Class 9 History Chapter 3 (ঊনবিংশ শতকের ইউরোপ : রাজতান্ত্রিক ও জাতীয়তাবাদী ভাবধারার সংঘাত) সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর Questions And Answers

 প্রশ্ন: জাতি রাষ্ট্র বলতে কী বোঝ?

উত্তর: রাষ্ট্রের অধীন সুগঠিত এক জনসমাজ হল জাতি এই জাতিকে নিয়ে গড়ে ওঠা রাষ্ট্রের মূল দুটি বৈশিষ্ট্য হল জনসমষ্টি ও নির্দিষ্ট ভূখণ্ড। সাংস্কৃতিক ও জাতিগত স্বতন্ত্রযুক্ত একটি জাতির সার্বভৌম কর্তৃত্বযুক্ত ভৌগোলিক অঞ্চল জাতি-রাষ্ট্র নামে পরিচিত। পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতকে ইউরোপে জাতি রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটেছিল।



প্রশ্ন: জাতি-রাষ্ট্রের উদ্ভবের দুটি কারণ লেখো।

উত্তর: জাতি-রাষ্ট্রের উদ্ভবের দুটি কারণ হল ১) ১৬৪৮ খ্রিস্টাব্দে ইউরোপে সম্পাদিত ওয়েস্টফেলিয়া চুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্রগুলির ওপর থেকে পোপের কর্তৃত্বের মুক্তি ঘটে; যা রাষ্ট্রকে সার্বভৌম করে তুলেছিল। ২) জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মাধ্যমে দেশ থেকে বিদেশি শাসনের অবসান ও জাতির ঐক্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেও জাতি-রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটে।



প্রশ্ন:  উনিশ শতকে ইউরোপে পুরাতনতন্ত্র কী? বিপ্লব প্রসূত মতাদর্শগুলি কী ছিল?

উত্তর: উনিশ শতকে ফরাসি বিপ্লব ও নেপোলিয়ন রাজতন্ত্রগুলিকে ধ্বংস করতে চেষ্টা করলেও সম্পূর্ণভাবে তাকে নির্মূল করতে পারেনি বরং নেপোলিয়নের পতনের পর রাজতন্ত্র অর্থাৎ পুরাতনতন্ত্র বলতে বোঝায় রাজতন্ত্র, অভিজাততন্ত্র ও চার্চতন্ত্র।

অন্যদিকে ফরাসি বিপ্লব প্রসূত নতুন মতাদর্শগুলি ছিল জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, প্রজাতন্ত্র প্রভৃতি।



প্রশ্ন: উনিশ শতকের ইউরোপে পরিবর্তনমুখী ও পরিবর্তন বিরোধী শক্তি বলতে কী বোঝ?

উত্তর: উনিশ শতকে নেপোলিয়নের পতনের পর ইউরোপে উদ্ভূত পরিবর্তনমুখী শক্তি ছিল জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, উদারনীতিবাদ, ও সমাজতন্ত্র পক্ষান্তরে পরিবর্তন বিরোধী শক্তি ছিল রাজতন্ত্র, অভিজাততন্ত্র ও চার্চতন্ত্র।



প্রশ্ন: উনিশ শতকের প্রথমার্ধে কীভাবে ইউরোপে রাজতন্ত্রের সংরক্ষণ করা হয়েছিল?

উত্তর: উনিশ শতকের প্রথমার্ধে ইউরোপে রাজতন্ত্রের সংরক্ষণ যেভাবে করা হয়েছিল, তা হল- ভিয়েনা কংগ্রেসের (১৮১৫ খ্রি.) ন্যায্য অধিকার নীতি অনুসারে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রাজতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয়। মেটারনিখ্ পদ্ধতির মাধ্যমে রাজতন্ত্র বিরোধী জাতীয়তাবাদী ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে প্রতিহত করে রাজতন্ত্রকে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়।



প্রশ্ন: ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দের পরবর্তীকালের ইউরোপে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের কেন্দ্রগুলিকে চিহ্নিত করো।

উত্তর: ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দের পরবর্তীকালের ইউরোপে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের কেন্দ্রগুলি ছিল : পোল্যান্ড, গ্রিস, স্পেন, বেলজিয়াম, জার্মানি ও ইটালি।



প্রশ্ন: ভিয়েনা সম্মেলন কবে, কেন আহূত হয়েছিল?

উত্তর: ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে ভিয়েনা সম্মেলন আহূত হয়েছিল। নেপোলিয়নের পতনের ফলে উদ্ভূত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ইউরোপের রাষ্ট্রব্যবস্থার পুনর্গঠন ও পুনর্বণ্টনের উদ্দেশ্যে ভিয়েনা সম্মেলন বসেছিল।



প্রশ্ন: ‘বিগফোর’ বলতে কাদের বোঝায়?

উত্তর: ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনাতে ইউরোপের প্রায় সমস্ত দেশ (তুরস্ক ছাড়া) উপস্থিত থাকলেও মূলত চারটি শক্তি ছিল প্রধান অস্ট্রিয়া (রাজা প্রথম ফ্রান্সিস ও প্রধানমন্ত্রী প্রিন্স মেটারনিখ্) রাশিয়া (জার প্রথম আলেকজান্ডার) প্রাশিয়া (সম্রাট ফ্রেডারিক উইলিয়াম, চ্যান্সেলার হার্ডেনবর্গ ও মন্ত্রী হামবোল্ড) ইংল্যান্ড (পররাষ্ট্র মন্ত্রি ক্যাসলরি ও সেনাপতি ওয়েলিংটন) এই চার শক্তিকে বলা হয় বিগফোর।



প্রশ্ন: বিশ্বের প্রথম আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সম্মেলন কবে কোথায় বসেছিল?

উত্তর: বিশ্বের প্রথম আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সম্মেলন হল ভিয়েনা সম্মেলন। এই সম্মেলনটি ১৮১৪-১৫ খ্রিস্টাব্দে অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনাতে বসেছিল। ভিয়েনার নামানুসারে এই সম্মেলনটির নাম হয় ভিয়েনা সম্মেলন।



প্রশ্ন: ভিয়েনা সম্মেলন বা ভিয়েনা কংগ্রেস কী? 

উত্তর: ১৮১৪ খ্রিস্টাব্দে নেপোলিয়নের পতনের পর রণক্লান্ত ইউরোপের রাষ্ট্রনায়করা তৎকালীন ইউরোপের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা, ইউরোপের রাষ্ট্র ব্যবস্থার পুনবিনাস এবং ভবিষ্যতের কর্মপন্থা ঠিক করার জন্য ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দের ১লা নভেম্বর ভিয়েনাতে যে আন্তর্জাতিক সম্মেলনে মিলিত হন তা ভিয়েনা সম্মেলন নামে পরিচিত। এই সম্মেলনের সভাপতি ছিলেন প্রিন্স মেটারনিথ্ এবং মূখ্য সচিব ছিলেন অস্ট্রিয়ার ফ্রিডরিখ কনগেন। এই সম্মেলনে তুরস্কের সুলতান ও রোমের পোপ ছাড়া ইউরোপের প্রায় প্রতিটি দেশ অংশ নিলেও অস্ট্রিয়া, রাশিয়া, ইংল্যান্ড ও প্রাশিয়াই ছিল মূল চালিকাশক্তি। এই সম্মেলনের লক্ষ্য ছিল ইউরোপের পুর্নগঠন, শান্তিপ্রতিষ্ঠা ও নেপোলিয়নের ভীতি থেকে ইউরোপকে রক্ষা করা। এই সম্মেলন ১৮১৫ সালের জুন মাস পর্যন্ত চলে।



প্রশ্ন: ভিয়েনা সম্মেলনের মূল উদ্দেশ্যগুলি কী ছিল?

উত্তর: ভিয়েনা সম্মেলনের মূল উদ্দেশ্যগুলি ছিল— ১) নেপোলিয়নের পতনের পর পুনর্গঠনের মাধ্যমে রাজকীয় শক্তিগুলিকে সু-সংহত করা। ২) উদ্ভূত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ইউরোপের রাষ্ট্র ব্যবস্থার পুনর্গঠন ও পুনর্বন্টন। ৩) ইউরোপের বিপ্লবী ভাবনার গতিরোধ করা। ৪) ক্ষতিপূরণ। ৫) ফ্রান্স যাতে আর কোনোদিন মাথাচাড়া দিয়ে উঠে ইউরোপের রাষ্ট্রব্যবস্থাকে ছিন্নভিন্ন করে না দিতে পারে সেদিকে লক্ষ রাখা।



প্রশ্ন: শক্তিসাম্য নীতি কী?

উত্তর: ১) শক্তিসাম্য নীতির মূল কথা হল ফ্রান্স যাতে ভবিষ্যতে আর কোনোদিন অপর রাষ্ট্রকে আক্রমণ করে ইউরোপের মানচিত্রকে ওলট-পালট করে দিতে না পারে সে জন্য ইউরোপকে ঢেলে সাজানো এবং নানা ধরনের কার্যকারি ব্যবস্থা গ্রহণ করা। ২) ফ্রান্সের রাষ্ট্র সীমানাকে প্রাক্ ফরাসি বিপ্লব যুগের সীমারেখায় ফিরিয়ে আনা। ৩) ফ্রান্সের সেনাবাহিনী ভেঙে দিয়ে সেখানে পাঁচ বছরের জন্য মিত্র পক্ষের সেনা মোতায়েন করা। ফ্রান্সের ওপর এই সেনাবাহিনীর খরচ চাপানো হয়। ৪) ফ্রান্সকে ৭০ কোটি ফ্রাঙ্ক ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করা হয়। ৫) ফ্রান্সের চারধারে এক শক্তিশালী সেনাবেষ্টনী গড়ে তোলা হয় ইউরোপের নিরাপত্তা রক্ষার তাগিদে।



প্রশ্ন: ভিয়েনা সম্মেলনে অনুসৃত ক্ষতিপুরণ নীতি কী ?

উত্তর: ১) নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে আর্থিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ইংল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, রাশিয়া, প্রাশিয়া প্রভৃতি দেশ কিছু কিছু ভূখণ্ড নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় সেটাই হল, ক্ষতিপূরণ ইংল্যান্ডে পায় সিংহল, মাল্টা, মরিশাস, কোপালনি, হেলিগোল্যাণ্ড আইডনিয় দ্বীপপুঞ্জ। ২) অস্ট্রিয়া লাভ করে লোম্বার্ডি, ভেনেসিয়া, টাইরন প্রভৃতি অঞ্চল। ৩) প্রাশিয়া লাভ করে সাক্সনির উত্তরাংশ, পোল্যান্ডের কিছুটা অংশ। ৪) রাশিয়া লাভ করে ফিনল্যান্ড, বেসারাবিয়া, পোল্যান্ড-এর একটা বড়ো অংশ প্রভৃতি অঞ্চল। এ ছাড়াও পরাজিত ফ্রান্সকে সেটি দিতে হয় বিজয়ী শক্তিবর্গকে। 



প্রশ্ন: ভিয়েনা ব্যবস্থার ত্রুটিগুলি উল্লেখ করো।

উত্তর: ১) ভিয়েনা চুক্তি প্রণেতাগণ লক্ষ লক্ষ মানুষের আশা আকাঙ্ক্ষা উপেক্ষা করে গণতন্ত্র, উদারতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদকে ধ্বংস করেছিল। ২) উদ্যোক্তারা নতুন নতুন ভূখণ্ড লাভের জন্য এতটা লালায়িত ছিল যে তারা অপরের সম্পত্তি গ্রহণ করতে দ্বিধাবোধ করেন না এবং ক্ষুদ্র ও অসহায় জাতিগুলির প্রতি অত্যন্ত নির্মম ব্যবহার করেছিল। ৩) ইটালির ক্ষেত্রে ন্যায্য অধিকার প্রয়োগ করা হয়নি। ৪) সম্মেলনের সিদ্ধান্তগুলি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারেনি।



প্রশ্ন: ভিয়েনা সম্মেলনের গুরুত্ব কী ছিল?

উত্তর: সমালোচনা থাকলেও ভিয়েনা সম্মেলনের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম—প্রথমত: এই সম্মেলনে গৃহীত সিদ্ধাস্ত ইউরোপে দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। দ্বিতীয়ত: এই সুদীর্ঘ সময়ে ইউরোপের জ্ঞান-বিজ্ঞানের অভূত পূর্ব উন্নতি হয়েছিল। তৃতীয়ত: এই সম্মেলন ভাবিকালের আন্তর্জাতিক সংগঠন জাতিসংঘ বা রাষ্ট্রপুঞ্জের মতো আন্তর্জাতিক সংগঠনের পথ নির্দেশ করেছিল। চতুর্থত: ভিয়েনা সন্ধিতে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে সেইরূপ প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পঞ্চমত: ভিয়েনা সন্ধির দ্বারা ফ্রান্সকে ব্যবচ্ছেদ না করে তার ন্যায্য সীমান্ত ফেরত দেওয়া হয়। ষষ্ঠত: এই সন্ধি ভার্সাই সন্ধি (১৯১৯ খ্রি:) বা ইউট্রোক্টের সন্ধি (১৭১৭ খ্রি.) অপেক্ষা নমনীয় ছিল।



প্রশ্ন: ভিয়েনা সম্মেলনে কোন চারটি শক্তির প্রাধান্য ছিল?

উত্তর: ভিয়েনা সম্মেলনে অস্ট্রিয়া, প্রাশিয়া, রাশিয়া ও ইংল্যান্ড এই চারটি শক্তির প্রাধান্য ছিল।



প্রশ্ন: ভিয়েনা সম্মেলনের গৃহীত নীতিগুলি কী ছিল ?

উত্তর: ইউরোপের পুনর্গঠনের উদ্দেশ্যে আহ্বত ভিয়েনা সম্মেলনে গৃহীত নীতিগুলি ছিল–ন্যায্য অধিকার নীতি, ক্ষতিপুরণ নীতি এবং শক্তিসাম্য নীতি।



প্রশ্ন: ভিয়েনা সম্মেলনে বৃহৎ চতুঃশক্তিবর্গের (ইংল্যান্ড, প্রশিয়া, অস্ট্রিয়া ও রাশিয়া) প্রতিনিধি কারা ছিলেন?

উত্তর: ভিয়েনা সম্মেলনে বৃহৎ চতুঃশক্তিবর্গের প্রতিনিধি ছিলেন ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ক্যাসালরি, প্রাশিয়ার প্রিন্স হার্ডেনবার্গ, অস্ট্রিয়ার প্রধানমন্ত্রী মেটারনিখ্ এবং রাশিয়ার জার প্রথম আলেকজান্ডার।



প্রশ্ন: পবিত্র চুক্তি কবে গৃহীত হয়?  এই চুক্তির প্রধান উদ্যোক্তা কে ছিলেন? 

উত্তর: ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বরে এই চুক্তি সাধিত হয়। রাশিয়ার জার প্রথম আলেকজান্ডার এই চুক্তির প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন।



প্রশ্ন: পবিত্র চুক্তি কী?

উত্তর: ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে রাশিয়ার ভাবপ্রবণ ও আদর্শবাদী জার প্রথম আলেকজান্ডারের উদ্যোগে যে চুক্তিটি প্রবর্তিত হয়েছিল তা পবিত্র চুক্তি নামে পরিচিত। এই চুক্তির মূল কথা হল— (১) প্রতিটি রাষ্ট্র খ্রিস্ট ধর্মের মূল আদর্শগুলি অনুসরণ করে নিজ নিজ অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্র নীতি নির্ধারণ করবেন। ২) জাতীয় রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ন্যায়, সততা ও নৈতিকতা প্রয়োগ করে ইউরোপের শাস্তি বজায় রাখবে। ৩) প্রতিটি রাষ্ট্র একে অপরের সঙ্গে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ থাকবেন। ৪) নিজ নিজ প্রজাদের সন্তানের মতো দেখবেন।



প্রশ্ন: ইউরোপের ইতিহাসে কোন্ যুগকে ‘মেটারনিখের যুগ’ বলা হয় কেন?

উত্তর: ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দের পরবর্তী তিরিশ বছরের ইউরোপের ইতিহাস মেটারনিথ্রে যুগ (Age of Metternich) নামে পরিচিত। অস্ট্রিয়ার প্রধানমন্ত্রী মেটারনিখ্ (১৮০৯-৪৮ খ্রি.) এই যুগে ইউরোপীয় রাজনীতির প্রধান নিয়ন্ত্রক ছিলেন।



প্রশ্ন: মেটারনিখ্ ব্যবস্থা বলতে কী বোঝায়?

উত্তর: অস্ট্রিয়ার চ্যান্সেলার তথা ইউরোপের অবিসংবাদী রাজনীতিক, কূটনৈতিক ব্যক্তিত্ব প্রিন্স মেটারনিখ্ ফরাসি বিপ্লব প্রসূত ভাবধারাগুলিকে দমন করে প্রাক্-বিপ্লব অবস্থা ফিরিয়ে আনতে যেসব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন তাকেই মেটারনিখ্ ব্যবস্থা বলা হয়।



প্রশ্ন: মেটারনিখ্ ব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি কী কী ছিল?

বৈশিষ্ট্য: ১) ফরাসি বিপ্লব প্রসূত প্রগতিশীল ভাবধারাকে ধ্বংস করা। ২) ইউরোপে অস্ট্রিয়ার প্রাধান্য অক্ষুণ্ণ রাখা ৩) ভিয়েনা চুক্তির ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক শাস্তি রক্ষা করা। 8) ইউরোপীয় শক্তি সমবায়কে বিপ্লব প্রসূত ভাবধারা দমনের কাজে ব্যবহার করা।



প্রশ্ন: মেটারনিখ্ যুগ কোন্ সময়কে বলা হয়?

উত্তর: ১৮১৫-৪৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত অস্ট্রিয়ার প্রধানমন্ত্রী মেটারনিখ্ ছিলেন ইউরোপীয় রাজনীতি, কূটনীতির প্রধান ব্যক্তিত্ব একচ্ছত্র অধিপতি ও ভাগ্যবিধাতা তাই এই সময়কে ঐতিহাসিক ফিসার মেটারনিখ্ যুগ বলে অভিহিত করেছেন।

শক্তি সমবায়ের মাধ্যমে সমস্ত ইউরোপকে তিনি নিয়ন্ত্রণ করতেন। এই সময়ে ইউরোপের সর্বত্র তার ক্ষমতা আর প্রতিপত্তির প্রতিফলন দেখা যায়।

এমনকি এই সময় ইউরোপের অধিকাংশ শাসক তার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে শাসনকার্য পরিচালনা করতেন বলে এই সময়কে মেটারনিখ্ যুগ বলা হয়।



প্রশ্ন: ইউরোপীয় শক্তি সমবায় বলতে কী বোঝায়?

উত্তর: ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে ভিয়েনা বন্দোবস্ত ও ইউরোপীয় শক্তি বজায় রাখার উদ্দেশ্য, ফ্রান্সের শক্তিবৃদ্ধি প্রতিরোধ করার জন্য, আন্তর্জাতিক স্থিতি বজায় রাখার স্বার্থে ইউরোপীয় বৃহৎ শক্তিগুলি যে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেছিলেন সেটি ইউরোপীয় শক্তি সমবায় নামে পরিচিত।

প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রতিযোগিতা ও অস্থিরতার মনোভাব যাতে আন্তর্জাতিক ভারসাম্য নষ্ট করে দিতে না পারে, ইউরোপীয় সমস্যাগুলি যাতে আলোচনায় মেটানো যায় সেই প্রয়োজনেই ইউরোপীয় শক্তি সমবায় গড়ে উঠেছিল।



প্রশ্ন: শক্তি সমবায়ের মোট ক-টি অধিবেশন বসে? 

উত্তর: সর্ব ইউরোপীয় সমস্যাগুলি আলোচনার মাধ্যমে মেটানোর জন্য শক্তি সমবায়ের মোট পাঁচটি অধিবেশন বসে। সেগুলি হল—  (১) আই-ল্যা-স্যাপেল অধিবেশন (১৮১৮) (২) ট্রপ্পো অধিবেশন (১৮২০) (৩) লাইবাঘ অধিবেশন (১৮২১) (৪) ভেরোনা অধিবেশন (১৮২২) এবং (৫) সেন্ট পিটার্স অধিবেশন (১৮২৫) ।



প্রশ্ন: ট্রপ্পো প্রটোকল কী?

উত্তর: ১৮২০ খ্রিস্টাব্দে ট্রপ্পো বৈঠকে মেটারনিখের পরামর্শে যে প্রটোকলটি রচিত হয় তাকে বলা হয় ট্রপ্পো প্রটোকল। এই প্রটোকলকে বলা হয় - ১) যদি কোনো দেশে বিপ্লব ঘটে এবং সেই দেশের রাজা যদি তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্ছিত হয় তাহলে শক্তি সমবায় বলপূর্বক সেই বিপ্লব দমন করবে। ২) যদি কোনো দেশ ইউরোপীয় অন্য কোনো রাষ্ট্রের পক্ষে বিপজ্জনক শাসন-সংস্কার করে তাহলে শক্তি সমবায় সেই দেশকে জোট থেকে বহিষ্কার করতে পারবে। প্রতিপক্ষকে প্রয়োজনে বলপ্রয়োগ করতে পারবে ব্রিটেন তীব্রভাবে এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করে।



প্রশ্ন: ইউরোপীয় শক্তি সমবায় কেন ব্যর্থ হয়েছিল?

উত্তর: গঠিত হবার ১০ বছরের মধ্যে ইউরোপীয় শক্তি সমবায় ব্যর্থ হয়ে গিয়েছিল তার কারণ - ১) এটি নেপোলিয়নের পুনরাক্রমণের ভয়ে গঠিত হয়। যে মুহূর্তে নেপোলিয়নের আক্রমণের আশঙ্কা তিরোহিত হয়, সেই মুহূর্তে সদস্যদের পরস্পরের স্বার্থগত বিরোধ প্রকট হয়ে ওঠে। ২) ইংল্যান্ডের অসহযোগিতা ও শক্তিসমবায় ত্যাগ একে দুর্বল করে দিয়েছিল। ৩) শক্তিসংঘ জনগণের দ্বারা সৃষ্টি হয়নি এটি ছিল প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিবর্গের একটি সমবায় যা ফরাসি বিপ্লব প্রসূত গণতন্ত্র জাতীয়তাবাদ আন্দোলন দমনের একটি যন্ত্র হয়ে উঠেছিল। ৪) শক্তি সমবায়ের কোনো গঠনমূলক উদ্দেশ্য ছিল না, সেজন্য সদস্য দেশগুলি একে অপ্রয়োজনীয় মনে করতে পারে। ফলে নেপোলিয়নের পতনের পর শক্তি সমবায় ভিত্তি দুর্বল হতে থাকে।



প্রশ্ন: কার্লসবাড নির্দেশ কী?

উত্তর: ১৮১৯ খ্রিস্টাব্দে জার্মানিতে জাতীয়তাবাদী ছাত্র আন্দোলন দমনের উদ্দেশ্যে মেটারনিখ্ কুখ্যাত যে আদেশনামাটি ঘোষণা করেছিলেন সেটি কার্লসবার্ড নির্দেশ নামে পরিচিত। এই নির্দেশের বলে– (১) বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আন্দোলন ও ছাত্র সংগঠনকে নিষিদ্ধ করা হয়। (২) সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ করা হয়। (৩) জার্মানির প্রগতিশীল ও উদারনৈতিক ভাবধারার কণ্ঠরোধ করা হয়। (৪) মানুষের সভাসমিতি করার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। (৫) ছাত্র ও অধ্যাপকদের কার্যকলাপ নজর রাখার জন্য গুপ্তচর নিয়োগ করা হয়। (৬) উদারপন্থী ও বিপ্লবী ছাত্রদের কারারুদ্ধ করা হয়।



প্রশ্নঃ মনরো নীতি বা Monroe Doctrine কী?

উত্তর: দক্ষিণ আমেরিকায় স্পেনীয় উপনিবেশগুলি স্বাধীনতা লাভের জন্য আন্দোলন শুরু করলে মেটারনিখ্ শক্তি সমবায়ের মাধ্যমে ওই আন্দোলন দমনে উদ্যোগী হলে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট জেমস্ মনরো ইউরোপীয়দের সতর্ক করে দিয়ে ঘোষণা করেন যে ১) মামেরিকা শুধুমাত্র আমেরিকাবাসীর জন্য এখানে ইউরোপের হস্তক্ষেপ বরদাস্ত করা হবে না। (২) আমেরিকায় ইউরোপের উপনিবেশ বিস্তারে মার্কিনদেশ বিরোধিতা করবে। এবং (৩) আমেরিকা ইউরোপের ব্যাপারে জড়িত থাকবে না। এই ঘোষণা মনরো নীতি বা Monroe Doctrine নামে পরিচিত।



প্রশ্ন: ফ্রান্সে জুলাই বিপ্লব (১৮৩০ খ্রি.)-এর সময়ে কে ফ্রান্সের রাজা ছিলেন? তার প্রধানমন্ত্রীর নাম কী?

উত্তর: ফ্রান্সে জুলাই বিপ্লবের সময়ে দশম চার্লস ফ্রান্সের রাজা ছিলেন এবং তাঁর প্রধানমন্ত্রী ছিলেন পলিগ্‌ন্যাক।



প্রশ্ন: ফ্রান্সের বাইরে ইউরোপের কোন্ কোন্ দেশে জুলাই বিপ্লবের প্রভাব পড়ে?

উত্তর: জুলাই বিপ্লবের ঢেউ ফ্রান্সের সীমানা অতিক্রম করে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আছড়ে পড়ে বিভিন্ন দেশকে প্রভাবিত করে। (১) জুলাই বিপ্লবের প্রভাবে হল্যান্ডের কর্তৃত্ব থেকে বেলজিয়াম মুক্ত হয়ে স্বাধীনতা লাভ করে। (২) ইংল্যান্ডে চার্টিস্ট আন্দোলন শুরু হয়। (৩) ইটালি জার্মানির বিভিন্ন রাজ্যে গণ আন্দোলন তীব্র হয়ে উঠে। (৪) রাশিয়ার হাত থেকে মুক্ত হতে পোল্যান্ডে স্বাধীনতা আন্দোলন শুরু হয়। (৫) স্পেন, পোর্তুগাল প্রভৃতি দেশে জাতীয়তাবাদ ও উদারনৈতিক ভাবধারার বিকাশ ঘটে।



প্রশ্ন: জুলাই রাজতন্ত্র বলতে কী বোঝ?

উত্তর: ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দে জুলাই বিপ্লবের ফলে ফ্রান্সের অত্যাচারী বুরবোঁ শাসনের তথা রাজবংশের অবসান ঘটে। উদারপন্থী অ্যাডলফ থিয়ার্সের নেতৃত্বে বিপ্লবীদের দ্বারা অর্লিয়েন্স বংশীয় লুই ফিলিপ রাজা নির্বাচিত হয়ে সিংহাসনে বসেন। তিনি সংশোধিত সংবিধান মেনে ফ্রান্সে শাসন পরিচালনার শপথ নেন। জুলাই বিপ্লবের ফলে প্রতিষ্ঠিত এই নতুন রাজতন্ত্র জুলাই রাজতন্ত্র নামে পরিচিত। কিন্তু ১৮ বছর (১৮৩০-১৮৪৮ খ্রি.) রাজত্ব করার পর ফেব্রুয়ারি বিপ্লব লুই ফিলিপের নেতৃত্বাধীন রাজতন্ত্রের পতন ঘটায়।



প্রশ্ন: লুই ফিলিপকে কেন নাগরিক রাজা বলা হয়?

উত্তর: দীর্ঘদিনের অত্যাচারী, বংশানুক্রমিক রাজা হবার অভিলাষী বুরবোঁ রাজতন্ত্রের অবসান্তে জনগণের ইচ্ছায় অর্লিয়েন্স বংশীয় লুই ফিলিপ সিংহাসনে বসেছিলেন। তাঁর সিংহাসন আরোহণের পেছনে উত্তরাধিকারের কোনো দাবি ছিল না। তাই তিনি জনগণের সঙ্গে একান্ত হয়ে যৌথভাবে শাসনকার্য পরিচালনা করতেন বলে লুই ফিলিপকে নাগরিক রাজা বলা হয়।



প্রশ্ন: ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দের জুলাই বিপ্লবের তাৎক্ষণিক গুরুত্বগুলি কী কী?

১৮৩০ খ্রিস্টাব্দের জুলাই বিপ্লবের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম—(১) দৈবাধিকার বিশ্বাসী রাজতন্ত্রের পতন ও নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা হয় এই বিপ্লবের ফলে।(২) কেড়ে নেওয়া হয় রাজার অর্ডিন্যান্স ক্ষমতা। (৩) অমান্য করা হয় ভিয়েনা সম্মেলনের ন্যায্য অধিকারনীতি। (৪) আইন প্রণয়নের ক্ষমতা কেবলমাত্র জাতীয় প্রতিনিধি সভার হাতে ন্যস্ত হয়। (৫) সাম্য, স্বাধীনতাকে গুরুত্ব প্রদান করা হয়। (৬) সংবাদপত্রের স্বাধীনতা প্রদান করা হয়। (৭) শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর গির্জার প্রাধান্য বিনষ্ট হয়। ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা ব্যবস্থা স্থায়ী হয়।



প্রশ্ন: জুলাই বিপ্লবের কারণগুলি কী কী ছিল?

উত্তর: শুধুমাত্র একটি বা দুটি কারণে জুলাই বিপ্লব ঘটেনি। এর পশ্চাতে ছিল নানাবিধ কারণ যেগুলি হল— (১) ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দের জুলাই বিপ্লবের সময় ফ্রান্সের রাজা ছিলেন দশম চার্লস যিনি উগ্র রাজপন্থায় বিশ্বাসী তিনি পুরাতনতন্ত্র পুনঃস্থাপনের চেষ্টা করেন। (২) চার্চ ও অভিজাতদের সমস্ত সুযোগসুবিধা ফিরিয়ে দিয়ে বুর্জোয়া শ্রেণির বিরাগভাজন। (৩) যাজকদের সাহায্যে শাসনকার্য চালানো। (৪) উগ্র রাজতান্ত্রিক ও প্রজাতান্ত্রিক আদর্শের বিরোধ। (৫) দশম চার্লস কর্তৃক জুলাই অর্ডিন্যান্স।



প্রশ্ন: জুলাই অর্ডিন্যান্স কী?

উত্তর: ফরাসি রাজা দশম চার্লসের মন্ত্রী ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দের জুলাই মাসে যে চারটি অর্ডিন্যান্স জারি করেন তা জুলাই অর্ডিন্যান্স নামে পরিচিত। এগুলি হল— ১) সংসদ তথা প্রতিনিধি সভা ভেঙে দেওয়া তথ্য সংশোধিত নির্বাচনী আইনে নির্বাচকদের সংখ্যা তিন-চতুর্থাংশ নামিয়ে আনা। ২) ভোটদাতার সংখ্যা হ্রাস করা; ৩) সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ এবং 8) জাতীয় সভার নতুন নির্বাচনের আদেশ দান। এর প্রতিবাদে প্যারিসের সর্বত্র সশস্ত্র অভ্যুত্থান ঘটে এবং দশম চার্লস সিংহাসন ত্যাগ করতে বাধ্য হন।



প্রশ্ন: ফ্রান্সে জুলাই বিপ্লবের সময়ে কে নতুন রাজা হয়েছিলেন? তিনি কোন্ বংশের লোক ছিলেন?

উত্তর: জুলাই বিপ্লবের সময় লুই ফিলিপ ফ্রান্সের রাজা হন। তিনি অর্লিয়েন্স রাজবংশের লোক ছিলেন।



প্রশ্ন: ‘জুলাই রাজতন্ত্র' কার রাজত্বকে বলা হয়?

উত্তর: কোন্ বছর ওই রাজতন্ত্র শেষ হয়? উত্তর লুই ফিলিপের। ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দে এই রাজতন্ত্রের অবসান হয়।



প্রশ্ন: রাজা লুই ফিলিপের বিরুদ্ধে ফ্রান্সের জনগণ কেন যুদ্ধ করেছিল?

উত্তর: লুই ফিলিপ ফ্রান্সের বিভিন্ন সামাজিক শ্রেণির স্বার্থে না চলে মধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপর নির্ভরশীল ছিল। এ ছাড়া বিদেশনীতির ক্ষেত্রেও তিনি সফল হননি।



প্রশ্ন: ফেব্রুয়ারি-বিপ্লবের সময় ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী এবং সমাজতন্ত্রী দলের নেতা কে ছিলেন?

উত্তর: ফেব্রুয়ারি-বিপ্লবের সময় গিজো ছিলেন ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী এবং সমাজতন্ত্রী দলের নেতা ছিলেন লুই ব্ল্যাঙ্ক।



প্রশ্ন: ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের কারণগুলি কী কী ছিল? 

উত্তর: ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সে সংঘটিত ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের প্রধান কারণগুলি ছিল নিম্নরূপ— (১) লুই ফিলিপের জনসমর্থনের অভাব। (২) অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রে লুই ফিলিপের ব্যর্থতা। (৩) লুই ফিলিপ কর্তৃক জনগণের ভোটাধিকার বৃদ্ধি আন্দোলন বলপূর্বক দমনের চেষ্টা। (৪) লুই ফিলিপের শাসনকালে ফ্রান্সের অর্থনৈতিক সংকট তীব্র হয়ে ওঠে। প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ নানা কারণে শস্যহানির ফলে বাণিজ্য ও শিল্পক্ষেত্রে মন্দা দেখা দেয়, বেকার সমস্যা বেড়ে যায়। (৫) শ্রমিক শ্রেণির উন্নয়নে সরকারের চরম ব্যর্থতা। এদের উন্নয়নের জন্য কোনোরকম ব্যবস্থা করা হয়নি। (৬) ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র ফ্রান্সে ক্যাথলিকদের বিরোধিতা। (৭) সরকার কর্তৃক শিল্প উদ্যোগের অভাব।



প্রশ্ন: ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের প্রত্যক্ষ কারণ কী?

উত্তর ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দে ২২ ফেব্রুয়ারি লা-মার্টিন, তিয়ের লুই ব্ল্যাংক প্রমুখ নেতৃবৃন্দ গণতান্ত্রিক শাসনের দাবিতে একটি ভোজসভার আয়োজন করলে সরকার তাতে নিষেধাজ্ঞা জারি করে।

নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে জনতা সভাস্থলে উপস্থিত হয়ে গিজোর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে একটি বিশাল মিছিলের আয়োজন করে। লুই ফিলিপ বাধ্য হয়ে গিজোকে বরখাস্ত করেন।

২৩ ফেব্রুয়ারি সৈন্যরা জনতার ওপর গুলি বর্ষণ করলে শান্তিপূর্ণ মিছিল সশস্ত্র আকার ধারণ করে। জনতার ওপর গুলিবর্ষণের সংবাদে প্যারিসে চরম উত্তেজনা দেখা দেয়। রাজার পদচ্যুতির দাবিতে সশস্ত্র বিপ্লব শুরু হয় (২৩ ফেব্রুয়ারি ১৮৪৮ খ্রি.)।

২৪ ফেব্রুয়ারি লুই ফিলিপ ভীত হয়ে সিংহাসন ত্যাগ করে ইংল্যান্ডে পালিয়ে গেলে ফ্রান্সে জুলাই রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে। প্রজাতন্ত্রী ও সমাজতন্ত্রীরা যুগ্মভাবে ফ্রান্সকে প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করেন।



প্রশ্ন: লুই ব্ল্যাঙ্ক কে ছিলেন?

উত্তর: লুই ব্ল্যাঙ্ক ছিলেন ফ্রান্সের সমাজতন্ত্রবাদে বিশ্বাসী একজন বিখ্যাত ফরাসি সমাজতন্ত্রবাদী নেতা। তাঁর লেখা বিখ্যাত পুস্তকটির নাম ছিল Organisation of Labour। ফেব্রুয়ারি বিপ্লবে তার ভূমিকা অনস্বীকার্য, তার এই অবদানের জন্য তাঁকে ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের পরে যে অস্থায়ী সরকার গড়া হয়েছিল তাতে শামিল করা হয়েছিল। তাঁরই প্রস্তাবে জাতীয় কর্মশালা, বেকারদের কর্মসংস্থানের দাবি মেনে নেওয়া হয়।



প্রশ্ন: ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের ফলাফল কী হয়েছিল?

উত্তর: ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের ফলে- ১) ফ্রান্সে রাজতন্ত্রের অবসান হয় এবং প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা হয়। ২) ফ্রান্সে জনগণের ভোটাধিকার সম্প্রসারিত হয়। ৩) সকলের কাজের অধিকার মেনে নেওয়া হয় এবং শ্রমিক শ্রেণির স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। ৪) কর্মহীন বেকারদের কর্মসংস্থানের জন্য জাতীয় কর্মশালা স্থাপিত হয়। ৫) এই বিপ্লব ইউরোপের ভিয়েনা বন্দোবস্ত ও মেটারনিখতন্ত্রের সলিল সমাধি ঘটায়।



প্রশ্ন: ফ্রান্সে কবে কোন্ জাতীয় কর্মশালা স্থাপিত হয়?

উত্তর: ফ্রান্সে ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দে ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের পর প্রজাতন্ত্রী ও সমাজতন্ত্রীরা মিলিত হয়ে দ্বিতীয়বার ফ্রান্সে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করলে, অস্থায়ী সরকারের মন্ত্রি তথা সমাজতন্ত্রী নেতা লুই ব্ল্যাঙ্কের দাবিতে জাতীয় কর্মশালা স্থাপিত হয়। এই কর্মশালার উদ্দেশ্য ছিল কর্মহীন বেকারদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা।



প্রশ্ন: ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের ব্যর্থতার কারণগুলি কী ছিল?

উত্তর নানাবিধ কারণে ফেব্রুয়ারি বিপ্লব ব্যর্থ হয়েছিল— ১) সুযোগ্য নেতৃত্বের অভাবে ২) নেতৃবর্গের মধ্যে মতাদর্শগত মতপার্থক্য ও পারস্পরিক বিরোধিতা ৩) মহামারি ৪) মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিরোধ ৫)অস্ট্রিয়ার মতো দেশগুলির তীব্র আক্রমণের ফলে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাওয়া প্রভৃতি।



প্রশ্ন: ফ্রান্সের দ্বিতীয় সাম্রাজ্য বলতে কী বোঝ?

উত্তর: ফ্রান্সের দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতি নেপোলিয়নের ভ্রাতুষ্পুত্র লুই নেপোলিয়ন ১৮৫১ খ্রিস্টাব্দে ২ ডিসেম্বর এক সশস্ত্র অভ্যুত্থানের মধ্যে দিয়ে, ফরাসি আইনসভার ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে, তৃতীয় নেপোলিয়ন উপাধি ধারণ করে ফরাসিদের সম্রাট বলে নিজেকে ঘোষণা করেন। পুনরায় এইভাবে ফ্রান্সে রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়ে যে সাম্রাজ্যটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তা দ্বিতীয় সাম্রাজ্য নামে পরিচিত।



প্রশ্ন: দ্বিতীয় ফরাসি সাম্রাজ্য কে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন? কোন্ বছর ওই সাম্রাজ্যের পতন হয়েছিল? 

উত্তর:  তৃতীয় নেপোলিয়ন দ্বিতীয় ফরাসি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দে ওই সাম্রাজ্যের পতন হয়েছিল।



প্রশ্ন: ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দকে বিপ্লবের বছর বলা হয় কেন?

উত্তর: ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দের বিপ্লব ফ্রান্সের সীমানা ছাড়িয়ে ইউরোপের ১৫টি দেশে (ইটালি, জার্মানি, অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি প্রভৃতি) জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সৃষ্টি করেছিল। তাই সাধারণভাবে ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দকে “বিপ্লবের বছর” বলা হয়।



প্রশ্ন: ইটালিতে প্রতিষ্ঠিত তিনটি গুপ্তসমিতির নাম ও তাদের কেন্দ্রস্থল চিহ্নিত করো।

উত্তর: ইটালিতে প্রতিষ্ঠিত তিনটি গুপ্ত সমিতির নাম ও তাদের কেন্দ্রস্থল হল—পিডমন্টের ফেডারিটি, লোম্বার্ডির গুয়েলফি এবং নেপলস-এর কার্বোনারি।



প্রশ্ন: ইটালির জাতীয়তাবাদের উদ্ভবের পেছনে নেপোলিয়নের কী অবদান ছিল?

উত্তর: ১৭৯৬ খ্রিস্টাব্দে নেপোলিয়ন কর্তৃক ইটালি জয়ের পূর্বে ইটালি ছিল পরস্পর বিবাদমান অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভক্ত। এর বেশির ভাগ অংশই ছিল বিদেশি রাষ্ট্রের শাসনাধীন। নেপোলিয়ন ইতালি জয় করে— ১) সমগ্র ইতালিকে এক শাসনাধীনে আনেন। ২) বিদেশি শক্তিকে বিতাড়িত করেন। ৩) সমগ্র ইটালিতে একই ধরনের শাসন ও আইনকানুন প্রবর্তন করেন। ৪) কোড নেপোলিয়ন প্রদান করেন।—যার ফলে ইটালির সাধারণ মানুষের মনে ঐক্যবোধ ও জাতীয় চেতনার উন্মেষ ঘটে এবং তারা স্বাধীন ও ঐক্যবদ্ধ জাতীয় রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন।



প্রশ্ন: ভিয়েনা সম্মেলনে ইতালির জন্য কী কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়?

উত্তর: ১) নেপোলিয়ন কর্তৃক সৃষ্ট ঐক্যবদ্ধ ইটালির অস্তিত্ব বিলুপ্ত করা হয়। ২) ন্যায্য অধিকার নীতি অনুসরণ করে ইটালিকে পুনরায় কয়েকটি রাজ্যে বিভক্ত করা হয়। ৩ )পুনরায় বিদেশি শক্তির আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা হয়। ৪) পোপ, স্যাভয়, বুরবো প্রভৃতি রাজবংশের অধিকার ইতালিতে পুনঃস্থাপন করা হয়।



প্রশ্ন: কার্বোনারি বলতে কী বোঝ?

উত্তর: কার্বোনারি ছিল ইটালির একটি গুপ্ত সমিতি। সর্বোপরি এই কথার অর্থ হল জ্বলন্ত অঙ্গারবাহী অর্থাৎ বাইরে কার্বন বা অঙ্গার বহনকারী ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মতো আচরণ করলে ও তাদের মূল লক্ষ্য ছিল বিদেশি শাসনের উচ্ছেদ ও ঐক্যবদ্ধ গণতান্ত্রিক ইটালি গড়ে তোলা।

এটি আসলে ছিল একটি সন্ত্রাসবাদী দল এবং এর প্রধান কার্যালয় ছিল নেপল্স।



প্রশ্ন: কার্বোনারি আন্দোলন কেন ব্যর্থ হয়?

উত্তর : কার্বোনারি আন্দোলনের ব্যর্থতার মূলে বেশ কয়েকটি কারণ ছিল। এগুলি হল - ১) পোপের রাজ্য ও পিডমন্ট ছাড়া অন্যত্র এই আন্দোলনের প্রভাব না থাকা; ২) কেবল মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের মধ্যে আন্দোলনের সীমাবদ্ধতা; ৩) আন্দোলনকারীদের মধ্যে গঠনমূলক কার্যসূচির অভাব ও অনৈক্য এবং ৪) অস্ট্রিয়ার সৈন্যবাহিনীর দমন-পীড়ন নীতি।



প্রশ্ন: ‘নব্য ইটালি’ আন্দোলনের প্রবক্তা কে ছিলেন? এই আন্দোলনের উদ্দেশ্য কী ছিল?

উত্তর: ইটালির জাতীয়তাবাদী নেতা যোশেফ ম্যাৎসিনি নব্য ইটালি আন্দোলনের প্রবক্তা ছিলেন। বিদেশি শক্তির সাহায্য ছাড়া ইটালির যুবকদের মাধ্যমে আত্মত্যাগ এবং আত্মদানের মাধ্যমে ইটালির মুক্তিসাধন এবং ঐক্যবদ্ধ করাই তার একমাত্র লক্ষ্য ছিল।



প্রশ্ন: কোন তিনটি শব্দের মাধ্যমে ম্যাৎসিনি তার কর্মপন্থাকে তুলে ধরেছিলেন? তার লক্ষ্য কী ছিল? 

উত্তর: ঈশ্বর, জাতি ও মানব এই তিনটি শব্দের মাধ্যমে ম্যাৎসিনি তার কর্মপন্থাকে তুলে ধরেছিলেন। ইটালির ঐক্যসাধন করে প্রজাতান্ত্রিক ইটালি গঠন করাই ছিল তাঁর লক্ষ্য।



প্রশ্ন: ইয়ং ইটালি দলের লক্ষ্য কী ছিল?

উত্তর: ইয়ং ইটালি দলটি গড়ে তোলার পেছনে ম্যাৎসিনির লক্ষ্য ছিল (i) ইটালির ঐক্যের ব্যাপারে সারাদেশে জনমত গড়ে তোলা (ii) দেশের যুবসমাজকে এই দলের সদস্য করে জাতীয় চেতনা জাগ্রত করা (iii) সদস্যদের সামরিক প্রশিক্ষণ প্রদান করে দেশের মুক্তির জন্য প্রস্তুত করা (iv) আত্মত্যাগ ও দেশেপ্রেমের মাধ্যমে ইটালির মুক্তি সাধন করা (v) অস্ট্রিয়ার প্রভাব মুক্ত করে প্রজাতান্ত্রিক ইটালি গঠন করা।



প্রশ্ন: ইতালির ঐক্য আন্দোলনে যারা নেতৃত্ব প্রদান করেছিলেন?

উত্তর: ম্যাৎসিনি, ক্যাভুর, গ্যারিবল্ডি, দ্বিতীয় ভিক্টর ইমান্যুয়েল প্রমুখ ব্যক্তিবর্গ ইটালির ঐক্য আন্দোলনের নেতৃত্ব প্রদান করেছিলেন।


প্রশ্ন: ম্যাৎসিনি কেন ব্যর্থ হয়েছিলেন?

উত্তর: প্রথমত: গ্যোটে, বাইরন, দাঁতর গুণমুগ্ধ রোমান্টিক ভাবাদর্শে আপ্লুত ম্যাৎসিনির কোনো রাজনৈতিক প্রতিভা ছিল না। 

দ্বিতীয়ত : ধর্মানুভূতি থেকে তিনি মুক্ত হতে পারেননি। 

তৃতীয়ত : গভীর ভাবে প্রজাতান্ত্রিক ভাবাদর্শে বিশ্বাসী হওয়ায় তাঁর নানা ভাবনা ছিল অবাস্তব। 

চতুর্থত: অতিরিক্ত ভাবাবেগ, বাস্তব বিমুখতা এবং বিদেশি শক্তির সাহায্য ছাড়া ইতালির ঐক্য সাধনের চেষ্টাও ছিল অবাস্তব।

জ্যাক ড্রজ তার সম্পর্কে বলেছেন This great pa triot......had no political genius |



প্রশ্ন: কে, কবে ‘ইয়ং ইটালি’ দলের প্রতিষ্ঠা করেন ?

উত্তর: ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দে ইটালির জাতীয়তাবাদী নেতা যোশেফ ম্যাৎসিনি ইটালিবাসীকে জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্য নিয়ে ‘ইয়ং-ইটালি’ (Young Italy) দলের প্রতিষ্ঠা করেন।



প্রশ্ন: রিসর্জিমেন্টো বলতে কী বোঝ?

উত্তর:  রিসর্জিমেন্টো কথাটির বাংলায় প্রতিশব্দ পুনর্জন্ম অথবা পুনর্জাগরণ। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে ইটালিতে যে জাতীয় ঐক্য আন্দোলনের সূচনা হয় তাকে সার্বিকভাবে রিসর্জিমেন্টো বলা হয়। এই নবজাগরণের লক্ষ্য ছিল বিদেশি শাসনের উচ্ছেদ করে ইটালিকে ঐক্যবদ্ধ করা ও ইটালির হৃত মর্যাদা পুনরুদ্ধার করা। এই রিসর্জিমেন্টো সংবাদপত্রটির সম্পাদক ছিলেন ক্যাভুর।



প্রশ্ন: ক্যাভুর অস্ট্রিয়াকে বিতাড়নের জন্য ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে কার সঙ্গে চুক্তি করেন এবং চুক্তিটির নাম কী ছিল?

উত্তর: অস্ট্রিয়াকে ইটালি থেকে বিতাড়নের জন্য ক্যাভুর ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে ফরাসি সম্রাট তৃতীয় নেপোলিয়নের সঙ্গে এক গোপনচুক্তি সম্পাদন করেন। এই চুক্তিটির নাম ছিল প্লমবিয়ার্সের চুক্তি।



প্রশ্ন: ক্যাভুর কে ছিলেন?

উত্তর: একজন সুদক্ষ দূরদৃষ্টি সম্পন্ন রাজনীতিবিদ্‌ কাউন্ট ক্যাভুর ছিলেন পিডমন্ট-সার্ডিনিয়ার প্রধানমন্ত্রী এবং ইটালির ঐক্য আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা। বাস্তববাদী ক্যাভুর পিটমন্ট-সার্ডিনিয়ার অধিনে বিদেশি শক্তির সাহয্যে আভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে ইটালি থেকে বিদেশি শক্তিদের বিতাড়িত করে ইটালির ঐক্য সম্পূর্ণ করেছিলেন।



প্রশ্নঃ ম্যাৎসিনির সাথে ক্যাভুরের আদর্শগত কী কী পার্থক্য ছিল?

উত্তর: 

প্রথমত: আদর্শবাদী নেতা ম্যাৎসিনি বাস্তব রাজনীতি ও কূটনীতিতে ততটা দক্ষ ছিলেন না কিন্তু ক্যাভুর ছিলেন বাস্তববাদী এবং সুদক্ষ কূটনীতিবিদ্‌। 

দ্বিতীয়ত: ম্যাৎসিনি ইতালির ঐক্য আন্দোলনে বিদেশি শক্তির সাহায্যের পক্ষপাতি ছিলেন না। এক্ষেত্রে ক্যাভুরের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সম্পূর্ণ পৃথক তিনি অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক পরিস্থিতিকে ইতালির অনুকূলে এনে প্রয়োজন মতো বিদেশি সাহায্যের পক্ষে ছিলেন।

তৃতীয়ত: ম্যাৎসিনি ছিলেন গণতন্ত্রের পূজারি কিন্তু ক্যাভুর বিশ্বাস করতেন সাংবিধানিক রাজতন্ত্রে।

চতুর্থত: ম্যাৎসিনি মনে করতেন শুধুমাত্র দেশের যুবকরাই ইতালির ঐক্য আনতে পারে এ ক্ষেত্রে বিদেশি শক্তির সাহায্যের প্রয়োজন নেই। কিন্তু ক্যাভুরের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন তিনি বিদেশি শক্তির সাহায্যে ইতালির ঐক্য আনার পক্ষপাতী ছিলেন।



প্রশ্ন: ‘প্লমবিয়ার্স-এর চুক্তি কবে স্বাক্ষরিত হয় এবং এর শর্তগুলি কী ছিল?

উত্তর: ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে পিডমন্ট-সার্ডিনিয়ার প্রধানমন্ত্রী ক্যাভুর ও ফরাসি সম্রাট তৃতীয় নেপোলিয়নের মধ্যে প্লমবিয়ার্সের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির প্রধান শর্তগুলি ছিল (১) পিডমন্ট-সার্ডিনিয়া যদি অস্ট্রিয়ার দ্বারা আক্রান্ত হয় তাহলে ফ্রান্স তার সাহায্যে এগিয়ে আসবে। (২) অস্ট্রিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে জিততে পারলে পিডমন্ট-সার্জিনিয়া, লোম্বার্ডি, ভেনিসিয়া, মোডেনা ও পোপের রাজ্যের কিছুটা অংশ নিয়ে উত্তর ইতালি গঠিত হবে ঠিক হয়। (৩) এই সাহায্যের বিনিময়ে ফ্রান্স ইটালির কাছ থেকে পাবে স্যাভয় ও নিস।



প্রশ্ন: গ্যারিবল্ডী কে ছিলেন?

উত্তর: ম্যাৎসিনির মন্ত্রশিষ্য ও ইতালির ঐক্য আন্দোলনের অন্যতম নির্ভীক ও দুঃসাহসিক সেনাপতি ছিলেন গ্যারিবন্ডী। গুরুত্ব তাঁর বিশ্বাস ছিল প্রজাতন্ত্রে। রোমান প্রজাতন্ত্রের তিনি ছিলেন রক্ষক কিন্তু শেষ পর্যন্ত রোমান প্রজাতন্ত্রের পতন হলে তিনি দেশত্যাগী হন। পরবর্তীকালে তিনি ফিরে এসে তার লাল কোর্তা বাহিনীর সাহায্যে সিসিলি ও নেপলস্ জয় করেন। নিজে গণতন্ত্রের সমর্থক হয়েও ইতালির ঐক্যের কথা ভেবে তিনি দুটি প্রদেশই ভিক্টর-ইম্যানুয়েলের হাতে তুলে দিয়ে তিনি তাঁর গ্রামে খামার বাড়িতে ফিরে গিয়ে দেশপ্রেমের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।



প্রশ্ন: গ্যারিবল্ডি কীভাবে নেপলস ও সিসিলিতে অভ্যুত্থান শুরু করেন?

উত্তর: নেপলস ছিল পিডমন্টের মিত্র দেশ এবং একারণেই ক্যাভুর তা দখলের চেষ্টা করেননি। তাই জাতীয়তাবাদী নেতা গ্যারিবল্ডি ‘লালকোর্তা’ বাহিনী (১০০০ মতান্তরে ১১০০ লাল পোশাক পরিহিত সৈন্য)-র সাহায্যে ছয় সপ্তাহের মধ্যে সিসিলি জয় করেন। অন্যদিকে স্থানীয় জনগণের সাহায্য নিয়ে তিনি নেপলস অধিকার করেন।



প্রশ্ন: ভিল্লাফ্রাঙ্কার চুক্তি কবে কাদের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়? এই চুক্তির উদ্দেশ্যগুলি কী ছিল?

উত্তর: ১৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে ফরাসি সম্রাট তৃতীয় নেপোলিয়ন ও অস্ট্রিয়ার মধ্যে ভিল্লাফ্রাঙ্কার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির উদ্দেশ্য ছিল (১) অস্ট্রিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ থেকে ফ্রান্সকে সরিয়ে আনা (২) ফরাসি সৈন্যের ক্ষয়ক্ষতি হ্রাস করা (৩) প্রাশিয়ার হস্তক্ষেপের সম্ভাবনাকে দূর করা।



প্রশ্ন: কীভাবে ভেনেশিয়া ও রোম ইটালির সঙ্গে সংযুক্ত হয়?

উত্তর: ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দে অস্ট্রিয়া-প্রাশিয়া যুদ্ধে অস্ট্রিয়া পরাস্ত হলে প্রাশিয়ার বন্ধুদেশ ইটালি ভেনেশিয়া লাভ করে। কয়েক বছর বাদে ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্স প্রাশিয়া যুদ্ধের সময় তৃতীয় নেপোলিয়ন রোম থেকে তাঁর সেনাবাহিনী সরিয়ে নিলে ইটালি রোম দখল করে ও ইটালির সঙ্গে সংযুক্ত করে।



প্রশ্ন: প্লমবিয়ার্স ও ভিল্লাফ্রাঙ্কা সন্ধির পার্থক্য কী?

উত্তর: ইটালি থেকে অস্ট্রিয়াকে বিতাড়নের জন্য প্লমবিয়ার্স। চুক্তির মাধ্যমে ফ্রান্সের সাহায্য লাভের উদ্দেশ্যে পিডমন্ট ফ্রান্সের সঙ্গে বোঝাপড়া করে। আর ফরাসি সম্রাট তৃতীয় নেপোলিয়ন পিডমন্টের বিশ্বাসভঙ্গ করে অস্ট্রিয়ার সঙ্গে ভিল্লাফ্রাঙ্কা সন্ধি সম্পাদন করে।



প্রশ্ন: সর্বজামানবাদ বলতে কী বোঝায়?

উড়র: সপ্তদশ শতকের মাঝামাঝি সময়কালে জার্মানি জুড়ে সাহিত্য দর্শন, শিল্প এবং সংগীতের ক্ষেত্রে এক নবজাগরণের সূচনা ঘটে। এই সাংস্কৃতিক জাগরণ পরবর্তী সময়ে জার্মান। জাতীয়তাবাদী ভাবধারার বহিঃপ্রকাশে সাহায্য করে। কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিক, ঐতিহাসিক, সংগীতজ্ঞরা নিজ নিজ কর্মের দ্বারা জার্মানির শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের চেষ্টা করেন ও জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটান। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক ভাবে বহুবিভক্ত জার্মানির ঐক্যের কথা প্রচার করা, এবং অখণ্ড জার্মান সাম্রাজ্য গড়ে তোলা। জার্মান জাতির এই ঐক্যবদ্ধ হওয়ার নবচেতনা ও আকাঙ্ক্ষাই সর্ব জার্মানবাদ নামে পরিচিত। দার্শনিক কান্ট, ফিটকে, হেগেল, বোহেমার, হাইনে, ঐতিহাসিক জাইলম্যান, মাইকেল হ্যাসার, অর্থনীতিবিদ্‌ লিস্ট প্রমুখ ব্যক্তিত্ববর্গ ছিলেন সর্বজার্মানবাদের প্রধান প্রচারক। 



প্রশ্ন: ‘ফ্রাঙ্কফোর্ট পার্লামেন্ট’ কী? এটি কেন ব্যর্থ হয়েছিল?

উত্তর: জার্মানির ঐক্যসাধন ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনের উদ্দেশ্যে ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দে জার্মানির ফ্রাঙ্কফোর্টে নির্বাচিত জাতীয় পার্লামেন্টের প্রথম যে অধিবেশনটি বসেছিল সেটি ফ্রাঙ্কফোর্ট পার্লামেন্ট নামে পরিচিত। এই সভাতে ঐক্যবদ্ধ জার্মানির জন্য একটি সংবিধান রচনার কাজ শুরু হয়। ফ্রাঙ্কফোর্ট পার্লামেন্টের প্রতিনিধি সভা প্রাশিয়ার রাজা চতুর্থ ফ্রেডারিক উইলিয়ামকে ঐক্যবদ্ধ জার্মানির রাজমুকুট গ্রহণের প্রস্তাব দিলে তিনি অস্ট্রিয়ার ভয়ে তা প্রত্যাখান করলে ফ্রাঙ্কফোর্ট পার্লামেন্ট ব্যর্থ হয়।



প্রশ্ন: ওলমুজের চুক্তি কী ও কাদের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়?

উত্তর: ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দের শেষভাগে অস্ট্রিয়া ও প্রাশিয়ার মধ্যে ওলমুজের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তি দ্বারা প্রাশিয়া জার্মানিতে অস্ট্রিয়ার প্রাধান্য মেনে নেয়। এই চুক্তির ফলে জার্মানিতে উদারনৈতিক ঐক্য আন্দোলনের পরিসমাপ্তি ঘটে।



প্রশ্ন: জোলভেরাইন কী? কী উদ্দেশ্যে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল?

উত্তর: অর্থনীতিবিদ ম্যাজনের উদ্যোগে ১৮১৯ খ্রিস্টাব্দে প্রাশিয়ার। নেতৃত্বে গড়ে ওঠা জার্মান রাষ্ট্রসমূহের শুল্ক সমবায়কে বলা হয় জোলভেরাইন।

উদ্দেশ্য : (১) সদস্য রাষ্ট্রগুলির মধ্যে আন্তঃশুল্ক বিলুপ্ত করা, (২) অবাধ বাণিজ্যের প্রবর্তন করে অর্থনীতির উন্নতি ঘটানো, (৩) জার্মান রাজ্যগুলির বাণিজ্যিক বাধা দূর করে বাণিজ্যের প্রসার ঘটানো, (৪) গোটা জার্মান ভূখণ্ডে এক শুল্ক নীতি প্রবর্তন করে জার্মানিকে অর্থনৈতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ করা।



প্রশ্ন: ভোর্লভেরাইনের গুরুত্ব কী?

উত্তর: জার্মানির ইতিহাসে জোলভেরাইনের গুরুত্ব অপরিসীম এর ফলে (১) জার্মান রাজ্যগুলির অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে একতাবোধ গড়ে উঠে। (২) আস্তে আস্তে জার্মানিতে শিল্পায়ন ঘটতে থাকে (৩) অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটে (৪) জার্মানির শক্তি বৃদ্ধি ঘটে।এ ছাড়াও পারস্পরিক ভাবের আদান-প্রদান, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটে ফলে ভবিষ্যতে প্রাশিয়ার উদ্যোগে জার্মানির ঐক্যের পথ প্রশস্ত হয়।



প্রশ্ন: বিসমার্কের “রক্ত ও লৌহ” নীতি কী? প্রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রি বিসমার্ক জার্মান ঐক্যকরণের জন্য কী নীতি গ্রহণ করেন?

উত্তর: জার্মানির জটিল রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানের জন্য বিসমার্ক গণতন্ত্র বা ভোট এবং বক্তৃতার ওপর আস্থাশীল ছিলেন না, বরং তিনি সামরিক শক্তির ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তাই তার নীতি “রক্ত ও লৌহ” নীতি নামে পরিচিত। রক্ত লৌহ নীতির মূল বিষয় হল যুদ্ধ ও কঠোর শৃঙ্খলা।



প্রশ্ন: জার্মানির ঐক্যের পথে প্রধান অন্তরায়গুলি কী কী ছিল?

উত্তর: 

প্রথমত: জার্মানির ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যগুলির মধ্যে তীব্র মতভেদ সন্দেহ ও বিদ্বেষ। 

দ্বিতীয়ত: ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যগুলির মধ্যে নিজস্ব স্বতন্ত্রতা রক্ষার চেষ্টা। 

তৃতীয়ত: কার্লসবাড ডিক্রি তথা মেটারনিখ্ ব্যবস্থার জাতাকলে জার্মানির জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের গতিরোধ। 

চতুর্থত: অস্ট্রিয়ার বিরোধিতা। 

পঞ্চমত: জার্মান শাসকবর্গের প্রতিনিধি সভা ডায়েটকে অস্ট্রিয়ার নিয়ন্ত্রণ। 

ষষ্ঠত: জার্মানির ঐক্য বিষয়ক মতপার্থক্য।



প্রশ্ন: Real politik কাকে বলে? কে এটা মেনে চলতেন?

উত্তর: তত্ত্ব, ভাববাদ, আদর্শবাদ ও নীতিবোধের পরিবর্তে যে রাজনীতিতে বাস্তববাদ, পরিস্থিতি অনুসারে কর্মপরায়ণ বেশি গুরুত্ব পায় তাকে বলা হয় Real Politik। প্রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী অটো ফান বিসমার্ক এই নীতি মেনে চলতেন।



প্রশ্ন: কোন্ দুইটি রাজ্যকে কেন্দ্র করে প্রাশিয়ার সঙ্গে ডেনমার্কের সংঘর্ষ বাধে এবং কোন্ চুক্তির দ্বারা এই যুদ্ধের নিষ্পত্তি হয়?

উত্তর: শেজউইগ ও হলস্টেইন এই দুইটি ছোটো রাজ্যখণ্ডকে কেন্দ্র করে ডেনমার্কের সঙ্গে প্রাশিয়ার সংঘর্ষ দেখা দেয় এবং ১৮৬৪ খ্রিস্টাব্দে ভিয়েনার চুক্তি দ্বারা এই যুদ্ধের নিষ্পত্তি হয়।



প্রশ্ন: শ্লেজউইগ-হলস্টিন সমস্যা কী?

উড়র: শ্লেজউইগ-হলস্টিন রাজ্য দুটি ডেনমার্ক ও প্রাশিয়ার সীমানায় অবস্থিত ছিল। দুটি প্রদেশই ছিল জার্মান জাতি অধ্যুষিত এবং ডেনমার্কের অধীনস্থ স্বায়ত্তশাসনভোগী।

১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে ডেনমার্কের রাজা এই প্রদেশ দুটির স্বায়ত্তশাসন বাতিল করে শ্লেজউইগকে ডেনমার্কের অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করলে সমস্যার সৃষ্টি হয়। প্রদেশ দুটির জনগণ জার্মানির সঙ্গে যুক্ত হতে চাইলে বিসমার্ক ডেনমার্ক আক্রমণ করে।



প্রশ্ন: অস্ট্রিয়া কবে, কোন্ যুদ্ধে প্রাশিয়ার কাছে পরাজিত হয়?

উত্তর: ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দে, স্যাডোয়ার যুদ্ধে অস্ট্রিয়া প্রাশিয়ার কাছে পরাজিত হয়।



প্রশ্ন: গ্যাস্টিনের চুক্তি কবে কাদের মধ্যে হয়?

উত্তর: এই চুক্তির শর্তগুলি কী কী ছিল? উত্তর ১৮৬৫ খ্রিস্টাব্দে অস্ট্রিয়া ও প্রাশিয়ার মধ্যে গ্যাস্টিনের এই চুক্তির শর্তগুলি হল— (১) অস্ট্রিয়া হলস্টিন ডাচিটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। লাভ করবে। (২) প্রাশিয়ার অধিকারে আসবে শ্লেজউইগ। (৩) হলস্টিনের অন্তর্গত লাউয়েনবার্গ অঞ্চল অর্থের বিনিময়ে অস্ট্রিয়া প্রাশিয়াকে ছেড়ে দেয়। (৪) অস্ট্রিয়া ও প্রাশিয়া স্থির করে যে, ভবিষ্যতে দ্বি-পাক্ষিক ভিত্তিতে ডাচি দুটি (শ্লেজউইগ, হলস্টিন) সম্পর্কে পাকা ব্যবস্থা করা হবে।

এই চুক্তির ফলে জার্মানিতে প্রাশিয়ার ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয় এবং প্রাশিয়ার নেতৃত্বে জার্মানির ঐক্য সম্ভব বলে জাতীয়তাবাদীরা মনে করতে থাকেন।



প্রশ্ন: কোন্ কোন্ যুদ্ধের মাধ্যমে জার্মানির ঐক্যকরণ ঘটে?

উত্তর: ১)ডেনমার্ক-প্রাশিয়া যুদ্ধ ২) অস্ট্রিয়া-প্রাশিয়া যুদ্ধ এবং ৩) ফ্রান্স-প্রাশিয়া যুদ্ধের মাধ্যমে জার্মানির ঐক্যকরণ ঘটে। 



প্রশ্ন: স্যাডোয়ার যুদ্ধ কবে, কাদের মধ্যে হয়েছিল? এই যুদ্ধে কে পরাজিত হয়? এই যুদ্ধের গুরুত্ব কী?

উত্তর: ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দে প্রাশিয়া ও অস্ট্রিয়ার মধ্যে স্যাডোয়ার যুদ্ধ হয়। এটি কনিগ্রাজ যুদ্ধ নামেও পরিচিত। (১) এই যুদ্ধে প্রাশিয়া জয়লাভ করে। পরাজিত অস্ট্রিয়া প্রাগের সন্ধির মাধ্যমে প্রাশিয়াকে জার্মানির উত্তরাংশ প্রদান করে ফলে প্রাশিয়ার নেতৃত্বে জার্মানির উত্তরাংশ অর্থাৎ শ্লেজউইগ, হলস্টিন, হ্যানোভার, হেস প্রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত হলে উত্তর জার্মানির ঐক্য সম্পূর্ণ হয়। (২) এই যুদ্ধে অস্ট্রিয়ার পরাজয়ের ফলে জার্মানিতে অস্ট্রিয়ার আধিপত্য ধ্বংস হয়। (৩) অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনা নগরীর পথ বিজয়ী প্রাশীয় সেনাদলের জন্যে উন্মুক্ত হয়।



প্রশ্ন: স্যাডোয়ার যুদ্ধ কেন হয়েছিল?

উত্তর: বিসমার্ক উপলব্ধি করেছিলেন জার্মানির ঐক্য সাধনের ক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায় অস্ট্রিয়া, তাই অস্ট্রিয়ার সাথে যুদ্ধ অপরিহার্য। এই কারণে নামমাত্র অজুহাতে বিসমার্ক অস্ট্রিয়া আক্রমণ করে হলস্টিন দখল করে নেয় এতে অস্ট্রিয়া ক্ষুব্ধ হলে অস্ট্রিয়া ও প্রাশিয়ার মধ্যে স্যাডোয়ার যুদ্ধ (১৮৬৬ খ্রি:) হয়। এই যুদ্ধে অস্ট্রিয়া শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয় এবং প্রাগের সন্ধি স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়। এই যুদ্ধে অস্ট্রিয়ার পরাজয়ের ফলে জার্মানিতে অস্ট্রিয়ার আধিপত্য ধ্বংস হয়। অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনা নগরীর পথ বিজয়ী প্রাশিয়া সেনাদলের জন্যে উন্মুক্ত হয়। সার্বজনীন ভোটের মাধ্যমে গঠিত হয় উত্তর জার্মানির জাতীয় সংসদ রাইখস্ট্যাগ এবং প্রাশিয়ার নেতৃত্বে জার্মানির ঐক্যের পথ প্রস্তুত হয়।



প্রশ্ন: কুন্টুর ক্যাম্প বা সভ্যতার সংগ্রাম কী?

উত্তর: জার্মান ক্যাথলিকগণ পোপ নবম পায়াসের নির্দেশে রাষ্ট্রীয়, আইনের উর্দ্ধে পোপের আইনকে স্থান দিতে চাইলে বিসমার্ক তা মেনে নেন না বরং তিনি মনে করেন ক্যাথলিকরা জার্মান সংহতি বিরোধী। এই কারণে তিনি একটি আইন জারি করে ক্যাথলিকদের দমন করতে সচেষ্ট হন। জার্মানিতে রাষ্ট্র ও চার্চের এই দ্বন্দ্ব কুন্টুর ক্যাম্প বা সভ্যতার সংগ্রাম নামে পরিচিত।



প্রশ্ন: ফ্রান্স কোন্ যুদ্ধে প্রাশিয়ার কাছে পরাজিত হয়? কোন্ চুক্তি দ্বারা ফ্রাঙ্কো-প্রাশিয়ান যুদ্ধের নিষ্পত্তি ঘটে?

উত্তর: ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে সেডানের যুদ্ধে ফ্রান্সের সেনাবাহিনী প্রাশিয়ার কাছে পরাজিত হয়। ফ্রাঙ্কফোর্টের সন্ধি দ্বারা (মে, ১৮৭১ খ্রি.) এই যুদ্ধের নিষ্পত্তি ঘটে।



প্রশ্ন: স্যাডানের যুদ্ধ কবে কাদের মধ্যে হয়? এই যুদ্ধের গুরত্ব কী?

উত্তর: ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে স্যাডানের যুদ্ধ হয়েছিল প্রাশিয়া ও ফ্রান্সের মধ্যে। এই যুদ্ধে ফ্রান্সের পরাজয় ঘটে।

গুরুত্ব: (১) এই যুদ্ধে পরাজয়ের ফলে তৃতীয় নেপোলিয়ন বন্দি হন এবং সিংহাসনচ্যুত হন। (২) পরাজিত ফ্রান্স ফ্রাঙ্কফোর্টের সন্ধি স্বাক্ষরে বাধ্য হয়। (৩) সন্ধির শর্তানুসারে পরাজিত ফ্রান্স প্রাশিয়াকে দক্ষিণ জার্মানি ও ইতালিকে রোম ছেড়ে দেয়। (৪) রোম লাভ করে ইতালির ঐক্য সম্পূর্ণ হয়। (৫) প্রাশিয়ার নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ জার্মানি গঠিত হয়। (৬) জার্মানির শক্তি বৃদ্ধি হয়ে ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী দেশে পরিণত হয়। (৭) ফ্রান্সে তৃতীয়বার প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়।



প্রশ্ন: কবে কোথায় প্রাশিয়ার রাজা জার্মানির সম্রাট বলে ঘোষিত হন?

উত্তর: ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দের ১৮ জানুয়ারি ভার্সাই রাজপ্রাসাদে প্রাশিয়ার রাজা প্রথম উইলিয়াম আনুষ্ঠানিকভাবে ঐক্যবদ্ধ জার্মানির সম্রাট বা কাইজার উপাধি নিয়ে সিংহাসনে বসেন।



প্রশ্ন: এমস টেলিগ্রাম কী?

উত্তর: এমস (Ems) নামক স্থানে ফরাসি রাষ্ট্রদূত বেনেদিতি প্রাশিয়ার রাজা উইলিয়ামের সঙ্গে দেখা করেন এবং ভবিষ্যতে স্পেনের সিংহাসনে প্রাশিয়ার কোনো দাবি থাকবে না এই মর্মে প্রতিশ্রুতি দাবি করেন। রাজা উইলিয়াম এই ঘটনার বিবরণ বিসমার্ককে টেলিগ্রাম করে জানালে বিসমার্ক টেলিগ্রামটির বয়ান সংশোধিত করে প্রকাশ করেন। এর ফলে ফরাসিরা মনে করল যে তাদের দূত প্রাশিয়ার রাজা কর্তৃক অপমানিত হয়েছেন। এই ঘটনা এমস টেলিগ্রাম নামে পরিচিত।



প্রশ্ন: ফ্রাঙ্কফোর্ট সন্ধির গুরুত্ব কী?

উত্তর: ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দে ফ্রাঙ্কফোর্টের চুক্তির মাধ্যমে— ১) ফ্রান্স আলসাস ও লোরেন জার্মানিকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। ২) এই সন্ধির ফলেই জার্মানির ঐক্য সম্পন্ন হয় এবং ৩) এই সন্ধির পরেই দ্বিতীয় ফরাসি সাম্রাজ্যের পতন ঘটে।



প্রশ্ন: ফ্রাঙ্কফোর্ট পার্লামেন্টের উদ্দেশ্য কী ছিল? 

উত্তর:  ১) এই পার্লামেন্টর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল—শান্তিপূর্ণ ও সাংবিধানিক পথে ও গণতান্ত্রিক পথে জার্মানিকে একটি ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত করা। (২) ঐক্যবদ্ধ জার্মানির জন্য একটি সংবিধান রচনা করা। (৩) জার্মানিতে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করা।



প্রশ্ন:  ফ্রাঙ্কফোর্ট পার্লামেন্ট কেন ব্যর্থ হয়েছিল? র ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দে ১৮ মে ফ্রাঙ্কফোর্ট পার্লামেন্টের ব্যর্থতার কারণগুলি নিম্নরূপ।

(১) পার্লামেন্টের সদস্যদের মধ্যে তীব্র মতপার্থক্যও পারস্পরিক সন্দেহ (২) পার্লামেন্টে মধ্যবিত্তদের প্রাধান্য (৩) কৃষক শ্রমিকদের পার্লামেন্টে কোনো স্থান না দেওয়া (৪) নিজ সিদ্ধান্ত কার্যকর করার মত কোন বৈধ ক্ষমতা না থাকা (৫) পার্লামেন্টের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অস্ট্রিয়া ও তার অনুগত জার্মান রাজ্যগুলির প্রতিবাদ। (৬) ন্যায্য অধিকার ও বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্রের যুগের চিন্তাধারা অনুযায়ী ফ্রাঙ্কফোর্ট পার্লামেন্টের কোনো বৈধ অধিকার ছিল না। (৭) জার্মানির রাজ্য সরকারগুলির সঙ্গে প্রস্তাবিত কেন্দ্রীয় সরকারের সম্পর্ক কী হবে এ বিষয়ে ফ্রাঙ্কফোর্ট সংবিধান পরিষ্কার ছিল না।



প্রশ্ন: ‘হেটাইরিয়া ফিলিকে’ কী ও কবে প্রতিষ্ঠিত হয়?

উত্তর: গ্রিসের একটি বৈপ্লবিক সংস্থার নাম ছিল ‘হেটাইরিয়া ফিলিকে' (বান্ধবসভা)। ১৮১৪ খ্রিস্টাব্দে তুরস্কের আধিপত্য থেকে মুক্তি অর্জনের জন্য গ্রিসের বিপ্লবীরা ওডেসায় এই গুপ্ত সমিতি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।



প্রশ্ন: কোন্ দেশ ‘ইউরোপের রুগ্ম মানুষ’ নামে পরিচিত ছিল এবং কেন?

উত্তর: তুরস্ক ইউরোপের রুগ্ধ মানুষ নামে পরিচিত ছিল, কারণ ১) তুরস্ক সাম্রাজ্যবাদ উনিশ শতকে দুর্বল হয়ে পড়েছিল এবং ২) ইউরোপের বল্কান অঞ্চলে তুরস্ক সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী মুক্তি আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, যা প্রতিহত করতে তুরস্ক ব্যর্থ হয়েছিল। ৩) যুগপোযুগী সংস্কারের অভাবে মধ্যযুগীয় মোল্লাতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় তুরস্ক সামাজিক অর্থনৈতিক, সামরিক প্রশাসনিক সমস্ত দিক দিয়েই ইউরোপের অন্যান্য রাষ্ট্রগুলির থেকে পিছিয়ে পড়ে ৪) তুর্কি সুলতানগণ ছিলেন স্বেচ্ছাচারী, ব্যভিচারী অদক্ষ দুর্বল ও সংস্কার বিমুখ। তারা গভর্নর, সৈন্যবাহিনী, পুলিশ ও গুপ্তচরদের দিয়ে দেশ শাসন করতেন। ৫) তীব্র অর্থনৈতিক সংকট ইউরোপের অন্যান্য দেশ থেকে তুরস্ককে রুগ্ম করে তোলে। এ ছাড়াও সেনাবাহিনীকে আধুনিক রণসজ্জায় সজ্জিত করে না তুলতে পারায় তুরস্ক ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় দুর্বল হয়ে পড়ে তাই তুরস্ককে ইউরোপের রুগ্ম মানুষ বলা হয়।



প্রশ্ন: বন্ধান লিগ কেন গঠিত হয়েছিল?

উত্তর: তুরস্কের সুলতানের অত্যাচার থেকে স্বাধীনতাকামী জাতীয়তাবাদী, বল্কানবাসীদের সাহায্য করার উদ্দেশ্যে গ্রিস সার্বিয়া, মন্টিনিগ্রো এবং বুলগেরিয়া মিলিত ভাবে বল্কান লিগ গঠন করেছিলেন।



প্রশ্ন: বঙ্কান জাতীয়তাবাদের উদ্ভবের দুটি কারণ কী ছিল?

উত্তর: বল্কান জাতীয়তাবাদের উদ্ভবের দুটি কারণ ছিল—  ১)ফরাসি বিপ্লবের আদর্শের প্রভাব ও নেপোলিয়নের সাম্রাজ্যবাদের প্রতিক্রিয়া, ২) বল্কান অঞ্চলের জনগণের ওপর তুর্কি-শাসক গোষ্ঠীর অত্যাচার এবং রাশিয়া কর্তৃক বঙ্কান অঞ্চলের জাতীয়তাবাদের মদত দান।



প্রশ্ন: বল্কান অঞ্চলটি কোথায় অবস্থিত ছিল? এই অঞ্চলে কোন্ কোন্ জাতিগোষ্ঠীর লোক বাস করত?

উত্তর: পূর্ব ইউরোপের ঠিক মাঝখানে বল্কান অঞ্চলটির অবস্থান ছিল, দানিয়র নদী ও ইজিয়ান সাগরের মধ্যবর্তী পার্বত্য অঞ্চলটি ছিল বল্কান অঞ্চল। এই অঞ্চলে বাস করত গ্রিক, সার্ব, বুলগার, রুমানিয়ান, শ্লাভ প্রভৃতি ইউরোপীয় জাতিগুলি।



প্রশ্ন: বঙ্কান জাতীয়তাবাদ কী?

উত্তর: বল্কান অঞ্চলে বসবাসকারী গ্রিস, সার্ব, বুলগার প্রভৃতি জাতির বেশির ভাগই ছিল খ্রিস্টান আর ছিল কিছু সংখ্যক ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষ। তুরস্কের সুলতানও ছিলেন ইসলাম ধর্মাবলম্বী। তিনি বল্কান অঞ্চলের খ্রিস্টান প্রজাদের ওপর ধর্মীয় চাপের সৃষ্টি করলে বঙ্কান অঞ্চলের জাতিগুলি তুরস্কের হাত থেকে মুক্তি পেতে চায়। তুরস্কের দুর্বলতার সুযোগে, রাজনৈতিক সংকটে বল্কান অঞ্চলের অধিবাসীদের স্বাধীনতা লাভের ইচ্ছা বল্কান জাতীয়তাবাদ নামে পরিচিত।



প্রশ্ন: Plan Slavism কী?

উত্তর: বল্কান অঞ্চলে তুরস্কের অতুর্কি প্রজাদের অধিকাংশই ছিল শ্লাভ-জাতীয় মানুষ। রাশিয়াতেও ছিল শ্লাভ জাতির লোকের বাস। বল্কান অঞ্চলে শ্লাভ জাতির ঐক্যের আদর্শের প্রচারের জন্য যে আন্দোলন শুরু হয় তাকেই Pan-Slavism বলা হয়। এই আন্দোলনের নেপথ্যে ছিল রাশিয়া। বঙ্কান অঞ্চলে শ্লাভ জাতির স্বাধীনতা লাভ করলে, যাতে তুর্কি সাম্রাজ্যের ভাঙ্গন সৃষ্টি করা যায় সে জন্যই রাশিয়া সেখানে প্রভাব বিস্তার করে। গ্রিক খ্রিস্টান আধিপত্য প্রতিষ্ঠার দাবি জানায় এবং একে কেন্দ্র করেই ক্রিমিয়ার যুদ্ধ শুরু হয়।



প্রশ্ন: ক্রিমিয়ার যুদ্ধ কত খ্রিস্টাব্দে শুরু হয়? এই যুদ্ধে যোগদানে ক্যাভুরের উদ্দেশ্য কী ছিল?

উত্তর: ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে ক্রিমিয়ার যুদ্ধ শুরু হয়। ক্রিমিয়ার যুদ্ধে যোগদান ক্যাভুরের রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচায়ক। এই যুদ্ধে যোগান তাঁর উদ্দেশ্য ছিল— ১) আন্তর্জাতিক স্তরে ইতালির গুরুত্ব বৃদ্ধি করা এবং ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের সহানুভূতি অর্জন করা। ২) ইতালির সমস্যাকে আন্তর্জাতিক সমস্যায় পরিণত করা। ৩) অস্ট্রিয়ার অন্যায় কর্তৃত্ব থেকে মুক্ত হওয়া এবং ৪) ইতালির জাতীয়তাবাদী চেতনার কথা আন্তর্জাতিক স্তরে তুলে ধরা।



প্রশ্ন: ক্রিমিয়ার যুদ্ধ কবে কাদের মধ্যে হয়? কতদিন ধরে এই যুদ্ধ চলে?

উত্তর: ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে মূলত তুরস্ক [নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য পরবর্তী সময়ে তুরস্কের পক্ষে যোগদান করে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, পিডমন্ট-সার্ডিনিয়া] ও রাশিয়ার মধ্যে শুরু হয়। এই যুদ্ধ চলে দুবছর ধরে অর্থাৎ ১৮৫৪ থেকে ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত।



প্রশ্ন: ক্রিমিয়ার যুদ্ধের মূল কারণগুলি কী ছিল?

উত্তর: ১) তুরস্কের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে রাশিয় আগ্রাসন নীতি ২) তৃতীয় নেপোলিয়ন কর্তৃক প্যালেস্টাইনে খ্রিস্টান ধর্মস্থানগুলির ওপর ক্যাথলিকদের আধিপত্য স্থাপনের চেষ্টা। ৩) রাশিয়া কর্তৃক গ্রিক খ্রিস্টান অধিবাসীদের গ্রেটোর গির্জার চাবি ফেরতের দাবি।

তুরস্কের সুলতান রাশিয়ার জার নিকোলাসের দাবি না মানলে নিকোলাস অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন এবং তুরস্ক আক্রমণ করেন। তুরস্কের সাহায্যে এগিয়ে আসে ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, সার্ডিনিয়া পিডমন্ট। শুরু হয়ে যায় ক্রিমিয়ার যুদ্ধ (১৮৫৬ খ্রি:) এই যুদ্ধে রাশিয়ার পরাজয় ঘটে।



প্রশ্ন: ক্রিমিয়ার যুদ্ধ কীভাবে ইতালির ঐক্য আন্দোলনে সাহায্য করেছিল?

উত্তর: ক্রিমিয়ার যুদ্ধের সময় পিডমন্ট-সার্ডিনিয়ার প্রধানমন্ত্রী ক্যাভুর ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের পক্ষে একদল সৈন্য প্রেরণ করেন। ফলে প্যারিসের শাস্তি সম্মেলনে ক্যাভুর আমন্ত্রণ পান এবং তিনি ইতালির সমস্যাগুলি ইউরোপের বৃহৎ শক্তি বিশেষ করে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের সামনে তুলে ধরে সহানুভূতি অর্জন করেন। ফ্রান্স ইতালিকে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি প্রদান করে, ফলে ইতালির ঐক্যের পথ অনেকটাই প্রশস্ত হয়।



প্রশ্ন: ক্রিমিয়ার যুদ্ধের দুটি ফলাফল লেখো।

উত্তর: ক্রিমিয়ার যুদ্ধে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল ছিল— এই যুদ্ধে রাশিয়া পরাজিত হয় এবং ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দে প্যারিসের সন্ধি করতে বাধ্য হয়। ২ তুরস্ক সাম্রাজ্য ব্যাপক ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পায় এবং বল্কান জাতীয়তাবাদ তীব্র হয়ে ওঠে।



প্রশ্ন: আদ্রিয়ানোপল-এর সন্ধির (১৮২৯ খ্রি.) গুরুত্ব কী ?

উত্তর: আদ্রিয়ানোপল সন্ধির মাধ্যমে ১) তুরস্কের সুলতান নতিস্বীকার করেন এবং ২) গ্রিস তুরস্ক সাম্রাজ্যের মধ্যে একটি স্বশাসিত রাষ্ট্ররূপে স্বীকৃতি লাভ করে। 



প্রশ্ন: হেটাইরিয়া ফিলিকে বা জনগণের বন্ধু কবে কেন গড়ে উঠে?

উত্তর: গ্রিসের একটি বিখ্যাত গুপ্ত সমিতির নাম হল হেটাইরিয়া ফিলিকে বা স্বাধীনতার অনুরাগী নামে গুপ্ত সমিতি । স্কুপাস নামক একজন বণিক তিনজন সহ চারজন বণিকের উদ্যোগে ১৮১৪ খ্রিস্টাব্দে গ্রিসের ওডেসা বন্দরে কৃষ্ণসাগর উপকূলে এটি গড়ে উঠে। 

উদ্দেশ্য: ১) বিধর্মী তুর্কি আধিপত্য তথা তুরস্কের হাত থেকে মুক্ত হতে গ্রীক জাতীয়তাবাদীদের সংগঠিত করা ২) গ্রিক জনগণকে জাতীয়তাবাদের ভাবধারায় দীক্ষিত করে স্বাধীনতা আন্দোলন সংগঠিত করা। ৩) তুরস্ক থেকে তুর্কিদের বিতাড়ন করে প্রাচীন বাইজেনটাইন সাম্রাজ্যের পুনরুত্থান ঘটানো।




প্রশ্ন: বার্লিন সন্ধি কোন্ সালে স্বাক্ষরিত হয়? কে এর উদ্যোক্তা ছিলেন?

উত্তর: ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে বার্লিন সন্ধি স্বাক্ষরিত হয়। জার্মানির প্রধানমন্ত্রী বিসমার্ক এই সন্ধির প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন।



প্রশ্ন: প্যারিসের শান্তিচুক্তি কবে কাদের মধ্যে হয়? চুক্তিগুলি কী কী ছিল?

উত্তর: প্যারিসের শান্তিচুক্তি ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দে ৩০ মার্চ রাশিয়ার সঙ্গে তুরস্ক ও ইংল্যান্ড, ফ্রান্সের হয়। শর্তাবলি— ১) রাশিয়া মোলদাভিয়া ও ওয়ালাছিয়া থেকে সৈন্য সরিয়ে নেবে। ২) তুরস্কের স্বাধীনতা ও অখন্ডতা স্বীকার করা হবে। ৩) তুরস্কের নবজীবন লাভে ইউরোপের শক্তিগুলি সাহায্য করবে। 



প্রশ্ন: 'মুক্তির ঘোষণা' কী? অথবা, ভূমিদাসদের মুক্তির সনদ কে, কবে ঘোষণা করেন?

উত্তর:  জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডার ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে রাশিয়ায় অমানবিক ভূমিদাস প্রথা অবসানের জন্য যে আইন প্রণয়ন করেন, তা মুক্তির ঘোষণা নামে পরিচিত।



প্রশ্ন: ‘মির’ বলতে কী বোঝায়?

উত্তর: মির বলতে রাশিয়ার গ্রাম্য সমিতিকে বোঝানো হত। মির একারণেই তাৎপর্যপূর্ণ ছিল যে, জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডার রাশিয়ায় ভূমিদাস প্রথার বিলোপসাধন করেন। অবশ্য ভূমিদাসগণ মুক্তি লাভ করে জমির মালিকানা পায়নি। মুক্তিপ্রাপ্ত ভূমিদাসদের ‘মির’ বা গ্রাম্য সমবায় সমিতির নিয়ন্ত্রণে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ফলে কৃষকরা মুক্ত হলেও মিরের দ্বারা নির্যাতিত হতে থাকে।



প্রশ্ন: কবে ও কীভাবে জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডার নিহত হন?

উত্তর:  ১৮৮১ খ্রিস্টাব্দে রাশিয়ার নিহিলিস্ট তথা বিপ্লবীদের বোমার আঘাতে জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডার নিহত হন। 



প্রশ্ন: রাশিয়ায় ভূমিদাসরা কেন প্রকৃত অর্থনৈতিক স্বাধীনতা পায়নি?

উত্তর: রাশিয়ায় ভূমিদাসরা ভূমিদাসত্ব থেকে মুক্তি পেয়েছিল ঠিকই, কিন্তু কৃষকদের ব্যক্তিগতভাবে জমির মালিকানা না দিয়ে তাদের ‘মির’ নামক গ্রাম্য সমবায় সমিতির তত্ত্বাবধানে রাখা হয়। ফলে ভূমিদাসরা প্রকৃত অর্থনৈতিক স্বাধীনতা পায়নি।



প্রশ্ন: মুক্তিদাতা জার কাকে কেন বলা হয়? 

উত্তর: রাশিয়ার জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডারকে বলা হয় মুক্তিদাতা জার।  ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে তিনি এক আদেশ জারি করে রাশিয়াতে যুগ যুগ ধরে চলে আসা ভূমিদাসেদের দাসত্ব থেকে মুক্তি দিয়ে তাদের স্বাধীন বলে ঘোষণা করেন। ভূমিদাসরা স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করার ও সম্পত্তির অধিকার লাভ করে। তাই আলেকজান্ডারকে মুক্তিদাতা জার বলা হয়।



প্রশ্ন: ভূমিদাসদের মুক্তির ঘোষণপত্রে কী কী ঘোষণা করা হয়?

উত্তর: মুক্তির ঘোষণাপত্রে ঘোষণা করা হয় - ১) ভূমিদাস প্রথার অবসান হবে। ২) ভূমিদাসরা মুক্ত হয়ে স্বাধীন নাগরিকদের মর্যাদা পাবে। ৩) ভূমিদাসরা পূর্বে প্রভুর যে জমি চাষ করত তার অর্ধেক তাকে দেওয়া হবে। ৪) জমিদাররা ক্ষতিপূরণ পাবে ৫) জমিদারদের কাছ থেকে প্রাপ্ত জমির মালিকানা ভূমিদাসরা পাবে না। তা থাকবে গ্রামসভা মিরের হাতে। 



প্রশ্ন: ভূমিদাস প্রথার উচ্ছেদের তাৎপর্য কী?

এর ফলে  ১) সমগ্র রাশিয়ায় ভূমিদাস প্রথার উচ্ছেদ হয় ২) ভূমিদাসরা স্বাধীন নাগরিকের মর্যাদা পায়। ৩) ভূমিদাসদের বিক্রি, বন্দক ও ভাড়া খাটানোর অধিকার ভূস্বামীরা হারায় ৪) রাশিয়ার আধুনিকীকরণের দ্বার উন্মুক্ত হয়। ৫) রাশিয়ার কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্যের প্রভূত অগ্রগতি হয়।



প্রশ্ন: জেমস্তভো কাকে বলে?

উত্তর: রাশিয়ার জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডার রাশিয়ায় নানা রকমের সংস্কারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। কেন্দ্রীভূত শাসনব্যবস্থা কিছুটা শিথিল করার জন্য তিনি স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন ব্যবস্থার প্রচলন করেন এবং এই উদ্দেশ্যে স্থানীয় প্রতিনিধিসভার হাতে আঞ্চলিক শাসনভার আংশিক তুলে দেন। এইসব স্থানীয় প্রতিনিধিসভা জেমস্তভো নামে পরিচিত ছিল। প্রতিনিধি সভার হাতে নিজ নিজ এলাকার রাস্তাঘাট নির্মাণ, প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়া, চিকিৎসা ব্যবস্থা, শান্তি রক্ষা, জনস্বাস্থ্য দেখার ভার অর্পিত হয়।



প্রশ্ন: নিহিলিস্টদের উদ্দেশ্য কী ছিল?

উত্তর: রাশিয়ার জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডারের রাজত্বকালে সে দেশে যে বিপ্লবী আন্দোলন শুরু হয় তা নিহিলিস্ট আন্দোলন নামে পরিচিত। রাশিয়ার শিক্ষিত সম্প্রদায় উপলব্ধি করে যে প্রচলিত সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর বিলোপসাধন না করলে সেদেশের প্রকৃত উন্নতি ঘটবে না। তাই তারা সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ পরিচালনার উদ্দেশ্যে একটি কেন্দ্রীয় গুপ্ত সমিতি (Land and liberty) গঠন করে। হিংসা ও সন্ত্রাসের মাধ্যমে প্রচলিত ব্যবস্থাকে আঘাত করা এদের লক্ষ্য ছিল।