 3) মানচিত্রের ক্ষেত্রফল রৈখিক স্কেলের সাহায্যে খুব সহজেই নির্ণয় করা যায়। 4) মানচিত্রের ছোটো দূরত্বও এই স্কেলের সাহায্যে সঠিকভাবে নির্ণয় করা সম্ভব।
রৈখিক স্কেলের অসুবিধাগুলি হল—
1) এই স্কেল আঁকার জন্য হিসাবের যথেষ্ট জটিলতা আছে। 2) স্কেলের নকশা তৈরি ও শিরোনাম ইত্যাদি লেখা দিয়ে, একে দৃষ্টিনন্দন করতে যথেষ্ট সময় ও পরিশ্রম ব্যয় করা হয়।
বিবৃতিমূলক স্কেলের সুবিধা ও অসুবিধাগুলি কী কী?
উত্তর: বিবৃতিমূলক স্কেলের সুবিধাগুলি হল—
1) এটি সহজ ও সরল স্কেল। তাই মানচিত্র পাঠে এই স্কেল ব্যবহার করা সুবিধাজনক। 2)এটি বিবৃতির মাধ্যমে বা কথায় লেখা হয় বলে আঁকার প্রয়োজনীয়তা নেই। 3) অঙ্কের জটিলতা বা হিসাবের কোনো জটিলতা নেই।
বিবৃতিমূলক স্কেলের অসুবিধাগুলি হল—
1) যে ভাষায় ফেল লেখা আছে সেই ভাষা জানা ব্যক্তি ছাড়া অন্য কারও পক্ষে মানচিত্র পাঠগ্রহণ করা অসুবিধাজনক। 2) এই স্কেলের একক পরিবর্তনের সময় জটিলতার সৃষ্টি হয় এবং তা সময়সাপেক্ষ। 3) মূল মানচিত্রকে ছোটো বা বড়ো করলে আবার নতুন করে স্কেলের হিসাব করতে হয়।
