বৃক্কের সঙ্গে নেফ্রনের সম্পর্ক কী?
নেফ্রনকে বৃক্কের গঠনগত ও কার্যগত একক বলে। অর্থাৎ, বৃক্ক ও নেফ্রন পরস্পর গঠন ও কার্যগত দিক থেকে সম্পর্কযুক্ত। যথা—
1. গঠনগত সম্পর্ক: প্রতিটি বৃক্ক অসংখ্য নেফ্রন দিয়ে গঠিত। তাই নেফ্রন বৃক্কের গঠনগত একক।
2. কার্যগত সম্পর্ক: বৃক্কের প্রধান কাজ হল মূ উৎপাদন করা। এই মূত্র উৎপাদন পদ্ধতিটি নেফ্রনের মধ্যেই সংঘটিত হয় | সুতরাং, নেফ্রন বৃক্কের কার্যগত একক।
নেফ্রনের প্রধান অংশগুলির নাম লেখো।
নেফ্রনে প্রধান দুটি অংশ হল– ম্যালপিজিয়ান কণিকা ও বৃক্কীয় নালিকা | ম্যালপিজিয়ান কপিকা বাওম্যান্স ক্যাপসুল ও গ্লোমেরুলাস, এই দুটি অংশ নিয়ে গঠিত। বৃক্কীয় নালিকার তিনটি অংশ—নিকটবর্তী সংবর্ত নালিকা, হেনলির লুপ এবং দূরবর্তী সংবর্ত নালিকা।
ম্যালপিজিয়ান করপালের অবস্থান ও কাজ লেখো।
অবস্থান: ম্যালপিজিয়ান করপাসূল মেরুদণ্ডী প্রাণীর বৃক্কের কর্টেক্স অঞ্চলে অবস্থিত। এটি নেফ্রনের মুক্ত প্রান্তে অবস্থিত ফানেল সদৃশ অংশ।
কাজ: গ্লোমেরুলাস অংশ দূষিত রেচন পদার্থযুক্ত রক্তকে পরিস্রুত করে এবং বাওম্যান্স ক্যাপসুল অংশ পরিস্রুত তরল সংগ্রহ করে বৃক্কীয় নালীতে প্রেরণ করে।
গ্লোমেরুলাস কী ? এর কাজ উল্লেখ করো।
গ্লোমেরুলাস: মেরুদণ্ডী প্রাণীর বৃক্কের ম্যালপিজিয়ান করপাসূলের বাওম্যান্স ক্যাপসুল দ্বারা পরিবৃত রক্তজালককে গ্লোমেরুলাস বলে।
কাজ: গ্লোমেরুলাস আল্ট্রা-ফিলটার (ultra-filter) বা পরাপরিস্রাবকের কাজ করে। এর মাধ্যমে দূষিত রেচন পদার্থ মিশ্রিত রক্ত পরিস্রুত হয় এবং গ্লোমেরুলার পরিস্রুত (glomerular filtrate) উৎপন্ন হয়।
পোডোসাইট কোশ কাকে বলে? এর কাজ কী?
পোডোসাইট : বাওম্যান্স ক্যাপসুলের ভিতরের দিকে গ্লোমেরুলাসকে ঘিরে বিন্যস্ত (ভিসেরাল স্তর) অ্যামিবার মতো ক্ষণপদ বা পেডিসেল-যুক্ত যে সমস্ত কোশ থাকে তাদের পোডোসাইট বলে।
কাজ: পোডোসাইট কোশগুলির পেডিসেল বা পদগুলি মিলে যে পরিস্রাবন ঝিল্লি তৈরি করে। এটি বৃহৎ প্রোটিন, রক্তকণিকা প্রভৃতি বাদে জল, লবণ, শর্করা ছেঁকে পৃথক করে মূত্র উৎপাদনে সাহায্য করে।
ব্রাশ বর্ডার কী ও কোথায় তা দেখা যায় ?
ব্রাশ বর্ডার: মূলত নিকটবর্তী সংবর্ত নালিকার (PCT) প্রাচীর গাত্রের কোশে আঙুলের মতো অভিক্ষেপ বা মাইক্রোভিলাই দেখা যায়। এগুলিকে একত্রে ব্রাশ বর্ডার বলে।
JGA কাকে বলে ? এর কাজগুলি লেখো।
JGA: নেফ্রনের দূরবর্তী সংবর্ত নালিকা এবং অন্তর্মুখী ধমনিকার সংলগ্ন হলে সেই অংশের কোশগুলি পরিবর্তিত হয়ে বিশেষ কোশগুচ্ছ তৈরি করে। এদের একত্রে JGA বা জাক্সটাগ্লোমেরুলার অ্যাপারেটাস বলে | JGA এর কোশগুলি হল—দূরবর্তী সংবর্ত নালিকার ম্যাকুলা ডেনসা কোশ, অন্তর্মুখী ধমনিকার ম্যাকুলা ডেনসা কোশ এবং তাদের সাথে বিন্যস্ত ল্যাসিস কোশ |
কাজ: JGA-এর কাজগুলি হল— 1. রেনিন হরমোন ক্ষরণ করার মাধ্যমে রক্তবাহকে সংকুচিত করে রক্তচাপ বৃদ্ধি করা। 2. গ্লোমেরুলাসে পরিস্রাবণ হার নিয়ন্ত্রণ করা।
হেনলির লুপের অবস্থান ও কাজ উল্লেখ করো।
অবস্থান: হেনলির লুপ মেরুদণ্ডী প্রাণীর বৃক্কের মেডালা অঞ্চলে অবস্থিত। এটি নেফ্রনের বৃক্কীয় নালিকার ‘U' আকৃতিবিশিষ্ট অংশ |
কাজ: এই অংশে নেফ্রনের পরিস্রুত তরলের প্রয়োজনীয় উপাদানের পুনঃশোষণ ঘটে।
সংগ্রাহী নালিকা কাকে বলে?
নেফ্রনের প্রতিটি বৃক্কীয় নালিকার শেষপ্রাপ্ত অপেক্ষাকৃত যে মোটা নালিকার সঙ্গে যুক্ত থাকে তাকে সংগ্রাহী নালিকা * (collecting tubule) বলে | অনেকগুলি সংগ্রাহী নালিকা মিলিত হয়ে বেলিনির নালিকা (duct of Bellini) গঠন করে। নেফ্রনে উৎপাদিত মূত্র এই অংশে সস্কৃিত হতে থাকে এবং তা ধীরে ধীরে গবিনীর মধ্যে প্রবেশ করে।
নেফ্রনের কাজ কী?
নেফ্রনের কাজ হল— 1. প্রোটিন বিপাকের ফলে উদ্ভূত নাইট্রোজেনঘটিত বর্জ্য পদার্থকে মূত্রের মাধ্যমে দেহ থেকে ত্যাগ করা। 2. দেহের জলসাম্য বজায় রাখা। 3. রক্তে অম্ল-ক্ষারের সাম্যাবস্থা বজায় রাখা। 4. হিপপিউরিক অ্যাসিড, অ্যামোনিয়া, অজৈব ফসফেট ইত্যাদির সংশ্লেষ ঘটিয়ে, মূত্রে তাদের নিঃসরণ করা। 5. রেনিন (renin) নামক প্রোটিওলাইটিক উৎসেচক নিঃসরণের মাধ্যমে। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে অংশগ্রহণ করা।
মূত্র কী? অথবা, মূত্রের সংজ্ঞা লেখো।
মূত্র হল মেরুদণ্ডী প্রাণীদের নেফ্রনে উৎপন্ন বিভিন্ন রেচন পদার্থ-সমন্বিত একপ্রকার স্বচ্ছ, ফিকে হলদে বর্ণের, অম্লধর্মী ঝাঝালো গন্ধযুক্ত তরল পদার্থ |
নেফ্রনে মূত্র তৈরির পর্যায়গুলির নাম লেখো।
নেফ্রনে মূত্র তৈরির পর্যায়গুলি হল— রক্তের পরাপরিস্রাবণ, আয়নের সক্রিয় পুনঃশোষণ, রেচন পদার্থের ক্ষরণ ও জলের নিষ্ক্রিয় পুনঃশোষণ |
মূত্রের মাধ্যমে নির্গত রেচন পদার্থগুলি কী কী ?
মানুষের মূত্রের প্রধান রেচন পদার্থ হল—ইউরিয়া, ইউরিক অ্যাসিড, অ্যামোনিয়া ও কিটোন বড়ি |
মূত্রের দুটি স্বাভাবিক উপাদানের নাম লেখো।
মূত্রের দুটি স্বাভাবিক উপাদান হল ইউরিয়া ও ক্রিয়েটিনিন।
মূত্রে প্রোটিনের এবং শর্করার উপস্থিতিজনিত অবস্থাকে কী বলে?
মূত্রে প্রোটিনের উপস্থিতি: মূত্রে প্রোটিনের উপস্থিতিকে বলে প্রোটিনুরিয়া।
মূত্রে শর্করার উপস্থিতি: মূত্রে শর্করার উপস্থিতিকে বলে গ্লাইকোসুরিয়া।
গ্লোমেরুলার পরিসুত বা গ্লোমেরুলার ফিলট্রেট কী?
নেফ্রনের গ্লোমেরুলাসে পরিস্রাবণ চাপের প্রভাবে যে তরল পরিস্রুত হয়, তাকে গ্লোমেরুলার ফিলট্রেট বা গ্লোমেরুলার পরিস্রুত বলে। এর দৈনিক মান 180 লিটার।
গ্লোমেরুলার পরিসুত তরলকে মূত্র বলা যায় না কেন? অথবা, মানব নেফ্রনের গ্লোমেরুলাস নিঃসৃত তরলের সঙ্গে মূত্রের উপাদানগত পার্থক্য লেখো।
গ্লোমেরুলার পরিস্রুত মূত্র তৈরির প্রাথমিক পদ্ধতি, ফলে এতে রক্তকণিকা ও প্লাজমা প্রোটিন ছাড়া রক্তরসের অধিকাংশ উপাদান উপস্থিত থাকে | পরবর্তী পর্যায়ে এর সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান (খনিজ, জল, শর্করা প্রভৃতি) বৃক্কীয় নালিকায় শোষিত হয় ও বাকি রেচন পদার্থপূর্ণ অংশ মূত্র বলে গণ্য হয়।
দূরবর্তী সংবর্ত নালিকায় উৎপন্ন একটি হরমোনের নাম ও কাজ লেখো।
দূরবর্তী সংবর্ত নালিকায় উৎপন্ন একটি হরমোনের নাম হল অ্যান্টি ডাইইউরেটিক হরমোন বা ADH | এই হরমোন দূরবর্তী সংবর্ত নালিকা থেকে জলের পুনঃশোষণে সাহায্য করে।
ডায়াবেটিস ইনসিপিডাস কাকে বলে?
মানবদেহে ADH বা ভ্যাসোপ্রেসিন হরমোন কম ক্ষরণের ফলে বৃক্কীয় নালীতে জল পুনঃশোষণ হ্রাস পায় | ফলে দৈনিক প্রচুর পরিমাণ মূত্র সৃষ্টি হয়। এই রোগকে ডায়াবেটিস ইনসিপিডাস বলে |
রেচনে ‘যকৃতের’ দুটি ভূমিকা উল্লেখ করো।
রেচনে যকৃতের দুটি ভূমিকা হল— অরনিথিন চক্রের মাধ্যমে ইউরিয়া তৈরি করা এবং বিলিরুবিন, বিলিভারডিন, লেসিথিন ইত্যাদি রেচন পদার্থ সৃষ্টি করে, পিত্তের মাধ্যমে পৌষ্টিকনালীতে নিঃসরণ করা।
ত্বককে আনুষঙ্গিক রেচন অঙ্গ বলার দুটি কারণ বলো।
ত্বককে রেচন অঙ্গ বলা হয় কারণ— 1. ত্বক দ্বারা ঘামের মাধ্যমে সোডিয়াম ক্লোরাইড,সামান্য মাত্রায় কার্বন ডাইঅক্সাইড, ইউরিয়া রেচিত হয়। 2. ত্বকের ডারমিস স্তরে অবস্থিত সিবেসিয়াস গ্রন্থি থেকে সিবাম ক্ষরিত হয়। এর দ্বারা ফ্যাটি অ্যাসিড, গ্লিসারল,কোলেস্টেরল রেচিত হয়।
ফুসফুসকে রেচন অঙ্গ বলা হয় কেন ?
ফুসফুসকে রেচন অঙ্গ বলা হয় কারণ— 1. ফুসফুসের মাধ্যমে শ্বসনজাত কার্বন ডাইঅক্সাইড গ্যাস নিশ্বাস দ্বারা যুক্ত হয়। 2. নিশ্বাস বায়ুর সঙ্গে অ্যাসিটোন, জলীয় বাষ্প, অ্যালকোহল প্রভৃতি উপাদানও রেচিত হয়।
