প্রশ্ন: প্রাক্-ফরাসি বিপ্লবযুগে যে সমস্ত কর ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল সেগুলি লেখো।
উত্তর: প্রাক্-ফরাসি বিপ্লবযুগে প্রচলিত করগুলি ছিল—টেইলি (ভূমিকর), ক্যাপিটেশন (উৎপাদন কর), ভিংটিয়েমে (সম্পত্তি কর/আয়কর), গ্যাবেলা (লবণ কর), টাইথ (ধর্ম কর), এডস্ (মদ, তামাক প্রভৃতির ওপর ধার্য কর), করভি (বাধ্যতামূলক শ্রমদান) প্রভৃতি।
প্রশ্ন: কে, কেন প্রাক্-বিপ্লব ফরাসি অর্থনীতিকে ‘ভ্রান্ত অর্থনীতির জাদুঘর' বলে অভিহিত করেন?
উত্তর: ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথ ‘ওয়েলথ অব নেশনস্’ গ্রন্থে প্রাক্-বিপ্লব ফরাসি অর্থনীতিকে ‘ভ্রান্ত অর্থনীতির জাদুঘর' বলে অভিহিত করেন। কারণ ফ্রান্সের অর্থনৈতিক নীতি, শুল্ক নীতি ও শিল্প নিয়ন্ত্রণ নীতি ছিল বিশৃঙ্খলাপূর্ণ ও অবাধ বাণিজ্য নীতির পক্ষে বাধাস্বরূপ।
প্রশ্ন: অভিজাত বিদ্রোহকে কেন ফরাসি বিপ্লবের সূচনা বলা হয়?
উত্তর: অভিজাত শ্রেণি বিশেষ অধিকার ও সুযোগসুবিধা বজায় রাখার জন্য অভ্যুত্থান করে। অভিজাত বিদ্রোহের ফলেই রাজা এস্টেট জেনারেল আহ্বান করেন। এরপর জনগণ বিদ্রোহের পথে ধাবিত হয়।
প্রশ্ন: ফিজিওক্র্যাটস্ কাদের বলা হয়?
উত্তর: ফ্রান্সের ফিজিওক্র্যাটস্ নামক দার্শনিকগণ ছিলেন ইংরেজ অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথের অনুগামী। তাঁরা মার্কেন্টাইল মতবাদের বিরোধী ছিলেন। তাঁরা অবাধ বাণিজ্য ও সার্বজনীন শিক্ষার সমর্থক ছিলেন। তাঁদের মতে, ভূমি কর ছাড়া অন্য কোনো কর থাকবে না। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন কুইজেন ও তুর্গো।
প্রশ্ন: রুশো (1712-1778 খ্রি.) কে ছিলেন?
উত্তর: অষ্টাদশ শতকের চিন্তা ও মননের ক্ষেত্রে পরিবর্তন সূচনাকারী দার্শনিকদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য ও জনপ্রিয় ছিলেন রুশো। তাকে ফরাসি বিপ্লবের ‘ঝড়ের পাখি’ বলা হয়। তাঁর উল্লেখযোগ্য একটি গ্রন্থ ছিল ‘সোশ্যাল কন্ট্যাক্ট'।
প্রশ্ন: ভেনিস দিদেরো কে ছিলেন?
উত্তর: ভেনিস দিদেরো ছিলেন একজন ফরাসি দার্শনিক। তিনি জড়বাদী দর্শনে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি কয়েকজন বন্ধুর সহযোগিতায় বিশ্বকোশ রচনা করেন। এই বিশ্বকোশে তৎকালীন ফরাসি স্বৈরাচার, দুর্নীতিগ্রস্ত বিচারব্যবস্থা এবং অসম রাজস্ব ব্যবস্থার কঠোর সমালোচনা করা হয়।
প্রশ্ন: মস্তেস্ক রচিত দুটি বইয়ের নাম লেখো।
উত্তর : ফরাসি দার্শনিক মস্তেস্কু রচিত দুটি বইয়ের নাম হল ‘স্পিরিট অফ্ দি লজ’ এবং ‘দি পার্সিয়ান লেটার্স'।
প্রশ্ন: ‘স্পিরিট অফ দি লজ’ গ্রন্থের লেখক ও তার বিষয়বস্তু কী ছিল?
উত্তর: "স্পিরিট অফ দি লজ' গ্রন্থের লেখক ছিলেন মত্তেঙ্কু। তিনি ফ্রান্সের একজন চিন্তাবিদ ও দার্শনিক। ওই গ্রন্থে তিনি আইন, শাসন ও বিচারব্যবস্থার বিভাজনের মাধ্যমে ব্যক্তি স্বাধীনতা রক্ষার পরামর্শ দেন।
বাস্তিল দুর্গের পতনের গুরুত্ব কী ছিল?
উত্তর: বাস্তিল দুর্গ পতনের গুরুত্ব : 1. বাস্তিলের পতন স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের পতন সূচনা করে, 2. বাস্তিলের পতন ফ্রান্স তথা ইউরোপের মুক্তিপিপাসু মানুষের কাছে মুক্তির অনুপ্রেরণা নিয়ে আসে, 3. জাতীয় সভাকে শক্তিশালী করে, 4. অভিজাত শ্রেণি দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়, 5. গ্রামাঞ্চলে ব্যাপক উন্মাদনার সৃষ্টি হয়।
প্রশ্ন: টেনিস কোর্টের শপথ বলতে কী বোঝ?
উত্তর: 1789 খ্রিস্টাব্দের 5 মে ফ্রান্সে জাতীয় সভার অধিবেশন শুরু হলে জাতীয় সভার ভোটদানের পদ্ধতি নিয়ে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সঙ্গে তৃতীয় শ্রেণির বিরোধ শুরু হয়। তৃতীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিগণ মাথাপিছু ভোটের দাবি জানালে রাজা সভার অধিবেশন বন্ধ করে দেন। তৃতীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিগণ সভাগৃহ বন্ধ দেখে উত্তেজিত হয়ে পড়েন এবং জিয়াত্যর নেতৃত্বে পার্শ্ববর্তী টেনিস খেলার মাঠে এই মর্মে শপথ গ্রহণ করেন যে, যতদিন না ফ্রান্সের জন্য একটি কার্যকরী সংবিধান রচিত হচ্ছে ততদিন তারা ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। একেই টেনিস কোর্টের শপথ (20 জুন 1789 খ্রিস্টাব্দ) বলে।
অতিরিক্ত সংযোজন: টেনিস কোর্টের শপথ অনুষ্ঠান চলাকালীন যাজক সম্প্রদায়ের 139 জন (কোবানের মতে 170 জন) এবং অভিজাত সম্প্রদায়ের 47 জন (কোবানের মতে, 50 জন) প্রতিনিধি তৃতীয় সম্প্রদায়ে যোগদান করে।
প্রশ্ন: প্যারিসের ন্যাশনাল গার্ডের ভূমিকা উল্লেখ উত্তর বাস্তিল দুর্গের পতনের পর লাফায়েতের নেতৃত্বে করো।
উত্তর: প্যারিসের ন্যাশনাল গার্ড গড়ে উঠেছিল। পৌরশাসনে গুরুত্বপূর্ণ বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটানো ছিল ন্যাশনাল গার্ডের উদ্দেশ্য।
প্রশ্ন: ‘ক্যাহিয়ে’ বা কেহিয়ার্স কী?
উত্তর: কেহিয়ার্স কথাটির অর্থ অভিযোগের তালিকা। ফ্রান্সের স্টেটস্ জেনারেলের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা তাঁদের নির্বাচনি এলাকা থেকে নির্বাচকদের অভিযোগ ও দাবিদাওয়ার তালিকা নিয়ে আসেন। এগুলিতে শাসনব্যবস্থার ত্রুটিবিচ্যুতি ও দাবিদাওয়ার কথা ছিল। এই কেহিয়ার্স রচনার সময় বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীরাই প্রধান ভূমিকা নেয়।
প্রশ্ন: রোবসপিয়ার কে ছিলেন?
উত্তর: ফরাসি বিপ্লবের সময় উগ্রপন্থী জ্যাকোবিন দলের নেতা ছিলেন রোবসপিয়ার। তাঁর নেতৃত্বে ফ্রান্সে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম হয়েছিল। তিনি ফরাসি বিপ্লবকে অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ ও বহিরাক্রমণ থেকে রক্ষা করেছিলেন।
প্রশ্ন: সন্দেহের আইন বলতে কী বোঝ?
উত্তর: সন্ত্রাসের রাজত্বকালে জননিরাপত্তা কমিটি একটি আইন পাস করেছিল। এই আইনের সাহায্যে যে কোনো ব্যক্তি রাজতন্ত্রী বা প্রজাতন্ত্র-বিরোধী কিংবা ব্যক্তিস্বাধীনতার বিরোধী বলে সন্দেহের পাত্র হলেই তাকে গ্রেপ্তার করার ব্যবস্থা করা হয়। দমনমূলক এই আইনটি সন্দেহের আইন নামে পরিচিত।
প্রশ্ন: দ্বিতীয় ফরাসি বিপ্লব কখন শুরু হয়?
উত্তর: 1792 খ্রিস্টাব্দের 21 সেপ্টেম্বর জাতীয় কনভেনশনের অধিবেশনে রাজতন্ত্রের বিলোপসাধন করা হয় এবং ফ্রান্সে প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সূচনা হয়। অনেকে এই ঘটনাকে দ্বিতীয় ফরাসি বিপ্লব নামে অভিহিত করেছেন।
প্রশ্ন: ব্রান্সউইক ঘোষণাপত্রের বিষয়বস্তু কী ছিল?
উত্তর: প্রাশিয়ার সেনা প্রধান ব্রান্সউইক ফরাসি রাজতন্ত্র রক্ষার লক্ষে 25 জুলাই, 1792 খ্রিস্টাব্দে এক ঘোষণাপত্র জারি করেন। এর নাম ‘ব্রান্সউইক ঘোষণাপত্র’। এই ঘোষণাপত্রের দ্বারা তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ফরাসি রাজপরিবারের ওপর আঘাত আসলে তিনি প্যারিস শহর ধ্বংস করে দেবেন।
প্রশ্ন: সেপ্টেম্বর হত্যাকাণ্ড কী?
উত্তর প্যারিসের উগ্র প্রজাতান্ত্রিক বিপ্লবীগণ রাজতন্ত্রকে নির্মূল করার উদ্দেশ্যে 1792 খ্রিস্টাব্দের 2-5 সেপ্টেম্বর বন্দিশালায় প্রবেশ করে 1100 রাজতন্ত্রের সমর্থককে নির্বিচারে হত্যা করে। এই ঘটনাই ‘সেপ্টেম্বর হত্যাকাণ্ড' নামে খ্যাত। এই হত্যাকাণ্ডের নায়ক ছিলেন জাঁ পল মারা।
প্রশ্ন: জন নিরাপত্তা কমিটি (Committee of Public Safety) কেন গঠিত হয়েছিল?
উত্তর সন্ত্রাসের রাজত্বের সময় 12 জন সদস্যকে নিয়ে জন নিরাপত্তা কমিটি গঠিত হয়। এই সমিতি 1793-94 খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় মূল ক্ষমতার অধিকারী হয় এবং জাতির নিরাপত্তার জন্য যে-কোনো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্ব পায়। এই সংগঠনের মুখ্য পরিচালক রোবসপিয়ার বিপ্লব-বিরোধী ব্যক্তিদের নির্মূল করেন।
প্রশ্ন: শ্বেত সন্ত্রাস (White Terror) কারা সৃষ্টি করেছিল এবং কেন?
উত্তর: রোবসপিয়ারের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে লাল সন্ত্রাসের অবসান ঘটে (28 জুলাই 1794 খ্রিস্টাব্দ)। এরপর রোবসপিয়ার বিরোধীরা একজোট হয়ে যে সন্ত্রাস শুরু করেন তাকে ‘শ্বেত সন্ত্রাস’ বলা হয়। এর নেতৃত্ব ছিল বুর্জোয়াদের হাতে।
প্রশ্ন: শ্বেত সন্ত্রাসের প্রকৃতি কী ছিল?
শ্বেত সন্ত্রাস বুর্জোয়া বা বিত্তবান শ্রেণির স্বার্থে পরিচালিত হয় এবং এই সন্ত্রাসের ফলে বিপ্লবের অনুগামী জ্যাকোবিনদের জীবনহানি ঘটে। শ্বেত সন্ত্রাসের মাধ্যমে বিত্তবান শ্রেণি নিজেদের প্রাধান্য বজায় রাখতে চেয়েছিল।
প্রশ্ন: ব্যক্তি ও নাগরিক অধিকার ঘোষণায় কী বলা হয়েছিল?
উত্তর: ব্যক্তি ও নাগরিক অধিকার ঘোষণায় বলা হয় যে, 1. স্বাধীনতা মানুষের জন্মগত অধিকার 2. আইন জনগণের ইচ্ছার প্রতিফল এবং আইনের চোখে সকল মানুষই সমান, 3. বাকৃস্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, সম্পত্তি ক্রয়-বিক্রয় মানুষের সার্বজনীন অধিকার। 4. জনগণই রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। 5. আইনের সাহায্য ছাড়া কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার বা কারাদণ্ড দেওয়া যাবে না।
প্রশ্ন: ধর্মযাজকদের সংবিধান (Civil Constitution of the Clergy) কী?
উত্তর: 1789 খ্রিস্টাব্দের নভেম্বর মাসে সংবিধান সভা যাজক সম্প্রদায়ের সুবিধাভোগী সমস্ত ক্ষমতা খর্ব করার জন্য ধর্মযাজকদের সংবিধান (Civil Constitution of the Clergy) নামে একটি নির্দেশ জারি করেন। এই ব্যবস্থা দ্বারা চার্চের সব ভূ-সম্পত্তি রাষ্ট্রায়ত্ত করা হয় এবং যাজকদের রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীনে আনা হয়। এই পদক্ষেপের ফলে চার্চ রাষ্ট্রের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়।
প্রশ্ন: ডাইরেক্টরি শাসন কী?
উত্তর: 1796 খ্রিস্টাব্দ থেকে 1799 খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ফ্রান্সে যে শাসনব্যবস্থা প্রচলিত ছিল তা ডাইরেক্টরি শাসন নামে পরিচিত। পাঁচজন ডিরেক্টরি বা পরিচালক এই সময় ফ্রান্সের রাজনীতিতে সর্বশক্তিমান হয়ে ওঠেন। এঁরা ছিলেন বারাস (Baras), লা রভেলিয়ার (La Ravelliere), ল্যতুনিয়ে (Letourner), রউবেল (Raubel) ও কারনট (Carnot)।
প্রশ্ন: বব্যুফ (Babeut) কে ছিলেন? তিনি কী করেছিলেন?
উত্তর: ডাইরেক্টরির শাসনকালে ফ্রান্সে বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় যার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল বব্যুফ (Babeuf) পরিচালিত সাম্যবাদী অভ্যুত্থান। বব্যুফ ছিলেন ফরাসি বিপ্লবের প্রতি অবিচল, আস্থাশীল এবং তিনি গরিব নিপীড়িত মানুষের মধ্যে বিপ্লবের পরিধি সম্প্রসারিত করতে চেয়েছিলেন। সমাজে সম্পত্তির বিলোপসাধন করে সাম্য প্রতিষ্ঠা করা ছিল তার মূল মতাদর্শ। তাঁকে বিশ্বের প্রথম সাম্যবাদী বিদ্রোহের জনক বলা হয়।
প্রশ্ন: অঁসিয়া রেজিম বলতে কী বোঝ?
উত্তর: অঁসিয়া রেজিম-এর অর্থ হল পূর্বতন সমাজ। 1789 খ্রিস্টাব্দে ফরাসি বিপ্লবের পূর্ববর্তীকালে ফ্রান্স তথা ইউরোপের অধিকাংশ দেশে যে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল তাকে ‘অঁসিয়া রেজিম' বা পুরাতনতন্ত্র বা old regime বলা হয়।
প্রশ্ন: বিপ্লব বলতে কী বোঝ?
উত্তর: কোনো প্রচলিত ব্যবস্থার অতিদ্রুত ও কার্যকরী পরিবর্তনকে বিপ্লব বলে। যেমন—ফ্রান্সে ফরাসি বিপ্লব সমগ্র ইউরোপের সমাজ, রাষ্ট্র, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এক ব্যাপক ও সর্বাত্মক পরিবর্তন ঘটিয়েছিল।
প্রশ্ন: প্রাক্ বিপ্লব যুগে ফরাসি সমাজ ক-টি শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল ও কী কী?
উত্তর: প্রাক্-বিপ্লব যুগে ফরাসি সমাজ তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল। যথা—যাজক শ্রেণি, অভিজাত শ্রেণি এবং সাধারণ শ্রেণি। এদের যথাক্রমে প্রথম শ্রেণি, দ্বিতীয় শ্রেণি এবং তৃতীয় শ্রেণি হিসেবে অভিহিত করা হত।
প্রশ্ন: 'ক্যাপিটেশন' কী?
উত্তর: ফ্রান্সের তিনটি প্রত্যক্ষ করের মধ্যে ক্যাপিটেশন বা উৎপাদন কর অন্যতম। ১৭০১ খ্রিস্টাব্দে যখন এই কর ধার্য করা হয় তখন বলা হয়েছিল এই কর প্রত্যেক ফরাসিবাসীর উপর সমভাবে প্রযোজ্য হবে। কিন্তু পরবর্তীতে যাজক ও অভিজাত শ্রেণি এই কর থেকে অব্যাহতি পায় এবং একমাত্র সাধারণ শ্রেণিকে এই করভার বহন করতে হয়।
প্রশ্ন: ‘বানালিতে’ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: বানালিতে হল সামন্তপ্রভুকে প্রদেয় একটি কর। উৎপন্ন ফসলের একটি নির্দিষ্ট অংশ প্রদানের বিনিময়ে সামস্তপ্রভুর কলে গম অথবা যব ভাঙার অথবা খাদ্য প্রস্তুতের বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা।
প্রশ্ন: ‘করভি’ কী?
উত্তর: প্রাক্-বিপ্লব যুগে ফ্রান্সে প্রচলিত বাধ্যতামূলক শ্রমকরের নাম ছিল ‘করভি’। সামন্তপ্রভুর সেবায় সপ্তাহে নির্দিষ্ট কয়েকদিনের পারিশ্রমিকহীন বাধ্যতামূলক শ্রমদান করতে হত। আর এই পারিশ্রমিকহীন শ্রমদানকে করভি বা শ্রমকর বলা হত।
প্রশ্ন: প্রাক্-বিপ্লব যুগে ফ্রান্সে কর কাঠামো কেমন ছিল?
উত্তর: প্রাক্-বিপ্লব যুগে ফ্রান্সে দুই ধরনের কর ব্যবস্থার প্রচলন ছিল—প্রত্যক্ষ কর ও পরোক্ষ কর।
প্রত্যক্ষ কর—টেইলি, ক্যাপিটেশন এবং ভিংটিয়েম।
পরোক্ষ কর—গ্যাবেল, করভি, এইস্।
প্রশ্ন: ফ্রান্সে ‘প্রথম শ্রেণি’ কাদের বলা হত?
উত্তর: প্রাক্-বিপ্লব যুগে ফরাসি সমাজে যাজকদের প্রথম শ্রেণি বলা হত। 1789 খ্রিস্টাব্দে তাদের সংখ্যা ছিল 1 লক্ষ 20 হাজার। উচ্চ যাজক ও নিম্ন যাজক এই দুই ভাগে যাজকশ্রেণি বিভক্ত ছিল। মোট জনসংখ্যার এক শতাংশ না হয়েও সমাজ ও রাষ্ট্রে তারা ছিল অত্যন্ত সুবিধাভোগী। রাষ্ট্রীয় আইনের ঊর্ধ্বে ছিলেন তারা। কনট্র্যাক্ট অব পোইসি নামে এক চুক্তি অনুসারে তারা কেবল ফরাসি রাজাকে এক স্বেচ্ছাকর দিত। আর কোনো প্রকার কর প্রদান করতে হত না।
প্রশ্ন: ফ্রান্সে দ্বিতীয় শ্রেণি কাদের বলা হত?
উত্তর: প্রাক্-বিপ্লব যুগে ফরাসি সমাজে অভিজাতদের ‘দ্বিতীয় শ্রেণি’ বলা হত। ফরাসি বিপ্লবকালে এদের সংখ্যা ছিল 3 লক্ষ 50 হাজার—যা ছিল দেশের মোট জনসংখ্যার 1/2 শতাংশ। তারা ছিল সমাজের সর্বাপেক্ষা প্রভাবশালী অংশ। সরকারি চাকরি, বিচারবিভাগের উচ্চপদ, প্রশাসন ব্যবস্থা সব ছিল তাদের অধিকারে।
প্রশ্ন: প্রাক্-বিপ্লব যুগে ফরাসি সমাজে তৃতীয় শ্রেণি' কারা ছিল?
উত্তর: প্রাক্-বিপ্লব যুগে ফ্রান্সে মোট জনসংখ্যার 17 শতাংশ মানুষই তৃতীয় সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত ছিল। জাহাজ মালিক, ব্যাংকার, বৃহৎ শিল্পপতি, অধ্যাপক, আইনজীবী, চিকিৎসক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কারিগর, শ্রমিক, কৃষক, ভবঘুরে প্রভৃতি ছিল তৃতীয় শ্রেণিভুক্ত মানুষ। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও সামাজিক মর্যাদায় তারা ছিল অপাঙ্ক্তেয়। অথচ রাষ্ট্রের সব নাগরিক দায়িত্ব এদেরকেই পালন করতে হত।
প্রশ্ন: ফ্রান্সে ‘বুর্জোয়া শ্রেণি’ বলতে কাদের বোঝাত?
উত্তর: বুর্জোয়া শ্রেণি ছিল তৃতীয় সম্প্রদায়ের একটি অংশ। তৃতীয় শ্রেণির এই বুর্জোয়ারাই ছিল বিপ্লবের অগ্রদূত। বড়ো ব্যবসায়ী, শিল্পপতি ও ব্যাংকারদের বলা হত উচ্চ বুর্জোয়া। আইনজীবী, অধ্যাপক, চিকিৎসকদের বলা হত মধ্য বুর্জোয়া। কারিগর, দোকানদার, কৃষক, শ্রমিক প্রভৃতিদের বলা হত নিম্ন বুর্জোয়া। বিদ্যা, বুদ্ধি ও ধনবলে বলীয়ান হয়েও কেবল বংশ কৌলীন্যের অভাবে সমাজ ও রাষ্ট্রে তারা ছিল অপাঙ্ক্তেয়।
প্রশ্ন: প্রাক্-বিপ্লব যুগে ফরাসি সমাজে ‘অধিকারহীন শ্রেণি’ বলতে কাদের বোঝাত?
উত্তর: প্রাক্-বিপ্লব যুগে ফরাসি সমাজে ‘অধিকারহীন শ্রেণি’ বলতে তাদেরকেই বোঝাত যারা সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি কেবল কর্তব্যই পালন করত ত–অধিকার বলতে কিছু ছিল না। অধিকারহীন শ্রেণির মানুষরাই কেবল রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় কর প্রদান করত। ফরাসি সমাজের 97 শতাংশ মানুষই ছিল ‘অধিকারহীন শ্রেণি’র অন্তর্ভুক্ত।
প্রশ্ন: বিপ্লবের পূর্বে ফ্রান্সকে রাজনৈতিক কারাগার বলা হত কেন?
উত্তর: বিপ্লবের পূর্বে ফরাসি জনগণের কোনো ব্যক্তি স্বাধীনতা ছিল না। ‘লেতর দ্য ক্যাশে’ নামক এক পরোয়ানার জোরে যে-কোনো ব্যক্তিকে বিনা বিচারে আটকে রাখা যেত। এভাবে বাস্তিল দুর্গ নিরাপরাধ বন্দিতে ভরে গিয়েছিল। রাজতন্ত্রের সমালোচনা করার কারণে দার্শনিক ভলতেয়ারকেও এই দুর্গে বন্দি থাকতে হয়েছে। বিচারব্যবস্থা ছিল ত্রুটিপূর্ণ। এইসব দিক উপলব্ধি করে ভলতেয়ার ফ্রান্সকে 'রাজনৈতিক কারাগার’ বলেছেন।
প্রশ্ন: 'লেতর দ্য ক্যাশে' বলতে কী বোঝ?
উত্তর: ‘লেতর দ্য ক্যাশে’ হল ফ্রান্সে প্রচলিত একপ্রকার রাজকীয় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। এই আইন প্রয়োগ করে দেশের যে-কোনো ব্যক্তিকে বিনা বিচারে বন্দি করে রাখা যেত।
প্রশ্ন: বুরবো শাসকেরা কীভাবে দেশশাসন করেছিল?
উত্তর: বুরবো শাসকেরা ফ্রান্সে নির্জলা স্বৈরতন্ত্র চালু রেখেছিলেন। তাঁরা কোনো নিয়মনীতির ধার ধারতেন না। কারণ তারা মনে করতেন ঈশ্বরের প্রতিনিধি হিসেবে মর্ত্যলোকে তাদের আবির্ভাব ঘটেছে। সুতরাং তাদের কৃতকর্মের জন্যে জনগণের কাছে জবাবদিহি করার প্রশ্নই আসে না।
প্রশ্ন: প্রাক্-বিপ্লব যুগে ফ্রান্সে ভূমিদাস কাদের বলা হত?
উত্তর: প্রাক্-বিপ্লব যুগে ফ্রান্সে মোট জনসংখ্যার 80 শতাংশ ছিল কৃষক। এই কৃষকদের মধ্যে 5 শতাংশ ছিল ভূমিদাস। সামন্ততন্ত্রের মূল ভিত্তি ছিল ভূমিদাস। ভূমিদাসদের জমির মালিকানার অধিকার ছিল না। বংশপরম্পরায় ভূস্বামীর জমিতে সে চাষ করত। তার অনুমতি ছাড়া অন্যত্র চলে যাওয়ারও অধিকার ছিল না।
প্রশ্ন: ফরাসি অভিজাত শ্রেণির মধ্যে শ্রেণিবিন্যাস কেমন ছিল?
উত্তর: ফরাসি অভিজাত সম্প্রদায় প্রধানত তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত ছিল। যথা— 1. দরবারি বা অসিধারী অভিজাত (উচ্চ বংশজাত ব্যক্তিরা, এরা নিজেদেরকে কুলীন অভিজাত বলে মনে করতেন, 2. পোশাকি অভিজাত (এরা রাজা কর্তৃক উচ্চ রাজপদে নিযুক্ত হয়ে অভিজাত শ্রেণিভুক্ত হতেন), 3. গ্রামীণ অভিজাত (এদের অবস্থা তেমন ভালো ছিল না এবং অন্য দুই শ্রেণি এদের তাচ্ছিল্যের চোখে দেখত)।
প্রশ্ন: ‘লেত্র দ্য গ্রেস' কী?
উত্তর: অষ্টাদশ শতকে (প্রাক্-বিপ্লব কালে) ফরাসি বিচার ব্যবস্থার ‘লেত্র দ্য গ্রেস' দ্বারা নাগরিকদের বিচারের ক্ষেত্রে রাজা হস্তক্ষেপ করতে পারতেন। এই ক্ষমতা প্রয়োগ করে তিনি আদালত দ্বারা প্রদত্ত শাস্তি মুকুব করতে পারতেন। ফলে যে কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তিকে মুক্তি দেওয়া যেত।
প্রশ্ন: ‘কনট্যাক্ট অব পোইসি’ কী?
উত্তর: ফ্রান্সের মোট কৃষি জমির পাঁচভাগের 1 ভাগ ছিল ফরাসি গির্জার অধীনে। এজন্য যাজকদের কোনো কর দিতে হত না। রাজা ও যাজকের মধ্যে 1561 খ্রিস্টাব্দে স্বাক্ষরিত এক চুক্তি অনুসারে রাজাকে তারা একটি স্বেচ্ছাকর দিত। এই চুক্তিকে ‘কনট্র্যাক্ট অব পোইসি’ বলা হত।
প্রশ্ন: রাজা ষোড়শ লুই কেন স্টেটস্ জেনারেলের অধিবেশন আহ্বান করেছিলেন?
উত্তর: অর্থনৈতিক সংকট থেকে মুক্তি পাবার জন্য ষোড়শ লুই পরপর কয়েকজন অর্থমন্ত্রী নিযুক্ত করেন। কিন্তু সুবিধাভোগী শ্রেণির বিরোধিতায় তার সংস্কার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। অতঃপর তিনি অর্থনৈতিক সংকট থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য এবং অভিজাত বিদ্রোহে ভীত হয়ে স্টেটস্ জেনারেলের অধিবেশন আহ্বান করেন (1 মে 1789 খ্রিস্টাব্দ)।
প্রশ্ন : প্যাট্রিশিয়ান (Patricians) ও প্লিবিয়ান (Plebeians) কারা?
উত্তর: প্রাক্-বিপ্লব যুগে ফরাসি সমাজে অভিজাতদের ‘প্যাট্রিশিয়ান’ এবং সাধারণ মানুষকে ‘প্লিবিয়ান' বলা হত।
প্রশ্ন: ফরাসি রাজাদের 'দৈব অধিকার’ বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: ফ্রান্সের রাজারা দৈব রাজতন্ত্রের ধারণায় বিশ্বাসী ছিলেন। রাজারা নিজেদেরকে দেবতার প্রতিনিধি বলে প্রচার করতেন। তাই তারা বলতেন, জনগণের কাছে তাঁরা জবাবদিহি করতে বাধ্য নয়। কারণ ঈশ্বর রাজাকে নিযুক্ত করেছেন। তাই রাজারা ঈশ্বর ছাড়া আর কারও কাছে দায়বদ্ধ নন।
প্রশ্ন: কাদের ‘পোশাকি অভিজাত' ও কাদের ‘দরবারি অভিজাত’ বলা হত?
উত্তর: বুরবো রাজারা এক সময় আর্থিক সমস্যার সমাধান করার আশায় খুব উচ্চমূল্যে কিছু প্রশাসনিক পদ বিক্রি করেন। যারা অর্থের বিনিময়ে ওই প্রশাসনিক পদ লাভ করতেন, তারা অভিজাত বলে গণ্য হতেন। এদের বলা হত ‘পোশাকি অভিজাত'। দরবারি অভিজাতরা পোশাকি অভিজাতদের মোটেই গুরুত্ব বা সম্মান দিতেন না।
জন্মসূত্রে যাঁরা অভিজাত ছিলেন তাঁদের 'দরবারি অভিজাত’ বলা হত। এঁরা তাদের বংশ কৌলীন্য নিয়ে খুব গর্বিত ছিলেন। এদের সংখ্যা ছিল মাত্র 4 হাজার।
প্রশ্ন: মেরি আঁতোয়ানিয়েত কে ছিলেন?
উত্তর: ফ্রান্সের রাজা ষোড়শ লুই-এর রানি ছিলেন মেরি আঁতোয়ানিয়েত। তিনি ছিলেন অস্ট্রিয়ার সম্রাট দ্বিতীয় লিওপোল্ডের ভগ্নী। মেরি আঁতোয়ানিয়েত অত্যন্ত বিলাসবহুল জীবনযাপন করতেন। তাঁর ব্যক্তিগত ভৃত্যের সংখ্যা ছিল 500।
প্রশ্ন: ফ্রান্সের ‘তৃতীয় শ্রেণি’ সভায় রূপান্তরিত হয়েছিল কেনো?
ফরাসি জাতীয় সভার তৃতীয় শ্রেণির প্রতিনিধিরা মাথাপিছু ভোটাধিকারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। তাদের আন্দোলনে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে রাজা ষোড়শ লুই তৃতীয় সম্প্রদায়কেই জাতীয় সভার সদস্য বলে মেনে নিতে বাধ্য হন (27 জুন, 1789 খ্রিস্টাব্দ) এবং মাথাপিছু ভোটদানের অধিকারও দেন।
প্রশ্ন: রুশোর একটি বিখ্যাত গ্রন্থের নাম ও তার প্রধান বিষয়বস্তু লেখো৷
উত্তর: রুশোর একটি বিখ্যাত গ্রন্থের নাম সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট। এই গ্রন্থে তিনি বলেন জনগণের ইচ্ছা অনুযায়ী এক চুক্তির মাধ্যমে রাজা শাসন ক্ষমতা পেয়েছেন। তাই রাজা যদি স্বৈরাচারী হন বা জনকল্যাণ না করেন, তবে তাকে পদচ্যুত করে নতুন রাজা নির্বাচন করার অধিকার জনগণের আছে। তিনি আরও বলেন যে, মানুষ মাত্রেই স্বাধীন হয়ে জন্মায়। সামাজিক অব্যবস্থা মানুষকে দরিদ্র অথবা পরাধীন করে।
প্রশ্ন: বিশ্বকোশ সংকলক কারা?
উত্তর: বিশ্বকোশ (Encyclopaedia) সংকলকগণ হলেন— ডেনিস দিদেরো, ডি-এলেমবার্ট, হেলভেটিয়াম প্রমুখ। এদের নেতা ছিলেন দিদেরো। এদের উদ্যোগে 35 খণ্ডের বিশ্বকোশ সংকলিত হয়।
প্রশ্ন: সাঁ কুলোৎ কাদের বলা হত?
উত্তর: ফ্রান্সের ভিটেমাটিহীন ভবঘুরে শ্রেণিকে সাঁ কুলোৎ বলা হত। ‘কুলোৎ' কথার অর্থ হল যারা ব্রিচেস বা লম্বা মোজা পরে না। এই মোজা পরার ক্ষমতা ফ্রান্সের শহরগুলির দরিদ্র বাসিন্দাদের ছিল না। তাই তারা ব্যঙ্গ করে নিজেদেরকে ‘কুলোৎ’ ছাড়া বা সাঁ কুলোৎ বলত। গৃহভৃত্য, রাজমিস্ত্রি প্রমুখ ছিল সাঁ কুলোৎ শ্রেণিভুক্ত। সাঁ কুলোত্রা ছিল ফ্রান্সের মোট জনসংখ্যার 1/5 অংশ।
প্রশ্ন: মার্কেন্টাইলবাদ কী?
উত্তর: মার্কেন্টাইলবাদের মূলকথা হল অর্থই একমাত্র সম্পদ এবং সেটা সীমিত। সুতরাং বিদেশি মাল অবাধে আমদানি বা খাদ্যশস্য অবাধে রপ্তানি করা যাবে না। শিল্পদ্রব্যের রপ্তানি বাড়িয়ে আমদানি কমাতে হবে। বিদেশি দ্রব্যের ওপর আমদানি শুল্ক বসাতে হবে। কারণ রপ্তানির চেয়ে আমদানি বেশি হলে দেশের সম্পদ বাইরে বেরিয়ে যাবে। মান্থাস ছিলেন একজন উল্লেখযোগ্য মার্কেন্টাইলবাদী অর্থনীতিবিদ।
প্রশ্ন: কয়েকজন ফিজিওক্র্যাটস-এর নাম লেখো।
উ: কয়েকজন ফিজিওক্র্যাটস হলেন—কুইজনে, তুগোঁ, মিরাব্যু, কেনে, নেমুর, গুর্ণে প্রমুখ।
প্রশ্ন: অভিজাত বিদ্রোহের গুরুত্ব কী ছিল?
অভিজাত বিদ্রোহের ফলে—1. রাজতন্ত্রের মর্যাদাহানি ঘটে, 2. রাজার ঈশ্বরদত্ত ক্ষমতা ম্লান হয়। 3. ফরাসি স্বৈরাচারী শাসনের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে, 4. পুরাতনতন্ত্রের ভিত্তি আলগা হয়ে যায়, 5. ফরাসি বিপ্লবের পথ প্রশস্ত হয়।
প্রশ্নঃ কবে, কার নেতৃত্বে ‘টেনিস কোর্টের শপথ” অনুষ্ঠিত হয়?
উত্তর: ‘টেনিস কোর্টের শপথ” মিরাব্যু ও অ্যাবে সিয়েসের নেতৃত্বে 1789 খ্রিস্টাব্দের 20 জুন অনুষ্ঠিত হয়।
প্রশ্ন: মিরাব্যু কে ছিলেন?
উত্তর: মিরাব্য ছিলেন ফরাসি বিপ্লবের একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা। জন্মসূত্রে অভিজাত হলেও তিনি স্টেটস্ জেনারেলে নির্বাচিত হয়েছিলেন তৃতীয় শ্রেণির প্রতিনিধি হিসেবে। 1791 খ্রিস্টাব্দের সংবিধান রচনায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ব্যক্তিগতভাবে তিনি ছিলেন একজন উদারপন্থী অভিজাত।
প্রশ্ন: ‘বুর্জোয়া বিপ্লব' বলতে কী বোঝ?
উত্তর: টেনিস কোর্টের শপথ অনুষ্ঠান চলাকালীন যাজকদের 139 জন এবং অভিজাতদের 47 জন প্রতিনিধি তৃতীয় শ্রেণিতে যোগদান করে। এইরুপ পরিস্থিতিতে 27 জুন 1789 খ্রিস্টাব্দে ভীত ও হতাশাগ্রস্ত রাজা তৃতীয় শ্রেণির মাথাপিছু ভোটদান ও একই কক্ষে বসার দাবি মেনে নেয়। এই ঘটনা ‘বুর্জোয়া বিপ্লব’ নামে পরিচিত। বুর্জোয়া বিপ্লবের মধ্য দিয়েই ফরাসি বিপ্লবের জয়যাত্রা শুরু হয়।
প্রশ্ন: সংবিধান সভা গঠনে কারা সক্রিয় ভূমিকা নেয়?
প্রথমদিকে সংবিধান সভার প্রধান দায়িত্ব পালন করেন মুনিয়ের এবং মোলেৎ। এরপর দায়িত্ব নেন বার্নেভ, ডুপো, চার্লস ল্যামেথ এবং রোবসপিয়ার। সংবিধান সভায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন সাইয়েস, লাফায়েৎ, মিরাব্যু, ট্যালির্যান্ড প্রমুখ।
প্রশ্ন: কোন ঘটনাকে ফরাসি বিপ্লবের 'ক্ষুদ্র সংস্করণ' বলা হয়?
উত্তর: ১৭ জুন, 1789 খ্রিস্টাব্দে তৃতীয় শ্রেণি অ্যাবে সিয়েসের প্রস্তাব অনুযায়ী নিজেদের জাতীয় সভা বলে ঘোষণা করে। তাই এই ঘোষণা বিপ্লবকে নবরূপ দান করে। এক আদেশনামায় তারা বলেন যে, যদি এই সভা ভেঙে দেওয়া হয় বা কোনো সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়, তবে রাজাকে কোনো কর দেওয়া হবে না। এই ঘটনাকে ঐতিহাসিক গ্রান্ট ও টেম্পারলি ফরাসি বিপ্লবের ‘ক্ষুদ্র সংস্করণ’ বলেছেন।
প্রশ্ন: ‘রাজতন্ত্রের শবযাত্রা’ বলতে কী বোঝ?
উত্তর: 1789 খ্রিস্টাব্দের 5 অক্টোবর কয়েক হাজার মহিলা খাদ্যের দাবিতে ভার্সাই শহরে উপস্থিত হয় এবং সমগ্র রাজপরিবারকে সাধারণ ঘোড়ার গাড়িতে করে প্যারিসে আসতে বাধ্য করে। কার্যত এই সময় থেকেই রাজা তৃতীয় সম্প্রদায়ের হাতে বন্দি হন। এই ঘটনাকেই ঐতিহাসিক রাইকার ‘রাজতন্ত্রের শবযাত্রা’ বলে অভিহিত করেছেন।
প্রশ্ন: ‘পাদুয়ার ঘোষণা কী?
উত্তর: 6 জুলাই 1791 খ্রিস্টাব্দে অস্ট্রিয়ার সম্রাট লিওপোল্ড পাদুয়া নামক স্থান থেকে এক ঘোষণাপত্র জারি করে ইউরোপীয় শক্তিবর্গকে ফরাসি বিপ্লবের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান। এই ঘোষণাই ‘পাদুয়ার ঘোষণা’ নামে পরিচিত।
প্রশ্ন: পিলনিৎসের ঘোষণা কী?
উত্তর: 27 আগস্ট 1791 খ্রিস্টাব্দে অস্ট্রিয়ার লিওপোল্ড ও প্রাশিয়ার উইলিয়াম ফ্রেডারিক পিলনিস নামক এক স্থান থেকে এক ঘোষণাপত্র দ্বারা ইউরোপীয় রাজাদের কাছে ফরাসি রাজতন্ত্র রক্ষার আবেদন রাখেন। এই ঘোষণাকে পিলনিৎসের ঘোষণা বলা হয়।
প্রশ্ন: 'মহা আতঙ্ক’ বা ‘মহাভয়' কী?
উত্তর: বাস্তিল দুর্গের পতনের মধ্যে দিয়ে গ্রামাঞ্চলে ব্যাপক কৃষক বিদ্রোহ শুরু হয়। তারা সামন্তপ্রভু ও জমিদারদের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান ঘটায়। সেসময় গুজব রটে যায় যে, কৃষকদের শায়েস্তা করার জন্য সামস্তপ্রভু ও জমিদারদের ভাড়াটে গুন্ডা এগিয়ে আসছে। লেফেভরেস্ত-এর মতে, এই গুজব কৃষকদের আতঙ্কিত করে তোলে। একেই ‘মহা আতঙ্ক’ বা ‘মহাভয়’ (Great Fear) বলা হয়।
প্রশ্ন : 4 আগস্ট ও 26 আগস্ট, 1789 খ্রিস্টাব্দ—ফ্রান্সের ইতিহাসে বিখ্যাত কেন?
উত্তর: সংবিধান সভা 4 আগস্ট 1789 খ্রিস্টাব্দে একটি আইন পাসের মাধ্যমে ফ্রান্সের সামন্ততন্ত্রের বিলুপ্তি ঘোষণা করে। [সামস্তপ্রথা, ভূমিদাস প্রথা, সামস্ত কর, করভি, টাইথ তুলে দেওয়া হয়।
26 আগস্ট 1789 খ্রিস্টাব্দে ব্যক্তি ও নাগরিকের অধিকার ঘোষণা করে।
প্রশ্ন: ব্যক্তি ও নাগরিক অধিকার ঘোষণাকে ‘পুরাতনতন্ত্রের মৃত্যু পরোয়ানা’ বলা হয়েছে—কেন?
উত্তর: ব্যক্তি ও নাগরিক অধিকার ঘোষণার মাধ্যমে ফ্রান্সের পুরাতনতন্ত্র ধ্বংসের চেষ্টা করা হয় এবং সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতার আদর্শ তুলে ধরা হয় যা ছিল পুরাতনতন্ত্রের আদর্শ বিরোধী। এই কারণে ঐতিহাসিক ওলার এই ঘোষণাপত্রকে পুরাতনতন্ত্রের মৃত্যু পরোয়ানা বলেছেন। শত শত বছর ধরে ফরাসি জাতি যে সকল গণতান্ত্রিক, মৌলিক ও মানবিক অধিকারে বঞ্চিত ছিল। এই ঘোষণাপত্রে তাদের এই সকল অধিকার দানের প্রতিশ্রুতি দেয়। এই ঘোষণাপত্রটি যথার্থই পুরাতনতন্ত্রের অবসানের প্রতীক ছিল।
প্রশ্ন: 1789 খ্রিস্টাব্দের ফরাসি বিপ্লবের মূল আদর্শগুলি কী ছিল?
উত্তর: 1789 খ্রিস্টাব্দের ফরাসি বিপ্লবের মূল আদর্শগুলি ছিল– সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতা; অর্থাৎ জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্রবাদ ও ব্যক্তিস্বাধীনতা।
প্রশ্ন: নতুন সংবিধান অনুযায়ী আইনসভায় কোন্ কোন্ দলের অস্তিত্ব ছিল?
উত্তর: নতুন সংবিধান অনুযায়ী আইনসভায় 4টি দলের অস্তিত্ব ছিল। এগুলি হল— 1. ফিউল্যান্ট বা দক্ষিণপন্থী নিয়মতান্ত্রিক গোষ্ঠী 2. জিরভিন 3. জ্যাকোবিন এবং 4. মডারেট বা মধ্যপন্থী দল।
প্রশ্ন: অ্যাসাইনেট কী?
উত্তর: ফরাসি সংবিধান সভা আর্থিক সংকট মোচনের জন্য ফ্রান্সের গির্জার সকল ভূ-সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে (1790 খ্রিস্টাব্দ) এবং তা আমানত রেখে তার পরিবর্তে এক ধরনের কাগজের নোট প্রচলন করে। এই কাগজের নোটকে অ্যাসাইনেট বলা হয়।
প্রশ্ন: নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্র কীভাবে ‘নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্রে’ পরিণত হয়?
উত্তর: ফরাসি সংবিধান সভা নিরঙ্কুশ স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রকে নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্রে রূপান্তরিত করেছিল। তাঁর দৈব অধিকারের দাবি নাকচ করা হয়। তিনি আইন রচনা, আইনসভার ওপর নিয়ন্ত্রণ, রাজ্যের কর্মচারী ও বিচারকদের নিয়োগ এবং ইচ্ছামতো রাজকোশ ব্যবহারের অধিকার হারান। এইভাবে নিয়ম বা আইনের বন্ধনে ফরাসি রাজতন্ত্রকে বাঁধা হয়।
প্রশ্ন: তুর্গের যুদ্ধ কবে, কাদের মধ্যে হয়?
উত্তর: 20 এপ্রিল, 1792 খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্স ও অস্ট্রিয়ার মধ্যে তুর্গের যুদ্ধ হয়। ফ্রান্স পরাজিত হয়।
প্রশ্ন: ভামির যুদ্ধ কবে হয়, কাদের মধ্যে হয়?
উত্তর: 20 সেপ্টেম্বর, 1792 খ্রিস্টাব্দে অস্ট্রো-প্রাশিয়ান বাহিনীর সঙ্গে ফরাসি জাতীয় বাহিনীর। অস্ট্রো-প্রাশিয়ান বাহিনী পরাজিত হয়।
প্রশ্ন: 'সিভিল লিস্ট' (Civil List) কী?
উত্তর: ফরাসি সংবিধান সভা রাজার সমস্ত ভূ-সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে রাজপরিবারের ব্যয় নির্বাহের জন্য একটি খরচের তালিকা প্রস্তুত করে। এই তালিকাকেই ‘সিভিল লিস্ট' বলা হয়।
প্রশ্ন: ‘সক্রিয়’ ও ‘নিষ্ক্রিয়’ নাগরিক বলতে কী বোঝ?
উত্তর: ফরাসি সংবিধান সভা সম্পত্তির ভিত্তিতে জনগণকে ‘সক্রিয়’ ও ‘নিষ্ক্রিয়’—এই দুভাগে ভাগ করে। যারা নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পত্তির অধিকারী বা কমপক্ষে 3 দিনের আয়কর দিতে সক্ষম এবং বয়স 25 বছর, তারাই ‘সক্রিয়’ নাগরিক। সম্পত্তিহীনরা হলেন ‘নিষ্ক্রিয়’ নাগরিক। সক্রিয় নাগরিকরাই আইনসভার নির্বাচনে ভোটাধিকার পায়। নিষ্ক্রিয় নাগরিকদের ভোটাধিকার ছিল না।
প্রশ্ন: ‘লিট দ্য জাস্টিস' (Lit de Justice) কী?
উত্তর: প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী ফ্রান্সে রাজকীয় আদেশগুলি প্যারিস পার্লামেন্টে নথিভুক্ত করতে হত। পার্লামেন্ট নথিভুক্ত করতে অস্বীকার করলে রাজা যে বিশেষ অধিকার বলে বিশেষ সভা ডেকে রাজাদেশ অনুমোদন করে দিতেন, তাকে ‘লিট দ্য জাস্টিস’ বলা হত।
প্রশ্ন: ‘সাসপেনসিভ ভেটো’ (Suspensive Veto) বা ‘সাময়িক নাকচ ক্ষমতা বলতে কী বোঝ?
উত্তর: ফরাসি সংবিধান সভা রাজাকে এই ক্ষমতা দিয়েছিল। এতে স্থির হয় যে, রাজা আইন বাতিল করতে পারবেন না। তবে ‘সাসপেনসিভ ভেটো’ প্রয়োগ করে কোনো আইন সাময়িক স্থগিত করতে পারবেন। তবে কোনো আইন তিনবার আইনসভা কর্তৃক গৃহীত হলে রাজা তা মেনে নিতে বাধ্য থাকবেন।
প্রশ্ন: প্যারিসের ন্যাশনাল গার্ড বা জাতীয় রক্ষী বাহিনী কেন গঠন করা হয়েছিল?
উত্তর: বাস্তিল দুর্গের পতনের পর লাফায়েতের নেতৃত্বে প্যারিসের ‘ন্যাশনাল গার্ড’ বা ‘জাতীয় রক্ষীবাহিনী’ গড়ে উঠেছিল। পৌরশাসনে গুরুত্বপূর্ণ বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটানো ছিল এই বাহিনীর মুখ্য উদ্দেশ্য।
প্রশ্নঃ কোন্ কোন্ কারণে রাজা ষোড়শ লুইকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল?
উত্তর: 1. ফ্রান্স থেকে পলাতক রাজতন্ত্রীদের সাহায্যদান, 2. নতুন সংবিধান বাতিলের অপচেষ্টা এবং সেনাবাহিনীর ঐক্য ও শৃঙ্খলা রক্ষার প্রতি উদাসীনতা ইত্যাদির দায়ে রাজাকে অভিযুক্ত করা হয়।
প্রশ্ন: দ্বিতীয় ফরাসি বিপ্লব বলতে কী বোঝ?
উত্তর : জ্যাকোবিনদের নেতৃত্বে উত্তেজিত জনতা 10 আগস্ট, 1792 খ্রিস্টাব্দের টুইলারিস রাজপ্রাসাদ আক্রমণ করে রাজার দেহরক্ষী দলকে হত্যা করে এবং রাজতন্ত্র উচ্ছেদের দাবি জানায়। শেষ পর্যন্ত রাজাকে ক্ষমতাচ্যুত করে টেম্পল দুর্গে বন্দি রাখা হয়। এর ফলে কার্যত রাজতন্ত্র ভেঙে পড়ে এবং রাজার অভাবে 1791 খ্রিস্টাব্দের সংবিধান বাতিল হয়ে যায়। এই ঘটনাকে ঐতিহাসিক লেফেভর 'দ্বিতীয় ফরাসি বিপ্লব’ বলে অভিহিত করেছেন।
প্রশ্ন: কোন্ কোন্ দেশ নিয়ে এবং কেন ফ্রান্স বিরোধী কোয়ালিশন (শক্তিজোট) গঠিত হয়?
উত্তর: ইংল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, প্রাশিয়া, স্পেন, পোর্তুগাল, সার্ডিনিয়া, নেপলস্ প্রভৃতি দেশ নিয়ে 1793 খ্রিস্টাব্দে প্রথম ফ্রান্স বিরোধী কোয়ালিশন গঠিত হয়। ইউরোপের রাজতান্ত্রিক দেশগুলি ফরাসি বিপ্লবের অগ্রগতি ও বিপ্লব প্রসূত ভাবধারা প্রতিরোধের জন্য এই কোয়ালিশন গড়ে তোলা হয়।
প্রম: গিলোটিন কী? কে আবিষ্কার করেন?
উত্তর: গিলোটিন হল শিরশ্ছেদ করার একটি যন্ত্র। এই যন্ত্রে দুটি কাঠের লাঠির মাঝে ঝুলন্ত অবস্থায় ভারী লোহার কাটারি থাকত। ওপরে দিক থেকে নেমে এটি শায়িত মানুষের শিরশ্ছেদ করত।
এই যন্ত্রের আবিষ্কারক ছিলেন ডঃ গিলোটিন নামে ফরাসি চিকিৎসক।
প্রশ্ন: ফ্রান্সের আর্থিক সংকট মোচনের জন্য ষোড়শ লুই কোন্ কোন্ ব্যক্তিকে অর্থমন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত করেছিলেন?
উত্তর: ফ্রান্সের আর্থিক সংকট মোচনের জন্য ষোড়শ লুই তুর্গো, নেকার, ক্যালোন, ব্রিয়াঁকে অর্থমন্ত্রী নিযুক্ত করে আর্থিক সংস্কারের চেষ্টা করেছিলেন। যদিও তার এই প্রচেষ্টা ফলপ্রসূ হয়নি।
প্রশ্ন: সংবিধান রচনার আগে ফরাসি সংবিধান সভার দুটি গুরুত্বপূর্ণ কাজের উল্লেখ করো।
উত্তর: মূল সংবিধান রচনার আগে ফরাসি সভা দুটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করে। যেমন— 1) 4 আগস্ট, 1789 খ্রিস্টাব্দে সামস্ততন্ত্রের অবসানের কথা ঘোষণা করে, 2) 26 আগস্ট, 1789 খ্রিস্টাব্দে ব্যক্তি ও নাগরিকের অধিকার ঘোষণা করে।
প্রশ্ন: ‘অ্যাসেম্বলি অব নোটেবল্স' (Assembly of Notables) বলতে কী বোঝায়?
উত্তর: অর্থনৈতিক সংকট সামলে দেওয়ার জন্য অর্থমন্ত্রী ক্যালোনের পরামর্শে রাজা ষোড়শ লুই যাজক, অভিজাত এবং তৃতীয় শ্রেণির প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সভা গঠন করেন, যা ‘অ্যাসেম্বলি অব নোটেব্লস’ বা ‘গণ্যমান্যদের পরিষদ' নামে পরিচিত। এই সভায় সিদ্ধান্ত হয়, সংস্কার গ্রহণ করা হবে কিনা তা ঠিক করবে স্টেট্স জেনারেল।
প্রশ্ন: পৌরবিপ্লব কী?
উত্তর: বাস্তিল দুর্গের পতনের পর বুর্জোয়ারা প্যারিসে নতুন পৌরশাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলে, এই ঘটনা পৌরবিপ্লব নামে পরিচিত। পৌরবিপ্লবের ফলে পৌরপরিষদগুলি গণতান্ত্রিক ও জনদরদি কর্মসূচি গ্রহণ করতে বাধ্য হয়।
প্রিয়: ফ্রান্সে ক'টি বিপ্লব হয়েছিল ও কী কী?
উত্তর: অভিজাত বিপ্লব, বুর্জোয়া বিপ্লব, পৌরগণ বিপ্লব, কৃষক বিপ্লব ও সাঁ কুলোৎ বিপ্লব—এই 5টি বিপ্লব ফ্রান্সে হয়েছিল।
প্রশ্ন: বুর্জোয়া বিপ্লবকে ফরাসি বিপ্লবের একটি ধাপ বলা হয় কেন ?
উত্তর: বুর্জোয়া বিপ্লব দ্বারা স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের পতন ত্বরান্বিত হয়। ফ্রান্সের যাজক ও অভিজাত শ্রেণির চিরাচরিত বৈষম্যমূলকগুলি নাকচ করার কাজে বুর্জোয়া শ্রেণি হাত দেয়। বুর্জোয়া বিপ্লবই জাতীয় বিপ্লবের পথ প্রস্তুত করেছিল। এই কারণে বুর্জোয়া বিপ্লবকে ফরাসি বিপ্লবের একটি ধাপ বলা হয়।
প্রশ্ন: রাজা ষোড়শ লুই কেন দেশ থেকে পালানোর চেষ্টা করেছিলেন?
উত্তর: বিশ্বের থেকে সাহায্য পাবার আশায় 20 জুন, 1791 খ্রিস্টাব্দে রাজা ষোড়শ লুই সপরিবারে ছদ্মবেশে দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ছদ্মবেশ থাকা সত্ত্বেও ফরাসি জনগণ রাজাকে চিনতে পারেন এবং সীমান্তবর্তী ভেরেন্নে গ্রামে তিনি ধরা পড়েন। অতঃপর চরম লাঞ্ছনার মধ্যে প্যারিসে ফিরে আসতে হয়।
প্রশ্ন: তুর্গো কে ছিলেন?
উত্তর: তুর্গো ছিলেন ফরাসি অর্থনীতিবিদ। ফ্রান্সের অর্থনৈতিক সংকট মোচনের জন্য ফরাসি সম্রাট ষোড়শ লুই তুর্গোকে অর্থমন্ত্রী পদে নিযুক্ত করেন (2774–'76 খ্রি.)। ফিজিওক্র্যাট্স মতবাদ অনুযায়ী তিনি রাজস্ব সংস্কার করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অভিজাত সম্প্রদায়ের প্রবল বিরোধিতায় সংস্কারকার্য ব্যর্থ হয়।
প্রশ্ন: নেকার কে ছিলেন?
উত্তর: নেকার ছিলেন জেনিভার একজন ব্যাংক মালিক। রাজা ষোড়শ লুই তুর্গোর পর নেকারকে অর্থমন্ত্রী নিযুক্ত করেন (2776–2781 খ্রি.)। তিনি অনাবশ্যক ব্যয় বন্ধ করে রাজকোশে অর্থ সঞ্চয়ের চেষ্টা করেন। নেকারও অভিজাত শ্রেণির বিরাগভাজন হওয়ায় তাঁকে পদচ্যুত হতে হয়।
প্রশ্ন: রাজা ষোড়শ লুই এর কী শাস্তি হয়েছিল?
উত্তর: জাতীয় কনভেনশন ষোড়শ লুই এর বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার অভিযোগ এনেছিল। কনভেনশনে জ্যাকোবিন দলের দাপটে বিচারের প্রহসন করে ষোড়শ লুই-এর মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এবং 21 জানুয়ারি, 1793 খ্রিস্টাব্দে গিলোটিনে তার শিরশ্ছেদ করা হয়।
প্রশ্ন: কোনো দুটি বৈদেশিক ঘটনা ফরাসি বিপ্লবকে প্রভাবিত করেছিল?
উত্তর: ইংল্যান্ডের গৌরবময় বিপ্লব (১৬৮৮ খ্রিস্টাব্দে) এবং আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ (১৭৭৬ খ্রিস্টাব্দে)–এই দুটি বৈদেশিক ঘটনা ফরাসি বিপ্লবকে প্রভাবিত করেছিল।
প্রশ্ন: আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ কীভাবে ফরাসি বিপ্লবকে প্রভাবিত করেছিল?
উত্তর: আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগদানকারী ফরাসি সৈনিকরা স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকারের ঘোষণা ফ্রান্সে বহন করে এনে ফরাসি বিপ্লবের পথ প্রশস্ত করে দেয়।
প্রশ্ন: কারা, কবে ফ্রান্সে প্রথম প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে?
ফ্রান্সের জাতীয় মহাসভা (ন্যাশনাল কনভেনশন) 22 সেপ্টেম্বর, 1732 খ্রিস্টাব্দে রাজতন্ত্রের উচ্ছেদ ঘটিয়ে ফ্রান্সে প্রথম প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে।
প্রশ্ন: জাতীয় মহাসভা (ন্যাশনাল কনভেনশন) কী ?
উত্তর: আইনসভা রাজতন্ত্র মুলতুবি করে ষোড়শ লুই বন্দি করলে ফ্রান্সের জন্য একটি নতুন সংবিধানের প্রয়োজন হয়। অতঃপর গণভোটের মাধ্যমে 1792 খ্রিস্টাব্দে যে নতুন আইনসভা গঠিত হয় তার নাম জাতীয় মহাসভা বা ন্যাশনাল কনভেনশন। এই সভার ওপর ফ্রান্সের নতুন সংবিধান রচনা দায়িত্ব অর্পিত হয়।
প্রশ্ন: জিরন্ডিস্ট কাদের বলা হয়?
উত্তর: জ্যাকোবিনদের একটি গোষ্ঠী ব্রিসোর নেতৃত্বে একটি দল গঠন করে, প্রথমে তারা ‘ব্রিসোপন্থী’ নামে পরিচিত ছিল। পরে তারা জিরন্ডিন নামে পরিচিতি লাভ করে, কারণ এই দলের সদস্যরা জিরন্ত প্রদেশ থেকে নির্বাচিত হয়েছিল। জিরন্ডিস্টরা ছিল রাজতন্ত্রবিরোধী বা প্রজাতন্ত্রবাদী।
প্রশ্ন: টিপু সুলতানের সঙ্গে জ্যাকোবিন ক্লাবের কী সম্পর্ক ছিল?
উত্তর: টিপু সুলতান ছিলেন মহীশূরের এক স্বাধীন শাসক। ইংরেজ শক্তিকে প্রতিহত করার জন্য তিনি ফ্রান্স, তুরস্ক, আফগানিস্তান, আরব প্রভৃতি দেশে দূত পাঠান। এই দূত মারফত তিনি ফরাসি জ্যাকোবিন ক্লাবের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং সদস্যপদ গ্রহণ করেন। ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের বিরোধী ছিল সর্বজনবিদিত টিপু সুলতান। এই বিরোধের সুযোগ নিয়ে ফরাসি সহযোগিতায় ইংরেজদের প্রতিরোধ করতে চেয়েছিলেন।
প্রশ্ন: জ্যাকোবিন ও জিরভিন দলের মধ্যে বিরোধের মূল কারণ কী ছিল
উত্তর: জ্যাকোবিন ও জিরন্ডিন দলের মধ্যে বিরোধের মূল কারণ ছিল বিপ্লব সম্পর্কে পরস্পর বিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি। জিরন্ডিন দল মনে করত, ফ্রান্সে বিপ্লবের প্রয়োজন ফুরিয়ে গিয়েছে। তারা চেয়েছিল বিপ্লবকে গোটা ইউরোপে ছড়িয়ে দিতে। অন্যদিকে জ্যাকোবিন দল মনে করত, বিপ্লবের অবসান হয়নি এবং এখনও অনেক কাজ বাকি আছে। তারা বিপ্লবকে জয়যুক্ত করতে চেয়েছিল।
প্রশ্ন: রাজার (ষোড়শ লুই) সঙ্গে জ্যাকোবিন ও জিরভিনদের মতবিরোধের কারণ কী?
উত্তর: রাজার সঙ্গে জ্যাকোবিন ও জিরন্ডিনদের বিরোধ শুরু হয় তিনটি বিল পাস হওয়াকে কেন্দ্র করে। বিল তিনটি হল— 1. যেসব যাজক সংবিধান অমান্য করবেন, 2. দেশত্যাগী অভিজাতদের দুমাসের মধ্যে ফ্রান্সে ফিরে আসতে হবে নতুবা তাদের সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে হবে এবং 3. দেশদ্রোহিতার অভিযোগে যে-কোনো অভিজাতকে মৃত্যুদণ্ড দিতে হবে। এই বিল তিনটি অনুমোদনের জন্য রাজার কাছে পাঠানো হলে রাজা ‘ভেটো’ প্রয়োগ করে স্থগিত রাখেন। ফলে রাজার সঙ্গে জ্যাকোবিন ও জিরভিন দলের বিরোধ চরমে ওঠে।
প্রশ্ন: সন্ত্রাসের রাজত্ব বলতে কী বোঝ?
উত্তর: ফ্রান্সের অভ্যন্তরে বিপ্লব বিরোধী শক্তির তৎপরতা এবং বিদেশি আক্রমণ সমগ্র ফ্রান্সের ভেতরে ও বাইরে এক সংকটময় অবস্থান সৃষ্টি করে। এই পরিস্থিতি থেকে দেশকে রক্ষা করতে জাতীয় প্রতিনিধি সভা এক জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে এবং ফ্রান্সে এক কঠোর দমনমূলক শাসন প্রবর্তন করেন। এই শাসনব্যবস্থাকে ‘সন্ত্রাসের রাজত্ব’ বলা হয়েছে। যার স্থায়িত্বকাল ছিল 2জুন, 1793 খ্রিস্টাব্দ–27 জুলাই 1794 খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত।
প্রশ্ন: সন্ত্রাসের রাজত্ব কেন প্রবর্তন করা হয়েছিল?
উত্তর: একদিকে বহিঃশত্রুর আক্রমণ এবং অপরদিকে অভ্যন্তরীণ প্রতিবিপ্লবী আন্দোলনের ফলে ফ্রান্স এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিল। এই পরিস্থিতির হাত থেকে দেশকে রক্ষা করে বিপ্লবকে দৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করার জন্য ‘সন্ত্রাসের রাজত্ব’ নামক নৃশংস অধ্যায়ের সূচনা করা হয়েছিল। এ ছাড়াও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, ফরাসি সেনাপতি ডুমারিজ এর বিশ্বাসঘাতকতা প্রভৃতি এক অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছিল।
প্রশ্ন: সন্ত্রাসের রাজত্বের বিভিন্ন সংগঠনগুলি কী কী ?
উত্তর: ফ্রান্সের বুকে জাতীয় মহাসভা (ন্যাশনাল কনভেনশন) সন্ত্রাসের শাসন চালু করেন। সন্ত্রাসের শাসনের সংগঠনগুলি পাঁচভাগে বিভক্ত ছিল। যথা— 1. জন নিরাপত্তা সমিতি, 2. সাধারণ নিরাপত্তা সমিতি, 3. সন্দেহের আইন, 4. বিপ্লবী বিচারালয় এবং 5. বিপ্লবের বধ্যভূমি।
প্রশ্ন: সন্ত্রাসের শাসনকালের চারজন নেতার নাম লেখো।
সন্ত্রাসের শাসনকালে চারজন নেতা ছিলেন সেন্টজাস্ট, দাঁতো, কারনট্, রোবসপিয়ার।
প্রশ্ন: সন্ত্রাসের বলি হয়েছেন এমন কয়েকজন বিখ্যাত ব্যক্তির নাম লেখো।
উত্তর: সন্ত্রাসের রাজত্বে প্রায় 50 হাজার নরনারীকে গিলোটিনে হত্যা করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে কয়েকজন বিখ্যাত ব্যক্তি হলেন—মাদাম রোল্যান্ড, মাদাম দ্য বেরি, রানি অ্যাতোয়ানেৎ, দাঁতন, বিজ্ঞানী ল্যাভেসিয়র, হিবার্ট, রাজা ষোড়শ লুই, জেনারেল ওয়েস্টারম্যান প্রমুখ।
প্রশ্ন: Law of Maximum' (সর্বোচ্চ মূল্য আইন) কী?
উত্তর: সন্ত্রাসের রাজত্বকালে দরিদ্র জনসাধারণের স্বার্থে সর্বোচ্চ মূল্যের আইন কঠোরভাবে কার্যকরী করা হয়। এই আইনের মাধ্যমে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ও খাদ্যবস্তুর দর বেঁধে দেওয়া হয়। সন্ত্রাসের রাজত্বের একটি ইতিবাচক দিক ছিল Law of Maximum' এর প্রয়োগ।
প্রশ্ন: লাল সন্ত্রাস বলতে কী বোঝ?
উত্তর: জ্যাকোবিন দলের পরিচালনায় এবং রোবসপিয়ারের নেতৃত্বে 2 জুন 1793–27 জুলাই, 1794 খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ফ্রান্সে যে নৃশংস সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছিল, তাকে লাল সন্ত্রাস বলা হত।
প্রশ্ন: ‘থমিডোরীয় প্রতিক্রিয়া’ বলতে কী বোঝ?
উত্তর: রোবসপিয়ারের বিরোধীরা বিপ্লবী ক্যালেন্ডার অনুযায়ী 9 থমিডোর (27 জুলাই, 1794 খ্রিস্টাব্দে) রোবসপিয়ারকে ক্ষমতাচ্যুত করে এবং পরের দিন অর্থাৎ 10 থর্মিডোর তাঁকে গিলোটিনে হত্যা করে। এর ফলে সন্ত্রাসের অবসান ঘটে এবং বুর্জোয়ারা শাসনক্ষমতা লাভ করে। এই ঘটনাই ‘থমিডোরীয় প্রতিক্রিয়া’ নামে খ্যাত।
প্রশ্ন: দাঁতো কে ছিলেন ?
উত্তর: দাঁতো ছিলেন ফ্রান্সে সন্ত্রাসের রাজত্বের একজন সংগঠক এবং রোবসপিয়ারের সহযোগী। তিনি পেশায় একজন আইনজীবী ছিলেন। 1790 খ্রিস্টাব্দে তিনি ফ্রান্সে কর্ডেলিয়ের ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেন। সন্ত্রাসের রাজত্বের সময় রোবসপিয়ারের সঙ্গে মতানৈক্যের কারণে গিলোটিনে তাঁকে প্রাণ দিতে হয়।
