Class 9 History Chapter 6 (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও তারপর) সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর Questions And Answers

প্রশ্ন: জাতীয়তাবাদ কাকে বলে? 

উত্তর: কোনো জনসমাজের মধ্যে বংশ, ধর্ম, ভাষা, সাহিত্য সংস্কৃতি প্রভৃতি নানা কারণে যখন এক গভীর একাত্মাবোধের সৃষ্টি হয় এবং এই একাত্মাবোধের জন্য জনসমাজের প্রত্যেকে যখন নিজেকে সুখ-দুঃখ, ন্যায়-অন্যায়, মান-অভিমানের সমান অংশীদার বলে মনে করে তখন তাকে জাতীয়তাবাদ বলা হয়।



প্রশ্ন: উগ্র জাতীয়তাবাদ বলতে কী বোঝ? 

উত্তর: জাতীয়তাবাদের বিকৃতরূপ হল উগ্র জাতীয়তাবাদ। স্বদেশ ও স্বজনের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে যে জাতীয়তাবাদ জাত্যাভিমানে পরিণত হয়। তাকে উগ্র জাতীয়তাবাদ বলা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে জার্মানি, ইটালি, জাপানে বিধ্বংসী উগ্র জাতীয়তাবাদ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমি তৈরি করেছিল।



প্রশ্ন: ‘হেরেনফোক তত্ত্ব' কী?

উত্তর: জার্মানরা মনে করত, তারাই একমাত্র আদি ও অকৃত্রিম আর্য জাতি। সেই কারণে বিশ্বে তারাই একমাত্র প্রভু জাতি (Master Race)। সুতরাং অন্য সকল সংকর জাতির ওপর তাদের শাসন প্রতিষ্ঠা করার মৌলিক অধিকার আছে। এই তত্ত্বই ‘হেরেনফোক তত্ত্ব' নামে পরিচিত।



প্রশ্ন: ফ্যাসিবাদ কী?

উত্তর: (যুদ্ধ-ফেরত খেঁকার সেনা এবং বেকার যুবকদের নিয়ে মুসোলিনি এক আধা সামরিক স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী গঠন করেন। তিনি এর নাম দেন ফ্যাসিস্ট। এই দলের মতবাদই ফ্যাসিবাদ নামে পরিচিত। ইতালিতে মুসোলিনির নেতৃত্বে ফ্যাসিবাদের বিকাশ ঘটেছিল। ফ্যাসিস্টরা মনে করত, রাষ্ট্রই সকল শক্তির আধার। রাষ্ট্রের বাইরে কিছু নেই এবং রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেও কিছু করার নেই। জনমত, ব্যক্তিস্বাধীনতা প্রভৃতি গণতান্ত্রিক প্রথাকে ফ্যাসিবাদ সম্পূর্ণ অবজ্ঞা করত।



প্রশ্ন: নাতসিবাদ কী?

উত্তর: নাতসিবাদের জন্মদাতা ছিলেন অ্যাডল্ফ হিটলার। এই মতবাদের মূল ভিত্তি হল জাতিতত্ত্ববাদ। একদলীয় শাসন ও তার নেতার হাতে রাষ্ট্রের সর্বাত্মক ক্ষমতা সমর্পণ করাই নাতসিবাদের মূল মন্ত্র। নাতসিদের মতে, রাষ্ট্র হল জাতি ও সমাজ থেকে ভিন্ন এক সর্বাত্মক সংগঠন।



প্রশ্ন: ফ্যাসিবাদ ও নাতসিবাদের মধ্যে মিল কোথায়? 

উত্তর: ১) উভয় মতবাদই সর্বাত্মক ক্ষমতার নীতিতে আস্থাশীল, ২) উভয় মতবাদই শান্তির বদলে যুদ্ধনীতিতে বিশ্বাসী ৩) উগ্র জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী ৪) গণতন্ত্র ও সাম্যবাদের ঘোরবিরোধী এবং একনায়কতন্ত্রের পূজারি।



প্রশ্ন: ফ্যাসিবাসের সঙ্গে গণতন্ত্রের তফাত কোথায়?

উত্তর: ১) ফ্যাসিবাদে যেমন রাষ্ট্রই সব, কিন্তু গণতন্ত্রে জনগণই হল ক্ষমতার উৎস ২) ফ্যাসিবাদে কেবল একটি দলের অস্তিত্ব স্বীকার হয়, কিন্তু গণতন্ত্রে বহুদলীয় ব্যবস্থা স্বীকৃত, ৩) গণতন্ত্রে ব্যক্তিস্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও জনগণের বাকৃস্বাধীনতাকে স্বীকার করা হয়, কিন্তু ফ্যাসিবাদ এসবের ঘোর বিরোধী।



প্রশ্ন: ‘ওয়ালওয়াল’ ঘটনা কী?

উত্তর: সামালিল্যান্ড ও আবিসিনার সীমান্তে অবস্থিত ওয়াল নামে একটি গ্রাম। এই গ্রামের অধিকার নিয়ে ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে ইটালি ও আবিসিনিয়ার মধ্যে সংঘর্ষ বাঁধলে কয়েকজন ইটালিয় সেনার মৃত্যু হয়। এই ঘটনাই ‘ওয়ালওয়াল' ঘটনা নামে পরিচিত। এই ঘটনার অজুহাতেই ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে মুসোলিনি আবিসিনিয়া দখল করে নেয়।



প্রশ্ন: ‘হোর-লাভাল’ প্রস্তাব বলতে কী বোঝ?

উত্তর: ইটালি কর্তৃক আবিসিনিয়া আক্রান্ত হলে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স মীমাংসার সূত্র খুঁজতে থাকে। অতঃপর ব্রিটিশ পররাষ্ট্র সচিব স্যামুয়েল হোর ফরাসি পররাষ্ট্র সচিব পিয়ের লাভাল এর সাথে আলোচনা করে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে—যা ‘হোর-লাভাল’ প্রস্তাব নামে পরিচিত। এই প্রস্তাবে ঠিক হয় ইটালি আবিসিনিয়ার দুই তৃতীয়াংশ ভূখণ্ড লাভ করবে।



প্রশ্ন: কোন্ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মুসোলিনি আবিসিনিয়া আক্রমণ করেন? কত খ্রিস্টাব্দে আবিসিনিয়া ইটালির অন্তর্ভুক্ত হয়?

উত্তর: ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে (ডিসেম্বর) ওয়ালওয়াল ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মুসোলিনি আবিসিনিয়া আক্রমণ করেন। ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে আবিসিনিয়া ইটালির অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল।



প্রশ্ন : ইটালি কেন লিগের সদস্যপদ ত্যাগ করেছিল?

উত্তর: মুসোলিনি কর্তৃক আবিসিনিয়া আক্রমণ করলে (১৯৩৫ খ্রি.) আবিসিনিয়ার সম্রাট হাইলে সেলামি লিগের কাছে প্রতিবাদ জানায়। লিগ ইটালির বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ-ঘোষণা করলে ইটালি লীগের সদস্যপদ ত্যাগ করে।



প্রশ্ন: কবে, কাদের মধ্যে এবং কেন ইস্পাত চুক্তি (Pact of steel) স্বাক্ষরিত হয়?

উত্তর: ২২ মে, ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে জার্মানি ও ইতালির মধ্যে ইস্পাত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তি স্বাক্ষরের উদ্দেশ্য ছিল জার্মানি ও ইটালির জনসাধারণের বাঁচার মতো স্থান ও শাস্তি রক্ষার জন্য ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করা। হিটলার পোল্যান্ডের কাছে পোলিশ করিডর ও ডানজিগ দাবি করলে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স পোল্যান্ডের স্বাধীনতার গ্যারান্টি দিয়ে সাহায্যের কথা বলে। এই অবস্থায় ইঙ্গ-ফরাসি শক্তির সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা বুঝে হিটলার মুসোলিনির সঙ্গে ইস্পাতের চুক্তি স্বীকার করেন। বাস্তবে এটি ছিল একটি সামরিক চুক্তি।



প্রশ্ন: গমের যুদ্ধ (Battle of Wheat) বলতে কী বোঝ?

উত্তর: আর্থিক ক্ষেত্রে ও খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ম্বরতার লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য মুসোলিনি জলপাই ও অন্যান্য ফলের চাষ কমিয়ে গম উৎপাদনের ওপর বিশেষ জোর দেন। তিনি এর নাম দেন ‘গমের যুদ্ধ' (Battle of Wheat)।



প্রশ্ন: মুসোলিনি কেন আবিসিনিয়া আক্রমণ করেন? 

উত্তর: ইতালির আবিসিনিয়া আক্রমণের কারণ— ১) পূর্ব পরাজয়ের (১৮৯৬ খ্রি.) প্রতিশোধ, ২) শিল্পের প্রয়োজনে কাঁচামাল সংগ্রহ ৩) উদ্বৃত্ত জনসংখ্যার পুনর্বাসন, ৪) আবিসিনিয়াকে ইটালির সাম্রাজ্যভুক্ত করা। মূলত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অভিলাষ চরিতার্থ করা উদ্দেশ্যেই মুসোলিনি ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে আবিসিনিয়া দখল করেন।



প্রশ্ন: রোম-বার্লিন অস্কৃতি কবে, কাদের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছিল?

উত্তর: ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দের নভেম্বরে জার্মানি ও ইটালির মধ্যে রোম-বার্লিন অক্ষচুক্তি সম্পাদিত হয়। জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী রিবেনট্রপ ও ইটালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিয়ানো এর স্বাক্ষরকারী ছিলেন।



প্রশ্ন: রোম-বার্লিন-টোকিও অক্ষচুক্তি কবে এবং কারা স্বাক্ষর করেছিল?

উত্তর: ২৫ নভেম্বর, ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে জার্মানি ও জাপান একটি সাম্যবাদ বিরোধী চুক্তি স্বাক্ষর করে। পরের বছর (১৯৩৭ খ্রি.) ইটালি এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করলে জার্মানি-জাপান ও ইটালির মধ্যে একটি শক্তিজোেট গড়ে ওঠে যা রোম-বার্লিন-টোকিও অক্ষশক্তি নামে পরিচিত।



প্রশ্ন: রোম-বার্লিন-টোকিও অক্ষশক্তি কেন গড়ে ওঠে ?

উত্তর: রোম-বার্লিন-টোকিও অক্ষশক্তি গড়ে ওঠার কারণ: ১) জার্মানি-জাপান-ইটালি—নিজেদের দেশে সাম্যবাদের প্রসার রোধ করা এবং এই উদ্দেশ্যে পরস্পর পরস্পরকে সাহায্য করা। ২) রাশিয়ার সঙ্গে কোনোরকম চুক্তি না করার অঙ্গীকার করা। ৩) কোনো চতুর্থ শক্তি দ্বারা আক্রান্ত হলে এই তিনটি দেশ পরস্পর পরস্পরকে সহযোগিতার অঙ্গীকার করা। ৪) এই চুক্তির মেয়াদ হবে দশ বছর। বিশ্ব রাজনীতিতে ‘রোম-বার্লিন-টোকিও’ চুক্তি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ—এই চুক্তি একনায়কতন্ত্রের প্রসার ঘটায়, সাম্যবাদের প্রসার রোধ করে।



প্রশ্ন: অ্যান্টি কমিন্টার্ন চুক্তি কী?

উত্তর: ২৫ নভেম্বর, ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে জার্মানি ও জাপানের মধ্যে কমিন্টার্ন বিরোধী চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তির লক্ষ্য ছিল নিজেদের দেশে সাম্যবাদের প্রসার রোধ করতে পরস্পরকে সাহায্য করা এবং রাশিয়াকে প্রতিহত করা। ৬ নভেম্বর ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে ইটালি অতিরিক্ত সদস্য হিসেবে এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করে।



প্রশ্ন: কমিনটার্ন কী?

উত্তর: ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে মস্কোতে যে তৃতীয় কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক সংস্থা গঠিত হয় তা কমিনটার্ন নামে পরিচিত। এটি একটি আন্তর্জাতিক সৌভ্রাতৃত্বের স্বার্থে গঠিত শ্রমিক সংস্থা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমথ পর্যন্ত কমিনটার্ন বিশ্ব সাম্যবাদী আন্দোলনের পথ নির্দেশ করেছিল।



প্রশ্ন: হিটলার কোন্ কোন্ সংগঠনের মাধ্যমে সমস্ত বিরোধিতা দমন করে জার্মানিতে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন?

উত্তর: নাতসি দলের স্টর্ম ট্রুপার্স বা ব্রাউন শার্টস, এলিট গার্ডস বা ব্ল্যাক শার্টস, গেস্টাপো বা গুপ্ত পুলিশ বাহিনী প্রভৃতি আধাসামরিক সংগঠনের মাধ্যমে কড়া হাতে সমস্ত বিরোধিতা দমন করে হিটলার জার্মানিতে নাভসি একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন।



প্রশ্ন: ইল জার্মান নৌ চুক্তি ( Naval) Agreement) বলতে কী বোঝ?

উত্তর ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে জুন মাসে ইঙ্গ-জার্মান নৌচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর ফলে জার্মান ব্রিটিশ নৌবহরের ৩৫% হারে জাহাজ নির্মাণ এবং ৪৫% হারে সাবমেরিন নির্মাণের অনুমতি পায়। এই চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে ইংল্যান্ড হিটলারের আগ্রাসী মনোভাবকে পরোক্ষ সমর্থন জানায়।



প্রশ্ন: লেবেনশ্রউম (Leben Sraum) কী ?

উত্তর: ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর হিটলার জার্মান জাতির শ্রেষ্ঠত্বের আদর্শ প্রচার করে একটি বৃহত্তর জার্মান সাম্রাজ্য গঠনের পরিকল্পনা করেন। তাঁর এই নীতি লেবেনশ্রউম (Leben Sraum) নামে পরিচিত। এই কারণেই তিনি বিস্তারধর্মী নীতি গ্রহণ করেছিলেন।



প্রশ্ন: পোল-জার্মান অনাক্রমণ চুক্তির গুরুত্ব কী ছিল?

উত্তর: জার্মানি ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে পোল্যান্ডের সঙ্গে ১০ বছরের জন্য পোল-জার্মান অনাক্রমণ চুক্তি স্বাক্ষর করে। জার্মানি এই চুক্তির মাধ্যমে পোল্যান্ডকে ১০ বছর আক্রমণ না করার প্রতিশ্রুতি এবং পরস্পরের বিরোধ শান্তিপূর্ণ ভাবে মেটানোর প্রতিশ্রুতি দেয়। এই চুক্তির ফলে ফ্রান্সের সঙ্গে পোল্যান্ডের জার্মান বিরোধী জোট ভেঙে যায়। ফ্রান্স ও পোলান্ড পরস্পর পরস্পরের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।



প্রশ্ন: ‘পোলিশ করিডর (Polish Corridor) কী ?

উত্তর: ভার্সাই সন্ধি অনুসারে জার্মানি নবগঠিত পোল্যান্ডকে সমুদ্রপথে নিষ্ক্রমনের জন্য জার্মানির ভেতর দিয়ে সমুদ্র উপকূল পর্যন্ত (২৬০ × ৪০) বর্গমাইল বিশিষ্ট একটি সংকীর্ণ ভূখণ্ড প্রদান করে। এই ভূখণ্ডটিই পোলিশ করিডর নামে পরিচিত।



প্রশ্ন: হিটলার কীভাবে অস্ট্রিয়া দখল করে?

উত্তর: ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে নাতসিদের প্ররোচনায় অস্ট্রিয়ার চ্যান্সেলার ড: ডলফাস (Dr. Dolfuss) নিহত হলে হিটলার অস্ট্রিয়া দখলের চেষ্টা করেন। কিন্তু ইটালি, ফ্রান্স প্রভৃতি ইউরোপীয় দেশের বিরোধিতার কারণে তাঁর সেই প্রয়াস ব্যর্থ হয়। শেষ পর্যন্ত ১৪ মার্চ ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের তোষণ নীতির সুবাদে হিটলার অস্ট্রিয়া দখল করে নেন।



প্রশ্ন: হিটলারের পররাষ্ট্রনীতির উদ্দেশ্য কী ছিল?

উত্তর: হিটলারের পররাষ্ট্রনীতির মূল উদ্দেশ্যগুলি হল— ১) জার্মানির সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করা, ২) ভার্সাই চুক্তিকে নাকচ করা, ৩) জামান সাম্রাজ্যের প্রসারের জন্য বিস্তারধর্মী নীতি গ্রহণ করা ৪) জার্মান ভাষাভাষী মানুষের জন্য লেবেনশ্রউম (Laben Sraum) গঠন করা।



প্রশ্ন: মার্শাল পেঁতা কে ছিলেন?

উত্তর: জার্মানির কাছে আত্মসমর্পণের পর ফ্রান্সে যে জার্মান তাবেদার সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তার প্রধান ছিলেন মার্শাল পেঁতা। তাঁরই নেতৃত্বে ফ্রান্সে 'ভিচি সরকার' প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তিনি ছিলেন ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী পল রেনোঁর স্থলাভিষিক্ত।



প্রশ্ন: নিরস্ত্রীকরণ সম্মেলন কেন ব্যর্থ হয়। অথবা জার্মানি কবে, কেন লিগের সদস্যপদ ত্যাগ করে?

উত্তর: ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে (ফেব্রুয়ারি) জাতিসংঘের উদ্যোগে জেনেভায় নিরস্ত্রীকরণ সম্মেলন আহূত হয়। এই সম্মেলনে জার্মানি দাবি করেছিল হয় অন্যান্য রাষ্ট্রকে সামরিক দিক থেকে জার্মানির পর্যায়ে নিয়ে আসতে হবে, অথবা জার্মানিকে সামরিক শক্তি বৃদ্ধিতে অনুমতি দিতে হবে। কিন্তু জার্মানির এই প্রস্তাব অগ্রাহ্য হলে জার্মানি নিরস্ত্রীকরণ সম্মেলন ত্যাগ করে এবং ১৪ অক্টোবর ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে লিগের সদস্যপদ ত্যাগ করে। ফলে নিরস্ত্রীকরণ সম্মেলন ব্যর্থ হয়ে যায়।



প্রশ্ন: জাপান কেন জাতিসংঘের সদস্যপদ ত্যাগ করে ?

উত্তর: সাম্রাজ্যবাদী অভিলাষ চরিতার্থ করার জন্য জাপান ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে চিনের মাঞ্চুরিয়া আক্রমণ করে। এই আক্রমণের বিরুদ্ধে চিন জাতিসংঘের কাছে প্রতিকার দাবি করে। লিগের নিযুক্ত অনুসন্ধান কমিটি (লিটন কমিশন) জাপান কে আক্রমণকারী দেশ বলে আখ্যা দিলে জাপান ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে জাতিসংঘের সদস্যপদ ত্যাগ করে।



প্রশ্ন: আনপ্পুস কী? এটি কবে সম্পন্ন হয়েছিল?

উত্তর: জার্মানির সঙ্গে অস্ট্রিয়ার সংযুক্তিকরণকে বলা হয় আনপ্পুস। হিটলার জার্মান ভাষাভাষী অঞ্চল নিয়ে এক বৃহত্তর জার্মান সাম্রাজ্য গঠন করতে চেয়েছিলেন এবং আনক্সুস তারই একটি দিক ছিল। ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দের মার্চে হিটলার আনপ্পুস সম্পন্ন করেন।



প্রশ্ন: যৌথ নিরাপত্তা (Collective Security) ব্যবস্থা বলতে কী বোঝ?

উত্তর: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অবসানের পর বিভিন্ন রাষ্ট্র নিজেদের নিরাপত্তা ও বিশ্ব শান্তি রক্ষার জন্য একক প্রচেষ্টার পরিবর্তে মিলিত প্রচেষ্টার গুরুত্ব উপলব্ধি করেছিল। তাই জাতিসংঘের উদ্যোগে বিভিন্ন রাষ্ট্রের যৌথ প্রয়াসে শান্তি ও নিরাপত্তার যে ব্যবস্থা গড়ে ওঠে তাকে যৌথ নিরাপত্তা (Collective Security) বলা হয়।



প্রশ্ন: মিউনিখ চুক্তি কবে, কারা, কেন স্বাক্ষর করেছিল?

উত্তর: ২৯ সেপ্টেম্বর, ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে মুসোলিনির মধ্যস্থতায় জার্মানির হিটলার, ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী চেম্বারলেন এবং ফরাসি প্রধানমন্ত্রী দালা দিয়েরের মধ্যে মিউনিখ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল।

চেকোশ্লোভাকিয়ার সুদেতান অঞ্চলে জার্মান জাতির সমস্যার সমাধানের জন্য এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির শর্তানুসারে চেকোশ্লোভাকিয়ার জার্মান সংখ্যাগরিষ্ঠ সুদেতান অঞ্চল জার্মানিকে ছেড়ে দিতে হয়।



প্রশ্ন: মিউনিখ চুক্তিতে কী কী শর্ত উল্লেখ ছিল?

উত্তর: ২৯ সেপ্টেম্বর ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে স্বাক্ষরিত মিউনিখ চুক্তিতে স্থির হয় যে, ১) ১১ অক্টোবর থেকে ১০ অক্টোবরের মধ্যে সুদেতান অঞ্চল থেকে চেক সেনা ও সরকারি কর্মচারীদের প্রত্যাহার করা হবে। ২) এই সময়সীমার মধ্যে জার্মান বাহিনী ধাপে ধাপে সুদেতান অঞ্চলের দখল নেবে, ৩) ব্রিটেন, ফ্রান্স ও ইটালি সুদেতান অঞ্চল ও অবশিষ্ট চেকোশ্লোভাকিয়ার সীমান্ত নির্দেশ করে দেবে, ৪) ব্রিটেন ও ফ্রান্স অবশিষ্ট চেকোশ্লোভাকিয়ার স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার রক্ষার গ্যারান্টি দেয়।



প্রশ্ন: মিউনিখ চুক্তির তাৎপর্য উল্লেখ করো।

উত্তর: মিউনিখ চুক্তি ছিল হিটলারের প্রতি ইঙ্গ-ফরাসি তোষণ নীতির প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এই চুক্তি স্বাক্ষরের কালি শুকোবার আগেই পূর্ব প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে হিটলার অবশিষ্ট চেকোশ্লোভাকিয়া দখল করে নেয়। এই নীতির ফলে লিগের যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। অপরদিকে সোভিয়েত রাশিয়াকে মিউনিখ বৈঠক থেকে বাইরে রাখায় সোভিয়েত সরকারের সঙ্গে পশ্চিমি দেশগুলির বিচ্ছেদ সম্পূর্ণ হয়। যা হিটলারের পক্ষে ছিল স্বস্তিদায়ক কারণ। এই বিচ্ছিন্নতার কারণে জার্মান বিরোধী মহাজোট গঠনের সম্ভাবনা দূর হয়।



প্রশ্ন: তোষণ নীতি (Appeasement Policy) বলতে কী বোঝ?

উত্তর: তোষণ নীতির প্রবক্তা ছিলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বলডুইন ও নেভিল চেম্বারলেন। বিংশ শতকের ত্রিশের দশকে ব্রিটেন ও ফ্রান্স ইউরোপীয় ফ্যাসিবাদী শক্তিগুলির (জার্মান ও ইটালি) আগ্রাসী নীতির প্রতিবাদ না করে যে নমনীয় ও আপসমূলক নীতি গ্রহণ করেছিল, তাকেই তোষণনীতি বলা হয়। তোষণ নীতির অর্থ হল অন্যায়ের প্রতিবাদ না করে নীরবে সহ্য করে যাওয়া।



প্রশ্ন: হিটলারের প্রতি ব্রিটেন ও ফ্রান্সের তোষণ নীতির কারণ কী ছিল?

উত্তর: হিটলারের প্রতি ব্রিটেন ও ফ্রান্সের তোষণ নীতির কারণগুলি হল-  ১) প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের সামরিক প্রস্তুতিহীনতা; ২) ব্রিটেনের অর্থনৈতিক স্বার্থরক্ষা (নাতসি জার্মানি ছিল ব্রিটিশ বাণিজ্য পণ্যের অন্যতম ক্রেতা); 3) ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স সোভিয়েত রাশিয়ার প্রতি বিদ্বেষভাবাপন্ন ছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল রাশিয়া ও জার্মানির মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি করে নিজেদের শক্তি অব্যাহত রাখা।



প্রশ্ন: ইঙ্গ-ফরাসি তোষণ নীতির উদ্দেশ্য কী ছিল?

উত্তর: ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের তোষণ নীতি গ্রহণের উদ্দেশ্য— ১) হিটলার ও মুসোলিনিকে সন্তুষ্ট রেখে ইউরোপে শাস্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখা। ২) তারা মনে করত নাতসি জার্মানি বা ফ্যাসিবাদী ইটালির চেয়ে সমাজতন্ত্রী রাশিয়া ছিল অনেক বেশি বিপজ্জনক। তাই ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স চেয়েছিলেন হিটলারের জার্মানি ও মুসোলিনির ইটালিকে দিয়ে সোভিয়েত সাম্যবাদকে ধ্বংস করতে। অর্থাৎ ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে জার্মানি ও ইটালিকে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন রাশিয়ার বিরুদ্ধে।



প্রশ্ন: ইঙ্গ-ফরাসি তোষণ নীতির আশু ফল কী হয়েছিল?

উত্তর: ইঙ্গ-ফরাসি তোষণ নীতির ফলে হিটলার ও মুসোলিনির রাজ্যগ্রাস ক্ষুধা বেড়ে গিয়েছিল। তোষণ নীতির সুবাদে হিটলার যেমন রাইনল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, চেকোশ্লোভাকিয়ার সুদেতান অঞ্চল এবং অবশেষে চেকোশ্লোভাকিয়া দখল করে নেন, তেমনি মুসোলিনিও আবিসিনিয়ার ওপর কর্তৃত্ব কায়েম করে। এই তোষণ নীতি হিটলার ও মুসোলিনিকে দুঃসাহসী করে তুলেছিল। এর ফলে একদিকে যেমন বিশ্বশান্তি বিঘ্নিত হয়, তেমনি বিশ্ব আর একটি যুদ্ধের জন্য প্রহর গুনতে থাকে।



প্রশ্ন: তোষণ নীতি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জন্য কতখানি দায়ী ছিল?

উত্তর: ইঙ্গ-ফরাসি তোষণ নীতির ফলে হিটলার ও মুসোলিনি বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তাঁদের আগ্রাসী নীতির ফলে লিগের যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। তোষণ নীতির ফলেই হিটলার পোল্যান্ড আক্রমণ করার সাহস পেয়েছিলেন। তার ধারণা ছিল বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তার স্বার্থে এবং রাশিয়ার কমিউনিজমের ভয়ে ইঙ্গ-ফরাসি শক্তিদ্বয় পূর্বের মত নীরবতা পালন করবে। কিন্তু তার ধারণা ভ্রান্ত প্রতিপন্ন করে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স পোল্যান্ডের পক্ষ নিয়ে জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে-যার ফলশ্রুতিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। এই জন্য তোষণ নীতিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম কারণ বলা হয়।



প্রশ্ন: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জন্য হিটলার কতখানি দায়ী ছিলেন?

উত্তর: কোনো কোনো ঐতিহাসিক মনে করেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঘটার পেছনে হিটলার কোনো মতেই দায়িত্ব এড়াতে পারেন না। কারণ তার আগ্রাসী নীতি, জাতিসংঘের নিয়মনীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে একের পর এক রাজ্য গ্রাস, রুশ-জার্মান অনাক্রমণ চুক্তি এবং সর্বোপরি পোল্যান্ড আক্রমণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ডেকে আনে। তবে ঐতিহাসিক টেলর মনে করেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জন্য হিটলার এককভাবে দায়ী ছিলেন না; হিটলারের থেকেও ইঙ্গ-ফরাসি শক্তির ভ্রান্ত কূটনীতি বিশ্বযুদ্ধের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিল।



প্রশ্ন: হিটলার কেন চেকোশ্লোভাকিয়া দখল করেছিলেন?

উত্তর: হিটলারের চেকোশ্লোভাকিয়া দখলের কারণ— ১) চেকোশ্লোভাকিয়ার সুদেতান অঞ্চল ছিল জার্মান অধ্যুষিত, ২) চেকোশ্লোভাকিয়ার SKODA কারখানার ওপর তাঁর বিশেষ লোভ ছিল। অর্থাৎ শিল্প কারখানা ও সম্পদ করায়ত্ব করা, ৩) পূর্ব ইউরোপে সাম্রাজ্য বিস্তার নীতির অঙ্গ হিসেবে চেকোশ্লোভাকিয়া গ্রাস খুবই জরুরি ছিল।



প্রশ্ন: হিটলার কবে এবং কোন্ কোন্ চুক্তি অগ্রাহ্য করে রাইনল্যান্ড দখল করেন?

উত্তর: ভার্সাই চুক্তি (১৯১৯ খ্রি:) এবং লোকার্নো চুক্তি (১৯২৫ খ্রি:) অগ্রাহ্য করে ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে হিটলার রাইনল্যান্ড দখল করেন।



প্রশ্ন: হিটলার কেন পোল্যান্ড আক্রমণ করেছিলেন? 

উত্তর: ভার্সাই সন্ধিতে ডানজিগ বন্দর ও পোলিশ করিডর পোল্যান্ডকে দেওয়া হয়েছিল। বৃহত্তর জার্মানি গঠনের জন্য এই অঞ্চল হিটলারের প্রয়োজন ছিল। তাই হিটলার পোল্যান্ডের কাছে ডানজিগ ও পোলিশ করিডরের ভূখণ্ড দাবি করে। কিন্তু পোল্যান্ড হিটলারের এই দাবি নাকচ করে দেয়। (উপরতু ২৬ নভেম্বর ১৯৩৮ খ্রিস্টাব্দে রাশিয়ার সঙ্গে মৈত্রী চুক্তি এবং ৬ এপ্রিল ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটেনের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সামরিক চুক্তি স্বাক্ষর করে।) পোল্যান্ডের এই আচরণে হিটলার ক্ষুব্ধ হন এবং ১ সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে পোল্যান্ড আক্রমণ করেন।



প্রশ্ন: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কীভাবে শুরু হয়?

উত্তর: ১ সেপ্টেম্বর, ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে হিটলার পোল্যান্ড আক্রমণ করলে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের মোহভঙ্গ হয়। এই আক্রমণের ২ দিন পর অর্থাৎ ৩ সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে জার্মানির বিরুদ্ধে অর্থাৎ পোল্যান্ডের পক্ষ নিয়ে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়।



প্রশ্ন: 'ভূতুড়ে যুদ্ধ' (Phony war) বলতে কী বোঝ?

উত্তর: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দ সময়কাল ইঙ্গ-ফরাসি মিত্রশক্তি জার্মানির বিরুদ্ধে কাগজে-কলমে যুদ্ধ ঘোষণা করলেও হাতে কলমে কোনো যুদ্ধে লিপ্ত হয় নি। পশ্চিম রণাঙ্গনে ফ্রান্সে-জার্মান সীমান্তে উভয় পক্ষ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি চালালেও কোনো আক্রমণ ঘটেনি। এই কারণেই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল এই যুদ্ধকে 'ভূতুড়ে যুদ্ধ’ বলেছেন।



প্রশ্ন : 'আশ্চর্যজনক নিষ্কৃতি' (miracle deliverance) কী ?

উত্তর: ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে (জুন) হিটলারের ফ্রান্স আক্রমণের সময় মিত্র বাহিনীর ৩ লক্ষাধিক সেনা ফ্রান্সের ডানকার্ক বন্দরে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। জার্মান বোমারু বিমান ও কামানের আক্রমণ উপেক্ষা করে প্রবল ঝুঁকি নিয়ে মিত্রপক্ষের সেনাপতিরা এই বিশাল সেনাদলকে জাহাজযোগে ইংলিশ চ্যানেল পার করে ইংল্যান্ডে এসে পৌঁছায়। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল এই ঘটনাকে আশ্চর্যজনক নিষ্কৃতি বলে অভিহিত করেছেন।



প্রশ্ন: ‘ভিচি সরকার' বলতে কী বোঝ?

উত্তর: ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে (জুন) হিটলার ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। ইটালিও এই যুদ্ধে জার্মানির পক্ষ নেয়। এই মিলিত বাহিনীর আক্রমণে ফ্রান্স জার্মানির কাছে আত্মসমর্পণ করে এবং ২৯ নভেম্বর এক সন্ধি স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়। সন্ধির শর্তানুসারে ৩/৫ অংশ ফরাসি ভূখণ্ডে জার্মান কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। ফ্রান্সের অবশিষ্ট অংশ নিয়ে মার্শাল পেঁতার নেতৃত্বে একটি জার্মান তাবেদার সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সরকারের রাজধানী ছিল ভিচি শহর। এই শহরের নাম অনুসারে সরকার পরিচিত হয় 'ভিচি সরকার' বলে।



প্রশ্ন: সুপার ব্যাটল (Super Battle) কাকে বলে?

উত্তর: হিটলারের ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ১২৬ ডিভিশন সৈন্য নিয়োগ করেন। এই আক্রমণের প্রচন্ডতা যেমন ছিল, তেমন ছিল নতুন নতুন যন্ত্র ও অস্ত্র সজ্জা। সামরিক ইতিহাসে একে ‘সুপার ব্যাটেল’ বা চরম বলা হয়। এই আক্রমণের ফলে তিন লক্ষাধিক ফরাসি সেনা ফ্রান্সের ডানকার্ক বন্দরে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে।



প্রশ্ন: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রত্যক্ষ কারণ কী ছিল? অথবা, কবে কোন ঘটনার মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হয়?

উত্তর: ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে ১ সেপ্টেম্বর জার্মানি পোল্যান্ড আক্রমণ করে। জার্মানির পোল্যান্ড আক্রমণের দু'দিন পর ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হয়।



প্রশ্ন: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রধান দুই প্রতিপক্ষ কারা ছিল?

উত্তর: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের এক পক্ষে ছিল জার্মানি, ইটালি ও জাপানের অক্ষ শক্তিজোট এবং অপর পক্ষে ছিল ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত রাশিয়ার মিত্র শক্তিজোট বা মহাজোট।



প্রশ্ন: 'পার্ল হারবারের ঘটনা' কী?

উত্তর: উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে অবস্থিত পার্ল হারবার ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌঘাটি। ৭ ডিসেম্বর ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে জাপান পার্ল হারবারে বিমান আক্রমণ চালিয়ে নৌবহরটিকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেয়। এই ঘটনাই পার্ল হারবারের ঘটনা নামে পরিচিত। এই ঘটনার পরেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার নিরপেক্ষতা ভেঙে জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রপক্ষে যোগ দেয়।



প্রশ্ন: কোন্ কোন্ পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যোগ দেয়?

উত্তর: পার্ল হারবারের ঘটনার মধ্য দিয়েই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সামিল হলেও এই অংশগ্রহণের পেছনে আরো অন্যান্য প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল। যেমন- ১) প্রশান্ত মহাসাগরে জাপানের সঙ্গে সংঘাত  ২) উত্তর আফ্রিকায় অক্ষশক্তির সঙ্গে ঔপনিবেশিক দ্বন্দ্ব এবং ৩) ফ্যাসিস্ট আক্রমণের হাত থেকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে রক্ষা করা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণের এই তিনটি প্রধান ক্ষেত্র ছিল।



প্রশ্ন: জাপান কেন পার্ল হারবার আক্রমণ করেছিল?

উত্তর: প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে জাপানের উপনিবেশ দখলের তৎপরতা ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে ইটালি ও জার্মানির সাথে ত্রিপাক্ষিক অক্ষচুক্তি সম্পাদন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বিচলিত করে তোলে। স্বভাবতই জাপানের আগ্রাসী মনোভাবের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৯১১ সালে জাপান-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি বাতিল করে এবং জাপানে পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। এতে জাপান ক্রুদ্ধ হয়ে ৭ ডিসেম্বর ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থিত পার্ল হারবার নৌঘাঁটি আক্রমণ করে।



প্রশ্ন: এক সর্বনাশা মূঢ়তার দিন (A day of Supreme folly) কী?

উত্তর: ৭ ডিসেম্বর, ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে প্রশান্ত মহাসাগরের হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জে অবস্থিত মার্কিন নৌঘাঁটি পার্ল হারবারের ওপর জাপানি নৌবহর (কোনোরকম যুদ্ধ ঘোষণা না করেই) হঠাৎ একযোগে ৩৩৫ টি যুদ্ধ বিমান নিয়ে আক্রমণ হানে। এতে পার্ল হারবার নৌঘাঁটিটি ধ্বংস হয়ে যায়। উইলফ্রিড ন্যাপ এই দিনটিকে জাপানের পক্ষে ‘এক সর্বনাশা মূঢ়তা বা বোকামির দিন’ বলে চিহ্নিত করেছেন। মার্কিন রাষ্ট্রপতি রুজভেল্ট এই দিনটিকে একটি ‘কলঙ্কিত দিন’ বলেছেন।



প্রশ্ন: হিটলার কেন রাশিয়া আক্রমণ করেছিলেন?

উত্তর: ২৩ আগস্ট, ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে স্বাক্ষরিত রুশ-জার্মান অনাক্রমণ চুক্তিকে ভঙ্গ করে ২২ জুন, ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে হিটলার রাশিয়া আক্রমণ শুরু করেন। এর পেছনে কয়েকটি কারণ ছিল। যেমন—১)  রাশিয়ার উত্তরোর সামরিক ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং রাশিয়া কর্তৃক জার্মানি আক্রান্ত হওয়ার অপেক্ষা। এই কারণে রাশিয়া কর্তৃক আক্রান্ত হওয়ার আগেই তিনি রাশিয়া আক্রমণ করেন, ২) রাশিয়া জয়ের ফলে রুশ সীমান্তে অবস্থানরত জার্মান সেনাকে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার সুবিধা, ৩) রাশিয়া জয়ের ফলে ইউক্রেনের গমের ভাণ্ডার ও বাকুর পেট্রোলিয়াম খনিগুলি হস্তগত করে যুদ্ধ প্রচেষ্টাকে চালিয়ে যাওয়া (৪) সর্বোপরি সাম্যবাদকে প্রতিহত করা। এই সব কারণে হিটলার রাশিয়া আক্রমণ করেন।



প্রশ্ন: ‘অপারেশন বারবোরোসা’ (Operation Barbarossa) কী?

উত্তর: হিটলারের রাশিয়া অভিযানের সাংকেতিক নাম ছিল ‘অপারেশন বারবারোসা'। জার্মানির নাতসি বাহিনী ৪০ লক্ষ সেনা, ৩৩০০ ট্যাংক, ৫০০০ বিমান নিয়ে ২২ জুন ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে এই 'অপারেশন বারবারোসা’ শুরু করেন।



প্রশ্ন: হিটলারের রাশিয়া অভিযানের ব্যর্থতার দুটি কারণ উল্লেখ করো। 

উত্তর: রাশিয়া অভিযানে হিটলারের ব্যর্থতার কারণ—রুশ বাহিনীর পোড়ামাটি নীতি ও সক্রিয় গেরিলা আক্রমণ খাদ্যাভাব ও প্রচণ্ড শীতে জার্মান নাতসি বাহিনী বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।



প্রশ্ন: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির মিত্রপক্ষ কারা ছিল? অথবা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে “অক্ষশক্তি” বলতে কোন্ কোন্ রাষ্ট্রকে বোঝাত?

উত্তর: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির পক্ষে ছিল ইটালি ও জাপান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এই তিনটি দেশ ‘অক্ষশক্তি’ নামে পরিচিত।



প্রশ্ন: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহৃত কয়েকটি যুদ্ধক্ষেত্রের নাম লেখো।

উত্তর: অ্যাসল্ট রাইফেল, বি-২৯ মার্কিন জঙ্গি বিমান, ক্ষেপনাস্ত্র, যান্ত্রিক বাহিনী কামান, সাবমেরিন, ট্যাংক, পরমাণু বোমা প্রভৃতি যুদ্ধাস্ত্র দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছিল।



প্রশ্ন: মিত্রপক্ষ কেন দ্বিতীয় রণাঙ্গন খোলে? 

উত্তর: ইটালি দখলের পর মিত্রশক্তিবর্গ পশ্চিম রণাঙ্গনে জার্মানির ওপর নতুন করে আক্রমণ গড়ার কথা চিন্তা করে। মিত্রপক্ষের সদস্য রাশিয়াও কামনা করেছিল যে, পশ্চিম রণাঙ্গনে নতুন করে যুদ্ধের সূচনা হলে রাশিয়ার ওপর জার্মান আক্রমণের চাপ কিছুটা শিথিল হবে, এই উদ্দেশ্যে উত্তর ফ্রান্সের নর্মান্ডি উপকূলে ৬ জুন ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে মিত্রপক্ষ দ্বিতীয় রণাঙ্গনের সূচনা করে।



প্রশ্ন : 'অপারেশন ওভারলর্ড* (Operation Overlord) বলতে কী বোঝ?

উত্তর: মিত্রশক্তিবর্গ ৬ জুন, ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে উত্তর ফ্রান্সের নমান্ডি উপকূলে দ্বিতীয় রণাঙ্গন খোলার পর ফ্রান্সের ভূখণ্ডে জার্মান বিরোধী অভিযান শুরু হয়। এই অভিযানের সাংকেতিক নাম অপারেশন ওভারলর্ড (Operation Overlord)।



প্রশ্ন: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ২ জন মার্কিন সেনাপতি ও ২ জন ব্রিটিশ সেনাপতির নাম লেখো।

উত্তর: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ২ জন মার্কিন সেনাপতির নাম আইজেন হাওয়ার ও জেনারেল ডগলাশ এবং ২ জন ব্রিটিশ সেনাপতির নাম আর্চিবল্ড ওয়াভেল ও লর্ড মাউন্টব্যাটেন।



প্রশ্ন: রুশ-জার্মান অনাক্রমণ চুক্তির শর্তগুলি কী ছিল?

উত্তর: রুশ-জার্মান অনাক্রমণ চুক্তির শর্ত : ১) আগামী ১০ বছর জার্মানি ও রাশিয়া–কেউ কাউকে আক্রমণ করবে না। ২) শাস্তিপূর্ণভাবে পারস্পরিক বিবাদ মিটিয়ে নেবে, ৩) একে অপরের শত্রুর সঙ্গে কোনোরূপ চুক্তিতে আবদ্ধ হবে না। ৪) তৃতীয় কোনো শক্তি কর্তৃক তাদের কেউ আক্রাস্ত হলে, কেউই তৃতীয় পক্ষকে সাহায্য করবে না। ৫) দুই স্বাক্ষরকারী দেশ নিজেদের মধ্যে পোল্যান্ডকে ভাগ করে নিয়ে নিজ নিজ প্রভাবমুক্ত এলাকা স্থির করে নেবে।



প্রশ্ন: রুশ-জার্মান অনাক্রমণ চুক্তি কবে স্বাক্ষরিত হয়েছিল? কে, কে ওই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন?

উত্তর: ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দের ২৩ আগস্ট রুশ-জার্মান অনাক্রমণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সোভিয়েত পররাষ্ট্রমন্ত্রী মলোটভ ও জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী রিবেনট্রপ এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।



প্রশ্ন: কী উদ্দেশ্য নিয়ে রুশ-জার্মান অনাক্রমণ চুক্তি (১৯৩৯) স্বাক্ষরিত হয়?

উত্তর: জার্মানির রুশ-জার্মান অনাক্রমণ চুক্তি (১৯৩৯ খ্রি.) স্বাক্ষরের সময় জার্মানির উদ্দেশ্য ছিল—ভবিষ্যতে পোল্যান্ড আক্রমণের সময় সম্ভাব্য ইঙ্গ-ফরাসি বিরোধিতার সময়ে সোভিয়েত যুক্তরাষ্ট্রকে নিরপেক্ষ রাখা। অন্যদিকে, এই চুক্তি স্বাক্ষরের সময় সোভিয়েত যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য ছিল সামরিক প্রস্তুতির কাজ সম্পন্ন করা।



প্রশ্ন: ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে স্বাক্ষরিত রুশ জার্মান অনাক্রমণ চুক্তির গুরুত্ব কী ছিল?

উত্তর: রুশ-জার্মান অনাক্রমণ চুক্তির গুরুত্ব - ১) রুশ-জার্মান চুক্তির দ্বারা রাশিয়া বিশ্বযুদ্ধ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নেয়, ২) প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতার নিরিখে হিটলার পূর্ব-পশ্চিম এই দুই রণাঙ্গনে এক সঙ্গে যুদ্ধ চালাতে রাজি ছিলেন না। তাই তিনি রাশিয়া কে নিরপেক্ষ রেখে পূর্ণ শক্তি দিয়ে পশ্চিম রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়েন, ৩) এই চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে সোভিয়েত বাধা অপসারিত হওয়ায় হিটলার পূর্ব ইউরোপে তাঁর বিস্তার নীতিকে সফল করেন।



প্রশ্ন: স্টালিনগ্রাডের যুদ্ধ কেন বিখ্যাত?

উত্তর: স্টালিনগ্রাডের যুদ্ধ ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাসে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ (১৭ জুলাই, ১৯৪২ খ্রি. – ২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৩ খ্রি.)। এই যুদ্ধ বিখ্যাত, কারণ-  ১) প্রায় চৌদ্দো ডিভিশন জার্মান বাহিনী আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয় এবং আড়াই লক্ষের বেশি জার্মান সৈন্য নিহত হয়। ২) এই যুদ্ধে জার্মানি শেষ পর্যন্ত পরাজিত হওয়ায় ইউরোপে জার্মানির পতনের সূচনা হয় ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের গতি মিত্র পক্ষের দিকে ঘুরে যায়।



প্রশ্ন: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনায় রাশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি কে ছিলেন?

উত্তর: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনায় যোশেফ স্ট্যালিন ছিলেন রাশিয়ার ‘প্রধানমন্ত্রী’। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি ছিলেন । এফ. ডি. রুজভেল্ট।



প্রশ্ন: ভন পৌলাস কে ছিলেন? তিনি কেন বিখ্যাত?

উত্তর: ভন পৌলাস ছিলেন একজন জার্মান সেনাপতি। রাশিয়া অভিযানে যেসব খ্যাতনামা জার্মান সেনাপতিদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ভনপৌলাস। বীর বিক্রমে রুশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেও ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে জানুয়ারি মাসে স্ট্যালিনগ্রাদের যুদ্ধে রুশ সেনাপতি মার্শাল ঝুকভের কাছে আত্মসমর্পণ করেন।



প্রশ্ন: চেম্বারলেন কে ছিলেন?

উত্তর: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে নেভিল চেম্বারলেন ছিলেন ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী। তিনি জার্মানির প্রতি তোষণনীতি অনুসরণ করেন। ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে তিনি পদত্যাগ করেন।



প্রশ্ন: এটিলা কূটনীতি (Attila Diplomacy) কী ? 

উত্তর: ১৯৩০-এর দশকে একনায়কতন্ত্রী ও সমরবাদী রাষ্ট্র জাপান, জার্মানি ও ইটালির সম্প্রসারণবাদী তৎপরতা, তারা শান্তি ও গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণার কারণে যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা বলবৎ সম্ভব হয়নি। ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ উইনস্টন চার্চিল এই আগ্রাসী তৎপরতাকে ‘এটিলা কূটনীতি’ ( Attila Diplomacy) বলেছেন।



প্রশ্ন: শাস্তি অভিযান (Peace Offensive) কী?

উত্তর: পোল্যান্ড বিজয়ের পর হিটলার ‘শান্তি অভিযান’ (Peace Offensive) শুরু করেন। রাশিয়া ও জার্মানি এই মর্মে এক যুগ্ম ঘোষণা করে যে, মানবজাতির মঙ্গলের কথা চিন্তা করে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের বোঝাপড়ায় আসা উচিত।



প্রশ্ন: ব্রিটেনের যুদ্ধ কী?

উত্তর: ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে আগস্ট মাসে জার্মান বিমান বাহিনী ব্রিটেন আক্রমণ শুরু করে। কিন্তু বিমান বিধ্বংসী কামান ও ব্রিটিশ জঙ্গি বিমানের পালটা আক্রমণে বহু জার্মান বিমান ধ্বংস হয়। ২৫ আগস্ট ব্রিটেনের R. A. F ( রয়্যাল এয়ারফোর্স) বার্লিনের ওপর আক্রমণ চালায়। এর ফলে জার্মানি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এই যুদ্ধ ব্রিটেনের যুদ্ধ (Battle of Britain) নামে পরিচিত। ব্রিটিশ আক্রমণের চাপে পড়ে হিটলার ব্রিটেনের ওপর বিমান আক্রমণ কমিয়ে দিতে বাধ্য হন। ফ্রান্সের পতনের পর পশ্চিম সীমান্তে মূলত ব্রিটেনকে এককভাবেই যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হয়। তাই এই যুদ্ধ যথার্থই ব্রিটেনের যুদ্ধে পরিণত হয়েছে।



প্রশ্ন: ফিল্ড মার্শাল রোমেল কেন বিখ্যাত?

উত্তর: জার্মান সেনানায়ক ফিল্ড মার্শাল এরউইন রোমেল উত্তর আফ্রিকায় ‘আফ্রিকা কর্পস’ নামে পরিচিত জার্মান বাহিনীর অধিনায়ক ছিলেন। ব্রিটিশরা তাঁকে ‘মরুভূমির শিয়াল’ (Desert Fox) নামে সম্বোর্ধিত করত।



প্রশ্ন: আটলান্টিক চার্টার কী?

উত্তর: ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট মাসে মার্কিন রাষ্ট্রপতি রুজভেল্ট ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল উত্তর আটলান্টিকের সমুদ্র বক্ষে এক বৈঠকে মিলিত হন। তারা বিশ্বশান্তির উদ্দেশ্যে যে দলিল প্রকাশ করেন তা আটলান্টিক চার্টার নামে পরিচিত।



প্রশ্ন: জেনারেল মন্টগোমারি কী জন্য বিখ্যাত?

উত্তর: ব্রিটিশ সেনাপতি মন্টগোমারি উত্তর আফ্রিকায় ‘মরুযুদ্ধে’ (Desert War) মিত্রপক্ষের অষ্টম বাহিনী পরিচালনা করেন। তাঁর নেতৃত্বে এল আলমেইন-এর যুদ্ধে জার্মান প্রতিরোধ চূর্ণ করেন।



প্রশ্ন: ডি. ডে (D. Day) কাকে বলে?

উত্তর: একদিকে যখন জার্মান বাহিনী রাশিয়ার লাল ফৌজের আক্রমণে বিধ্বস্ত, তখন মিত্রপক্ষ পশ্চিম দিক থেকে ফ্রান্স পুনর্দখলের পরিকল্পনা করে। ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দের ৬ জুন নরম্যান্ডির সমুদ্র উপকূল থেকে ফ্রান্স আক্রমণ শুরু করে। এই তারিখটি ইউরোপের ইতিহাসে ডি ডে (D. Day) বা ‘মুক্তি দিবস’ বা ‘ইউরোপ অভিযান দিবস’ নামে খ্যাত।



প্রশ্ন: হিটলার কবে ও কীভাবে প্রাণত্যাগ করেন?

উত্তর: নাতসি জার্মানির নায়ক অ্যাডলফ হিটলার আসন্ন পরাজয় বুঝতে পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। লাল ফৌজ বার্লিন শহরে ঢুকে পড়লে হিটলার ভূগর্ভস্থ লোহার ঘরে আশ্রয় নেন। এখানে এক রুদ্ধদ্বার কক্ষে ৩০ এপ্রিল, ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে জীবন সঙ্গিনী ইভা ব্রাউনের সঙ্গে আত্মহত্যা করেন।



প্রশ্ন: কোন্ বৎসর জাপান পার্ল হারবার নৌ-ঘাঁটি ধ্বংস করেছিল? দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে জাপান কবে আত্মসমর্পণ করেছিল?

উত্তর: ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দের ৭ ডিসেম্বর জাপান পার্ল হারবার নৌ-ঘাঁটি ধ্বংস করে। ১৯৪৫ সালের সেপ্টেম্বরে জাপান আত্মসমর্পণ করে।



প্রশ্ন: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যোগদান করে?

উত্তর: ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দের ৭ ডিসেম্বর জাপান প্রশান্ত মহাসাগরে অবস্থিত হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের অন্তর্গত পার্ল হারবার বন্দরে মার্কিন রণতরীর ওপর আকস্মিকভাবে বিমান আক্রমণ করার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্র পক্ষের পক্ষে প্রত্যক্ষভাবে যোগদান করে।



প্রশ্ন: 'ক্যাশ অ্যান্ড ক্যারি’ নীতি কী?

উত্তর: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিরপেক্ষতার নীতি মেনে চলে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রথমদিকেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেনি। কিন্তু যুদ্ধরত গণতান্ত্রিক দেশগুলির প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে আমেরিকা গণতান্ত্রিক শক্তিগুলির কাছে অর্থের বিনিময়ে অস্ত্র ও অন্যান্য যুদ্ধের উপকরণ বিক্রি করতে শুরু করে। এই নীতিই ‘ক্যাশ অ্যান্ড ক্যারি’ নীতি নামে পরিচিত।



প্রশ্ন: ‘লেণ্ড লিজ’ কী, এটি কবে প্রবর্তিত হয়?

উত্তর: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ফ্যাসিস্ট আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত গণতান্ত্রিক দেশগুলিকে যুদ্ধ বিমান, যুদ্ধ জাহাজ এবং বিভিন্ন ধরনের যুদ্ধাস্ত্র দিয়ে সাহায্যদান করার কর্মসূচি গ্রহণ করে এবং ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে ১১ মার্চ মার্কিন সেনেট এই মর্মে একটি আইন প্রনয়ণ করে—যা লেন্ড লীজ (Lend Lease) আইন নামে পরিচিত। এই আইন অনুসারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মিত্রপক্ষকে প্রচুর সামরিক সাজসরঞ্জাম ও আর্থিক সাহায্যদান করে। অর্থাৎ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ‘গণতন্ত্রের সামরিক কারখানা’-তে পরিণত হয়।



প্রশ্ন: পারমাণবিক বোমা বা অ্যাটম বোমা সর্বপ্রথম কোন্ দুটি শহরের ওপর ফেলা হয়?

উত্তর: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্তিমলগ্নে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি নামক শহর দুটির ওপর অ্যাটম বোমা নিক্ষেপ করে। এর ফলে জাপান নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়।



প্রশ্ন: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে কোন্ কোন্ দেশে সাম্যবাদী ভাবধারা বিস্তারলাভ করে?

উত্তর: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে রাশিয়া, পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি, চেকোশ্লোভাকিয়া, রুমানিয়া, বুলগেরিয়া, আলবেনিয়া, পূর্ব জার্মানি প্রভৃতি দেশে সাম্যবাদী ভাবধারার প্রসার ঘটে।



প্রশ্ন: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুদ্ধ জাহাজের প্রযুক্তিতে কী কী পরিবর্তন লক্ষ করা যায়?

উত্তর: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সাবমেরিন, টর্পেডো, মাইন নির্মাণের ক্ষেত্রে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়। শক্তিশালী ব্রিটিশ মাইন ধ্বংস করার জন্য জার্মানি ম্যাগনেটিক মাইন আবিস্কার করে। জার্মানির এই নতুন অস্ত্রের কার্যকারিতা নষ্টের জন্য ব্রিটেন নতুন প্রতিষেধক আবিস্কার করে। এ ছাড়া জার্মানির টর্পেডোর ব্যবহার এবং এর প্রতিষেধক হিসেবে মিত্রপক্ষের ‘Noise Makers' আবিস্কার যুদ্ধ জাহাজের প্রযুক্তিতে এক নবদিগন্তের উন্মোচন করে।



প্রশ্ন: কীভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসান হয়? অথবা, কবে জার্মানি ও জাপান আত্মসমর্পণ করেছিল?

উত্তর: পূর্বদিক থেকে রাশিয়ান সৈন্যবাহিনী ও পশ্চিম দিক থেকে ইঙ্গ-মার্কিন বাহিনীর আক্রমণে জার্মানি পর্যুদস্ত হয়ে পড়ে এবং হিটলার, গোয়েবলস, হিমলার প্রমুখ শীর্ষ নাতসি নেতারা আত্মহত্যা করলে ৭ মে (১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দ) জার্মানি আত্মসমর্পণ করে। অন্যদিকে এশিয়ার রণাঙ্গনে ৬ আগস্ট (১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দ) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাপানের হিরোশিমা এবং ৯ আগস্ট, ১৯৪৫ খ্রি. নাগাসাকি শহরের ওপর আণবিক বোমা নিক্ষেপ করে। এরপর ১৪ আগস্ট জাপান বিনা শর্তে আত্মসমর্পণ করে। এভাবে জার্মানি ও জাপানের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে।



প্রশ্ন: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যখন শেষ হয় তখন মিত্রপক্ষের নেতৃত্বে কারা ছিলেন? এঁরা কোথায় মিলিত হন?

উত্তর: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তিকালে মিত্রপক্ষভুক্ত তিন প্রধান শক্তির কর্ণধার ছিলেন মার্কিন রাষ্ট্রপতি হ্যারি ট্রুম্যান, সোভিয়েত রাশিয়ার রাষ্ট্রনায়ক যোশেফ স্ট্যালিন এবং ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেন্ট এটলি। এঁরা জার্মানির পোটডামে (জুলাই, ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে) শহরে মিলিত হন।



প্রশ্ন: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালে কোন রাষ্ট্রের মধ্যে ঠান্ডা লড়াই শুরু হয়েছিল?

উত্তর: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালে গোটা বিশ্ব দুটি শিবিরে ভাগ হয়ে যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ধনতান্ত্রিক বা পুঁজিবাদী জোট এবং সোভিয়েত রাশিয়ার নেতৃত্বে সাম্যবাদী জোট। এই দুই জোটের আদর্শগত সংঘাত ছিল এই ঠান্ডা লড়াই।