প্রশ্ন: জ্যাকোবিন শাসন বলতে কী বোঝ??
উত্তর: জিরন্ডির দলের পর্তনের মধ্য দিয়ে জ্যাকোবিন দল ফ্রান্সের শাসন ও যুদ্ধনীতি পরিচালনায় অপ্রতিহত ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ওঠে। এই দলের কর্মসূচি ছিল উগ্র, সংগঠন ছিল শক্তিশালী এবং নেতৃত্ব ছিল সুসংহত। এই দলের সর্বাধিনায়ক ছিলেন রোবসপিয়র।
ক্ষমতা লাভ : রাজার মৃত্যুদণ্ড ও রাজতন্ত্রের পতনের পর ন্যাশনাল কনভেনশনে ক্ষমতাসীন জিরন্ডিস্টদের হঠিয়ে 2 জুন 1793 খ্রিস্টাব্দে সাঁ কুলোৎ সমর্থনপুষ্ট জ্যাকোবিন দলের নিরঙ্কুশ একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। জ্যাকোবিন দলের নেতৃত্বে স্বৈরতান্ত্রিক ও একনায়কতান্ত্রিক শাসন প্রবর্তিত হয়।
সন্ত্রাসের শাসন কায়েম : রাজার প্রাণদণ্ডের পর অভ্যন্তরীণ প্রতিবিপ্লবী আন্দোলন ও বৈদেশিক আক্রমণে যখন ফ্রান্স জেরবার তখন সদ্য প্রতিষ্ঠিত ফরাসি প্রজাতন্ত্রকে রক্ষা করার জন্য সবরকম দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয় জ্যাকোবিন দল। অতঃপর দেশের নিরাপত্তা, বিপ্লবের স্থায়িত্ব ও প্রতিবিপ্লবী শক্তির ধ্বংস-সাধনের লক্ষ্যে জ্যাকোবিন পরিচালিত ন্যাশনাল কনভেনশন দেশজুড়ে এক কঠোর শাসনব্যবস্থা কায়েম করেন। প্রবল ভীতি ও সন্ত্রাস সৃষ্টির মাধ্যমে এই বিপ্লবী সরকার ফ্রান্সে যে শাসন জারি রাখে তা ইতিহাসে সন্ত্রাসের শাসন (Region of Terror) নামে পরিচিত।
জনকল্যাণমূলক কাজ: সন্ত্রাসের রাজত্বকালে জ্যাকোবিন দল মজুতদারি ও কালোবাজারির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ, নতুন মাপ ও ওজন পদ্ধতির ব্যবহার দশমিক পদ্ধতির প্রচলন, সর্বনিম্ন মজুরি আইন, সর্বোচ্চ মূল্যের আইন প্রয়োগ ইত্যাদির মাধ্যমে ফ্রান্সে নবজীবনের সূচনা করে।
প্রশ্ন: ফ্রান্সে কেন সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছিল?
উত্তর: ষোড়শ লুই এর প্রাণদণ্ডের পর ফ্রান্সে এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। একদিকে বহিঃশত্রুর আক্রমণ ও অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ প্রতিবিপ্লবী আন্দোলনের সূচনা হয়। জাতীয় জীবনের এই সংকটময় পরিস্থিতিতে বিপ্লবী নেতৃত্ববৃন্দ দেশে এক কঠিন এবং কঠোর শাসনব্যবস্থা চালু করেন, যা ‘সন্ত্রাসের রাজত্ব' (Region of Terror) নামে পরিচিত।
সন্ত্রাসের রাজত্বের প্রবর্তনের কারণ—
বহিঃশত্রুর আক্রমণ : রাজার প্রাণদণ্ডের পর ইউরোপের রাজতান্ত্রিক দেশগুলি (অস্ট্রিয়া, প্রাশিয়া, ইংল্যান্ড, স্পেন, পোর্তুগাল, সার্ডিনিয়া) ফ্রান্স বিরোধী শক্তিজোট গঠন করে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে আক্রমণ শুরু করে এবং ফ্রান্স ইউরোপীয় দেশগুলির সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।
রাজতন্ত্রের সমর্থনে বিদ্রোহ: রাজার প্রাণদণ্ডের প্রতিবাদে দেশের নানা অঞ্চলে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। ফ্রান্সের 83 টি প্রদেশের মধ্যে 60 টি প্রদেশে বিদ্রোহ দেখা দেয়। এই বিদ্রোহকে প্রতিবিপ্লব বলা হয়েছে।
দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি : এই সময় নিত্য প্রয়োজনীয় প্রতিটি জিনিসের দাম অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পায়। সাঁ কুলোৎ জনতা প্রকাশ্যে প্রজাতন্ত্রী সরকারের বিরোধিতা করতে থাকে।
ডুমোরিজ এর বিশ্বাসঘাতকতা : দেশের এই সংকটময় মুহূর্তে ফরাসি সেনাপতি ডুমোরিজ দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে অস্ট্রিয়ার পক্ষে যোগ দেন। এই ঘটনা জিরন্ডিন দলের ব্যর্থতা প্রমাণ করে।
সন্ত্রাসের রাজত্ব প্রবর্তন : অতঃপর দেশের নিরাপত্তা বিপ্লবের স্থায়িত্ব ও অভ্যন্তরীণ প্রতিবিপ্লবী শক্তির ধ্বংসসাধনের লক্ষ্যে জ্যাকোবিন পরিচালিত ন্যাশনাল কনভেনশন দেশ জুড়ে এক কঠিন ও নৃশংস শাসনব্যবস্থা কায়েম করে, যা ‘সন্ত্রাসের রাজত্ব’ (Region of Terror) নামে পরিচিত। যার স্থায়িত্বকাল ছিল 2 জুন 1793 খ্রিস্টাব্দ থেকে 27 জুলাই 1794 খ্রিস্টাব্দ। এই শাসনব্যবস্থার রূপকার ছিলেন রোবসপিয়র।
প্রকৃতপক্ষে বিদেশি শত্রুর আক্রমণ ও অভ্যন্তরীণ প্রতিবিপ্লব দমনের জন্য সন্ত্রাস ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। প্রবল ভীতি ও সন্ত্রাস সৃষ্টির মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছিল।
