Class 9 History (ইউরোপ ও আধুনিক যুগ) বিশ্লেষণধর্মী প্রশ্নাবলি Mark 4 Questions And Answers

প্রশ্ন: সামন্ততন্ত্রের সংকটের কারণগুলি লেখো।

উত্তর : ভূমিকা : একাদশ-দ্বাদশ শতক ছিল ইউরোপে সামন্ততন্ত্রের চূড়ান্ত বিকাশের সময়। কিন্তু চতুর্দশ শতকের মধ্যভাগ থেকে সামস্ততন্ত্র ক্রমশ সংকটে নিমজ্জিত হয়।

সামাতলো সংকটের কারণ :

1) রক্ষণশীল কৃষি উৎপাদন : গবেষক মরিস ডব-এর মতে, বিভিন্ন কারণে সামন্ততান্ত্রিক উৎপাদন ব্যবস্থার প্রধান কেন্দ্র ম্যানরগুলির উৎপাদন জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধি পায়নি। কৃষি উৎপাদনের এই রক্ষণশীলতা সামন্ততন্ত্রের সংকটের সৃষ্টি করেছিল।

২) ভূমিদাস বিদ্রোহ: ভূমিদাস প্রথা ছিল সামন্ততন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি। কিন্তু সামন্তপ্রভুগণ কর্তৃক ভূমিদাসদের উপর অত্যাচার ও শোষণের পদানত ভূমিদাসদের মধ্যে বিক্ষোভ ও বিদ্রোহ শুরু হয়। এর ফলে সামন্তপ্রথা দুর্বল হয়ে পড়েছিল।

3) ক্রুসেড-এর প্রভাব : খ্রিস্টধর্মের পবিত্র তীর্থস্থান প্যালেস্টাইনের জেরুজালেম দখলকে কেন্দ্র করে সংঘটিত ক্রুসেডে ইউরোপের অগণিত সামন্তপ্রভু ও ভূমিদাসদের যোগদান এবং তাদের অধিকাংশের মৃত্যু সামন্ততন্ত্রের ভিত্তিকে দুর্বল করে দিয়েছিল।  

4) বাণিজ্য বিস্তার : গবেষক পল সুইজির মতে, একাদশ শতকের শেষদিক থেকে ইউরোপের বাণিজ্য বিস্তার এবং দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতকের নগরায়ণের ফলে সামন্ততান্ত্রিক কাঠামো ক্রমশ ভেঙে পড়তে শুরু করেছিল। কারণ সামন্ত ব্যবস্থা ছিল কৃষি নির্ভর গ্রামীণ ব্যবস্থা।

5) জনসংখ্যা হ্রাস : ঐতিহাসিক লাদুরি ও পোস্তান-এর মতে, চতুর্দশ ও পঞ্চদশ শতকে যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ ও প্লেগের ফলে ইউরোপের জনসংখ্যা হ্রাস পায় এবং জমির অনুপাতে কৃষক ও ভূমিদাসের স্বল্পতার কারণে সামন্ততান্ত্রিক উৎপাদন ব্যাহত হয়।

উপসংহার: এইভাবে সামন্ততন্ত্রের অভ্যন্তরীণ স্ববিরোধিতা, ম্যানর প্রথায় উৎপাদনের সীমাবদ্ধতা, ভূমিদাস প্রথার অবসান, বাণিজ্যবিস্তার ও শহরের উত্থান প্রভৃতি কারণে চতুর্দশ শতকে একদিকে সামন্ততন্ত্রে সংকটের সৃষ্টি করেছিল। অন্যদিকে ধনতন্ত্রের উত্থানের পথ প্রশস্ত করেছিল।




প্রশ্ন : কৃষিক্ষেত্রে রূপান্তর ও সম্প্রসারণ কীভাবে হয়েছিল?

ভূমিকা : ষোড়শ শতক থেকে ইউরোপে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পায় ও কৃষিপণ্যের মধ্যে বৈচিত্র্য দেখা যায়। পনেরো শতকের মাঝামাঝি থেকে সতেরো শতক পর্যন্ত কৃষিক্ষেত্রে যে ব্যাপক রূপান্তর ঘটে তার মধ্যে তিনটি বিষয় ছিল তাৎপর্যপূর্ণ।

1) সামন্ততন্ত্রের পতন: সামন্ততন্ত্রের পতনের ফলে ভূমির মালিকানায় পরিবর্তন ঘটে, ভূস্বামী ও কৃষকদের হাতে কৃষিযোগ্য জমির পরিমাণ বৃদ্ধি পায়।

2) নতুন প্রযুক্তি : কৃষিক্ষেত্রে নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন শুরু হয়। লোহা দিয়ে তৈরি লাঙলের ফলা, কোদাল, খুরপি, কাস্তে প্রভৃতি সাজসরঞ্জাম ব্যবহারের ফলে কৃষিতে উৎপাদনের হার বাড়ে, এ ছাড়া জলসেচ ব্যবস্থাতেও প্রভূত উন্নতি ঘটে।

3) সমুদ্র অভিযান : সামুদ্রিক অভিযানের ফলে ইউরোপের জনগণ নানারকম ফল, সবজির সঙ্গে পরিচিত হয়। আলু, ভুট্টা, ফুলকপি, বিন, মটরশুঁটি, বাদাম, ধান, তামাক, কোকো, কফি, আনারস, টম্যাটো এইসব ফল ও খাদ্যশস্যের উৎপাদন শুরু হয়। ফলে ইউরোপের কৃষি অর্থনীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন হয়।



প্রশ্ন: ইটালিতে প্রথম নবজাগরণ ঘটেছিল কেন?

উত্তর : ভূমিকা : পঞ্চদশ-ষোড়শ শতকে প্রথমে ইটালির ফ্লোরেন্সে ও পরে পশ্চিম ইউরোপে ধ্রুপদি গ্রিক ও রোমান শিক্ষাসংস্কৃতির পুনর্জন্ম ঘটেছিল এবং এর ফলে পশ্চিম ইউরোপে যে নতুন সাংস্কৃতিক ও মানসিক পুনরুজ্জীবন ঘটেছিল তা রেনেসাঁস তথা নবজাগরণ নামে পরিচিত।

ইটালিতে নবজাগরণের কারণ : ইটালিতে প্রথম নবজাগরণ ঘটেছিল, যার কারণগুলি ছিল :

1) পৃষ্ঠপোষক ইটালি : 1453 খ্রিস্টাব্দে কনস্ট্যান্টিনোপলের পতনের পর গ্রিক-রোমান সংস্কৃতির চর্চাকারী পণ্ডিতরা তাদের মূল্যবান পুথিপত্র সঙ্গে নিয়ে মূলত ইটালির বিভিন্ন শহরে আশ্রয় নিয়েছিলেন এবং গ্রিক-রোমান সংস্কৃতিচর্চার ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছিলেন।

2) ইটালির ব্যাবসাবাণিজ্য : ভূমধ্যসাগরের তীরে অবস্থিত মিলান, ভেনিস, ফ্লোরেন্স, জেনোয়া প্রভৃতি নগরগুলি ব্যাবসাবাণিজ্যের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। এইসব নগরগুলির শাসক এবং বিত্তশালী বণিক ও নাগরিকরা তৎকালীন খ্যাতনামা চিত্রশিল্পীদের গ্রিক-রোমান সংস্কৃতির চর্চায় অর্থ সাহায্য ও উৎসাহদান করে পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন। নয়নাভিরাম ছবি, প্রাসাদ ও শিল্পসৌন্দর্যের প্রতি এইসব বণিকদের তীব্র আকর্ষণ ছিল।

3) শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উদ্যোগ : ইটালির একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উদ্যোগ গ্রিক-রোমান সংস্কৃতির চর্চা নবজাগরণকে সম্ভব করে তুলেছিল।

4) ইটালির নাগরিক সংস্কৃতি : মধ্যযুগীয় সামন্ততান্ত্রিক প্রভাবমুক্ত ইটালির নগরগুলির নাগরিক সংস্কৃতি নবজাগরণের উদ্ভবে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিল, কারণ নগরগুলির নাগরিকদের মনে জন্মেছিল স্বাধীন চিন্তাধারা ও অজানাকে জানার আগ্রহ।



প্রশ্ন: টীকা লেখো : মানবতাবাদী সাহিত্য।

উত্তর : ভূমিকা : ইটালি তথা ইউরোপের নবজাগরণের প্রকাশের উল্লেখযোগ্য দিকগুলি ছিল গ্রিক-রোমান সংস্কৃতির পুনর্জন্ম, মানবতাবাদী চিত্রাঙ্কন ও সাহিত্য।

মানবতাবাদী সাহিত্য : নবজাগরণের সময়কালের মানবতাবাদী সাহিত্যের বিভিন্ন দিকগুলি ছিল :

1. ইটালি : ইটালির মানবতাবাদী সাহিত্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল (ক) কথ্য ভাষায় রচিত দান্তের 'ডিভাইন কমেডি' গ্রন্থে ইটালির প্রচলিত ধ্যানধারণার সমালোচনা প্রকাশ পেয়েছিল; (খ) ‘নবজাগরণের জনক' রূপে পরিচিত ফ্রান্সিসকো পেত্রার্ক ইউরোপীয় সাহিত্যে ‘সনেট’ বা চতুর্দশপদী কবিতা রচনা করেন। সনেটের মাধ্যমে জ্ঞানজগতের ক্ষেত্রে ল্যাটিন চার্চের কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ জানান; (গ) গিয়োভানি বোকাচ্চিও ছিলেন ইতালীয় গদ্য সাহিত্যের জনক, ল্যাটিন ও ইতালীয় ভাষায় পদ্য রচনাকারী এবং তাঁর প্রসিদ্ধ গ্রন্থ হল ‘ডেকামেরন’; (ঘ) নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি “The Dis courses' ও 'The Prince' গ্রন্থ রচনার মাধ্যমে মানবতাবাদী ও ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক চিন্তাধারা তুলে ধরেছিলেন।

2) ইংল্যান্ড : মানবতাবাদী সাহিত্য রচনার ক্ষেত্রে ইংল্যান্ড বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিল, যেমন : (ক) প্রাক্-নবজাগরণ পর্বে মানবতাবাদী জিওফ্রে চসার মধ্যবিত্ত সমাজের জীবন ও প্রচলিত ধর্মের প্রতি সাধারণ মানুষের অশ্রদ্ধাকে তুলে ধরেছিলেন ‘ক্যান্টারবেরি টেলস' নামক গ্রন্থে; (খ) এডমন্ড স্পেনসার ও দার্শনিক ফ্রান্সিস বেকন ছিলেন উল্লেখযোগ্য মানবতাবাদী লেখক, (গ) ইংরেজি সাহিত্যে সর্বশ্রেষ্ঠ মানবতাবাদী কবি ও নাট্যকার ছিলেন শেকসপিয়র। মানুষের সুখ-দুঃখ, আশা-আকাঙ্ক্ষাকে কেন্দ্র করে তিনি বহু বিয়োগান্তক ও মিলনান্তক কাব্য (জুলিয়াস সিজার’, ‘হ্যামলেট’, ‘ওথেলো’, ‘ম্যাকবেথ’ প্রভৃতি) রচনা করেন।


3) অন্যান্য দেশ : ইটালি ও ইংল্যান্ড ব্যতীত নেদারল্যান্ডের পণ্ডিত ইরাসমাস, স্পেনের সার্ভেস্তিস, ফ্রান্সের রাচেলে প্রমুখের রচনায় মানবতাবাদী আদর্শের প্রতিফলন পড়েছিল।



প্রশ্ন : যুদ্ধ প্রযুক্তির নানা উদ্ভাবনের কারণ ও উদ্ভাবনগুলি চিহ্নিত করো।

উত্তর: ভূমিকা : পঞ্চদশ-ষোড়শ শতকে জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রগতির পাশাপাশি যুদ্ধ প্রযুক্তির আদলে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। এগুলির কারণ ছিল : 

(ক) সামরিক সাহায্য : সামন্ততান্ত্রিক পরিকাঠামোয় ঊর্ধ্বর্তন প্রভুকে অধস্তন কর্তৃক সামরিক সাহায্য প্রদানের রীতির সীমাবদ্ধতা; 

(খ) শাসকের প্রচেষ্টা : স্বৈরাচারী শাসক কর্তৃক কেন্দ্রীভূত শাসন প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা ও অন্যান্য রাজ্য বা দেশ জয়ের প্রচেষ্টায় সৈন্যবাহিনীর উপর নিয়ন্ত্রণ স্থাপন; 

(গ) আর্থিক সচ্ছলতা : সামন্ততান্ত্রিক অর্থনীতির ক্রমিক অবক্ষয় ও ব্যাবসাবাণিজ্যের সম্প্রসারণ ঘটলে রাজাদের আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্যও বৃদ্ধি পায়, ফলে তাঁরা সামরিক ক্ষেত্রে পরীক্ষানিরীক্ষার জন্য অর্থ বরাদ্দে সক্ষম হয়েছিলেন।

*যুদ্ধ প্রযুক্তির নানাদিক : যুদ্ধ প্রযুক্তির নানান দিক ছিল :

(ক) বারুদের ব্যবহার : ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ধাতুনির্মিত গোলা বা হাত কামানের মতো গোলাবর্ষণকারী যন্ত্রের ব্যবহার শুরু হয়। এর ফলে শত্রুপক্ষের দুর্গের দেয়াল বা দরজা ধ্বংস করা সহজ হয়েছিল।

(খ) দুর্গ নির্মাণ পদ্ধতি পরিবর্তন: কামানের আবিষ্কার ও তার ব্যাপক ব্যবহার দুর্গ নির্মাণ রীতির ক্ষেত্রেও পরিবর্তনকে অপরিহার্য করে তুলেছিল। ইতিপূর্বের শক্ত দেয়ালবেষ্টিত দুর্গের পরিবর্তে পঞ্চদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে করাতের দাঁতের ন্যায় অনিয়মিত রেখায় দুর্গ প্রাচীর নির্মাণের উপর জোর দেওয়া হয়। প্রথমে উত্তর ইটালিতে পরে ফ্রান্সের উত্তর-পূর্ব সীমান্তে প্রচুর সংখ্যক এরূপ রক্ষণাত্মক দুর্গ তৈরি করা হয়েছিল। তবে এ ধরনের দুর্গও অভেদ্য ছিল না।

(গ) পদাতিক বাহিনীর অস্ত্রে পরিবর্তন: আগ্নেয়াস্ত্র আবিষ্কারের পরবর্তী পর্যায়ে পদাতিক বাহিনীর ব্যবহৃত অস্ত্রেও পরিবর্তন সাধিত হয়। চতুর্দশ শতকের শেষদিকে পদাতিক বাহিনী পাইক, বল্লম, তিরধনুক ব্যবহারের পাশাপাশি আর্কেবুস (Arquebus) নামক এক ধরনের বন্দুক ব্যবহার শুরু করে। পক্ষান্তরে আর্কেবুস-এর চেয়ে উন্নতমানের বন্দুক ছিল ‘মাস্কেট’; যা ১৫২০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ স্পেনে ব্যবহৃত হয়েছিল।

উপসংহার : যুদ্ধ প্রযুক্তির নানা উদ্ভাবনের ফলে (ক) যুদ্ধ আরও বেশি হিংসাত্মক ও বিপর্যয়কারী হয়ে ওঠে; (খ) বারুদ ও কামানের ব্যবহার ব্যয়সাপেক্ষ হওয়ায় সামন্তপ্রভুদের পক্ষে এই ধরনের যুদ্ধাস্ত্র তৈরি সম্ভব ছিল না, তাই তাদের ক্ষমতা হ্রাস পায় এবং রাজার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।



প্রশ্ন: টীকা লেখো : টমাস হবস।

উত্তর : টমাস হবস, ম্যাকিয়াভেলি ও জাঁ বোঁদা বর্ণিত রাষ্ট্রকর্তৃত্বের ধারণা ইংল্যান্ডের দার্শনিক টমাস হবসের (১৫৮৮-১৬৭৯ খ্রি.) মাধ্যমে তা পরিপূর্ণতা লাভ করে। তাঁর রাষ্ট্রচিন্তার বিভিন্ন দিক হল—

(1) রাষ্ট্রচিন্তার গ্রন্থ : হবসের রচিত গ্রন্থগুলি হল ‘লেভিয়াথান’, ‘ডি কর পোরে’, ‘ডি হোমাইন’ এবং এগুলির মধ্যে ‘লেভিয়াথান’ গ্রন্থটিতেই টমাস হবস তাঁর রাষ্ট্রচিন্তাকে ব্যক্ত করেন। 

(2) রাষ্ট্র মানুষের সৃষ্টি : হবসের মতে, সমাজ, রাষ্ট্র, সরকার কোনো কিছুই প্রকৃত পরিকল্পিত নয় বা ঈশ্বরের ইচ্ছাপ্রসূত নয়, বরং এগুলি সবই মানুষের সৃষ্টি। 

(3) সার্বভৌম শক্তির প্রতিষ্ঠা: নিজেদের মধ্যে এক চুক্তির মাধ্যমেই মানুষ একজন শাসক বা সার্বভৌম শক্তি প্রতিষ্ঠা করেছে। এই সার্বভৌম শাসক নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী।



প্রশ্ন: টীকা লেখো : মুদ্রণ বিপ্লব।

উত্তর : ভূমিকা : নবজাগরণের প্রধানতম স্থায়ী দিকটি হল মুদ্রণ বিপ্লব। এই বিপ্লব ১৪৫০-এর দশকে সংঘটিত হয়েছিল জোহান গুটেনবার্গ, জোহান ফাস্ট ও পিটার শোয়েফার-এর উদ্যোগে।

মুদ্রণ বিপ্লব : মুদ্রণ বিপ্লবের বিভিন্ন দিকগুলি ছিল : 

(ক) ধাতুর উন্নত টাইপ: ১৪৫০-এর দশকে জার্মানির মেইনটজ শহরের জোহান গুটেনবার্গ আলাদা আলাদা অক্ষরের জন্য ধাতুর টাইপযুক্ত ও যতিচিহ্নযুক্ত এক উন্নতমানের মুদ্রণ ব্যবস্থার প্রবর্তন করেছিলেন। তাঁর এই যন্ত্র দ্বারা মুদ্রিত আদি পর্বের বইয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ‘গুটেনবার্গ বাইবেল', যা ১৪৫৪-৫৫ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়েছিল।

(খ) ফাস্ট ও শোয়েফার : জোহান ফাস্ট ও পিটার শোয়েফার-এর মুদ্রণযন্ত্রও ছিল উন্নতমানের এবং এদের মুদ্রণ শিল্প মূলত চার্চ, মঠ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের চাহিদা মেটাত। 

(গ) বই বাঁধানো ও বিক্রয় : মুদ্রণ বিপ্লব বলতে শুধুমাত্র মুদ্রণকেই বোঝায় না, কারণ বই বাঁধানো ও তা বিক্রয়ের ব্যবস্থাও এর অন্তর্গত। গুটেনবার্গ, ফাস্ট ও শোয়েফার প্রমুখ বই বাঁধানো ও বিক্রয়ের ব্যবস্থা করে মুদ্রণ শিল্পকে একটি সংগঠিত শিল্পে পরিণত করেন।

প্রভাব : সমকালীন সমাজ, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির ওপর মুদ্রণ বিপ্লবের প্রভাব ছিল তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ : 

(ক) গ্রন্থ মুদ্রণ অল্প সময়ে উৎকৃষ্টভাবে বেশি সংখ্যক গ্রন্থ ছাপানো সম্ভব হয়। 

(খ) জ্ঞানচর্চার প্রসার : মুদ্রণ বিপ্লব ধ্রুপদি বিদ্যাচর্চা ও জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার অন্যতম সহায়ক উপাদানে পরিণত হয়।

(গ) আঞ্চলিক ভাষার উত্থান : মুদ্রণ বিপ্লব মধ্যযুগের ল্যাটিন ভাষার একাধিপত্যকে খর্ব করে আঞ্চলিক ভাষার উত্থানের সহায়ক হয়ে ওঠে।

(ঘ) সংস্কার আন্দোলন : ভাবধারা প্রচার ও ভাবের আদানপ্রদানের মাধ্যমে মুদ্রণ বিপ্লব ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে ধর্মসংস্কার আন্দোলনের পথ প্রশস্ত করেছিল।



প্রশ্ন: টীকা লেখো : সৌরকেন্দ্রিক মহাবিশ্ব সংক্রান্ত ধারণার উদ্ভব। অথবা, টীকা লেখো : কোপারনিকাস।

উত্তর: ভূমিকা : পঞ্চদশ-ষোড়শ শতকে জ্যোতির্বিজ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে একটি দিক্‌চিহ্ন ছিল কোপারনিকাসের বিপ্লব বা সৌরকেন্দ্রিক মহাবিশ্ব সংক্রান্ত ধারণার উদ্ভব।

কোপারনিকাস : পোলিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও গণিতজ্ঞ নিকোলাস কোপারনিকাস (১৪৫৩-১৫৪৩ খ্রি.) তাঁর গবেষণার মাধ্যমে পৃথিবীকেন্দ্রিক বিশ্ব সম্পর্কিত পরম্পরাগত ভ্রান্ত ধারণার অবসানে সচেষ্ট হন। তাঁর মৃত্যুর কিছুদিন আগে (১৫৪৩ খ্রি.) প্রকাশিত তাঁর ‘On the Revolution of the Celestial Spheres’ গ্রন্থে বেশ কিছু সত্য প্রতিষ্ঠা করেন। 

কোপারনিকাসের তত্ত্ব : কোপারনিকাসের সৌরকেন্দ্রিক মহাবিশ্ব সংক্রান্ত ধারণার বিভিন্ন দিকগুলি ছিল :

(ক) সূর্যকেন্দ্রিক: পৃথিবী স্থির নয়, পৃথিবীই তার কক্ষপথে প্রতি একবছরে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে। তার কথায়, মহাজগতের মধ্যস্থলে সিংহাসনে বিরাজমান হল সূর্য। 

(খ) বুধ ও শুক্র: বুধ ও শুক্র সূর্যের চারদিকে প্রদক্ষিণ করে, তবে তাদের কক্ষপথ পৃথিবীর কক্ষপথের তুলনায় অনেক ছোটো।

(গ) গ্রহের অবস্থান : বুধ ও শুক্র পৃথিবীর তুলনায় সূর্যের নিকটবর্তী এবং মঙ্গল, বৃহস্পতি ও শনি গ্রহরা পৃথিবীর তুলনায় সূর্যের দূরবর্তী।

(ঘ) চন্দ্র, পৃথিবী সম্পর্ক : কোপারনিকাস অ্যারিস্টটলের বক্তব্য (পৃথিবীর সঙ্গে চন্দ্রের সম্পর্ক ছিল অস্তরঙ্গ) মেনে নিয়ে বলেছিলেন চন্দ্র পৃথিবীর সেবায় নিয়োজিত।

উপসংহার: কোপারনিকাসের এই সৌরকেন্দ্রিক মহাবিশ্বের ধারণা বা তত্ত্ব খুব সহজে মান্যতা লাভ করেনি, কারণ মানুষের প্রতিদিনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা (পরস্পর বিপরীত দিকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত) ছিল একেবারেই বিপরীত। পরবর্তীকালে টাইকো ব্রাহে কোপারনিকাসের তত্ত্বের গাণিতিক প্রমাণ উপস্থাপন করেছিলেন।



প্রশ্ন: টীকা লেখো: ভৌগোলিক আবিষ্কারের কারণ।

উত্তর: ভূমিকা: পঞ্চদশ শতকের শেষ ও ষোড়শ শতকের প্রথম দিকে স্পেন ও পোর্তুগালের নেতৃত্বে সামুদ্রিক অভিযানের মাধ্যমে অভিযাত্রীরা ইউরোপের বাইরে বিভিন্ন দেশ আবিষ্কারে সচেষ্ট হয়েছিলেন, যা ভৌগোলিক আবিষ্কার নামে পরিচিত।

ভৌগোলিক আবিষ্কারের কারণ: ভৌগোলিক আবিষ্কারের প্রধানতম কারণ ছিল অজানা ভূখণ্ডকে জানা বা আবিষ্কার করা, তবে এর অন্যান্য কারণগুলি হল :

(ক) বাণিজ্যিক কারণ : ভৌগোলিক আবিষ্কারের প্রধানতম কারণ ছিল বাণিজ্যিক কারণ। মূলত ইউরোপ মহাদেশ সুতিবস্ত্র রেশম, মশলা ইত্যাদির জন্য অন্য মহাদেশের উপর বিশেষত প্রাচ্যের উপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু কনস্ট্যান্টিনোপলের পতনের পর অটোমান সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা প্রাচ্যের সঙ্গে ইউরোপের সমৃদ্ধ বাণিজ্যে অন্তরায় সৃষ্টি করেছিল।

(খ) ধনসম্পদ আহরণ : ইটালির মার্কোপোলো ভারতসহ প্রাচ্যের দেশগুলি ভ্রমণ করে ইউরোপে প্রত্যাবর্তন করে প্রাচ্যের অগাধ ঐশ্বর্য ও সম্পদের কথা প্রচার করেন এবং এই প্রচারের প্রভাবে ইউরোপের বণিকরা প্রাচ্যের সঙ্গে বাণিজ্যের বিষয়ে সচেষ্ট হয়েছিল।

(গ) চাষযোগ্য জমির সন্ধান : বহির্দেশে চাষযোগ্য সন্ধান, অর্থ বিনিয়োগ ও জমির দাসশ্রম সংগ্রহ করা। ছিল ভৌগোলিক আবিষ্কারের কারণগুলির অন্যতম একটি দিক, কারণ পোর্তুগালের বণিক সম্প্রদায় ও সম্পন্ন কৃষকরা আটলান্টিকের কয়েকটি দ্বীপে আখচাষের জন্য জমি সন্ধানে উৎসুক ছিল।

(ঘ) খ্রিস্টধর্ম প্রচার: ভৌগোলিক আবিষ্কারের পশ্চাতে খ্রিস্টধর্ম প্রচারের উদ্দেশ্যও খুব স্বল্পমাত্রায় কাজ করেছিল, কারণ পঞ্চদশ শতকের পূর্বেই খ্রিস্ট ধর্মপ্রচারকরা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছিলেন। পোর্তুগালের প্রিন্স হেনরি আফ্রিকায় সামুদ্রিক অভিযানের মধ্য দিয়ে 'স্বর্ণলাভের’ সঙ্গে ‘স্বর্গলাভের’ স্বপ্নও দেখতেন।

উপসংহার : ভৌগোলিক আবিষ্কারের উপরোক্ত কারণগুলির পাশাপাশি ম্যারিনার্স কম্পাস, অ্যাস্ট্রোলেব প্রভৃতি যন্ত্র ও মানচিত্র সমুদ্রযাত্রাকে পূর্বাপেক্ষা অনেক বেশি নিরাপদ করে তুলেছিল।



প্রশ্ন: ভৌগোলিক আবিষ্কারের ফলাফল কী ছিল?

উত্তর: ভূমিকা : পঞ্চদশ শতকের শেষ ও ষোড়শ শতকের প্রথম দিকে স্পেন ও পোর্তুগালের নেতৃত্বে সামুদ্রিক অভিযানের মাধ্যমে অভিযাত্রীরা ইউরোপের বাইরে বিভিন্ন দেশ আবিষ্কারে সচেষ্ট হয়েছিলেন, যা ভৌগোলিক আবিষ্কার নামে পরিচিত।

ভৌগোলিক আবিষ্কারের ফলাফল : ভৌগোলিক আবিষ্কারের গুরুত্বপূর্ণ ফলাফলগুলি হল— 

(1) ভৌগোলিক পরিধি বিস্তার : স্পেন ও পোর্তুগালের নেতৃত্বে এশিয়া ও আমেরিকার নতুন নতুন এলাকা আবিষ্কারের ফলে ইউরোপীয়দের বিশ্বের আয়তন সম্পর্কে ধারণা পরিবর্তিত হয় ও ভৌগোলিক পরিধির বিস্তার ঘটে।

(2) পৃথিবী গোলাকার : স্পেনের নাবিক ম্যাগেলান ও এলকানোর নেতৃত্বে শুরু হয়েছিল প্রথম জলপথে ভূ-প্রদক্ষিণ। সাফল্যের সঙ্গে তাঁদের এই ভূ-প্রদক্ষিণের ঘটনায় প্রমাণিত হয়েছিল যে, পৃথিবী গোলাকার। ফলে পৃথিবী সম্পর্কিত ইতিপূর্বের ধারণা (পৃথিবী চ্যাপটা, গোলাকার নয়) পরিবর্তিত হয়।

(3) প্রাচীন সভ্যতার আবিষ্কার: ১৫২০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যেই আমেরিকার অধিকাংশ বৃহৎ দ্বীপগুলি স্পেন কর্তৃক আবিষ্কৃত হয়েছিল ও মেক্সিকোর আজটেক ও ইন্কা সভ্যতাও আবিষ্কৃত হয়েছিল।

(4) সমুদ্র বাণিজ্যের বিস্তার: মধ্যযুগের শেষদিকে মধ্যপ্রাচ্যে আরবদের আধিপত্য গড়ে ওঠায় ইউরোপের সঙ্গে প্রাচ্যের বাণিজ্য হ্রাস পেয়েছিল, কিন্তু ভাস্কো-ডা-গামা কর্তৃক আটলান্টিক মহাসাগর হয়ে ভারতসহ প্রাচ্য দেশগুলিতে আসার জলপথ আবিষ্কারের ফলে সমুদ্র বাণিজ্য বিস্তৃত হয়েছিল। ভৌগোলিক আবিষ্কারের ফলে বণিক সম্প্রদায় সমৃদ্ধিশালী হয়ে ওঠে এবং ধনতন্ত্রের আগমনের সূচনা হয়।

(5) খ্রিস্টধর্মের প্রসার : ভৌগোলিক আবিষ্কারের ফলে খ্রিস্টধর্মের প্রসার ঘটে ফলে খ্রিস্টধর্ম পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে।