Class 9 History Chapter 7 (দজাতিসংঘ এবং সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ) সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর Questions And Answers

জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠায় উইলসনের চোদ্দো দফা শর্তের কী ভূমিকা ছিল?

উত্তর: মার্কিন রাষ্ট্রপতি উইলসনের ৮ জানুয়ারি ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে ঘোষিত চোদ্দো দফা শর্তের সর্বশেষ দফায় সমস্ত জাতির প্রতি ন্যায়বিচার সমস্তজাতির স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা রক্ষার জন্য একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা গঠনের কথা বলেন। যুদ্ধাবসানে প্যারিসের শাস্তি সম্মেলনে তিনি এই প্রস্তাব উত্থাপন করলে তা সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয় যার ফলশ্রুতি হিসেবে জাতিসংঘের জন্ম।



প্রশ্ন: চোদ্দো দফা শর্ত কে, কবে ঘোষণা করেছিলেন?

উত্তর: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি, ১৯১৮ খ্রিস্টাব্দের ৮ জুলাই চোদ্দো দফা শর্ত ঘোষণা করেছিলেন।



প্রশ্ন: প্যারিসের শাস্তি সম্মেলন কীভাবে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান গঠনে সাহায্য করেছিল?

উত্তর: প্যারিসের শাস্তি সম্মেলনে মার্কিন রাষ্ট্রপতি উড্রো উইলসনের চোদ্দো দফা শর্তে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান স্থাপনের পরিকল্পনা উত্থাপিত হলে পরিকল্পনাটি বিবেচনার জন্য উইলসনের সভাপতিত্বে একটি কমিটি গঠিত হয়। এই কমিটি ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে লিগ অফ নেশনস্-এর গঠনতন্ত্র ও শর্তাবলির খসড়া প্রস্তুত করেছিল। এই খসড়া অনুমোদিত হয়েছিল।



প্রশ্ন: কীভাবে জাতিসংঘ বা লিগ অব নেশনস্-এর আত্মপ্রকাশ ঘটে?

উত্তর: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষে প্যারিসের শান্তি সম্মেলনে মার্কিন রাষ্ট্রপতি জাতিসংঘ গঠনের প্রস্তাব উত্থাপন করলে তা সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়। অতঃপর তার সভাপতিত্বে ফেব্রুয়ারি ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে জাতিসংঘের চুক্তিপত্র রচিত হয়। কিছু সংশোধনের মধ্য দিয়ে ২৮ এপ্রিল ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে প্যারিস শাস্তি সম্মেলনে জাতিসংঘের চুক্তিপত্রটি গৃহীত হয়। এবং ঐ দিনই আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘ বা লিগ অব নেশন্‌স-এর আত্মপ্রকাশ ঘটে।



প্রশ্ন: লিগ কভেন্যান্ট (League Covenant) বা লিগের চুক্তিপত্র বলতে কী বোঝ?

উত্তর: প্যারিস শান্তি সম্মেলনে মার্কিন রাষ্ট্রপতি উড্রো উইলসনের সভাপতিত্বে ১৯টি দেশের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি খসড়া কমিটি গঠিত হয়। এই কমিটি ফেব্রুয়ারি মাসে ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে ২৬টি অনুচ্ছেদ বিশিষ্ট জাতিসংঘের খসড়া সংবিধান প্রস্তুত করে—যাকে লিগ কভেন্যান্ট বা লিগের চুক্তিপত্র বলা হয়।



প্রশ্ন: লিগ পরিষদের স্থায়ী ও অস্থায়ী সদস্য কত ছিল?

উত্তর: লিগ পরিষদ গঠনকালে ৫ জন স্থায়ী ও ৪ জন অস্থায়ী সদস্য অর্থাৎ মোট ৯ জন সদস্য নিয়ে এই পরিষদ গঠিত ছিল। পরে স্থায়ী ও অস্থায়ী সদস্যসংখ্যা বাড়িয়ে ৬ ও ৯ মোট ১৫ জন করা হয়েছিল।



প্রশ্ন: লিগ অফ নেশনস্-এর দুটি উদ্দেশ্য লেখো। 

উত্তর : লিগ অফ নেশনস্-এর উদ্দেশ্যগুলি হল- ১) যুদ্ধের পরিবর্তে আপস-মীমাংসার দ্বারা আন্তর্জাতিক সমস্যার সমাধান করা; ২) আন্তর্জাতিক চুক্তি ও সন্ধির শর্তসমূহ সম্পূর্ণ ভাবে পালন করে আন্তর্জাতিক শান্তি বজায় রাখা, ৩) ন্যায় ও সততার ভিত্তিতে লিগ অফ নেশনভুক্ত দেশগুলির পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করা।



প্রশ্নঃ লীগ অফ নেশনস্-এর সংগঠনগুলি কী ছিল? 

উত্তর: লিগ অফ নেশনস্-এর সংগঠনগুলি হল— ১) সাধারণ সভা, ২) পরিষদ,  ৩) সচিবালয়, 8) আন্তর্জাতিক বিচারালয়, ৫) আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংস্থা।



প্রশ্ন: জাতিসংঘ গঠনের উদ্দেশ্য কী ছিল?

উত্তর: জাতিসংঘের মূল উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধের পরিবর্তে আপস-মীমাংসা ও পারস্পরিক সহযোগিতার দ্বারা আন্তর্জাতিক সমস্যাগুলির সমাধান করা এবং আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা স্থাপন করা। বিশ্বে নিরস্ত্রীকরণের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা, বিশ্বের সর্বত্র নারী, শিশু ও অবহেলিত শ্রেণি এবং শ্রমিক শ্রেণির স্বার্থরক্ষা করা।



প্রশ্ন: জাতিসংঘ কয় ধরনের সদস্য নিয়ে গঠিত?

উত্তর: জাতিসংঘ দুই ধরনের সদস্য নিয়ে গঠিত ছিল। প্রাথমিক সদস্য ও সাধারণ সদস্য। মিত্রপক্ষের দেশগুলির প্রাথমিক সদস্য এবং অন্য দেশগুলি অর্থাৎ বিজিত কোনো রাষ্ট্রের সদস্য হলে সাধারণ সদস্য বলে বিবেচিত হত।



প্রশ্ন: জাতিসংঘ কী কী সংস্থা নিয়ে গঠিত ছিল?

উত্তর: জাতিসংঘ তার কার্যাবলিকে সম্পন্ন করার জন্য অনেকগুলি সংস্থা গঠন করেছিল। এগুলি হল : সাধারণ সভা (League Assembly), পরিষদ (League Council), সচিবালয় (Secretariat), আন্তর্জাতিক বিচারালয় (Permanant court of International Justices = PCIJ), আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (International Labour Organisation)। এই সংস্থাগুলি এবং আরও কিছু উন্নয়নমূলক সংস্থা নিয়ে জাতিসংঘ গঠিত হয়েছিল।



প্রশ্ন: জাতিসংঘের যে কোনো দুটি সহযোগী সংস্থার নাম লেখো।

উত্তর: জাতিসংঘ তার কার্যাবলিকে সঠিকভাবে রূপায়ণের জন্য অনেকগুলি সংস্থা গঠন করেছিল। এগুলির মধ্যে অন্যতম দুটি সংস্থা ছিল—সাধারণ সভা (League Assembly) এবং পরিষদ (League Council)।



প্রশ্ন: কোন্ তিনটি সংস্থা জাতিসংঘের কার্যাবলি যথাযথ রূপায়ণ ঘটাত?

উত্তর: জাতিসংঘের কার্যাবলির রূপায়ণের জন্য যে তিনটি সংস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। সেগুলি হল—সাধারণ সভা (League Assembly) পরিষদ (League Council) এবং সচিবালয় (Secretariat) ।



প্রশ্ন: জাতিসংঘের সাধারণ সভার কাজ কী ছিল? 

উত্তর: জাতিসংঘের প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্রকে নিয়ে গঠিত হয়েছিল সাধারণ সভা। এই সভায় আন্তর্জাতিক বিরোধ সংক্রান্ত বিষয়ে আলোচনা হত। নতুন সদস্য গ্রহণ, বাজেট অনুমোদন প্রভৃতি বিভিন্ন কাজের দায়িত্ব ছিল সাধারণ সভার হাতে। 



প্রশ্ন: জাতিসংঘের ব্যর্থতার যে কোনো ২টি কারণ উল্লেখ করো।

উত্তর: ১) জাতিসংঘে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তিশালী দেশ সদস্যপদ গ্রহণ না করায় জন্মলগ্ন থেকেই জাতিসংঘ বিকলাঙ্গ ছিল, ২) জাতিসংঘের কোনো স্থায়ী সেনাবাহিনী ছিল না। এই সামরিক দুর্বলতাই জাতিসংঘের ব্যর্থতার অন্যতম একটি কারণ।



প্রশ্ন: কবে, কোথায় 'আটলান্টিক চার্টার’ স্বাক্ষরিত হয়? অথবা, কবে কোথায় 'আটলান্টিক সনদ’ রচিত হয়? 

উত্তর: ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দের ১৪ আগস্ট তারিখে আটলান্টিক মহাসাগরে প্রিন্স অব ওয়েলস্ নামে একটি যুদ্ধজাহাজে আটলান্টিক চার্টার বা আটলান্টিক সনদ স্বাক্ষরিত হয়।



প্রশ্ন: আটলান্টিক সনদ (চার্টার) কী? (Atlantic Charter)

উত্তর: ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী চার্চিল ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট ৯ আগস্ট ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে আটলান্টিক মহাসাগরে প্রিন্স অব ওয়েলস্ নামক যুদ্ধ জাহাজে বসে পারস্পরিক আলোচনার পর ১২ আগস্ট একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে এবং ১৪ আগস্ট চুক্তিপত্রটি প্রকাশ করে। এই চুক্তিপত্রটিকেই আটলান্টিক সনদ (চার্টার) বলা হয়।



প্রশ্ন: আটলান্টিক সনদের মূল বক্তব্য কী ছিল?

উত্তর: ১৪ আগস্ট ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত আটলান্টিক সনদের মূল বক্তব্য ছিল এইরূপ ১) সনদের স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রবর্গ সকল রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব স্বীকার করবে, ২) শান্তিপূর্ণ পথে পারস্পরিক আলোচনার ভিত্তিতে সকল বিবাদের মীমাংসা করবে, ৩) প্রত্যেক রাষ্ট্রের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারকে মর্যাদা দেওয়া হবে এবং ৪) স্থায়ী শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার জন্য সকল রাষ্ট্রকে নিরস্ত্রীকরণের প্রস্তাব মেনে নিতে হবে।



প্রশ্ন: 'আটলান্টিক সনদে' স্বাক্ষরকারী দেশগুলির নাম লেখো।

উত্তর: ইংল্যান্ড, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, পোল্যান্ড, গ্রিস, নরওয়ে, যুগোশ্লাভিয়া, চেকোশ্লোভাকিয়া, বেলজিয়াম, সোভিয়েত রাশিয়া প্রভৃতি সহ সর্বমোট ২৬টি দেশ এই সনদে স্বাক্ষর করেছিল।



প্রশ্ন: আটলান্টিক সনদের ঐতিহাসিক গুরত্ব কী? 

উত্তর: আটলান্টিক সম্মেলনের দুটি উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক গুরুত্ব হল: ১) যুদ্ধের হাত থেকে পৃথিবীকে রক্ষা ও শান্তি স্থাপন এবং ২) বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্বাধীনতার দাবিকে সমর্থন।



প্রশ্ন: জাতিপুঞ্জ প্রতিষ্ঠায় আটলান্টিক সনদের কী ভূমিকা ছিল?

উত্তর: আটলান্টিক সনদেই জাতিপুঞ্জ গঠনের বীজ সুপ্ত অবস্থায় নিহিত ছিল। আটলান্টিক সনদের মূল বক্তব্যগুলি ধরেই জাতিপুঞ্জ গঠনের পরবর্তী পদক্ষেপগুলি গ্রহণ করা হয়েছিল। ১ জানুয়ারি, ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে ওয়াশিংটন সম্মেলনে ২৬টি দেশ আটলান্টিক সনদের মূল নীতিগুলির মান্যতা দিয়ে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের ঘোষণা পত্র স্বাক্ষর করে। আটলান্টিক সনদকে জাতিপুঞ্জের সাধারণ কর্মসূচি ও নীতি হিসেবে মেনে নেওয়া হয়। তাই জাতিপুঞ্জ প্রতিষ্ঠায় আটলান্টিক সনদের ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না।



প্রশ্ন: প্রিন্স অব ওয়েলস্ জাহাজ কেন বিখ্যাত?

উত্তর: আটলান্টিক মহাসাগরের নিউ ফাউন্ডল্যান্ডের কাছে প্রিন্স অব ওয়েলস্ জাহাজে ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দের ৯ আগস্ট মার্কিন রাষ্ট্রপতি রুজভেল্ট ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল গোপনে বৈঠকে মিলিত হন। এই জাহাজে বসেই যুদ্ধের পর বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে একটি ঘোষণাপত্র প্রকাশ করেন।



প্রশ্ন: ওয়াশিংটন ঘোষণা বা রাষ্ট্রসংঘের ঘোষণা কাকে বলে?

উত্তর: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যান্ড, চিন, সোভিয়েত রাশিয়া প্রভৃতি রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা ১ জানুয়ারি, ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে ওয়াশিংটনে মিলিত হয়ে সেখান থেকে যে ঘোষণা প্রকাশ করেন তা ‘ওয়াশিংটন ঘোষণা’ বা ‘রাষ্ট্রসংঘের ঘোষণা’ বলা হয়। এই সম্মেলনেই প্রথম ‘ইউনাইটেড নেশনস্’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়।



প্রশ্ন: লন্ডন ঘোষণা কী?

উত্তর: জাতিপুঞ্জ গঠনের প্রথম পদক্ষেপ ছিল লন্ডন ঘোষণা। ইংল্যান্ড, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড প্রভৃতি রাষ্ট্র লন্ডনে একটি অধিবেশনে মিলিত হয়। বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তারা একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা গঠনের জন্য ১২ জুন ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে যে ঘোষণা প্রকাশ করে তা লণ্ডন ঘোষণা নামে পরিচিত।



প্রশ্ন: ‘তেহেরান ঘোষণা’ কী?

উত্তর: ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে ১ ডিসেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি এফ. ডি. রুজভেল্ট, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল ও রাশিয়ার রাষ্ট্রনায়ক যোশেফ স্ট্যালিন তেহেরানে এক সম্মেলনে মিলিত হয়েছিলেন। এরপর বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁরা যে ঘোষণা করেন তা ‘তেহেরান ঘোষণা’ নামে পরিচিত।



প্রশ্ন: ‘তেহেরান ঘোষণা’র গুরুত্ব কী ছিল?

উত্তর: ‘তেহেরান ঘোষণা’ (১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দ) ছিল জাতিপুঞ্জ গঠনের ক্ষেত্রে একটি বিশেষ পদক্ষেপ। কারণ— ১) এই ঘোষণার মাধ্যমে ছোটো বড়ো সব দেশগুলিকে একটি আন্তর্জাতিক সংগঠনে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছিল। ২) বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার কথাও এই ঘোষণায় ঘোষিত হয়েছিল।



প্রশ্ন: ডাম্বারটন ওক্স সম্মেলন কবে, কোথায় এবং কাদের নেতৃত্বে আহূত হয়েছিল?

উত্তর: ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ওয়াশিংটনের সন্নিকটে ডাম্বারটন ওক্স্ নামক স্থানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইংল্যাণ্ড, সোভিয়েত রাশিয়া, চিন প্রভৃতি রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের উদ্যোগে [জাতিপুঞ্জের কাঠামো ও রূপরেখা তৈরি করতে] ডাম্বারটন ওক্স্ সম্মেলন আহ্বত হয়েছিল।



প্রশ্ন: ইয়াল্টা সম্মেলন কবে, কোথায় এবং কাদের উদ্যোগে আহুত হয়েছিল?

উত্তর: ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে ফেব্রুয়ারি মাসে রাশিয়ার কৃষ্বসাগরের তীরে ক্রিমিয়ার ইয়াল্টা নামক স্থানে মার্কিন রাষ্ট্রপতি রুজভেল্ট, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল ও সোভিয়েত রাশিয়ার রাষ্ট্রনায়ক স্ট্যালিন এর উদ্যোগে ইয়াল্টা সম্মেলন আহত হয়। [এই সম্মেলনের বিষয়বস্তুতে উল্লেখ থাকে যে জাতিপুঞ্জের খসড়া চূড়ান্ত করার জন্য ২৫ এপ্রিল সানফ্রান্সিসকো শহরে এক সম্মেলন আহ্বান করা হবে।]



প্রশ্ন: ‘সানফ্রান্সিকো সম্মেলন’ কী?

উত্তর: ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসে মিত্রপক্ষীয় ও নিরপেক্ষ ৫০টি জাতির প্রতিনিধি আমেরিকার সানফ্রান্সিকো শহরে যে সম্মেলনে বসেছিলেন, তা ‘সানফ্রান্সিকো সম্মেলন’ নামে পরিচিত। এই সম্মেলনে বিশ্বশান্তি রক্ষার উদ্দেশ্যে জাতিসংঘের পরিবর্তে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ প্রতিষ্ঠার কথা ঘোষিত হয়।



প্রশ্ন: জাতিপুঞ্জের (United Nations) নামকরণ কীভাবে করা হয়?

উত্তর: ১ জানুয়ারি ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে ওয়াশিংটন সম্মেলনে প্রথম ইউনাইটেড নেশনস্' শব্দটি ব্যবহার করা হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট বিশিষ্ট ইংরেজ কবি লর্ড বায়রন এর Child Harods Pilgimage' নামক কবিতা থেকে ইউনাইটেড নেশনস্ (United Nations) শব্দ দুটি চয়ন করেছেন।



প্রশ্ন: জাতিপুঞ্জের সনদ কাকে বলে?

উত্তর: জাতিপুঞ্জ বিশ্বের বৃহত্তম সংগঠন হলেও প্রকৃতিগতভাবে একটি সংস্থা বা সংগঠন। প্রতিটি সংগঠন বা সংস্থার কিছু নিয়মনীতি থাকে। সেই হিসেবে জাতিপুঞ্জ নামক সংস্থাটিরও একটি নিজস্ব সংবিধান আছে। এই সংবিধানকেই জাতিপুঞ্জের সনদ বা চার্টার বলা হয়। জাতিপুঞ্জের এই সনদে ১৯টি অধ্যায়, ১১১ টি ধারা এফ্ ১ টি প্রস্তাবনা আছে।



প্রশ্ন: জাতিপুঞ্জের গঠনের উদ্দেশ্য কী ছিল?

উত্তর: প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসলীলায় আতঙ্কিত হয়ে বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে জাতিসংঘ গঠন করা হয়েছিল। কিন্তু জাতিসংঘ মানুষের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়। তাই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন মানুষ শান্তির জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে। তারই ফলশ্রুতি হিসেবে এবং জাতিসংঘের পরিপূরক রূপে ২৪ অক্টোবর ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে জন্ম নেয় সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ (United Nations)।



প্রশ্ন: জাতিপুঞ্জের প্রথম ও বর্তমান মহাসচিবের নাম কী?

উত্তর: জাতিপুঞ্জের প্রথম মহাসচিব ছিলেন নরওয়ের প্রাক্তণ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ট্রিগভি লি (Trygve Lie), যাঁর কার্যকালের মেয়াদ ছিল ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দ–১৯৫২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। জাতিপুঞ্জের বর্তমান তথা অষ্টম মহাসচিব হলেন দক্ষিণ কোরিয়ার, প্রাক্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বান কি মুন (Ban Ki Moon), যাঁর কার্যকাল ১ জানুয়ারি ২০০৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে বর্তমান পর্যন্ত।



প্রশ্ন: জাতিপুঞ্জের প্রস্তাবনায় কী বলা হয়েছে?

উত্তর: জাতিপুঞ্জ সনদের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, “আমরা সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের জনগণ–এতদ্বারা ঘোষণা করছি যে, আমরা পরবর্তী প্রজন্মদের যুদ্ধের মড়ক হতে। যে যুদ্ধ দু’বার মানব জাতির অশেষ দুঃখ-দুর্দশা সৃষ্টি করেছে” তা থেকে রক্ষা করার জন্যে একটি আন্তর্জাতিক সংঘ, যার নাম জাতিপুঞ্জ তা গঠন করলাম”।



প্রশ্ন: জাতিপুঞ্জের মহাসচিবের দুটি কাজ উল্লেখ করো।

উত্তর: জাতিপুঞ্জের মহাসচিবের দুটি কাজ হল—  ১) প্রশাসনিক কাজের তত্ত্বাবধান করা এবং ২) বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তার স্বার্থে বিশ্বের প্রতিটি ঘটনা নিরাপত্তা পরিষদের দৃষ্টিগোচরে আনা।



প্রশ্ন: জাতিপুঞ্জ গঠনের দুটি উদ্দেশ্য লেখো। 

উত্তর জাতিপুঞ্জ গঠনের দুটি উদ্দেশ্য হল :— ১) পৃথিবীকে যুদ্ধের হাত থেকে রক্ষা করা এবং শান্তিপূর্ণ উপায়ে আন্তর্জাতিক সমস্যার সমাধান করা ২) বিভিন্ন রাষ্ট্রের কাজের সমন্বয় সাধন করা।



প্রশ্ন: জাতিপুঞ্জের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের অধীন দুটি সংস্থার নাম লেখো।

উত্তর: জাতিপুঞ্জের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের অধীন দুটি সংস্থা হল- ১) UNESCO (United Nations Educational, Scientific and Cultural Organisation) জাতিপুঞ্জের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা ২) UNICEF (United Nations International Children's Emergency Fund) আন্তর্জাতিক শিশু উন্নয়ন বিষয়ক জরুরি তহবিল।



প্রশ্ন: বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য জাতিপুঞ্জ কী কী ব্যবস্থা নিতে পারে?

উত্তর : আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশেষজ্ঞ নিকোলাসের মতে, বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য জাতিপুঞ্জ পাঁচ ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে। যা হল—অনুসন্ধান, আপোস-মীমাংসা, মধ্যস্থতা, আবেদন এবং সুপারিশ।



প্রশ্ন: জাতিপুঞ্জের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের দুটি কাজ উল্লেখ করো।

উত্তর: ১) আর্থ-সামাজিক বিষয়ে রিপোর্ট তৈরি করা এবং এই রিপোর্ট সাধারণ সভায় পেশ করা ২) মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতাকে বাস্তবে প্রয়োগের বিষয়ে সুপারিশ করা।



প্রশ্ন: কোন্ কোন্ ক্ষেত্রে জাতিপুঞ্জ সাফল্য পেয়েছে?

উত্তর: ১) কোরিয়া, কঙ্গো, সুয়েজ সংকটে জাতিসংঘের কার্যকরী তৎপরতায় ঐ অঞ্চলগুলিতে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়, ২) অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে এই সংস্থার সাফল্য সর্বাধিক ৩)কার্যের দিক থেকে জাতিপুঞ্জের অছি পরিষদ ১০০ শতাংশ সফল।



প্রশ্ন: কোন্ কোন্ ক্ষেত্রে জাতিপুঞ্জ ব্যর্থ হয়েছে?

উত্তর: ১) জাতিপুঞ্জ, প্যালেস্টাইন সমস্যা, কাশ্মীর সমস্যা, কিউবা সংকট প্রভৃতি আন্তর্জাতিক সমস্যা সমাধানে কোনো সদর্থক ভূমিকা গ্রহণ করতে পারেনি ২) ইরাক ও আফগানিস্তানের ওপর মার্কিন আক্রমণ ও দখলদারির ক্ষেত্রে জাতিপুঞ্জ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে।



প্রশ্ন: আন্তর্জাতিক বিচারালয়ের ভূমিকা কী?

উত্তর: আন্তর্জাতিক বিচারালয়ের ভূমিকা হল, ১) ( বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক বিবাদের নিষ্পত্তি করা, ২) আন্তর্জাতিক আইনের ব্যাখ্যা করা এবং ৩) সদস্য রাষ্ট্রগুলির মধ্যে বিবাদের সঠিক ও আইনগত মীমাংসা করা।



প্রশ্ন: আন্তর্জাতিক বিচারালয় কী?

উত্তর: আন্তর্জাতিক বিবাদের নিস্পত্তি, আন্তর্জাতিক আইনের ব্যাখ্যা এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলির মধ্যে আইনগত বিরোধ মেটানোর উদ্দেশ্যে হল্যাণ্ডের হেগ শহরে ১৫ জন বিচারপতিকে নিয়ে একটি সংস্থা গঠন করা হয়—যা আন্তর্জাতিক বিচারালয় ( International Court of Justice) নামে খ্যাত।



প্রশ্ন: আন্তর্জাতিক বিচারালয়ের দুটি কাজ উল্লেখ করো।

উত্তর: আন্তর্জাতিক বিচারালয়ের দুটি কাজ হল— ১) আইনগত প্রশ্নে আন্তর্জাতিক আদালত পরামর্শ দিতে পারে ২) বিচারের জন্য প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্র বা সদস্য রাষ্ট্র নয় এমন রাষ্ট্রও ন্যায় বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক বিচারালয়ের দ্বারস্থ হতে পারে।



প্রশ্ন: আন্তর্জাতিক বিচারালয়ের গঠন কেমন?

উত্তর: জাতিপুঞ্জের সব সদস্য রাষ্ট্রই এই সংস্থার সদস্য। ১৫ জন বিচারপতি নিয়ে এই বিচারালয় গঠিত। বিচারপতিরা ৯ বছরের জন্য নির্বাচিত হন। সাধারণ সভা ও নিরাপত্তা পরিষদ পৃথক ভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে বিচারকদের নির্বাচন করে। একই রাষ্ট্র থেকে একজনের বেশি বিচারপতি নিয়োগ করা যায় না।



প্রশ্ন: নিরাপত্তা পরিষদ কী?

উত্তর: জাতিপুঞ্জের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা হল নিরাপত্তা পরিষদ—যাকে জাতিপুঞ্জের কার্যনির্বাহক কমিটি বলা হয়। ৫টি স্থায়ী ও ৩ জন অস্থায়ী সদস্য রাষ্ট্র নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদ গঠিত। আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা করা এর প্রধান কাজ।



প্রশ্ন: নিরাপত্তা পরিষদের কার্যাবলি কী?

উত্তর: নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান কাজ হল ১) আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বিধান করা। ২) আন্তর্জাতিক শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে নিরাপত্তা পরিষদ যে-কোনো বিষয়ে তদন্ত, সালিশি বিচার ও শাস্তিদান করতে পারে। এ ছাড়া ৩) অভিযুক্ত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে শাস্তি হিসেবে অর্থনৈতিক বয়কটের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা নিরাপত্তা পরিষদের রয়েছে।



প্রশ্ন: অছি পরিষদ (Trusteesship Council) কী ?

উত্তর: অছি পরিষদ জাতিপুঞ্জের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা। পরাধীন অনুন্নত দেশগুলিকে জাতিপুঞ্জের নিয়ন্ত্রণে এবং কয়েকটি বৃহৎ রাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে রেখে তাদের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন ঘটিয়ে স্বাধীনতা লাভের উপযুক্ত করে তোলাই ছিল অছি পরিষদের প্রধান লক্ষ্য। অছি শাসনাধীন অধিকাংশ দেশ আফ্রিকায় অবস্থিত। যদিও বর্তমানে অছি পরিষদের অধীনে অছি অঞ্চল নেই বললেই চলে।



প্রশ্ন: অছি পরিষদের দুটি দায়িত্ব উল্লেখ করো।

উত্তর : অছি পরিষদের দুটি দায়িত্ব হলঃ— ১) অছি অঞ্চলের শাসক রাষ্ট্র কর্তৃক পেশ করা প্রতিবেদন বিচার বিবেচনা করা। ২) অছি অঞ্চলের শাসকদের ও বাসিন্দাদের অভিযোগ ও দাবিগুলির প্রতিকার করা।



প্রশ্ন: সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের ঘোষণাপত্র কবে এবং কোথায় স্বাক্ষরিত হয়েছিল?

উত্তর: ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের ২৫ এপ্রিল থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সানফ্রান্সিসকো শহরে সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের ঘোষণাপত্র (Charter) পঞ্চান্নটি রাষ্ট্র কর্তৃক স্বাক্ষরিত হয়েছিল।১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের ২৬ জুন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স, সোভিয়েত রাশিয়া-সহ ৫১টি রাষ্ট্রের দ্বারা সম্মিলিত । জাতিপুঞ্জের সনদ স্বাক্ষরিত হয়েছিল।